Showing posts with label হা হা হি হি!!. Show all posts
Showing posts with label হা হা হি হি!!. Show all posts

Monday, 21 December 2020

মহাভারত ও পাটিসাপ্টা

 

সাতসকালে কড়ে আঙ্গুলের আকারের দেড়খানি কলা, দড়কচা মার্কা ছিল বলে অর্ধেকটা ফেলে দিতে হল, আর সাথে দুটি ঘসঘসে বিস্কুট আর চা। তারপর থেকে এই যে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল, খাবার কথা কারো মনেই নেই যেন। একা খাবার কথা ছিল না আজকে। সুতরাং অপেক্ষা করতেই হয়। খিদের জ্বালায় দু কুঁচি শশা, গাজর চিবিয়েছি ছাগলের মত। সেসব আবার খিদের সময় অনুঘটকের কাজ করে। পেটের ভেতর ইল্বল, বাতাপি একসঙ্গে ভীমপলশ্রীর আরোহণ সেই যে শুরু করেছে তার আর অবরোহণের নামটি নাই। ইচ্ছে করে দুবাক্স খাবার একাই খেয়ে ফেলি। কিন্তু সেসব তো আর করা যায় না। পেটে কিল মেরে রোদ খাচ্ছি তাই। এমন শীতের রোদ্দুর! এমন সময় চাট্টি গরম ফুরফুরে ভাত আর পোস্তর বড়া একখানা পাওয়া গেলে, আহা রে! এই বড়া বলতে মনে পড়লো, একজনের কি যেন একটা ভাল দিনে সাথে থেকেছিলুম বলে সে বেজায় উদার হয়ে বলেছিল, “কি খাবি বল খাওয়াব।“ তা আমি বাঙালি ভোজনপটীয়সী নোলা সামলে বললুম “কদ্দিন বড়ার ঝাল খাইনি।“ এ বড়া অবশ্য বড়োলোক পোস্তর বড়া নয়। নেহাতই ডালের বড়ার ঝাল। এ জিনিস আমি শয়নে-স্বপনে- জাগরণে সর্বদাই খেতে পারি। করে খাওয়ানোর লোক পাওয়া ইদানিং দুস্কর বলে মাঝে মধ্যে বিরহ অসহ্য হলে নিজেই নিজের জন্য বানিয়ে খাই। তা এমন উদার “কি খাবি বল?” আবাহন শুনে স্বাভাবিক ভাবেই বড়ার ঝাল ছাড়া আর কিই বা মনে আসে! তা সে নাকি আমায় ছুটির দিনে সে জিনিস বানিয়ে খাওয়াবে বলেছিল। তারপর অবশ্য দু-দুটো ছুটির দিন কেটে গেছে। আমার বড়া এখন ডালের কৌটোর ভেতরেই বিরাজ করছে। যাক গে, পেলে ভালো নইলে বানিয়েই নেবো। এসবে কি আর আমি ডরাই, সখি! 

এই যে, বসে বসে খটমট করে টাইপ করতে করতে কটা মনের কথা কইছি, তাতেও মাঝে মধ্যে শীতের খাবার-দাবারের কথা মনে করে প্রাণটা হু হু করে উঠছে। বাড়ি গেলে ঘরে-বাইরে কতই না খাবারের অনুসঙ্গ। এই মনে কর, সকালে ডাইজেস্টিভ বিস্কুট আর চা এর বদলে সাদা সাদা ফুলকো লুচি আর ঝাল-ঝাল আলুর তরকারি, মটরশুঁটি আর ধনেপাতার অলংকারসহ। তারপর মনে কর, তার সঙ্গে যদি একখানি পন্ডিতের দোকানের নলেন গুড়ের রসগোল্লা জুটেই যায়, তাহলে তো! যাক যে যাক, এসব মনে করে বড় বড় শ্বাস বের হয়ে আসছে। কদিন ধরে পিঠে আর পাটিসাপ্টার জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফেলে প্রায় লোকজনের মনে সন্দেহই ঢুকিয়ে দিচ্ছিলুম যে নির্ঘাত এ ব্যাটার কোভিড হয়েছে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। সেদিন আর থাকতে না পেরে নিজেই কটা রেসিপি ইত্যাদি দেখে পাটিসাপ্টা বানাতে গেলুম। ভেতরের পুরটা আদতে ক্ষীরের হবার কথা। কিন্তু অত করার ধৈর্য্য থাকলে তো হয়েই যেত! এমনই মরিয়া দশা যে ফ্রিজে দুধের বোতল নেই দেখে সেটা আর দোকান থেকে আনার পর্যন্ত তর সইলো না। কফির জন্যে রাখা কফিমেটের কৌটোটা হাতে পেয়েই- 'জয়তারা, এইটাই গুলে ঢেলে দেব', বলে কানে মহাভারত গুঁজে শুরু করে দিলুম। নারকেলের গুঁড়ো, ফ্রিজে থেকে থেকে প্রায় জীবাশ্ম পর্যায়ে চলে যাওয়া একখাবলা গুড় আর খানিকটা কফিমেটের গুঁড়ো মিশিয়ে একখানা মিষ্টি মণ্ড তৈরী হলো। যেটা দেখিয়ে- এই দেখ 'পাটিসাপ্টার পুর' বললে আমার মা কেন, আমার গোপালনগরের বাড়ির বেড়ালটাও হাসবে। একবার মনে হলো যাক যা হয়েছে হয়েছে। একে নিয়ে আর উচ্চাশা করে লাভ নেই। এইটাই নাড়ুর মত পাকিয়ে খেয়ে নিই বরং। কিন্তু কানের ভেতর দিয়ে ততক্ষণে গলগল করে ঢুকে যাচ্ছে অরণি, উপমন্যু আর বেদ এর পরম অধ্যবসায় আর শত প্রলোভনেও লক্ষ্যে স্থির থাকার কাহিনী। আমিও পূর্বপুরুষদের সেসব সুকীর্তির কথা শুনে সেই কুক্ষনেই ভুল করে লক্ষ্যে স্থির থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললুম। যতক্ষণে বুঝতে পারলুম যে ভুলটা করেই ফেলেছি ততক্ষনে দেখি হাতে চালের গুঁড়ো, ময়দা-টয়দা আর ভগবান জানেন কি কি মিশিয়ে একটা ট্যালট্যালে গোলার বাটি হাতে মুখ ভেটকে দাঁড়িয়ে আছি। ইয়ারফোনে শুনি মহাভারতের ব্যাখ্যাকার বলছেন-'অনুশোচনা রাখবে না, কাজের ভালো মন্দ কিছু হয় না। কাজ কাজই।' মহাভারতেরই কোনো উপকাহিনীর ব্যাখ্যা দিচ্ছেন নিশ্চয়ই। আমি মাঝখানে কিছুক্ষন শুনিনি বোধহয়। তাল পাচ্ছিনা। এরপরেও ফেঁদে বসা কাজ শেষ না করলে মহাভারত রচয়িতা ঠিক পাপ দেবেন। "জয় বেদব্যাস" বলে একহাতা ওই ট্যালট্যালে বস্তুটি ফ্রাইং প্যানে ঢেলে দিয়ে আর এক হাত দিয়ে জিমন্যাস্টিকের স্টাইলে তাকে ছড়িয়ে দিতে গিয়ে দেখি সে ব্যাটা প্যানের গায়ে সেঁটে গেছে। তাকে নাড়াতে না পেরে আর এক হাতা। তারপর আরো একহাতা। এই করে যতক্ষণে ব্যাপারটা পুরো প্যানে ছড়ালো ততক্ষনে সেটা আর পাটিসাপ্টার পাতলা ফুরফুরে খোল নয়, মোটা কাঁথার মতো ধুসকো একটা কি যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

তারপর আর কি? সেই কাঁথার মধ্যে নারকেল গুঁড়ো, প্রাগৈতিহাসিক গুড় আর কফিমেটের মন্ডটা যত্ন করে শুইয়ে কাঁথা দিয়ে মুড়ে বাক্সে তুলে দিলুম। যতই হোক, সুচিন্তা নিয়ে শুরু করা কাজ যত্ন করে শেষ করতে হয়। তার পরিণতির কথা না ভেবেই। মহাভারতে বলা আছে।  

এই সেই কাঁথায় মোড়া নারকেলের মন্ড 

  

Sunday, 29 November 2015

চা টা খাবো

Google image থেকে 

গদাম কয় গদামি
জানি তোর বদামি।
আমরা দুটি গাধা রে
গান ধরেছি সা ধা রে।
সুরের চোটে ফাটল ছাদ
সেই থেকে সুর রইল বাদ।
সেই থেকে মন বেজায় ব্যোম
হাত পা ছুঁড়ি দমাদ্দম।
হাত পা ছুঁড়ে ভাঙ্গল কাপ
চা টা খাব কোথায় বাপ?
একটা বাটিও নেই বাকি?
ঠিক বলছ? বাপরে সেকি?
এতো দেখি বেজায় রাগ!
আচ্ছা ছাড়ো, যাক গে যাক।
এবার চল চা টা খাবো
কাপটা না হয় আমিই দেব।
সেই ভাল বেশ চলো চলো
মনটা বরং হবে ভালো।

Friday, 20 March 2015

স্লীপিং ব্যাগ ও স্লীপার ক্লাস

সার্কাস-১,  যখন লিখেছিলাম তখন যাবার সময় ট্রেনে স্লীপিং ব্যাগে ঘুমোনো হলনা বলে অনেক কাঁদুনি গেয়েছিলাম। আপনারা ভেবেছিলেন হয়ত, “কি আশ্চর্য! স্লীপিং ব্যাগ নিয়ে এত আদেখলাপনা কেন রে বাবা?” তখনই আপনাদের বলেছিলাম যে এই আদেখলাপনার যথেষ্ট কারণ আছে। আমরা দুজনেই এদিক ওদিক বেরিয়ে পড়তে ভালবাসি ঠিকই কিন্তু দুজনের কেউই বড়সড় অ্যাডভেঞ্চার করতে যাইনি কখনও যেখানে স্লীপিং ব্যাগ বিষয়টি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বস্তু বলে মনে হতে পারে। তবুও আমরা যে কেন হুড়মুড়িয়ে গুচ্ছের টাকা খরচ করে স্লীপিং ব্যাগ কিনেছিলাম তার একটা দুর্দান্ত ইতিহাস আছে। আজকে আপনাদের সেই মারাত্মক অভিজ্ঞতার কথাই বলব বলে ঠিক করেছি। 

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা তিনজন যোধপুর যাব বলে ঠিক করলাম। তিনজন মানে আমরা দুজন আর আমাদের এক বন্ধু কাম বোন। ঘটনাচক্রে সে আর আমি সমনামধারিণী। এক্ষেত্রেও যাওয়া-আসার
 টিকিট এবং হোটেল বুকিং কনফার্ম ছিল। সুতরাং আমাদের পূর্ববর্তী ভ্রমণের ইতিহাস অনুসারে কিছু একটা গন্ডগোল হবারই ছিল। কিন্তু ইতিহাসের কালজয়ী ঘটনাবলী কি সেই ঘটনার কুশীলবদের আগে থেকে জানান দিয়ে আসে? স্বাভাবিকভাবেই আমাদের ক্ষেত্রেও আসেনি। আমরা তিনমূর্তি পিঠে একটা করে ছোট ব্যাগ নিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় বেরিয়ে রাতে পুরনো দিল্লী ষ্টেশন থেকে যোধপুরগামী ট্রেন এ চেপে বসলাম। যদিও সেটা ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ ছিল আর দিল্লিতে পর্যাপ্ত ঠান্ডা পড়েছিল এইবছর। তাও আমরা ভেবেছিলাম কয়েকঘন্টার তো জার্নি, সকালে চোখ খুললেই যোধপুর। আর আমরা তিনজনেই কেউই খুব একটা আতুপুতু যাত্রী নই, সুতরাং পকেটের স্বাস্থ্যরক্ষার্থে এই কয়েকঘন্টার জার্নির জন্য স্লীপার ক্লাসই ঠিক আছে। 

প্রত্যেক জায়গারই নিজস্ব বিশেষত্ব আছে। সেই বিশেষত্বের সাথে যদি মানিয়ে নেওয়া না যায় তবে ওই জায়গায় বেঁচে থাকাটা যে কি ধরনের মুশকিল ঘটনা
 হতে পারে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত হবার জন্য আমাদের সেদিনের সেই জার্নিটাই যথেষ্ট ছিল। ট্রেনে উঠে তিনজনে তিনটে পুঁচকে ব্যাগ নিয়ে বসে আছি। আর বাকি যাত্রীরা দেখছি বড় বড় ব্যাগ নিয়ে উঠছেন। কোথায় কোন ব্যাগ রাখবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। যত বড় পরিবার তত বেশি সংখ্যক ব্যাগ। হুলুস্থুল ব্যাপার। ট্রেন চালু হতে স্বাভাবিক নিয়মেই মোটামুটি স্থিতিশীল অবস্থা ফিরে এলো। আর আমরা তিনজনে এই পুরো অরাজকতার সময়টা এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ মটকে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে গেলাম। ভাবখানা এই যে, লোকে এত যে কি নিয়ে বেরোয়? অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে নিলেই তো হলো। তাহলে আর এই জগঝম্প জার্নি করতে হয়না। এত ব্যাগ! আমাদের মতন মিনিম্যালিস্ট হতে আর পারল না এরা। এই সব উত্কৃষ্ট ভাবনাচিন্তা করে মনে মনে বেশ পুলকিতও হয়ে উঠলাম। আত্মতৃপ্তিতে ভরপুর হয়ে তারপর যথাবিহিত নিয়মে খাওয়াদাওয়াও সারা হলো। এবার শোবার পালা। আমার আর দুই নম্বর অর্পিতার (বার বার দুই নম্বর অর্পিতা বলার চেয়ে ওর একটা অন্য নাম দেওয়া যাক। ধরা যাক ওর নাম টুকাই। এরপর থেকে ওকে টুকাই বলে ডাকবো।) শোবার জায়গা দুটো পাশাপাশি আপার বার্থে। আর পিনাকীর সাইড আপার। আমরা যথেষ্ট গরম জামা পরে আছি তাই শোবার জন্য একটা করে গায়ে দেবার চাদর পিঠের ব্যাগে নিয়ে বেরিয়েছিলাম। আমার আর পিনাকীর দুটি শাল। আর টুকাই-এর জন্য মোটামুটি পুরু একটি চাদর। আমরা ওপরে উঠে শুয়ে পড়লাম। চাদর গায়ে দিয়ে। বাকি জনগণ দেখি প্রত্যেকেই একটি করে মোটাসোটা কম্বল বের করে ফেলেছেন তাঁদের বয়ে আনা ব্যাগের পাহাড় থেকে। এদিক ওদিক নজরদারি করে দেখলাম এর কোনো ব্যতিক্রম নেই আমরা ছাড়া। না একটু ভুল বললাম পুরো কামরায় আরো একটি ব্যতিক্রম ছিল আমরা ছাড়া। তাঁর কাছে একটি স্লিপিং ব্যাগ ছিল। তিনি তাতে ঢুকে আরাম করে শুয়ে পড়লেন। আমরা একটু থতমত খেয়ে গেলাম। কি রে বাবা! প্রত্যেকেই তো দেখি কম্বল বের করে। যত বড় পরিবারই হোক না কেন সকলের জন্য একটি করে কম্বল। এতক্ষণে বুঝলাম কেন ট্রেনে উঠে সকলেই দুচারটে করে ব্যাগ সিটের তলায় না ঢুকিয়ে সিটের ওপরে রাখছিলেন। আর তাই দেখে আমরা তাঁদের নাস্তানাবুদ অবস্থা হচ্ছে ভেবে নিজেরা চাপা স্বরে ঠাট্টা ইয়ার্কি করছিলাম। এখন দেখি সেই সিটের ওপরের প্রত্যেকটি ঢাউস ব্যাগ থেকে একটি করে ঢাউস কম্বল বেরিয়েছে। আর সকলেরই ব্যাগের সংখ্যা এক কি দুই এ দাঁড়িয়েছে। আমাদেরই মত। তখন মনে আশা ছিল আমাদের যে, কম্বল কেন লাগবে রে বাবা শুতে?এইতো এখনো ট্রেন ছুটছে, এখন কি আমাদের ঠান্ডা লাগছে নাকি? আমাদের গায়ে মোটা-পাতলা মিলিয়ে দুটি উলিকটনের গেঞ্জি, তার ওপরে জামা, তার ওপরে সোয়েটার-মোটা উলের মায়ের হাতে বোনা, তার ওপরে মোটা হাওয়া নিরোধক জ্যাকেট। এরপরে আর কোথা দিয়ে ঠান্ডা ঢুকবে? শুধু শুধু কম্বল বয়ে বেড়াবার কোনো মানেই হয় না। আমরাই ঠিক কাজ করেছি। এই ভেবে আবার একপ্রস্থ আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ নিশ্চিন্তে ঘুমোলামও। 

তারপরে? 

তারপরে একটু একটু করে ঘুম কেটে যেতে লাগলো। কারণ আমার গায়ে মোটা-পাতলা মিলিয়ে দুটি উলিকটনের গেঞ্জি, তার ওপরে জামা, তার ওপরে সোয়েটার-মোটা উলের মায়ের হাতে বোনা, তার ওপরে মোটা হাওয়া নিরোধক জ্যাকেট। 

কিন্তু পায়ে?

পায়ের কথা আর কেই বা মনে রাখে শীতে? তুশ্চু প্রত্যঙ্গ। পায়ে আমার পাতলা ইনার এর ওপরে জিন্স। দুটোর কোনটিই হাওয়া নিরোধক নয়। আর এই মধ্যরাতে হুহু শব্দে ছুটে যাওয়া ট্রেনে শেষ ডিসেম্বরে পশ্চিমভারতের ঠান্ডা হাওয়া মোটা কম্বলের তলায় সুরক্ষিত স্লীপার ক্লাসের বাকি জনগনকে কামড় বসাতে না পেরে আমার এই নিরীহ অরক্ষিত পা জোড়াকেই খুঁজে পেয়ে মরণ কামড় বসিয়েছে। তারপর আমার সাথে সেই ঠান্ডা হওয়ার আক্ষরিক অর্থেই সারারাত্রিব্যাপী হাতাহাতি যুদ্ধ শুরু হলো। 

হাত পা গুলো ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগলো। আমি ব্যাগ থেকে উলের টুপি আর উলের গ্লাভস বের করে পরলাম। 

তারপর আমার শরীর আরো ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগলো। আমি ব্যাগ থেকে মাফলার বের করে টুপির ওপর দিয়ে মাথায় জড়ালাম। 

তারপর আমার শরীর আরো ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগলো। তখন আমি ব্যাগ থেকে আরো একটা মোজা বের করে পায়ে থাকা মোজার ওপর দিয়ে পরলাম।

তারপর আমার শরীর আরো ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগলো। তখন আমি ব্যাগ হাঁটকে আর কোনো কিছু পরার মতন পেলাম না। তখন আমি গায়ের শালটাকে গা থেকে খুলে দু ভাঁজ করে পায়ের ওপর দিলাম।

তারপর আমার শরীর আরো ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগলো। তখন আমি কি করব ঠিক করতে না পেরে পিঠের ব্যাগ টাকেই দুই পায়ের ওপর চাপালাম। মোটেই কিছু সুবিধে হলো না। পা দুটো বাবু হয়ে বসার মতন করে মুড়ে শুলাম। 

তারপর আমার শরীর আরো ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগলো। পিঠ দিয়ে ঠান্ডা উঠছে। শেষমেষ উঠে বসলাম। বেশ করে শালটাকে জড়িয়ে, নিজেকে যতটা সম্ভব ছোট্ট করে মুড়ে নিয়ে ব্যাগটাকে কোলে করে টুপির ওপর দিয়ে মাথা মুখ ভালো করে মাফলারে মুড়ে পুঁটলির মতন বসে দেখি- সামনের দুটো বার্থে আরো দুটো ছায়ামূর্তি উঠে গোল্লা পাকিয়ে বসে ঠকঠক করে কাঁপছে। আমাদেরই বাকি দুই মূর্তি। পা দুটো মনে হচ্ছে নেই আমার। প্রচন্ড ঠান্ডায় স্নায়ু কাজ করা বন্ধ করে দেয় পড়েছিলাম। প্র্যাকটিকাল পরীক্ষাটা সেদিন দিলাম। গা থেকে জ্যাকেটটা খুলে পায়ে জড়াবো কিনা ভাবলাম একবার। কিন্তু না। ঠান্ডার চোটে পা অবশ হয়ে গেলেও কাল আমায় লোকজন ট্রেন থেকে চ্যাংদোলা করে নামাতে পারবে। কিন্তু গা থেকে জ্যাকেট খুলে পায়ে দিলে, এ যা ঠান্ডা, তাতে গায়ের সোয়েটার ভেদ করে পাঁজরে গিয়ে ঘা মারলে যদি বুকের হৃৎপিন্ডটাই কোনো মতে জবাব দিয়ে দেয় ঠান্ডার চোটে, তাতে চলন্ত ট্রেনে এই মাঝরাতে আমায় নিয়ে বাকিদের বড়ই অসুবিধায় পড়তে হবে। যদিও জানিনা বাকি দুই জন তখনও বেঁচে আছে কিনা। নাকি ঠান্ডায় জমে গিয়ে জীবাশ্মে পরিনত হয়ে গেছে বাঙ্কে বসে বসেই। 

কিছুক্ষণ পরে দেখি পিনাকী নেমেছে নিচে। পায়চারী করতে শুরু করেছে ট্রেনের শরু প্যাসেজের মধ্যেই। যদিও ওকে তখন পিনাকী বলে চেনা যাচ্ছিল না।  আমি জানি তাই বললাম। চশমায় ঢাকা চোখদুটি ছাড়া বাকি সব পরতের পর পরতে ঢাকা। একই দশা। পায়ে কেবল পাতলা একটি পরতের ওপর জিন্স। টুকাইয়ের তাও নেই। শুধুই জিন্স। টুকাইকে ডাকতে দেখি সামনের বাঙ্কের পুঁটলিটা একটু নড়ে উঠলো আর ক্ষীণ একটা "উঁ" ভেসে এলো। বুঝলাম এখনো জীবাশ্ম হয়ে যায় নি। পিনাকী পায়চারী করেই চলেছে। একবার বললাম "লোকজন বিরক্ত হতে পারে এত বার যাতায়াত করছিস, ঘুমোচ্ছে সবাই।" উত্তর এলো, "হুম"। তারপর দেখি সোজা হয়ে গ্লাভস পরা হাত পকেটে ঢুকিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই। একই রে বাবা? বাকি রাত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাবে নাকি? এখনো তিন চার ঘন্টা জার্নি বাকি? বললাম, দাঁড়িয়ে আর কি করবি? ওপরে উঠে বস। উত্তর এলো, "হুম "। আমি আর ঘাঁটালাম না ভদ্রলোককে। কারণ এই স্লীপারে যাবার বদবুদ্ধিটা প্রধানত আমার। আর তার ফলেই এই দশা। এখন বেশি ঘাঁটালে যদি চড়-থাপ্পড় মেরে বসে? দরকার নেই বাবা। অবশ্য তাতেও বিশেষ অসুবিধা হত না। বরং সুবিধাই হত। দুচারটে কিলচড় খেলে খানিক গা গরম তো অন্তত হত। 

আশে পাশে তাকিয়ে দেখি আমরা তিনজন গর্বিত মিনিম্যালিস্ট ছাড়া কম্বলধারী প্রত্যেক বোকারাই আরাম করে কম্বলের মধ্যে নাক ডাকাচ্ছেন। এঁনারা স্লীপারের নিয়মিত যাত্রী। তাই এই শীতে যে কম্বল ছাড়া চলবে না তা এঁনারা জানেন। শুধু আমাদেরই স্লীপার ক্লাসে নিয়মিত যাতায়াত করা হয়না বলে এই যাত্রার আবশ্যকীয় উপাদানগুলি সম্পর্কে আমরা মোটেই ওয়াকিবহাল ছিলাম না। উল্টে যাঁরা এই যাত্রার নিয়মগুলি মেনে চলছিলেন তাঁদের নিয়ে হ্যাহ্যা করছিলাম। ভগবান তখন আমাদের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হ্যা হ্যা করছিলেন আমরা শুনতে পাইনি। তারপর যত রাত বাড়তে লাগলো নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুসারে ভগবানের হাসি তত আমাদের দিকে ধেয়ে আসতে লাগলো। আমার তো সত্যি বলছি এরকমও মনে হলো একবার যে, এই যে প্রত্যেকে একটা করে গোটা কম্বল মুড়ে আরাম করে ঘুমোচ্ছে। আর আমরা তিন তিনজন নিরীহ প্রাণী ঠান্ডায় প্রায় পঁচাত্তর ভাগ মরে গেছি। আর আমি নিশ্চিত বাকি পঁচিশ ভাগও কাল যোধপুর স্টেশনে পৌঁছবার আগেই মরে যাব। এ হেন দুর্ভাগাদের কি অন্তত একটা কম্বলও কেউ ধার দিতে পারে না? তাতেই তিনজনে পা ঢুকিয়ে বসে বাকি রাতে বাকি পঁচিশ ভাগটাকে বাঁচাবার একটা চেষ্টা অন্তত করতে পারব। শীতে দুঃস্থদের উষ্ণতা দেওয়া তো কত পূণ্যের কাজ। কিন্তু সে রাতে কোনো পূন্যাত্মাই পূণ্য সঞ্চয়ের লোভে জেগে বসে ছিলেন না। সুতরাং আমরা বাকি রাত জেগে বসে করুণ চোখে চারপাশের রং-বেরঙের নরম কম্বলের শোভা দেখতে দেখতে কাঁপতে লাগলাম। আর পিনাকী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগলো। 

সব মহাপ্রলয়েরই তো শেষ আছে। সেরকমই সেই রাত কেটেও ভোর হলো। ট্রেন যোধপুর স্টেশনে এসে পৌঁছালো। আসার আগে এই যোধপুর স্টেশন নিয়ে কত নস্টালজিয়া আমাদের। সোনার কেল্লায় ফেলুদারা এখানেই এসে নেমেছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। স্টেশনটা, চারপাশটা, শহরটা এখন কেমন দেখতে সেই নিয়ে কত জল্পনা আমাদের। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমায় যদি এখন জিজ্ঞাসা করা হয় যোধপুরে নেমে তুমি কি দেখলে? কেমন স্টেশন? আমি কি বলব জানেন? বলব, "যে প্লাটফর্মে নেমেছিলাম সেখানে কোনো রোদ ছিল না। ওভারব্রিজে উঠে প্রথম পায়ে রোদ লেগেছিল। আর স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে পুরো গায়ে রোদ লেগেছিল। আর সেই রোদ  মেখে আমরা স্টেশনের কাছেই হোটেল পর্যন্ত হেঁটে পৌঁছেছিলাম। আমাদের আনতে হোটেল থেকে কেউ গিয়েছিলেন। আমাদের মস্তিস্ক বোধহয় তখনও পুরোপুরি কাজ করতে শুরু করে নি তাই আমরা তিনজনেই তাঁকে নামের প্যাকার্ড থাকা সত্বেও সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ওভার ব্রিজে উঠে গেছিলাম। বোধহয় ট্রেন থেকে নেমে তিনজনেরই চোখ ছিল ওভারব্রীজের ওই রোদের ফালিটুকুর দিকে তাই আর ওই নশ্বর প্যাকার্ডধারীর দিকে আর কারো নজর পড়ে নি। 

এই হলো আমাদের যোধপুর যাবার ইতিকথা। হোটেলে পৌঁছালাম আমরা শনিবার সকালে। রবিবার রাতে আমাদের ফেরার ট্রেন। এর মধ্যেই আমাদের যোধপুরের যাবতীয় দ্রষ্টব্য শেষ করে একফাঁকে ওঁশিয়া ঢুঁ মেরে আসতে হবে। হোটেলের ছাদে চড়চড়ে রোদে বেশ করে হাত পা সেঁকে একটু সুস্থ হতেই মাথা কাজ করতে শুরু করলো। আর আমরা বেড়ানো-চড়ানো শিকেয় তুলে দৌড়ালাম পরদিনের তত্কালের টিকিট বুকিং করতে। আমাদের ফেরবার টিকিট কিন্তু কনফার্ম ছিল। কিন্তু সেও তো সেই স্লীপার ক্লাসে থুড়ি ফ্রীজার ক্লাসে। হোটেলের ঠিক উল্টো দিকেই রেলওয়ে বুকিং কাউন্টার। পিনাকী সেখানে, আর আমরা হোটেল মালিককে তাঁর চেয়ার থেকে উত্খাত করে তাঁর কম্পিউটারে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। আমরা তত্কালে এসির টিকিট পেলাম না। মানে পেলাম কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত কনফার্ম হলো না। ফলে ফেরার সময় আবার সেই ফ্রীজার ক্লাস।

এবারে মানসিক ভাবে অনেকটা প্রস্তুত ছিলাম বিপর্যয়ের জন্য। তারপর সদ্য বেড়ানোর তাজা মনোভাব আর উত্তেজনাও ছিল। ফলে যুদ্ধের জন্য সবচেয়ে বেশি যা দরকার অর্থাৎ মনোবল, সেটি যাবার সময়ের তুলনায় খানিক বেশিই ছিল আমাদের। ফেরার সময় ট্রেন অনেক ফাঁকা। তবুও যাঁরা আছেন প্রত্যেকেই কম্বল নিয়ে উঠেছেন। দেখে শুনে এবারে আমাদের স্বভাবতই আর হাসি এলো না। ব্যাকুল হয়ে তাকিয়ে রইলাম শুধু। খাওয়া দাওয়া সেরে নিলাম। আমাদের পাশেই একটি কমবয়সী ছেলে উঠলো সাথে একটি মাত্র মাঝারি মাপের ব্যাগ। নিজেদের একার দূর্দশায় যতটা কষ্ট হয়, সাথে আরো কেউ দূর্দশায় পড়লে কষ্টটা ভাগ করে নেবার আরো কেউ থাকে বলে মানুষ কষ্ট খানিক কম পায়। মনে আশা জাগলো। এ বেচারাও আমাদেরই মতন অভাগা। একটাই ব্যাগ নিয়ে উঠেছে। এই ব্যাগে যদি কম্বল নেয় তবে আর অন্য জিনিস কোথায় নেবে? তার মানে নিশ্চয়ই কম্বল নেই এর সাথে। কিন্তু সেযাত্রা আরো ঐশ্বরিক ঠাট্টা বরাদ্দ ছিল আমাদের কপালে। সবে মাত্র ফিসফিস করে টুকাইয়ের কানে কানে কথাটা বলেছি। সাথে সাথে, বিশ্বাস করুন সাথে সাথেই, আমার কথা শুনতে পেয়েছিল কিনা কে জানে, দেখি ছেলেটি তার ওই সবেধন নীলমনি ব্যাগখানি থেকে টেনে টুনে একটা মোটা কম্বল বের করে ব্যাগটাকে ভাঁজ করে মাথার বালিশ করে শুয়ে পড়ল। শোবার সময় আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসেছিল কিনা সেটা খেয়াল করিনি। ব্যাগটায় কম্বল বাদ দিয়ে আর কিচ্ছু ছিল না। এই ঘটনায় আমি অন্তত একটা জিনিস শিখলাম, যে, শীতকালে স্লীপারে যেতে হলে যদি একটিই ব্যাগ নিতে হয় তবে কম্বলের ব্যাগটিই নাও অন্য সব মহার্ঘ্য বস্তু ছেড়ে। 

তারপর আমরা চেষ্টা করলাম যদি বাড়তি টাকা দিয়ে এসি থেকে তিনটে কম্বল যোগাড় করা যায়। কারণ আমার মাথায় ছিল যে দিল্লি-হাওড়া দুরন্ত এক্সপ্রেসে স্লীপার ক্লাসে টিকিট কাটার সময়ই বেডরোলের অপশন দেওয়া হয়। কিছু টাকা বেশি লাগে টিকিটের সাথে। এই সুবিধা আমরাও নিয়েছি একবার। সুতরাং এখানেও কি বাড়তি টাকা দিলে তিনটে কম্বল পাওয়া যাবে না? এই বিশ্বাসে অন্তত পাঁচ ছয় বার স্লীপার থেকে এসিতে যাতায়াত করে, দুই টিকিট পরীক্ষক এবং এসির কোচ এটেন্ডেন্টের সাথে কথা বলে বুঝলাম যে, এই ট্রেনে আইনগত ভাবে সেই সুবিধা পাবার কোনো উপায় নেই। কিন্তু এসির কোচ এটেন্ডেন্ট আর একজন টিকিট পরীক্ষকের বদান্যতায় বেআইনি পথে অন্য টিকিট পরীক্ষকের চোখ বাঁচিয়ে আমরা তিনটি কম্বল ব্যবহার করতে পারি আজকে রাতের জন্য।প্রতিটি কম্বল পাঁচশ টাকা। যা সম্ভবত ভাগাভাগি হবে এসির কোচ এটেন্ডেন্ট এবং ওই টিকিট পরীক্ষকের মধ্যে। ভারতীয় রেলের লাভ লবডঙ্কা। ওই মহাপুরুষ টিকিট পরীক্ষকের নাম তার বুকের নেমপ্লেটে লেখা ছিল। ভুলে গেছি এখন। মনে রাখা উচিত ছিল। কারণ তাঁর প্যাঁচালো কথাতেই আর একটু হলে এই বেআইনি কাজটি আমরা করে ফেলতে যাচ্ছিলাম। ব্যাপারটা যে বেআইনি তা অন্য টিকিট পরীক্ষকের সাথে কথা না বলা পর্যন্ত তো আমরা বুঝতেই পারিনি। তারপরে ব্যাপারটা বুঝে ফিরে যখন আসলাম ততক্ষণে এসির প্রায় সমস্ত যাত্রী জেনে গেছেন যে আমরা স্লিপারের যাত্রী। আর তিনটি কম্বলের জন্য ট্রেনের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। 

তারপর আর কি? ব্যাগের সমস্ত জামাকাপড় পরে, এমনকি জিন্সের ওপর দিয়ে রাতে পরে শোবার জন্য যে পায়জামাটা নিয়ে গেছিলাম সেটা পর্যন্ত পরে বাঙ্কে উঠে শুলাম। আর একটু পর থেকেই আগের রাতের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি শুরু হলো। শুয়ে-দাঁড়িয়ে-বসে-কুন্ডলী পাকিয়ে কোনোক্রমে রাত কাটিয়ে যখন গুরগাঁও স্টেশনে এসে নামালাম তখন অন্ধকার। তারপর দুটো অটো বদলে এসে নামলাম আমাদের আস্তানা থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। এখান থেকে আমাদের ইনস্টিটিউটের গাড়ি এসে আমাদের নিয়ে যাবে। প্রচন্ড কুয়াশার মধ্যে হেডলাইট জ্বেলে গাড়ি ছুটছে। আমরা দাঁড়িয়ে আছি জাতীয় সড়কের ধারে আমাদের গাড়ির অপেক্ষায়। তখনিই আবার এমন একটা ঘটনা ঘটল যেটা নিয়ে আধখানা ব্লগপোস্ট আমি অলরেডি লিখে ফেলেছি। সেদিন ছিল এই মরশুমের শীতলতম দিন। দিল্লির তাপমাত্রা সেদিন ছিল ২.৬ ডিগ্রী। রাজস্থানের বুকে চলন্ত ট্রেনে সে তাপমাত্রা কত ছিল আমি জানি না। তবে সেযাত্রা দুটো পা নিয়ে আস্ত ফিরে এসে সেই দিনেই আমি দুটো স্লিপিং ব্যাগ অর্ডার করেছিলাম পরবর্তী এরকম কোনো স্লীপার ক্লাসে যাত্রার কথা মাথায় রেখে। 

এখনো কি বলবেন যে জানুয়ারির শিমলা-ফাগু-কুফরী যাবার সময় (সার্কাস-১ এবং সার্কাস-২ তে লেখা) কালকা মেলের স্লীপার ক্লাসে স্লিপিং ব্যাগে ঘুমোতে না পারার দুঃখটা সত্যিকারের দুঃখ নয়? আদেখলাপনা? যদিও সে দুঃখ আমার কালকা থেকে দিল্লি ফেরার সময় স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে মুছে গেছিল। 



          

Wednesday, 11 March 2015

মনুষ্যকুলের শ্রেণীবিভাগ এবং ফেসবুকের স্টেটাস

ফেসবুকের স্টেটাস আপডেট আপাতত হ্যাপি নিউ ইয়ার, অভিজিত চক্রবর্তী, বাৎসরিক বাংলাভাষা বন্দনা, অভিজিত রায় হত্যা, 'ইন্ডিয়াস ডটার', হ্যাপি হোলি, বাৎসরিক নারীবন্দনা পেরিয়ে এখন বিশ্বকাপ ক্রিকেটে থিতু হয়েছে। অবশ্যই তা কিছুদিনের জন্য। এটা আমাদের মস্ত গুণ যে আমরা ভীষণ জঙ্গম। এঁটুলির মতন কোনো একটি  বিষয়ে আটকে থাকা, ও আমাদের পোষায় না। A থেকে Z পর্যন্ত সমস্ত সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়ে কথা না বলে কি থাকা উচিত? আমরা সমাজবদ্ধ জীব না? পিঁপড়েদের মত। হুলুস্থুল দেশী-বিদেশী বিষয়ে যদি কথাই না বলতে পারলাম তবে দিনের মধ্যে পঁচিশ ঘন্টা ফেসবুকে চোখ লাগিয়ে বসে থেকে কি ছাতার মাথা লাভ হলো রে বাবা? সোজাসুজি কেউ আমার মতামতের তোয়াক্কা যে করে না সে তো হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছি এতদিনে। তা বলে মতামত দেব না? গণতান্ত্রিক অধিকার বলে কথা। তা মতামত প্রকাশের এত সুন্দর একটি ব্যবস্থা থাকতে বিছানায় শুয়ে, টয়লেটে বসে আঙ্গুলের একটু নাড়াচাড়া করলেই যদি বিশ্বব্রম্ভান্ডের আপামর জনগনকে আমার বিচক্ষনতার দাপট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করে ফেলা যায় তবে আর কেন লোকের মুখোমুখী চাট্টি কথা বলে সমস্যায় পড়ি? সুতরাং ফেসবুক স্টেটাস আপডেট জিন্দাবাদ।  

ফেসবুক স্টেটাস আপডেট বিচার করে কিন্তু সুন্দর একটি শ্রেণীবিভাগ করে ফেলা যায় আমাদের। মানে সমগ্র মনুষ্যকুলের। কেমন করে? বলছি।
  

এবার একটু বিশদে বলি? বেশ।  প্রথম থেকে শুরু করা যাক কেমন।

সারা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে যদি আমি দুই ভাগে ভাগ করি তবে একটি ক্ষুদ্র অংশ থাকবে প্রথম ভাগে। যাঁরা ফেসবুক ব্যবহার করেন না। তাঁদের মধ্যে আবার দুটি ভাগ।  


১.ক: যাঁরা ফেসবুক সম্পর্কে মোটেই উত্সাহী নন: হয় তাঁরা পারেন না, নয় তাঁদের ভালো লাগে না ফেসবুক ব্যাপারটাকে। তাঁদের সম্পর্কে আমার কোনো বক্তব্য নেই। 

১.খ: যাঁরা অন্যের ফেসবুক সম্পর্কে বেজায় উত্সুক: তাঁরা নিজেরা একটি একাউন্ট খুললেই পারেন। 'আমি সকলের চেয়ে আলাদা' এই আহ্লাদে একাউন্টটি খোলা হয় না। কিন্তু সকলের খবর জানা চাই। তাই 'দেখি দেখি অমুকে কি বলল' বা 'তমুকে কোথায় বেড়াতে গেল' বলে পাশের জন ফেসবুক খুললেই হামলে পড়েন। সত্যি বলছি এরকম লোক দেখেছি সামনে থেকে। আরে ভাই তুমিও খোল একটা একাউন্ট। কেউ তো কামড়ে দেবে না তোমায়। "নাহ, কি হবে? এসব আমার পোষায় না।" বলে উদাস জ্ঞানী মুখ করে বসে থাকে। 'কি আর হবে? এখন যা হচ্ছে। সকলের খবরাখবর জানতে পারবে"-বলে দেখেছি। উত্তর এসেছে, "এই তো তোদের থেকে জানতে পেরে যাই।" আশ্চর্য প্রজাতি। কি আর বলব। 

আর যাঁরা ফেসবুক ব্যবহার করেন তাঁদের মধ্যে স্টেটাস আপডেট হিসেব করলে আমি তো স্পষ্ট ছয়টি প্রজাতি দেখতে পাচ্ছি। একে একে বলছি। আরো কোনো প্রজাতি থেকে থাকলে ভুলটা ধরিয়ে দেবেন প্লিজ। 

২.ক:  আপডেট: +; চিন্তাভাবনা: +; অ্যাকশন: +: এঁনারা হলেন করিতকর্মা প্রজাতির মানুষ। যেকোনরকম সামাজিক, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত টালমাটালে চটপট বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেন। ঝটপট ফেসবুকে আপডেট দিয়ে ফেলেন তারপর বিষয়টির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। যেমন ধরুন যাদবপুর থেকে অভিভাবক তাড়াতে হবে, ঝপ করে চিন্তা করলেন 'ঠিকই তো বাচ্চাগুলো তো ঠিক কারণেই গলা ফাটাচ্ছে।' সুতরাং চট করে কলরব হয়ে গেল মানে স্টেটাস আপডেট এলো আর পরদিনই আপনি ব্যানার হাতে রাস্তায়। সত্যি করিতকর্মা। স্বাধীনতাপূর্ব যুগ হলে এঁনারা নিশ্চয়ই বৃটিশের চক্ষুশুল হতেন। 

কিংবা ধরুন হঠাৎ একদিন সকালে গলার কাছটায় কিরকম যেন একটা গুজগুজ করছে বলে ঘুম ভেঙ্গে দেখলেন সবকিছু কেমন যেন লাগছে। কি যেন একটা বলার আছে। গুরগুর করছে ভেতরটা। কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না ব্যাপারটা কি। কিছুক্ষণ পরে যেই পাশের লোকজন সকালে 'গুড মর্নিং' এর জায়গায় 'সুপ্রভাত' বলল অমনি আপনার টং করে মনে পরে গেল "ওহো! আজ তো একুশে ফেব্রুয়ারী।" অমনি আপনি বাংলা ভাষার অতীত, ভবিষৎ, বর্তমান নিয়ে ভয়ানক রকম চিন্তিত হয়ে উঠলেন আর সাথে সাথে একটা সাড়ে পঞ্চান্ন লাইনের স্টেটাস আপডেট দিয়ে চরাচরকে বাংলা ভাষা সম্পর্কে উদ্দীপ্ত করেই ছাড়লেন। পুরো দিনটাই আপনি বঙ্গভাষার জন্য উত্সর্গ করে ফেললেন। 

অর্থাত শুধু ভাবনা বা আপডেটেই আটকে থাকেন না এঁনারা কাজও সেই অনুযায়ী করেন। এঁনারা হলেন প্রথম প্রজাতি।     

২.খ: আপডেট: +; চিন্তাভাবনা: +; অ্যাকশন: - : এঁনারা হলেন দ্বিতীয় প্রজাতি। চটপট চিন্তা করেন। ঝটপট আপডেট দেন কিন্তু মাঠে নেমে গোল দেন না। মানে, যাদবপুর থেকে অভিভাবক তাড়াতে হবে, ঝপ করে চিন্তা করলেন 'ঠিকই তো বাচ্চাগুলো তো ঠিক কারণেই গলা ফাটাচ্ছে।' সুতরাং চট করে কলরব হয়ে গেল মানে স্টেটাস আপডেট এলো কিন্তু রাস্তায় কি আর নামা যায়? ওটা তোমরাই করো। আমি না হয় পেছন থেকে সাপোর্ট করছি। 
বা ধরুন 'ইন্ডিয়াস ডটার' এর হয়ে ঝড় তুলে ফেলবেন স্টেটাসে। লিখিত বাদ-প্রতিবাদে পাতার পর পাতা ভরে যাবে। সত্যি সত্যি বিষয়টি নিয়ে না ভাবলে এত যুক্তি আসে না কলমে থুড়ি কিবোর্ডে। কিন্তু ঘরোয়া জটলায় কেউ কোনো মহিলার পোশাক নিয়ে সরস মন্তব্য করলে চুপ করে থাকা বা হ্যা হ্যা করা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না তাঁদের।   

এঁনারাও মহার্ঘ্য প্রজাতি।

২.গ: আপডেট: + ; চিন্তাভাবনা: - ; অ্যাকশন: - : এই তৃতীয় প্রজাতিটির মধ্যে বড়বড় মহাপুরুষরা পড়েন। তাই অনেক সম্মান নিয়ে এঁনাদের কথা লিখতে বা পড়তে হবে। এঁনারা "আমায়ও এই বিষয়ে বলতে হবে" এই ভাবনায় এত বেশি বিভোর হয়ে থাকেন যে, যে বিষয়ে বলতে চাইছেন, সেটি সম্পর্কে আদ্যপান্ত ভাবার আর সময় পান না। ঝটপট আপডেটটা দিয়ে ফেলেন। সকলেই বলছে, অতএব আমার কি আর চুপ করে থাকা চলে? সমাজ সংসার সম্পর্কে আপডেটেড না থাকা একজন বোকা হাঁদা ভাববে না তো সকলে? অতএব সকালে বিকেলে বাজার চলতি বিষয় নিয়ে আপডেট দিয়ে যাও। 

ধরুন পশ্চিমবাংলার মাঠেঘাটে গরম ঘামে জন্ম থেকে ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত কাটিয়ে আমি হঠাত করে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের কোনো এক শীতল দেশে কয়মাস কাটিয়ে অঢেল বরফ টরফের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেশে ফিরে আমার গ্রাম সম্পর্কে প্রথম আপডেট এই দিলাম যে, "so hot and humid here, I hate this." আপনি কি করবেন? এসব ক্ষেত্রে পড়ার পরেই সুস্থ জনগনের প্রথম প্রতিক্রিয়া বোধহয় ভসভসিয়ে খানিকটা হাসি ছাড়া আর কিছুই আসবে না। তারপরেও যদি আমি অভিজিত রায় হত্যা বা 'ইন্ডিয়াস ডটার' এর মতন বিষয়েও আমার মতামত জানাই, সেটার মধ্যে কতটা বিবেচনাবোধ বা বিচক্ষণতা বা সচেতনতা আর আশা করা যায়? তবুও আমি আপডেট দিতে ছাড়ি না।   

সাধারণত 'সাহারায় সীতাহরণ' থেকে শুরু করে 'হন্ডুরাসে হাহাকার' বা 'বোর্নিওর বিভীষিকা' তা সে যাই হোক না কেন পৃথিবীর জনপ্রিয় কোনো বিষয়ই ছাড়া পায়না এই তৃতীয় গোষ্ঠীর হাত থেকে। সকল বিষয়েই এঁনারা প্রাজ্ঞ। সমাজ, রাজনীতি, কূটনীতি, সাহিত্য, বিজ্ঞান, সঙ্গীতকলা, খেলাধূলা, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র প্রভৃতি পৃথিবীর সকল বিষয়েই একজন মানুষের এত জ্ঞান যে একজীবনে কি করে হয় এ এক রহস্য আমার কাছে। প্রণম্য এঁনারা। 

যাক গে। পরের প্রজাতিতে যাওয়া যাক। 

২.ঘ:  আপডেট: - ; চিন্তাভাবনা: + ; অ্যাকশন: - :  এঁনারা দার্শনিক পর্যায়ভুক্ত। সব দেখেন, সব বোঝেন, কিন্তু কেউ 'যানতি পারে' না। সকলে ভাবে বুঝি ইনি ঘুমোচ্ছেন আদতে কিন্তু চিন্তাভাবনার চাষ চলে মনের মধ্যে সর্বক্ষণ। সমস্ত পার্থিব বিষয়ে এঁনারা ভাবনাচিন্তা করেন এবং উপরোক্ত সকল পর্যায়ভুক্ত জনগনের মতো স্টেটাস আপডেটটা আর দিয়ে উঠতে পারেন না। এত বেশি ভাবনা ভাবতে হয় যে ক্লান্তিতে আর কিবোর্ডে আঙ্গুল সরে না। কিন্তু কে কি আপডেট দিল আর তাতে কি কি ভুল আছে, কি কি অবান্তর চিন্তার ফসল সেই সব আপডেট, কিভাবে লোকজনের মগজের চিন্তাভাবনাগুলোকে সঠিক দিশা দেওয়া যায় এই সব ভাবতে গিয়ে আর বাকিদের আপডেটের খুঁত ধরতে গিয়ে এঁনাদের আর নিজেদের ভাবনাগুলো ফলপ্রসূ করা তো দূর, নিজেদের আপডেটটাই সময়মত দেওয়া হয়ে ওঠে না।   

২.ঙ: আপডেট: - ; চিন্তাভাবনা: + ; অ্যাকশন: + : এঁনারা চার নম্বরদের মতনই চিন্তা ভাবনা করেন। সাথে সাথে যেখানে যেমন দরকার কাজটাও করেন। আপডেট ইত্যাদি তুশ্চু জিনিসের ধার এঁনারা ধরেন না। কর্মবীর। ২.খ তে যেমন বললাম সেরকম পরিস্থিতিতে পড়লে অর্থাৎ ঘরোয়া জটলায় কেউ কোনো মহিলার পোশাক নিয়ে সরস মন্তব্য করলে চুপ করে থাকা বা হ্যা হ্যা করা তো দূরস্থান সেই দণ্ডেই মন্তব্যকারী বা কারিনীর এঁদের হাতে দুর্দশার অন্ত থাকে না। আর ইনি যেহেতু আপডেট তত্ত্বে বিশ্বাসী নন তাই জটলাকারীরা তো জানে না এঁনার স্টেটাস কি। সুতরাং ভুল মানুষের কাছে বেফাঁস মন্তব্যে বেচারাদের ল্যাজেগোবরে অবস্থা হয়। 

২.চ: আপডেট: - ; চিন্তাভাবনা: - ; অ্যাকশন: - : এই শেষ প্রজাতিটি সবচেয়ে ভালো থাকে। ফেসবুকে জন্মদিনের কেক কাটার ছবি লাগায়, নতুন রান্না করলে তার শৈল্পিক ছবি তুলে লাগায়, নতুন জামা কিনলে নতুন নতুন ভঙ্গিতে মুখ দেখায়, বাচ্চার প্রতি ঘন্টায় হাসা-কাঁদা-খাওয়া-পটি করার ছবি দেখায়, নামী জায়গায় বেড়াতে গিয়ে জায়গার তুলনায় নিজের নতুন সানগ্লাসের ছবি লাগায় তাতে ব্র্যান্ডের নামটা দেখা গেলে আরো ভালো। 

এঁনারা চারপাশের হালহকিকতের বিশেষ ধার ধারেন না। আপডেট থাকে মাঝে মাঝে। সেটা নিতান্তই ব্যক্তিগত।যেমন, বোর হচ্ছি, ঘুম পাচ্ছে, বেড়াতে যাচ্ছি, এই সিনেমা দেখছি, দেখে মাথায় ব্যথা করছে......ইত্যাদি ইত্যাদি। এতে সুবিধা হচ্ছে, বহুল প্রচলিত বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি তৈরী রাখতে গিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। সেলফি তোলার অনেক সময় পাওয়া যায়। কোনো ঝগড়ায় না থেকে কারো সাথে মনোমালিন্য হবার ভাবনা নেই। আর কোনো বিতর্কিত বিষয়ে খোলাখুলি মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে শেষে নিজের তৈরী কাঁচের স্বর্গতে পাটকেল পড়বার ভয় নেই। সবদিক থেকেই একদম সঠিক-নিশ্ছিদ্র-নিরাপদ ব্যাপার।

এই হলো গিয়ে আমার মতে ছয় প্রজাতির মনুষ্যকুল। কিছু বাদ দিয়ে গেলে বলবেন।

কি বলছেন? আমি কোন দলে পড়ি? পাগল নাকি? কোনোমতেই বলব না। সবগুলোর যেকোনো একটা হতে পারি। আপনি? 

Sunday, 8 March 2015

শিলাবৃষ্টি

আজকে নাকি কটকটে রোদ্দুর ওঠার কথা। আবহাওয়ার পূর্বাভাষ তাই বলছে। অথচ কাল রাত থেকে আবহাওয়া দপ্তরের ভাষায় বেজায় "বজ্র বিদ্যুতসহ ভারী বৃষ্টিপাত" হয়ে চলেছে। আজ সকাল থেকে আকাশ মেঘলা। বিকেল থেকে ঠান্ডা হাওয়া আর পশ্চিম দিক থেকে কালো মেঘের হুড়ুমদুড়ুমের চোটে বিকেল থেকে আর ঘরে থাকা গেল না। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই হলো। আর যার যা কাজ, পিনাকী ট্রাইপড-ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বেশ গুনগুনিয়ে ছবি টবি তুলছিল। হঠাত দেখি আঁই আঁই করতে করতে ডান গালে হাত ঘষতে ঘষতে লেজ গুটিয়ে সোজা ঘরের দিকে। 'কি রে কি হলো', টি হলো? বলতে বলতেই আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম। ধুপ ধাপ শিল পড়তে লেগেছে। আর হরিয়ানায় বিরল সেই শিলাবৃষ্টির জাঁদরেল মাপের প্রথম শিলটা সোজা এসে বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়টি বসিয়েছে সিধে আমার ঘরের নিবেদিতপ্রাণ আলোকচিত্রীর ডান গালে।

তার দিকে বিশেষ নজর আর দিতে পারলাম না। কারণ ততক্ষণে আমাদের বারান্দা আর সামনের মাঠ পেল্লায় মাপের শিলীভূত জলে সাদা হয়ে গেছে। ঠাস ঠাস শব্দে অবিরত শিল পড়ে চলেছে। দরজার বাইরে হাচিকো ভয়ে কাঠ হয়ে বসে আছে। এত বড় মাপের শিল বেচারা বোধহয় আগে দেখে নি। তাকে অভয় দিয়ে ঘরে বসানো হলো। থার্মোকলের বাক্স মাথায় দিয়ে কটা শিল কুড়োলামও। না না ছাতা ছিল আমার, কিন্তু যে সাইজের শিল পড়ছিল তাতে নতুন কেনা ছাতাটার ভেঙ্গে যাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল কিনা তাই আর ছাতা মাথায় দিয়ে বারান্দায় যাবার রিস্কটা নিলাম না আর কি। 

প্রায় দশ মিনিট ধরে আকাশ ভেঙ্গে পেল্লায় পেল্লায় মাপের শিলাবৃষ্টি হলো। আর আমাদের বোরিং ছুটির দিনটাকে দশমিনিটেই চাঙ্গা করে দিল। আমিও নিরাপদ দূরত্বে থেকে চাট্টি ছবি তুললাম। দেখুন কেমন সাদা হয়ে গেছে মাঠ। 



পিনাকীও গাল সামলে ছবি টবি তুলল। তারপর যখন শিলার মাপ আর তার পতনের ফ্রিকোয়েন্সি একটু কমে গেল তখন দেখি হাচিকো ঘরের এককোণে দেওয়াল ঘেঁষে কাঠ হয়ে বসে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বেচারাকে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার পরে কটা বড় বড় শিলা দিতে দেখি ব্যাটা চেটে চেটে খেল। ক্রিম বিহীন আইস ভেবে বোধহয়। বেচারা। আপাতত বৃষ্টিপত্র হয়ে চরাচর শান্ত। হাচিকো এখন ঘরের বাইরে বসে হাত পা চাটছে। এবার নিশ্চিন্তে ঘুমোবে মনে হয়। আমরাও একপেট ইডলি খেয়ে বুঁদ হয়ে বসে আছি। পিনাকী তবে মাঝে মধ্যেই দেখছি মহাভারত পড়তে পড়তে এখনো ডানগালে হাত ঘষছে। বেচারা!!               

Wednesday, 11 February 2015

নামাবলী

আবার নাম বিভ্রাট। হাসব না কাঁদব বুঝে উঠতে পারছিনা।  এর আগে নাম নিয়ে কি ঝামেলায় পড়েছিলাম সেটা তো বিশদে বলেছিলাম আপনাদের। আগেরবারভেবেছিলাম পোস্টটার নাম দেব 'নামাবলী' বা 'নামসংকীর্তন', আবার এই নাম বিভ্রাটে সেই পুরনো নামখানা আর না দিয়ে পারলাম না। জ্যেষ্ঠতাত প্রদত্ত সুন্দর একটি নাম থাকতে দিনের পর দিন ক্রমাগত একদল লোক যদি আপনাকে 'পিঙ্কি-পিঙ্কি ' বলে থাকে এবং শুধু তাই নয় নাম বিভ্রাটে আপনার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জিনিষ আপনি হাতে পাচ্ছেন না, এমতাবস্থায় মাথা গরম হয় কি না বলুন? 'পিনাকী' নামটির উত্পত্তি তো আমি যদ্দুর বুঝি 'পিণাক' থেকে অর্থাত কিনা 'পিণাক হস্তে যাহার'। কোন সমাস ভুলে গেছি। মোদ্দা কথা 'পিনাকী' শব্দটির অর্থ মহাদেব, শিবঠাকুর। যিনি নাকি সর্বাংশেই দৃপ্ত পৌরুষের প্রতীক। তাঁর সমনামধারী কোনো মানুষকে নিঃসন্দেহে  কি করে একজন মহিলা হিসাবে ধরে নেওয়া যেতে পারে আমার তো মাথায় ঢোকে না। নাকি 'ই-কার ' অন্ত শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ অনুসঙ্গের জন্যই শুধুমাত্র এই ভুল? হিন্দিভাষী বলয়ে পুরুষদের মধ্যে 'পিনাকী' নামটি প্রচলিত নয় একেবারেই। তুলনায় মহিলাদের মধ্যে 'পিঙ্কি' নামটি বহুল প্রচলিত। ফলে প্রথম থেকেই বেচারা পিনাকীকে তার পিতৃদত্ত নামটির মাঝখান থেকে একটি 'আ কার' মায়া ত্যাগ করতে হয়েছিল। অনেকের কাছেই 'শ্রী পিনাকী মন্ডল' 'শ্রীমতী পিঙ্কি মোন্ডাল' হয়ে বিড়ম্বিত হচ্ছিলেন। আর পিনাকীর অবসম্ভাবী মহিলা অনুসঙ্গ যেহেতু আমি, সেহেতু ইনস্টিটিউট এর সিকিউরিটি গার্ড, অনলাইনে কেনা জিনিষপত্র ডেলিভারি দিতে আসা মানুষেরা সকলের কাছেই আমিই হয়ে উঠলাম শ্রীমতী পিঙ্কি মোন্ডাল। কারণ পিঙ্কি তো মহিলাদের নাম। প্রচন্ড কনফিডেন্সের সঙ্গে আমায় লোকে অর্পিতার জায়গায় পিঙ্কি বলে ভুল করতে থাকলো আর আমিও কখনো হেসে, কখনো রেগে সে ডাকে সাড়া দিতে থাকলাম। তার বেশ কিছু ঘটনার কথা তো আপনাদের জানা। ব্যাপারটা আমাদের কাছে বেশ একটা মজার ব্যাপার হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সমস্যাটা হয় যখন এই বিভ্রাটে সত্যি সত্যি কিছু ঝামেলার উত্পত্তি হয়। সেরকমই একটি ঘটনার কথা বলি। 

গত তেইশ থেকে ছাব্বিশে জানুয়ারির সাপ্তাহান্তিক ছুটিতে বেড়াতে গিয়ে বীরত্ব দেখাতে গিয়ে লেন্স জুম্ করা অবস্থায় নিজের কম্প্যাক্ট ক্যামেরার ব্যাটারিটি আমি খুইয়েছিলাম। কি করে এই আপাত অবিশ্বাস্য ঘটনাটি আমি ঘটালাম তার ব্যাখ্যা আমি পরে দেবখন। আপাতত আমার সাধের ক্যামেরা ব্যাটারির অভাবে "ব্যাদড়া বালক" এর মতন মুখ ছুঁচালো করে দাঁড়িয়ে রইলো। কোনো ভাবেই তার হাঁ করা মুখ আমি লেন্স কভার এর আবরণে ঢাকতে পারলাম না। শেষে ধুত্তেরি বলে সেই অচল সরু মুখী ক্যামেরার লেন্স টিসু পেপার দিয়ে মুড়ে কোনক্রমে আর্দ্রতা আর ধুলো ময়লা থেকে বাঁচাবার একটা ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে হাঁ করা ক্যামেরা বগলদাবা করে বেজার মুখে বাকি বেড়ানো সম্পূর্ণ করে ফিরে এলাম। আর ফিরে এসেই আমার প্রথম কাজ ছিল ক্যামেরার ব্যাটারি অর্ডার করা। অনলাইনে সে অর্ডার দিতে গিয়ে দেখি "পয়সা কড়ি আগে থেকে না দিলে কিন্তু দিতে পারব না বাপু" নোটিশ সাঁটা। আমিও সাথে সাথে "হ্যাঁ বাবা, এই নাও বাবা, আমার ব্যাটারিটা কিন্তু যত শীঘ্র সম্ভব দিয়ে দিও বাবা। ব্যাটারির অভাবে আমার সাধের ক্যামেরা হাঁ করা মুখ বন্ধ পর্যন্ত করতে পারছে না বাবা- একটু তাড়াতাড়ি দিও বাবা " ইত্যাদি করে ঝটপট অর্ডার করে ফেললাম। তারপর হা ব্যাটারি, যো ব্যাটারি। কদিন পরে অনলাইন ট্র্যাকিং এ 'ডেলিভারড' কথাটা দেখেই লাফ দিয়ে উঠে সোজা নিচে রিসেপশনে সিকিউরিটি গার্ড এর কাছে। তার কাছেই দিয়ে যায় সব জিনিস। নেহাত 'ক্যাশ অন ডেলিভারি' তকমা না থাকলে আমাদের নিচে তলব পড়ে না। যে যার সময় মতন নিজের নিজের প্যাকেট সংগ্রহ করে নেয়। অর্ডারটা দেওয়া হয়েছিল পিনাকীর নামে। পিনাকীকে দেখিয়ে বললাম এর নামে কোনো প্যাকেট আছে? সিকিউরিটি গার্ড মুখ বেঁকিয়ে, মাথা নেড়ে বলল না কোনো প্যাকেট নেই। যা বাবা! হলো টা কি?  তারপর পরপর তিন চার দিন একই খবর। প্যাকেট আসেনি। এদিকে ট্র্যাকিং বলছে আইটেম ডেলিভারড। এদিকে আমার হাঁ করা ক্যামেরার লেন্স এ তিনজায়গায় ছত্রাক ফুল ফুটিয়ে ফেলল আমার ব্যাটারির দেখা নেই। রেগেমেগে বিক্রেতাকে এক গ্যালন কটুকাটব্য করব বলে ফোন করতে যাব, হটাত মনে হলো এ সেই পুরনো নাম বিভ্রাটের কেস নয় তো? নিচে গিয়ে বাচ্চা গার্ডটিকে বললাম ভাই একটু ভালো করে দেখনা তোমার ভান্ডারে আমাদের নাম কোনো প্যাকেট আছে কিনা। বড়ই জরুরি প্যাকেট আমার। বলল কি নামে আছে? বললাম "পিনাকী", তার দেরাজ হাঁটকে যথারীতি বেরোলো 'পিঙ্কি মোন্ডাল' এর প্যাকেট। তিন দিন আগে দিয়ে গেছে সেই প্যাকেট। আমি পিনাকী কে দেখিয়ে বলেছিলাম এর নাম কোনো প্যাকেট আছে কিনা। ফলে গার্ড কোনো পুরুষালী নাম খুঁজতে গিয়ে 'পিঙ্কি মোন্ডাল' কে নস্যাৎ করে দিয়েছে। প্যাকেটের গায়ে জ্বলজ্বল করছে 'পি-না-কী" কথাটা। মাঝের একটি 'A' কে অনাবশ্যক ভেবে আর ধর্তব্যের মধ্যে আনেনি হিন্দিভাষী গার্ড ছেলেটি। ফলে নামটি হয়ে পড়েছে 'পিঙ্কি', আর সেটি তো কোনো ছেলের নাম হতে পারে না। সুতরাং পিনাকীর কোনো প্যাকেট আসেনি এই তিনদিন ধরে। আর আমার ক্যামেরার হাঁ মুখ ও বন্ধ হয়নি। 

এই পর্যন্ত শুনেই পিনাকী রিসেপশন কাউন্টার এর পেছন দিকে চলে গেল। এরপর আমি যতক্ষণ ধরে হাত পা নেড়ে, প্যাকেটে লেখা বানান দেখিয়ে দেখিয়ে গার্ডটিকে 'পিনাকী ' আর 'পিঙ্কি' র তফাৎ বোঝাচ্ছিলাম, আর আমার নাম 'পিঙ্কি' নয় 'অর্পিতা', পিনাকীর নামও 'পিঙ্কি' নয় 'পিনাকী' যেটি বঙ্গ অভিধান মতে একটি পুরুষের নামই হওয়া সম্ভব, 'পিঙ্কি'-র সাথে আমাদের দুজনের নামের কোনো সম্পর্ক নেই-কোনদিন ছিলও না, এরপর কোনো প্যাকেট ডেলিভারি দিতে যেন এই ভুলটা না করে-এইসব বোঝাচ্ছিলাম আর রিসেপশনের মহিলা আমার মতন ম্যাদামারা ব্যক্তিত্বের হটাত এই উত্তেজিতার কারণ মগজস্থ করতে না পেরে আমার আর হাত পা নাড়া আর গার্ড এর মাথা নাড়ার দিকে ক্রমান্বয়ে গোলগোল চোখ করে দেখে গেলেন। আর এই পুরো সময়টা ধরে যার নাম নিয়ে এত সমস্যা তিনি রিসেপশন কাউন্টারের পেছনে অটোমেটিক বুট পালিশ মেশিনের সামনে পা বাড়িয়ে জুতোর ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে খ্যাক-খ্যাক করে হেসে গেলেন। সাধে কি বলে 'যার জন্যে করি চুরি সেই বলে চোর'।         

Thursday, 1 January 2015

নিউ ইয়ার রেজোলিউশান


কেমন আছেন সবাই? এই পঁচিশ থেকে এক তারিখ পর্যন্ত হুল্লোড়-নাচানাচি-ভালমন্দ খাওয়াদাওয়া- বেড়াতে যাওয়া এসবের মধ্যে কি করেই বা খারাপ থাকা যায়? যদিও একত্রিশ তারিখের সন্ধ্যে আর এক তারিখের সকালের মধ্যে নতুন করে ভাল বা খারাপ থাকা কোনটাই বোঝার কোন উপায় নেই বলেই আমার মনে হয়, তবে কিনা এক তারিখ সকালে যদি আমি আপনাকে দাঁত বার করে “হ্যাপি নিউ ইয়ার” না বলি সাথে সাথেই আপনি আমার সারা বছরের পাওনা নম্বর থেকে ঘ্যাঁচ করে খানিকটা কেটে নেবেন আর আমার চরিত্র বিশ্লেষণের ফর্মে ‘দেমাকি’ কথাটার পাশে টিক মার্ক পড়ে যাবে। সে আমি সেই “হ্যাপি নিউ ইয়ার” এর পেছনে আপনাকে যতই গালমন্দ করি না কেন। সুতরাং একত্রিশ তারিখের একত্রিশ বছরের পুরনো জং ধরা আমি আর এক তারিখের আরও একদিন বেশি বয়সের আমি দুটোই আপাদমস্তক একটুও পরিবর্তিত না হয়ে সকলকে সকাল থেকে “হ্যাপি নিউ ইয়ার” বলে চলেছি। তারাও সমান দাঁত দেখিয়ে প্রত্যুত্তর দিয়ে চলেছে। বাকি সবকিছু আজন্ম কালের মত সমান নড়বড়ে গতিতে হয়ে চলেছে। আজ ২০১৫ র পয়লা জানুয়ারি বলে তার কোন ব্যত্যয় হয়নি।

তবে কিনা চারিদিকে নিউ ইয়ার রেজোলিউশান এর ঠেলায় মাঝে মাঝে দোটানায় পড়ে যাচ্ছি। কি রে বাবা আমারও কি কিছু প্রতিজ্ঞা-টটিজ্ঞা এইবেলা করে ফেলা উচিৎ নাকি? নইলে লোকে কি বলবে? চারপাশের জনগণ তো বটেই, এমন কি বড় বড় দিকপাল বিজ্ঞানীরা পর্যন্ত প্রতিজ্ঞা করে সেই রেজোলিউশান বিশ্বের এক নম্বর বৈজ্ঞানিক পত্রিকায় ছাপিয়ে ফেলেছেন। সে তালিকায় কে নেই? মহাকাশ বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে জীববিজ্ঞানী, পদার্থবিজ্ঞানী সব সব। আর হেঁজিপেঁজি কেউ নয়, তাবড় তাবড় সব বিজ্ঞানীকুল ২০১৫ র তিনশ পঁয়ষট্টি দিনের মধ্যে কি কি করেই ফেলবেন তার তালিকা প্রকাশ করেছে নেচার জার্নাল।

NASA র প্রধান Ellen R. Stofan বলছেন ২০৩০ এর মধ্যে মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর জন্য প্রধান যেসব অগ্রগতি দরকার সেসব ২০১৫ র মধ্যে শেষ করে ফেলবেন। UK র প্রধান চিকিৎসা অধিকর্তা Sally Davies বলছেন ২০১৫ র মধ্যে Antimicrobial Research এ বিপ্লব এনে ফেলবেন। Bill and Melinda Foundation এর প্রধানের আবার প্রতিজ্ঞা এই বছরের মধ্যেই আফ্রিকা থেকে পোলিও আর ebola কে উৎখাত করেই ছাড়বেন। Sustainable energy-generation এর লক্ষ্যে চীনের রসায়নবিদ Yi Xie ঠিক করে ফেলেছেন যে নিজের ল্যাবরেটরিতে Photo, electro এবং chemical energy র পারস্পরিক পরিবর্তন সফল ভাবে করে ফেলবেন। UNFCCC এর অধিকর্তা বলছেন আমার আপনার দ্বারা পৃথিবীর জলহাওয়ার যে পরিবর্তন হচ্ছে তার বিরুদ্ধে লড়াইটা আরও জোরদার করবেন। CERN এর Director General হিসাবে তাঁর শেষ বছরে Rolf-Dieter Heuer বলছেন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তির উৎস হিসাবে CERN এর কাজকে স্থাপন করতে চান। মেয়েদের আর বেশি করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আসতে সাহায্য করবেন Gloria Bonder এবং Athene Donald। এরকমই সব ভাল ভাল প্রতিজ্ঞা। বেশি পড়তে গেলে এখানে দেখুন।

এত সবকিছু পড়ে-টড়ে ভাবলাম একটা নিউ ইয়ার রেজোলিউশান না হলেই নয়। কি এমন রেজোলিউশান নেওয়া যায়? যেটা কিনা যত শীঘ্র সম্ভব ভাঙতে হবে। হবেই। সেটাই নিয়ম। তো ভেবে-চিন্তে দেখলাম উপায় তো হাতের কাছেই রয়েছে। ঝট করে নিয়ে ফেললাম রেজোলিউশান। নিয়ে ফেলেই মনে মনে জোড়হাত করে বললাম, please ভগবান একটা দিন অন্তত এই পিতিজ্ঞেটি যেন রাখতে পারি। জীবনে পেথথম বার নেওয়া পিতিজ্ঞে যেন পেথথম দিনেই ভেসে না যায় ভগবান।

বলে টলে বেশ একটা স্ফূর্তি এল মনে। এই তো আমারও বেশ একটা রেজোলিউশান আছে। পেট টেট চুলকে শান্ত মনে নতুন বছরের মিষ্টি খেলাম (নিজের ‘জয়ঢাক’ নাম তাড়াতে আজ থেকে আর মিষ্টি খাবনা এই রেজোলিউশান আমি ভুলেও নেবনা কোনোদিন)। এবং অনেক জনের অনেক কথোপকথনের মাঝে তৎক্ষণাৎ নিজের রেজোলিউশান ভেঙ্গে বেরিয়ে এলাম।

এই আমার নিউ ইয়ার রেজোলিউশান এর গল্প। অ্যাঁ? রেজোলিউশানটা কি ছিল? এখনও আন্দাজ করতে পারলেন না? “নিজের চারপাশের শান্তিবলয় সঠিক রাখতে সঠিক সময় সঠিক কথাটা সঠিক স্বরে যেন বলতে পারি” - আরে বাবা এটা ছাড়া ক্যাবলাচরণ দ্যা গ্রেট-এর আর কি রেজোলিউশান হতে পারে? যাই হোক আপাতত সক্কলের আগে রেজোলিউশান ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার প্রতিযোগিতায় হই হই করে ফার্স্ট হয়ে গিয়ে দারুণ আহ্লাদিত হয়ে পড়েছি। বাড়ি ফিরেই সেই আনন্দে আর চাট্টি ল্যাংচা-মোয়া-নারকেল নাড়ু খাব কিনা ভাবছি।

নতুন বছর সকলের খুব ভাল কাটুক এই কামনা করি। আর যে যার রেজোলিউশান সঠিক সময়ে সফল ভাবে ভেঙ্গে বেরিয়ে এসে পুনর্মূষিকাবস্থা প্রাপ্ত হন এই শুভেচ্ছা রইল। ভাল থাকবেন সক্কলে।          

Sunday, 14 December 2014

আজকে স্নান? পাগল?



সেই গল্পটা মনে আছে তো? ওই যে প্রচন্ড কিপ্টে একজন লোক কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, "আপনি স্নান করেন না কেন?" তার উত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'ধরো, তোমায় দুটো দড়ি দেওয়া হলো। একটা তুমি রোজ কূয়ো-র জলে ডোবাবে আর তুলবে। আর অন্যটা বাড়িতে শুকনো জায়গায় রেখে দেবে। কোনটা বেশিদিন টিকবে বলে তোমার মনে হয়? আমাদের শরীরটাও হলো গিয়ে ওরকম দড়ির মতো। যত জল লাগবে তত তাড়াতাড়ি নষ্ট হবে। তার পর ধরো না কেন স্নানের সময় তেল, সাবান, গামছা এসবের খরচখরচা তো আছেই।' গল্পতে এই কিপ্টে ভদ্রলোক যতই হাসির খোরাক হন না কেন আমি কিন্তু মাঝে মাঝে এই লোকটির এই কথাটি বেদবাক্যি বলে মনে করি। বিশেষতঃ এই শীতকালে। না দাঁত বার করার মতন কিছু হয়নি। আজকের মতন এরকম একটা দিনে চান ফান করার মতন বিতিকিচ্ছিরি কাজে কেউ সময় নষ্ট করে? এ কি আর আমার সেই ছোটবেলার শীতকালের স্নান? চরচড়ে শীতের রোদে অনেকক্ষণ ধরে সর্ষের তেল মেখে রোদে রাখা গরম জলের সাথে আরো খানিক গরম জল মিশিয়ে উঠোনেই রোদের মধ্যে ঝুপঝাপ স্নান সেরে নেওয়া? একে শীতকাল, তায় আবার আকাশ জুড়ে মেঘ করেছে, সঙ্গে তেহাই হিসেবে আজ আবার রবিবার। ত্রহ্যস্পর্শ। সকাল দশটার সময় পর্দার ফাঁক দিয়ে আলো আসছে কিনা দেখে নিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিছানায় উঠে বসতে হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে কতগুলো শপথ করে ফেলতে হয়। যেমন, আজ আমায় কেটে ফেললেও আমি ঘর থেকে বেরোব না। তারপর কিছু রান্নাবান্না করব না, ফ্রিজ হাঁটকে যা বেরোবে তাই দিয়ে কাজ চালাব। কাজ না চললে দোকানে ফোন করে কাজ চালাবার ব্যবস্থা করব। অত্যন্ত জাগতিক ও জৈবিক প্রয়োজন ছাড়া সারাদিন লেপের ওম ত্যাগ করবনা। বিছানায় বসেই সিনেমা দেখা, গপ্পের বই পড়া, গান শোনা, ইন্টারনেট এ দেশের দশের খবর নেওয়া, হাচিকোকে ভ্যাংচানো, হাচিকোর ঘুমের সময় বিটকেল আওয়াজ করে ওকে চমকে ঘুম ভাঙিয়ে দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্ম সারব। আর মঝে মাঝেই একটু করে ঘুমিয়ে নেব। আর এর মধ্যে স্নান? পাগল? আজকে স্নান মানে তো অপরাধ। এইসব শপথ টপথ নিতে নিতেই দশটা থেকে অন্ততঃ এগারোটা বাজবে। তারপর জনগনের ঠেলায় ঝুঁটি টুঁটি সামলে আয়নার সামনে নিজেকে মুখ ভ্যাংচাতে-ভ্যাংচাতে দাঁত মাজতে হবে। তারপর বারোটার সময় ফ্রিজে রাখা চিকেন আর ভাত খেয়ে সারাদিনের জন্য আবার লেপের তলায় চলে যেতে হবে। 

বাপরে বাপ। কত্ত কাজ। এসব কাজ সেরে, হাচিকোকে খুঁচিয়ে শেষে মনে প্রবল বিরহ পেল। 'এএএই শীইইতে-মেঘলা দিইইনে-বাইরেএএএ  থাআআআকে নাআতও  মওওন। কবে যাবওও, কাছে পাবওও, ওগো লেপের নিমওওন্ত্রণ।'-গাইতে গাইতে লেপে ঢুকতে যাব, সেই মাহেন্দ্রক্ষণে জনগণ আমায় খোঁচালো। "কিরে তুই সত্যি স্নান করবি না?" 
করুণার দৃষ্টিতে তাকালাম। মনে মনে বললাম "ভগবান, এই অর্বাচীনকে তুমি ক্ষমা করে দিও ঠাকুর। এ জানে না এ নিজের কি ক্ষতি করছে এই শীতে রোজ রোজ স্নান করে। ভিজে দড়ি আর শুকনো দড়ির গল্পটা একে মনে করিয়ে দিও ঠাকুর।" কিন্তু এসব কথা তো আর মুখে বলা যাবে না। সুতরাং বললাম, "আজকে ছেড়ে দে। কাল ঠিক করব। কাল রোদ উঠবে, আমি ওয়েদার ফোরকাস্ট এ দেখে নিয়েছি (এখন দেখাচ্ছে কালও নাকি মেঘ বৃষ্টি হবে। হায় হায়!!!!! কাল আর ছাড়ান পাবোনি গো ঠাকুর। কাল গায়ে জল ঢালতেই হবে। নইলে জনগণ আমার গায়ে ঠান্ডা জলই না ঢেলে দেয়! নিজে করলে তাও গরম জল পাব। কি যন্ত্রণা!!)।"
মনটা সেই আগামীকালের সমাগত দুঃখে এত ভারী হয়ে গেল কি বলব। এরকমও মনে হতে লাগলো কেউ আমার বন্ধু নয়। আপনজন? ছোঃ !! আপনজন কি এই শীতে-মেঘলায় গায়ে জল ঢালার পরামর্শ দেয়? রাগে-দুঃখে বারান্দায় চলে গেলুম। গিয়েই বাপ বাপ বলে আবার ঘরে ঢুকে আসতে হলো যদিও। কি হওয়া কি বলব! তার মধ্যে ঝির ঝির বৃষ্টি। বারান্দায় রাখা একমেঅদ্বিতীয়ম কারিপাতার গাছটা পর্যন্ত এই হাওয়ায়-ঠান্ডায়-বৃষ্টিতে দিব্যি স্নান টান করে চকচকে ভেজা সবুজ পাতা নাড়িয়ে আমায় ভ্যাংচাচ্ছে। 



দেখে শুনে মনে মনে ভেউ ভেউ করে কাঁদতে কাঁদতে আর কাঁপতে কাঁপতে আরো দীর্ঘ্য দীর্ঘ্যশ্বাস ফেলে ঘরে ঢুকে এলাম। গুটি গুটি লেপের তলায় ঢুকে আপাতত প্রার্থনায় বসব ভাবছি। "হে ভগবান, কিছু একটা করো, কাল যেন রোদ ওঠে, নইলে যেন ঠিক স্নানের সময়টাতে অন্ততঃ ইনস্টিটিউট এর জলের সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় ঠাকুর।"


Thursday, 9 October 2014

মহিষাসুরমর্দিনী ও মিষ্টি বিতরণ

মা দূর্গা তো এইমাত্র সবে কৈলাসে ল্যান্ড করে হাত পা ধুয়ে নন্দী-ভৃঙ্গী-চ্যালা-চামুন্ডাদের কাছে মর্ত্যলোকের গল্পগাছা সেরে ভাবতে বসেছেন কি কি তরিতরকারী আছে ফ্রিজে এবার তো রান্না বান্না সুরু করতে হবে। মা লক্ষী তো ফিরব ফিরব করছেন এখনো ফেরেন নি। মানে এইসব ভ্যানতারা করে আমি বলতে চাইছি যে, এখনো তো পুজোর রেশ মেলায়নি, এখনও পুজোর গপ্প করা যায় তাই না? আমার একখানা মারাত্মক পুজোর গল্প জমে আছে। এখনো না বললে স্রেফ পেট ফেটে মরে যাব। অবিশ্যি গল্পটা এইবছরের পুজোর নয়। বছর বাইশ-তেইশ আগেকার তো বটেই। এতদিন চেপে রেখেছিলাম।  ফলে বুঝতেই পারছেন কি মারাত্মক ব্যাপার। ওই যে ছোটবেলার এক বিশ্বকর্মা পুজোয় আমাদের বাঁদরামোর গল্প বলেছিলাম না, সেখানেই তো আপনাদের একটু বলেছিলাম যে আরো এককাঠি সরেস ঘটনার গল্প শোনাব আপনাদের। সেটাই বলতে বসেছি আজ। এইটিই আমার শেষ বাঁদরামি। এর যে মারাত্মক প্রভাব আমার মনের ওপর পড়েছিল তারপর থেকে আমি আর ও রাস্তায় যাইনি। সেদিন আমার জন্য জনগণের গণপিটুনির চোটে আমার কচি কচি বন্ধুদের যে মৃত্যু হয়নি সেটাই যথেষ্ট। ঘটনাটা? হ্যাঁ হ্যাঁ এই যে বলছি এইবার।

তখন আমাদের কত বয়স হবে? দশের আশেপাশে। মাথায় বাঁদরামি বুদ্ধিতে ভর্তি। দুর্গাপুজোর অষ্টমী। পাড়ার প্যান্ডেলে বসে বোর হচ্ছি সক্কলে। কারণ রোদ পড়তে না পড়তেই নতুন জামা খরমরিয়ে বেরিয়ে পড়েছি অভিযানে। আশেপাশের চারটে প্যান্ডেলের ঠাকুর গত তিনদিন ধরে তিরিশবার দেখা হয়ে যাওয়া সত্বেও একতিরিশতমবার দেখে এসেছি। তারপরে প্যান্ডেলের পেছনে পাড়ার রেশন দোকানের সামনের একটুকরো জমিতে মহালয়ার দিনে টিভিতে দেখা 'মহিষাসুরমর্দিনী' পালার অভিনয় হয়ে গেছে। 'মহিষাসুরমর্দিনী' পালা-র ব্যাপারটা একটু বলার লোভ সামলাতে পারছি না।

পুজোর পাঁচদিনই (মানে আমাদের পুজো তখন ষষ্ঠী থেকে শুরু হত আর কি) আমরা একটা বিপুল আনন্দের কাজ করতাম। যেটা বছরের আর বাকি তিনশ ষাট দিনে করা হত না। ব্যাপারটা হলো মহালয়ার দিনে টিভিতে সকালবেলা যে 'মহিষাসুরমর্দিনী' বা 'দূর্গা-দুর্গতিনাশিনী' গোছের অনুষ্ঠান দেখানো হত সেটি আমরা কুঁচোর দল ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিদিন পাড়ার প্যান্ডেলের পেছনে আধো-অন্ধকারে নিজেদের মতন করে নাচা-নাচি-নকল যুদ্ধ ইত্যাদির মাধ্যমে পুনরোনুষ্ঠিত করতাম। টিভি অনুযায়ী, মা দুগ্গার নাচ জানাটা অত্যন্ত জরুরী। তাই মা দুগ্গার ভূমিকাটা সর্বসম্মতিক্রমে মোমের প্রাপ্য। কারণ আমরা বাকিরা প্রত্যেকেই নাচে এক একটি উদয়্শংকর। মোম দুহাতে বাঁশের কঞ্চি বাগিয়ে ধরে গোলগোল চোখ করে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে-নেচে-কুঁদে মহিষাসুরের পেছনে গোল হয়ে ঘুরছে। মহিষাসুরও (সে অবশ্যই কোনো একটা ছেলে, কারণ আমরা মেয়েরা কোনো মতেই নতুন জামার মায়া ছেড়ে মাটিতে গড়াগড়ি দেব না) আর একটা কঞ্চি বাগিয়ে ধরে মুখে প্যাঁ প্যাঁর প্যাঁ প্যাঁ বাজনা বাজিয়ে দুর্গার সাথে যুদ্ধ করছে। আমি যথারীতি নতুন ফ্রক গুটিয়ে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে সিংহ সেজেছি। বেশ খানিকক্ষণ কঞ্চিতে কঞ্চিতে যুদ্ধ হবার পর ঘাসে ভালো করে পা মুছে (নইলে আমার নতুন জামায় ময়লা লেগে যাবে, আর মা আমার সিংহ সাজা বার করে দেবে) আমার ঘাড়ে একটা পা রেখে হাতের লম্বা বাঁশের কঞ্চিটা মহিষাসুরের বুকে খুঁচে দিয়ে চোখ বড়বড় করে দাঁড়িয়েছে দুগ্গা ঠাকুর মানে আমার বন্ধু মোম। তার পায়ের কাছে জোর করে মহিষাসুরকে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। আর চারপাশে লক্ষী-সরস্বতী-কার্তিক-গনেশ যে যার মতন দাঁড়িয়ে গেছে। তখন পাশ থেকে বুবুন মুখেই পুঁ উ উ উ উ করে শাঁখ বাজিয়ে দিল। এই যে প্রচন্ড রোমহর্ষক ব্যাপারটা চলত এটাই হলো আমাদের মহিষাসুরমর্দিনী' পালা। প্রতি বছরই ষষ্ঠী থেকে দশমীতে প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা এটা আমাদের মাস্ট টু ডু লিস্টের এক নম্বর আইটেম।

তো সে যাই হোক, যেদিনের কথা বলছি সেদিন এই রোমহর্ষক খেলাটিও খেলা হয়ে গেছে। পাড়ার প্যান্ডেলে সন্ধ্যারতি-ধুনুচি নাচ এবং তত্সহ পাড়ার উঠতি দাদাদের প্রবল নাচন-কোঁদন শেষ সেদিনের মত। সন্ধ্যারতি সেরে পাড়ার মা-কাকিমা-জ্যাঠিমার দল আমাদের কুঁচোদের গলার বাকলস খুলে দিয়ে নিজেরা বাকি ঠাকুর দেখতে গেছেন। আমরা কিনা সেসব ঠাকুর একত্রিশবার দেখে ফেলেছি তাই বত্রিশতমবার আর যাব না এই অজুহাতে স্বাধীনতা ভোগ করছি। তখন তো আর টাইমপাসের সবচেয়ে ভালো উপায়টা জানতামনা। বেশ লোকজনের নামে সবাই মিলে নিন্দেমন্দ করে সুন্দর নির্বিঘ্নে সময় কাটিয়ে দেওয়া যেত। তাহলে টাইমপাস করতে গিয়ে জনতার হাতে মার খেতে খেতে বাঁচতে হত না। মোদ্দাকথা জীবনের সব ফুর্তি শেষ সেদিনের মত।

এমন সময় কি করে যেন হাতে এসে গেল সেবছরের দুর্গাপুজোর সময় নির্ঘন্টের লিফলেটের একটা বেওয়ারিশ বান্ডিল। আমাদের ওখানে কোনো বছরেই এই বিষয়টি ছাপা হত না। গ্রামের পুজো, মুখে মুখেই সকলে জেনে যেত কোন পুজো কখন হবে। সেবছরই কেন যে এই বস্তুটির আবির্ভাব হয়েছিল কে জানে? বোধহয় আমার মাথা থেকে বাঁদরামির পোকাটা সারা জীবনের জন্যে বার করে দেবার জন্যই হবে। কে জানে। তো সেই হলদে রঙের পাতলা কাগজের বান্ডিলটা দেখে মাথার পোকা নড়ে উঠলো। খুঁজে পেতে সকলের পকেট হাতড়ে কটা খুচরো পয়সাও পাওয়া গেল। বলাই বাহুল্য এই চাঁদা সংগ্রহে সংগ্রহ করা ছাড়া আমার কোনো অবদান ছিল না। আধুলি-সিকি জড়ো করে গুনে গেঁথে মোট গোটা আট-দশ টাকা হয়েছিল। সঠিক কত আমার তা মনে নেই। সেই নিয়ে সোজা পন্ডিতের মিষ্টির দোকানে। সেখান থেকে কেনা হলো মিষ্টির খালি কাগজের প্যাকেট। প্যাকেট এনে খাপে খাপে ভাঁজ করে মিষ্টির বাক্স রেডি। এবার তার মধ্যে এন্তার হাবিজাবি জিনিস ঠুসে, রাবার ব্যান্ড দিয়ে আটকে ওপরে একটা করে সেই হলদে পাতলা কাগজে লালকালি দিয়ে ছাপা দূর্গাপুজোর সময় নির্ঘন্ট দিয়ে আমরা রেডি হয়ে বসে রইলাম সম্ভব্য দর্শনার্থীর আশায়। গোটা পাঁচ-সাত প্যাকেট ছিল মনে আছে। এর মধ্যে ষোলোকলা পূর্ণ করতে প্যান্ডেলের চরণামৃত বিতরণের বাটিটি ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়ল আমাদেরই কোন কুঁচোর হাতে। মানে কেউ প্রচন্ড ভক্তি সহকারে পূন্যার্জন করতে এলে তাঁকে ওই চিনি মেশানো ফুল পাতাওয়ালা জল এক কুষি দিতে হবে। আমরাও সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম। কারণ তাতে করে আমাদের দেওয়া প্যাকেটের যথার্থতা বাড়ে। কেউ সন্দেহ করবে না।

এই চরণামৃত আর হলদে কাগজের নির্ঘন্টের জোরে আমরা এক দুই করে গোটা তিনেক প্যাকেট গছিয়েও দিলাম লোকজনদের। কেউ তো আর তক্ষুনি খুলে দেখবে না, কি দিল 'সার্বজনীন দুর্গোত্সব কমিটি'-র পক্ষ থেকে। আমাদের মনোবল বাড়তে লাগলো। আর ওভার কনফিডেন্সে মারাত্মক ভুলটা করে ফেললাম। বড়রা খুলে দেখবে না কিন্তু ছোটরা তো এসব চক্ষুলজ্জা টজ্জার ধার ধারে না। ভুল করে চার নম্বর প্যাকেটটা গেল একটি বাচ্চা ছেলের হাতে মানে আমদের তুলনায় বাচ্চা। বছর পাঁচেক হবে। সে তখুনি খোলার চেষ্টা করলো। আমাদের বাঁচিয়ে দিল তার মা। "বাবু, এখন না পরে, বাড়ি গিয়ে। এখন ঠাকুর দেখো।" বাপ বাপ বলে বেঁচে গেলাম। কিন্তু মারে হরি রাখে কে? ভবি ভুলল না। ঠাকুর দেখা শেষ করেই প্যান্ডেল থেকে দুপা বেরিয়েই বাবুর বায়নায় বাবুর মা প্যাকেট খোলার উদ্যোগ নিলেন। নজরে পড়তেই আমরা পড়ি কি মরি করে বাকি প্যাকেট ফ্যাকেট নিয়ে দুদ্দাড়িয়ে প্যান্ডেলের পেছনে। সেখান থেকেই শুনতে পেলাম বাবুর মা হাঁই হাঁই করে বাছাই করা গ্রাম্য গালিগালাজের সম্ভার নিয়ে প্যান্ডেলে বসে থাকা নিরাপরাধ দুই পাড়াতুতো দিদিকে আক্রমন করেছে। শুনেই তো আর একচোট হুটোপাটি। প্যান্ডেলের পেছন থেকে মোমেদের বাড়ি সবচেয়ে সামনে। দৌড় দিলাম সেদিকে। প্যান্ডেল আর মোমেদের বাড়ি মাঝে মোরাম ফেলা রাস্তা। সেই এক পুঁচকি রাস্তা যেন দৌড়ে শেষ করতে পারছিলাম না সেদিন। মাঝে আবার মোরামে পিছলে পড়ে গেলাম আমি। না পড়লেই আশ্চর্য হতাম। সবসময়ই আমি এরকম গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়ে যাওয়া-আটকে যাওয়া-হোঁচট খাওয়া ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকি। যাই হোক, পড়ে গেলাম, পড়ে গিয়ে দুটো হাঁটু ফালা ফালা হলো, সঙ্গে নতুন জামা ছিঁড়ল। খোঁড়াতে খোঁড়াতে মোমেদের বাড়িতে গিয়ে ঢুকলাম। বাকিরা আগেই পৌঁছে গেছে। আর আমার দেরী দেখে জনতার হাতে সম্ভব্য নির্যাতন আশংকায় বাড়ির বাকিদের বাইরে বেরিয়ে দেখতে পাঠিয়েছে। মোমের মা-জ্যেঠিমা আমায় বাড়ি নিয়ে গেলেন। মোমের মা আমায় তাঁদের বাড়ির বাথরুমে নিয়ে গিয়ে পা থেকে মোরাম, রক্ত ধুয়ে দিচ্ছেন, ডেটল লাগাচ্ছেন, ছেঁড়া জামা বাড়ি ফেরার উপযুক্ত করে দিচ্ছেন। আর আমি এই পড়ে যাওয়া-কেটে যাওয়া- তার ওপরে ডেটলের অত্যাচার এত কিছু হয়ে যাওয়া সত্বেও এতটুকুও কাঁদছি না। তার কারণ এই নয় যে আমার ছোটবেলা থেকেই দারুন সহ্যশক্তি। কারণটা এটাও না যে, যে দুজন দিদির উপর আমাদের 'বাবুর মা' ঝালটি ঝেড়েছেন আমাদের না পেয়ে, তারা ততক্ষণে আমাদের সন্ধান পেয়ে গেছে আর আমাদের ওপর যত্পরোনাস্তি মধুর বাক্যবাণ বর্ষণ করছে। কারণটা এই যে, তাদের মধ্যে একজন দিদি আমায় শাসিয়েছে, "দাঁড়া তোর বাড়িতে বলে দেব।" আর আমি এই একটি বাক্যেই কাবু। বাড়ি ফিরে আমার যে আজই শেষ দিন, সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহই ছিল না। মা-বাবা দুজনে পালা করে কম্বল ধোলাইয়ের মত করে পেটাবে। একজন ক্লান্ত হয়ে গেলে অন্যজন দায়িত্ব নেবে পেটানোর। "উফ! মরেই যাব, এবছর আর বিজয়ার দিনে প্যান্ডেলে বসে খিচুড়ি খাওয়া জুটল না আমার ভাগ্যে। কাল নবমী, কালকেই আমি মরে যাব।" এই চিন্তায় আমি প্রায় ল্যাম্পপোস্টের মত হয়ে গেছিলাম। বাইরে প্রবল গন্ডগোল। 'বাবু'-র কান্না-বাবুর মায়ের মুখের তুবড়ি-পুজো কমিটির লোকজনের তাঁকে শান্ত করার প্রচেষ্টা-বাকিদের মজা দেখা-মন্তব্য করা-আর কিছু লোকের আমাদের সন্ধানে চেঁচামেচি করা, লোকজন, চেঁচামেচি সব ছাপিয়ে আমি বোধহয় শেষ দিনের হরিনাম শুনতে পাচ্ছিলাম মনে মনে।

যাই হোক আমার অবস্থা দেখে বোধহয় মা দুগ্গার সেদিন দয়া হয়েছিল। মোমের জ্যেঠিমা বাড়ির সবার বড়। তিনি ওই দিদিটিকে বললেন যাক গে যা হয়ে গেছে যাক, ওর বাড়িতে কিছু বলিস না। সকলেই জানতেন বোধহয় আমার বাবা রাগলে একটি আস্ত শিব ঠাকুর। আমার অবস্থা ঠিক কি হতে পারে তার কিছু আন্দাজ করেছিলেন বোধহয়। দিদিটিও গাঁইগুঁই করে শেষ পর্যন্ত চুপ করে গেল। গজগজ করতে করতে বাড়ি চলে গেল। বেশ খানিকক্ষণ পরে আমায় মোমের মা সঙ্গে করে বাড়ি দিয়ে এলেন। আমি নতুন জামা আর দুটো হাঁটু কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ভয়ে কাঠ হয়ে বাড়ি চলে এলাম। পরেরদিন ঘটনাটা বাড়ির লোক জানতে পেরেছিল। কিন্তু আমিও যে সে ঘটনার একজন সক্রিয় কালপ্রিট, সেটা বোধহয় জানতে পারেননি। পারলে মনে হয় এই ব্লগপোস্টটা আজ আর আমায় লিখতে হত না।

আমি অন্ততঃ মাস খানেক ভয়ে ভয়ে থাকতাম এই বুঝি সেই দিদি মাকে বা বাবাকে বলে দিল।  তাকে এড়িয়ে চলতাম। আর পরদিন পুজো প্যান্ডেলে গিয়ে আমি দুই হাঁটুতে ব্যান্ডেজ বেঁধে খোঁড়াতে খোঁড়াতে রুমা-মোম-বুবুন ইত্যাদি বাকি ব্যাটেলিয়ানের সাথে আবার অনেক অনেক সময় নিয়ে বত্রিশতমবারের জন্য অন্য প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখতে গেছিলাম। যাতে আমাদের প্যান্ডেলে আমাদের কেউ দেখতে না পায়। দশমীতে খিচুড়িটাও মুখ নিচু করে খেয়ে এসেছিলাম সেবার। ভাগ্যিস বাবু আবার বায়না করে নি তার মায়ের কাছে আমাদের প্যান্ডেলে আবার ঠাকুর দেখতে আসার জন্যে। উফ!!!!! কি যন্ত্রণা নিয়ে যে বেঁচেছিলাম কদিন কি বলব। আর তারপর থেকে এরকম বাঁদরামি আর করিনি কোনদিন। সত্যি বলছি। বিশ্বাস করুন।

                              

Tuesday, 23 September 2014

বিশ্বকর্মা পুজো ও লাউগাছ

এই সেদিন একজনের সাথে কথা হচ্ছিল। আমি তাকে যত্পরোনাস্তি যুক্তিসঙ্গত ভাবে বোঝাবার চেষ্টা করছিলাম যে আমার এই পাঁচফুটিয়া চেহারাটা দেখে যতই শান্তশিষ্ট-সাত চড়ে রা না কাড়া জাতীয় মনে হোক না কেন আমি কিন্তু অত্যন্ত জটিল-অত্যন্ত কুচুটে-ঝগড়াটে আর পাজির পা ঝাড়া একটি মহিলা। বিটকেল বদমায়েসি বুদ্ধি কিন্তু আমার একটুও কম নেই। সে কিছুতেই ব্যাপারটার সত্যতা বোঝেনা। খালি হাসে আর মাথা নাড়ে। কি করে যে বোঝাব? যাক গে বলে তাকে আর ঘাঁটালাম না তখনকার মত। তারচেয়ে বরং আপনাদের কাছে আমার কুচুটেপনার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক।

অনেকদিন আগে যখন আমি সত্যি সত্যি ছোট ছিলাম মানে এইরকম সাইজে ছোট মাথায় বদ-বুদ্ধি গুলো বড়বড়, সেরকম নয়। চেহারা, বয়স আর মন তিনটেই যখন ছোট আর সাদা ছিল তখনকার কথা বলছি। আমার প্রানের বন্ধু রুমা। তার কথা তো আপনাদের আগেই বলেছি। তার জ্যেঠুদের ছিল ডেকোরেটিং-এর ব্যবসা। সেসব জিনিসপত্র রাখার জন্য বাড়ির লাগোয়া গুদামঘর। আর তাঁদের বাড়ির সামনে থাকত প্রচুর বাঁশ যেগুলো ছিল আমাদের মানে সারা পাড়ার কুঁচোদের বৈকালিক হুড়োহুড়ির জায়গা। বছরের একটি বিশেষ সময় এই বাঁশগুলি সরিয়ে ফেলা হত। কারণ তখন বাঁশগুলো দিয়ে খাঁচা বানিয়ে প্যান্ডেল বানানো হতো বিশ্বকর্মা পুজোর জন্য। আর যতদিন না সেই বাঁশের খাঁচার ওপরে লাল-গোলাপী-সাদা কাপড় লাগিয়ে প্যান্ডেলের অবয়ব তৈরী হত ততদিন ওই বাঁশের খাঁচাটা ছিল আমাদের সম্পত্তি। বিকেলে ওই খাঁচার সবচেয়ে নিচের ধাপের বাঁশে উঠে পা দোলানো, বা বাঁশ ধরে ঝুলে পা দুটিকেও বাঁশের ওপরে তুলে দিয়ে বাদুড়ঝোলা হয়ে থাকা এজাতীয় দুর্দান্ত এডভেঞ্চার করা চলত। যারা আমার মতন হাঁ করা বাচ্চা ছিল না, প্রাণে কিঞ্চিত সাহস এবং বাড়ির লোকের তুমুল উত্তম-মধ্যম হজম করার মত কলিজা ছিল, তারা বাঁশের খাঁচার আরো উপরের দিকে উঠে নানা কসরত দেখাত আর আমরা একদম নিচের ধাপে বসে জুলজুল চোখে সার্কাস দেখতাম আর মুগ্ধ হতাম। 

ক্রমে বিশ্বকর্মা পুজোর দিন এগিয়ে আসত। পুজোর আগের দিন বিকেল থেকে আমাদের বাঁশে চড়ার খেলা বন্ধ হত আর আমরা প্যান্ডেলে বসে প্যান্ডেলে কাপড় চাপানো আর একটা নারকেল দড়ি দিয়ে বাঁধা বাঁশের খাঁচা কেমন করে সুন্দর সাজানো ঘরের মত প্যান্ডেল হয়ে উঠছে সেটা অবাক চোখে বসে দেখতাম। রুমার সাথে হলায়-গলায় বন্ধুত্বের দৌলতে সেই পুজোবাড়িতে আমার অবাধ যাতয়াত ছিল। পুজোর আগের দিন রাত থেকে তাদের বাড়িতে রুমার সাথে সাথে আমারও পাত পড়ে যেত। এবং সেই সূত্রে বিশ্বকর্মা পুজোর আগের দিন সন্ধ্যেয় মা দয়া করে আমার পড়ার ছুটি দিত। আর সেই ছুটি আমি আর রুমা আমাদের পাড়ার বাকিদের সাথে যথেচ্ছভাবে উদযাপন করতাম।

সেরকমই একবছর বিশ্বকর্মা পূজোর আগেরদিন সন্ধ্যেয় প্যান্ডেল বানানো চলছে। ডেকোরেটিং এর জিনিসপত্রের গুদামে বিশ্বকর্মা ঠাকুর হাতির গায়ে ত্রিভঙ্গ মুরারী হয়ে হেলান দিয়ে চার হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তাঁর চারপাশে কাগজের ফুল-শিকলি-মাথার পেছনে কাগজের জাপানি পাখা সব লাগানো কমপ্লিট। এদিকে তখনও প্যান্ডেলের কাপড় সেলাই চলছে। বোরিং কাজ। এরপর লাগানো হবে তারপর সাজানো হবে। সেই অবাককরা ব্যাপারটা আসতে অনেক দেরী। আমাদেরও লুকোচুরি-কুমিরডাঙ্গা-পিট্টু সব শেষ হয়ে গেছে। এমনকি প্রতিটি খেলার শেষে যে ইন্টারেষ্টিং ঝগড়াঝাঁটি-চেঁচামেচির বিষয়টা থাকে সেটাও শেষ। সবাই বসে বসে প্যান্ডেলের কাপড় সেলাই দেখছে আর নাক-কান-হাত-পা খুঁটছে। মোদ্দাকথায় বেজায় বোরিং একটা ব্যাপার চলছে। এমন সময় আমাদের হাতে এসে পড়ল একটা নতুন ব্লেড। এই জিনিসটা সাধারণতঃ আমাদের হাতে কেউ তখন দিত না। কারণ উত্সাহের চোটে নিজেদের হাত পা-ই কেটে বসে থাকব হয়ত। প্যান্ডেলের কারিগরদের হাত থেকেই কোনভাবে এই নিষিদ্ধ বস্তুটি আমাদের হাতে এসে পড়েছিলো। সঙ্গে সঙ্গে সবাই পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠলো। চকচকে ধারালো ব্লেডটা নিয়ে কিছু যে  করতেই হবে এ বিষয়ে  দ্বিমত ছিল না। কিন্তু কি কাটা হবে  সেটাই প্রশ্ন। আমার মাথার বদ বুদ্ধির ঢিপি নড়ে উঠলো। বললাম চলে আয় সবাই আমার সাথে। প্রথমেই যে বাড়ির পুজো তাদের বাড়ির পেছনের বাগানে। সর্বসম্মতিক্রমে ঠিক হলো এখান থেকেই অভিযান শুরু। বেছে বেছে লাউ-কুমড়ো বা চালকুমড়ো গাছ খুঁজে নেওয়া হলো। কারণ এইসব গাছ ছাড়া ব্লেড দিয়ে কোনো গাছই কাটা যায় না। এই সময় এইসব গাছ সকলের বাগানেই লকলকিয়ে উঠেছে। আমরা আনন্দে নাচতে নাচতে সারা পাড়ার সমস্ত লাউ কুমড়ো গাছের গোড়া মানে মাটির ঠিক উপরেই কচাত করে কেটে সেই নতুন ব্লেড -এর ধার পরীক্ষা করতে লাগলাম। আমাদের লোকজনদের নিজেদের বাড়ির গাছও বাদ গেল না। রেহাই পেল কেবল যেসব বাড়ির পাঁচিলের মধ্যে গাছপালা আছে তারা। যেমন আমাদের বাড়ি, রুমাদের বাড়ি ইত্যাদি। ভর সন্ধ্যেবেলা, অন্ধকারে কোনো বাড়ির সদস্যদেরই মনে হয়নি বাড়ির পেছনের লাউ-কুমড়ো গাছ পাহারা দেবার কথা। সুতরাং পরদিন সকালে দেখা গেল পাড়ার এমুড়ো থেকে ওমুড়ো পর্যন্ত সমস্ত লাউ-কুমড়ো-চালকুমড়ো গাছ কোনো এক অজানা কারণে নেতিয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যের মধ্যে নেতিয়ে যাবার কারণটি আর অজানা রইলো না। প্রত্যেক বাড়ির মা জ্যেঠিমারা এই নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন এবং যে বা যারা এই কাজটি করেছে তাদের মুন্ডুপাত করতে লাগলেন।

আমরা যারা ভালোমানুষ মুখে এই আলোচনাচক্রে শ্রোতার ভূমিকায় ছিলাম তাদের যে মা-জ্যেঠিমা-কাকিমার দল বিন্দুমাত্র সন্দেহই করেননি বলাই বাহুল্য। কারণ আমাদের মত ক্যাবলাকান্ত-আঙ্গুলচোষা-শান্ত বাচ্চারা যে এসব গর্হিত অপরাধ করতে পারে এ তাঁদের কল্পনাতেও আসেনি। তাঁদের আমাদের প্রতি অগাধ আস্থার জোরে আমাদের পিঠ-কান-গাল সেযাত্রা বেঁচে গিয়েছিল।

এখন আমাদের সেদিনের দলবলের দিকে চোখ দিলে দেখা যায় কেউ প্রচন্ড কড়া মা , বাচ্চাকে শাসন করতে পেলে সন্ধ্যের সিরিয়াল পর্যন্ত ভুলে যায়। কেউ আপাদমস্তক গম্ভীর সরকারী কর্মচারী, প্রচন্ড দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত। কেউ বা আমার মতন হাড়-হাভাতে গবেষক, আজীবন ছাত্র থাকার জন্যে অঙ্গীকারবদ্ধ। মোটকথা কাউকে দেখলেই শান্ত-শিষ্ট রামগরুড়ের ছানা ছাড়া কিছু মনে হবার যো নেই। পেটে পেটে কিন্তু আমরা যে একেকটি বদের গাছ সেটার একটা উদাহরণ তো পেলেন? আরো আছে ক্রমশঃ প্রকাশ্য। এই তো পুজো আসছে, পুজোর সময়েই একটি ঘটনা ঘটিয়েছিলাম।সেটা আরো এককাঠি সরেস ব্যাপার। কয়েকদিন বাদে বলব নিশ্চয়ই।

Thursday, 18 September 2014

গুপ্তধন কোথায়?...........শেষ পর্ব


প্রথম ক্লু তো তালে গোলে হরিবোল হয়ে গেল। দ্বিতীয় ক্লু পেতে দেখি তাতে লেখা আছে ক্যান্সার সংক্রান্ত কিছু। এমন একটা জায়গা যেখানে ঢুকলে 1400 শতাব্দীর কথা মনে হয়, আবার তাতে ক্যান্সার এর উল্লেখ আছে, আবার তাতে নয়নতারা ফুলের উল্লেখ আছে..........বোঝো। ঠিক যেন চন্দ্রবিন্দুর '', বেড়ালের '' আর রুমালের 'মা' কি আর বলব? আমার মনে পড়ল কোথায় আমি নয়নতারা ফুলের ঝোপ দেখেছি। সবাইকে বলতে, দে দৌড় সেখানে। সেখানে গিয়ে যথারীতি কিছু মিলল না। কোনো সাইন, টুকরো কাগজ- কিচ্ছু না। আবার লেখা আছে একলা দাঁড়ানো একটি নয়নতারা ফুলের গাছের কথা। কেউ কোনো ভাবেই মনে করতে পারল না একলা দাঁড়ানো একটি নয়নতারার কথা (কোথায় কি গাছ আছে তার একটা ভার্চুয়াল লিস্ট মনে মনে সেভ করে রাখতে হবে দেখছি) আমি আর পিয়ুশি গেলাম ল্যাবে। ওখানে টবে টবে একটা করে গাছ রাখা আছে তার মধ্যে কোনটা নয়নতারা নয় তো? তারপর আবার ক্যান্সার এর কথা লিখেছে। তার মানে আমাদের ল্যাব নয় তো? আমাদেরতো ক্যান্সার নিয়ে কিঞ্চিত নাড়াঘাঁটা হয়। দুজনে দোতলার যাবতীয় টব দেখে শুনে একটা লতানে মানিপ্ল্যান্টকে প্রায় উত্খাত করার উপক্রম করে বিফল মনোরথ হয়ে নিচে নেমে এলাম। নিচে সবাই জটলা করছে। নানা মুনির নানা মত। বেচারা একটি নিরীহ ছেলে শেষ পর্যন্ত সন্দেহের তালিকায় চলে এলো। সে নাকি নেক্সট ভলেন্টিয়ার। তার কাছে নেক্সট ক্লু থাকতে পারে। তার অপরাধ বেচারা একটু বেশি সংখ্যায় সিগারেট খায়। যেহেতু ক্লু তে ক্যান্সার এর কথা আছে, সেহেতু তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে। সে বেচারাকে সিগারেট খায় বলে ক্যান্সার অবধি টেনে নিয়ে যেতেও ছাড়া হলো না। নেহাত সে আমার ব্লগ পড়বে না এই বিশ্বাস থেকেই লিখছি এত বিশদে। যাই হোক, এই ক্লু থেকে কোন ভলেন্টিয়ার আমাদের পরের ক্লু তে নিয়ে গেল আমি জানি না। কি ভাবেই বা এই ধাঁধার নির্ণয় হলো জানি না। দেখলাম তৃতীয় ক্লু হাতে চলে এসেছে। তাতে লেখা আছে এই ক্লু টি ভাঁওতা, আগের ক্লুতে ফিরে যাও। কি জ্বালা দেখুন দিকি

ততক্ষণে একটা জিনিস পরিস্কার হয়েছে যে আমাদের কোনো চিহ্ন খুঁজতে হবে না। ক্লু অনুসারে সঠিক ভলেন্টিয়ারকে খুঁজে বার করতে হবে। এইখানেই ট্রিক। যার জন্যই মিস্টার হুয়াং, মুখ বদল ইত্যাদি ইত্যাদি হাজারো ভাঁওতাবাজির অবতারণা। আমাদের টীম এর কত নম্বর ক্লু কোন ভলেন্টিয়ারের কাছে আছে সেটি বের করতে পারলেই হলো। যাই হোক, কি করে যেন সকলের মনে হলো গেটের কাছে যে ভলেন্টিয়ারটি আছে তার কাছে থাকতে পারে।  সে যেতে আমাদের পরের ক্লু দিয়েও দিল। আমি না অনেক কে জিজ্ঞাসা করলাম জানেনযে কি করে বুঝলে যে ওর কাছে আছে নেক্সট ক্লু? সবাই দেখি আমতা আমতা করে। যাই হোক পরের ক্লু তো পাতাভর্তি কিসব লেখা। সবাই ঝুঁকে পড়ে টর্চ জ্বালিয়ে পড়ছে। আমি যথারীতি এই পাঁচফুট উচ্চতা নিয়ে ডিঙ্গি মেরেও লোকজনের ঘাড় পেরিয়ে কিছু দেখতে পাচ্ছিনা। সুতরাং জটলার চারপাশে ঘুর ঘুর করে বেড়াচ্ছি। এমন সময় দেখি সেই প্রথম ক্লু এর গোমড়ামুখো দিদিমনি এসে জিজ্ঞাসা করছে, 'এই তোমাদের কত নম্বর ক্লু চলছে?' বললাম, চার। বলে দেখি আগের তিনটে ক্লু। সে গবেষণা শেষ করে যা জানালো তাতে বোঝা গেল গেটের ভলেন্টিয়ারটি গোলমাল পাকিয়েছে। সে যে ক্লু টি আমাদের দিয়েছে সেটি আমাদের হাতে এখনি পড়ার কথা নয়। এর ঠিক আগে আরো একটি ক্লু আছে যেটি এই দিদিমনির কাছে আছে। তাই সেটি তার হাত থেকে না নিয়ে কি করে আমরা পরের ক্লু পেয়ে গেলাম সেটি দেখেই তার মনে হয়েছে গড়বড় কিছু একটা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সে তোম্বা মুখে আগের ক্লু টি দিয়ে দিল হাতে আর বলল এটি একটি পাজল। এটার উত্তর না জানলে পরে যখন সব ক্লু এর সমাধান জিজ্ঞাসা করা হবে তখন না বলতে পারলে কিন্তু হবে না, নম্বর কাটা। অর্থাত কিনা আসল ফোর্থ ক্লু এখন আমাদের হাতে আর পঞ্চম ক্লু আমরা আগেই পেয়ে গেছি। ফোর্থ ক্লু এর সমাধান পরে ভাবা যাবে বলে সবাই ফিফথ ক্লু তে মনোনিবেশ করলো। আর আমি যথারীতি জটলার বাইরে দাঁড়িয়ে আঙ্গুল চুষতে শুরু করলাম। সেই একপাতা জোড়া আবোল তাবোল গল্প পড়া শেষ করে দেখি সবাই ক্যাম্পাস এর মেন গেট এর দিকে ছুটছে। জিজ্ঞেস করে জানলাম যে ওখানে ব্যারিকেড কথাটার উল্লেখ আছে। তাই ব্যারিকেড  যাওয়া হচ্ছে। ব্যারিকেড মানে হলো এই ইনস্টিটিউট এর মেন গেট ঢোকার প্রায় সাতশো মিটার আগে যে একটি চেকপোস্ট আছে সেটি। এই সাতশো মিটার রাস্তা ইনস্টিটিউট এরই। সবাই এখানে মর্নিং-ইভনিং-নাইট সবরকম ওয়াকই করে থাকে। তো সেদিকে ছুটছি এমনসময় পাশের ল্যাবের একটি ছেলে এসে অযাচিত ভাবেই আমাদের ফোর্থ ক্লু এর উত্তর বলে দিল। যেটা আমাদের এখনো দেখাই হয়নি। পরে পেলাম। তারপরে দেখি সেই ছেলেটি গাছের নিচে আধোঅন্ধকারে বসে আছে। যেখান থেকে যা জানতে পারছে সব দলকেই সাহায্য করছে। ভালো ব্যাপার। বড় উপকারী ছেলে। কচুরি খেতে বড় ভালবাসে জানি। ভাবছি ওকে একদিন ডেকে কচুরি টচুরি বানিয়ে খাইয়ে দেব। 

যাই হোক ব্যারিকেড যাবার আগেই দেখি একটি ফার্স্ট ইয়ারের ছেলে অন্ধকারে ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে বসে আছে। ব্যাটা নিশ্চয়ই ভলেন্টিয়ার। চেপে ধরলাম সবাই মিলে। বললাম আমরা টীম ফাইভ। তোমার কাছে কি আমাদের নেক্সট ক্লু? সে হাতের তালু আড়াল টাড়াল করে মোবাইলে অনেক কিছু চেক করে টরে বলে কিনা, "দেখি তোমাদের ফার্স্ট-সেকেন্ড-থার্ড-ফোর্থ-ফিফথ-সিক্সথ আর সেভেন্থ ক্লু।"

আঁই!!!! তার মানে এর কাছে আমাদের টীম এর আট নম্বর ক্লু আছে। আমরা তো এখন ফিফথ ক্লু তে আছি। সেটা আর জিজ্ঞাসা করেনি হাঁদাগঙ্গারামটা। আগেভাগেই প্রকারান্তরে জানিয়ে দিয়েছে যে তার কাছে আমাদের কখন আসতে হবে। হে হে। 

যাই হোক সেই পাঁচ নম্বর ক্লু সলভ করতে করতে তো হোস্টেল এর বাইরের দিকের মেনটেনেন্স এর জন্য রাখা যাবতীয় দরজা খুলে দেখা গেল। অন্য টীম এর ক্লু রাখা আছে দেখলাম। আমাদেরটাই নেই। পিনাকী, আমি আর ইমরান মিলে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে ড্রেন মেনটেনেন্স এর যাবতীয় সরু সরু সুগন্ধি দরজা খুলে খুলে দেখলাম। তার মধ্যে রুচি-পিয়ুশি মেস থেকে আলুর পরটা এনে মাঠে বসেই খেতে শুরু করে দিয়েছে। বেচারাদের খিদে পেয়ে গেছে ছুটতে ছুটতে। আমার এতক্ষণে মনে পড়ল যে ভাত-ডাল-বাঁধাকপির তরকারী আমার সাথে বিশেষ বেয়াদপি করেনি তো। বেশ তো দৌড়াচ্ছি। তার মানে এখনও অনিয়ন্ত্রিত রকম বেঢপ হইনি মনে হয়। নইলে এর আগেই দম শেষ হয়ে যাবার কথা ছিল। কথাটা মনে হতে এত ভাল্লাগলো জানেন, ঐসব গন্ধওয়ালা দরজা-ফরজা ছেড়ে দিয়ে মাঠে বসেই পড়লাম লা-লা-লা-লা করতে করতে। ট্রেজার না পেলেই বা কি? তাই না বলুন? 

তারপর আরো কিসব খোঁজা খুঁজির শেষে রুচি আবিষ্কার করলো নতুন ল্যাব বিল্ডিং নেক্সট ক্লু। সেই ষষ্ঠ ক্লু বলছে হোয়াং হো নদীর কথা এই নদীর নাম একটি নির্দিষ্ট ভলেন্টিয়ারকে বলতে হবে আর তারপর p79 আর p80 খুঁজতে হবে। এখন 'Huang He' নদী কে আমজনতা ছোটবেলা থেকেই 'হোয়াং হো' নামেই চেনে। বাংলা বা হিন্দিতেও উচ্চারণটা 'হোয়াং হো' বলেই জানে সবাই। সেমতই তাকে যেই বলা হয়েছে যে 'হোয়াং হো' নদী, বলে না হয়নি। ঠিক করে বলতে হবে। শেষমেষ ফাহিম বানান করে করে বলল। ওরে মা -কার আর -কার আলাদা কিছু আমরা বুঝিনি ঠিকই বুঝেছি। তবে সে সন্তুষ্ট হলো। তাকে নাকি 'হোয়াং হে' বলতে হতো। কি ভীষণ খেলা রে বাবা
যাক গে যাক।  তারপর p79 আর p80 ব্যাপারটা বলি। এটা সোজা। ঊনআশি আর আশি নম্বর লাইট পোস্ট। এই দুটি লাইট পোস্টের মাঝে একটু খোঁজাখুঁজি করতেই ঘাস জঙ্গলের মাঝে পাথর চাপা দেওয়া নেক্সট ক্লু বেরিয়ে গেল। সেখানেও অন্য দলের আরো একটি ক্লু ছিল দেখলাম। সেটা নিয়ে আর মাথা টাথা না ঘামিয়ে সোজা সেই মেন গেট এর বাইরে গঙ্গারামের কাছে। কারণ সে বলেছে তার কাছে আট নম্বর ক্লু আছে। সে আমাদের বিনা বাক্যব্যয়ে আট নম্বর ক্লু দিয়ে দিল। 


তাতে লেখা আছে "Mitochondria is the powerhouse of the cell"-এই একটি লাইন। এটা নিয়েও বিশেষ মাথা ঘামাতে হয়নি। কারণ পাওয়ার হাউস তো বলেই দিয়েছে।অতএবচল পানসি পাওয়ার হাউস। ওখানেই আছে নবম ক্লু। মানে শেষ ক্লু। পেতেই হবে তাড়াতাড়ি। তবেই ট্রেজার বক্স এর সন্ধান পাব। জয় মা বলে দৌড় লাগলাম পাওয়ার হাউস এর দিকে। বললে বিশ্বাস করবেন না আমার নিজের প্রতি কনফিডেন্স বেড়ে গেল যে আমি এত জোরেও দৌড়াতে পারি এখনো? এই চেহারা নিয়েও! দুদ্দাড়িয়ে পৌঁছালাম পাওয়ার হাউস। কে ভলেন্টিয়ার এখানে? কাউকে তো দেখছি না। তবে কি ঝোপে ঝাড়ে কোথাও লুকানো আছে ক্লু? পাওয়ার হাউস এর চারপাশ টর্চ দিয়ে পুরো খুঁজে ফেলা হলো। ভেতরে দানবীয় মেসিনগুলোর ফাঁক ফোঁকড়ও বাদ গেল না। উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখে নেওয়া হলো। কিন্তু অতবড় পাওয়ার হাউস কোথায় খুঁজবো? এই মেশিন তো আর কুলার নয় যে ফাহিম কে বলব ভাই সব খুলে ফেলে উল্টে দিয়ে দেখ। এখানে আর যাইহোক টানাটানি করা যাবে না। দেখা গেল হয়ত ইনস্টিটিউট সমেত উড়ে গেল। পরদিন কাগজে হেডলাইন- 'ট্রেজার হান্ট খেলতে গিয়ে DBT- আশির্বাদধন্য গবেষণা কেন্দ্র ভস্মীভূত।' ওরেব্বাস!! কি করি? বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি ফাহিম জনে জনে প্রতিটি কর্মচারীকে জিজ্ঞাসা করছে তুমি কি ভলেন্টিয়ার? তুমি কি ভলেন্টিয়ার? সবাই মাথা নাড়ে কি রে বাবা? এর মধ্যে দেখি রুচি, পিয়ুশি আর রেশমা হাওয়া। ফোন করতে বলে, আমরা তো মেসে এসেছি। পাওয়ারহাউস বলতে খাবারদাবারকেও বোঝাতে পারে তো, মানে আমরা তো ওখানথেকেই বডি-পাওয়ার পাই তাই এখানে এসেছি। এতক্ষণে মনে পড়ল ওদের আধখাওয়া আলুর পরোটাগুলো তো খবরের কাগজ মোড়া অবস্থায় আমার হাতেই রয়ে গেছে। কখন আমার হাতে দিয়েছিল। আমি সেটা নিয়ে নিয়েই দৌড়াচ্ছি। এই ফাঁকে আমিও ওগুলো থেকে কিছুটা পাওয়ার নিয়ে নেব কিনা ভাবছি, এমন সময় দেখি সদা, ইমরান আর পিনাকী নেক্সট ক্লু নিয়ে আমাদের ডাকছে। আর ফাহিম পাওয়ার হাউস এর একজন কর্মীকে প্রচন্ড বকাবকি করছে, "তুঝে ম্যায়নে কিতনি বার পুছা কি তু ভলেন্টিয়ার হ্যায় কি নেহি? বোল ?" -আর প্রতিটা শব্দের শেষে তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে একটা করে 'শালে' গুঁজে দিচ্ছে। বুঝলাম গত পনের-কুড়ি মিনিট ধরে অন্ততঃ পাঁচ-সাত বার ওই ছেলেটিকে ফাহিম জিজ্ঞাসা করেছে যে টীম ফাইভ-এর জন্য নাইন্থ ক্লু তার কাছে আছে কিনা, সে ভলেন্টিয়ার কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। সে প্রতিবারেই কোনো অজানা কারণে 'না' বলেছে। এখন নিজেই বলেছে যে তার কাছেই আছে ক্লু। কি আর বলব ভলেন্টিয়ারদের কথা।  কেউ নিজেই না বুঝে বলে দেয় আমার কাছে এত নম্বর ক্লু আছে। কেউ হাজারবার জিজ্ঞাসা করলেও বলে না। যেন আমরা খেলার নিয়মের বাইরে গিয়ে তাকে কোনোকিছু জিজ্ঞাসা করছি। মনে হলো বলে দি-" কে রে শান্তিগোপাল? এত আজব কালেকশন!!!" কিন্তু না আগের ভুল মাথায় রেখে আর বললাম না। যা হ্যাবলা আমি, বলব একজনকে, বুঝবে আর একজন হয়ত। কি দরকার বাবা? 

নবম ক্লু পেয়ে তো আহ্লাদে নাচতে নাচতে আটজন মিলে দেখলাম সেটা। একটা নক্সা। যেটা মাঠের মাঝে মেন বড় লাইট পোস্টটাকে বোঝাচ্ছে মনে হলো। আর তার চার পাশে প্রচুর সংখ্যা লেখা। দৌড়ে-দৌড়ে পোস্টটার কাছে পৌঁছে বুঝলাম এই সংখ্যাগুলো ছোটো ছোটো লাইট পোস্টগুলোর। যেমন আমরা p79 আর p80 খুঁজেছিলাম তেমনি এরকম পোস্ট সংখ্যা অনুযায়ী খুঁজে বার করে ক্লুএর কাছে পৌঁছাতে হবে যেটা আলটিমেটলি আমাদের বলবে কোথায় আছে গুপ্তধন। ক্লু অনুসারে p13, p9 p24 খুঁজে বার করার চেষ্টা করছি এমন সময় দেখি মাঠময় হুল্লোড়। কিসের? কি আর? আমাদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে অন্য একটা দল পেয়ে গেছে সন্ধান গুপ্তধনের। তারা যাচ্ছে সেটা নিতে। আর আমরাঅস্টরথীএকহাতে লাস্ট ক্লু আর এক হাতে বিশাল বড় ঝুলপড়া একটা হ্যারিকেন নিয়ে মাঠের মাঝে ভেবলু মুখে দাঁড়িয়ে আছি। 

তারপর? তারপর আর কি? তারা আনন্দে চেঁচাতে চেঁচাতে ট্রেজার এর বাক্স নিয়ে এলো। সেটা নিয়ে বাকি সব টীমের গায়ে জ্বালা ধরিয়ে ছবি টবি তুলল। এই সময় আবার আমি উঁকি মেরে ছবি তোলা দেখতে গেছিলাম। সামনে একজন জগদ্দল পাথরের মত এসে দাঁড়িয়ে পড়ল বলে কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না তাই 'ধুস' বলে জটলা ছেড়ে বাইরের দিকে বেরিয়ে এসেছি। এমন সময় দেখি পেছন থেকে একজন আবার ফ্রীতে জ্ঞান দিয়ে দিল। "আরে এতেই মুষড়ে পড়ছ কেন? জিততে পারনি তো কি হয়েছে?" আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি দেখে আবার আরো একটা কথা জুড়ে দিল-"জীবন অনেক বড়।".......ভগবান! কি বলব বলুন একে? ভাবলাম, একে আর কিছুই বলব না এখন। পরে বলব রসিয়ে, কি ছড়িয়েছে সে সেদিন। গুপ্তধনের বাক্স ততক্ষণে খোলা হয়ে গেছে। মণিমুক্তা সব ছড়িয়ে পড়ল তা থেকে। মণিমুক্তা মানে হলদিরামের চিপস, ভুজিয়া এসবের একগুচ্ছ প্যাকেট

দেখেশুনে খিদে পেয়ে গেল। আটগোয়েন্দা মিলে ক্যান্টিনে গিয়ে লোকেদের ঘুম ভাঙিয়ে চিপস কোল্ডড্রিংক খেতে খেতে পূর্ববর্তী বছরের ট্রেজার হান্ট এর গল্প করে, এই বছরের প্রথম ক্লু তে দেড়ঘন্টা পার হয়ে যাওয়া আর লাস্ট ক্লু তে পনের কুড়ি মিনিট ভলেন্টিয়ার এর জন্য নষ্ট হওয়া সময়ের বাপান্ত করতে করতে আরো খানিকক্ষণ হ্যা হ্যা করে বাড়ি চলে এলাম

এই হলো আমার জীবনের প্রথম গোয়েন্দাগিরির গল্প। এটা ঠিক কি ধরনের গোয়েন্দাগিরি জানিনা। হোমস-পোয়ারো-মিস মার্পল-ফেলুদা-ব্যোমকেশ-ভাদুড়িমশাই-কিরীটি বা হালের মিতিনমাসি-দীপকাকু-এঁদের কথা ছেড়েই দিলাম নেহাত পান্ডব গোয়েন্দারাও কি এরকম ভ্যাবলার মত গোয়েন্দাগিরি করত? মনে হয়না। যাই হোক অনেক কিছুর মত গোয়েন্দাগিরিতেও আমার দৌড় বোঝা গেছে। হাচিকোই ঠিক। আমার লাভ যেটা হলো সেটা এই যে, সারা সন্ধ্যে ধরে সারা ক্যাম্পাস ছোটাছুটি করে খানিক এনার্জি লস হলো। তাতে এই বিশাল বপুর হয়ত খানিক সুবিধা হলো এই আর কি। আর হ্যা হ্যা করে মাথাটার মেদও বেশ খানিকটা ঝরলো