Showing posts with label The cafe. Show all posts
Showing posts with label The cafe. Show all posts

Sunday, 3 May 2020

দ্য ক্যাফে - ৪

শনিবার বা রবিবারের সকালগুলো আমাদের কাটতো ওমাহার ছোট ছোট ক্যাফেগুলোতে। যেখানে পরিবারের স্বামী -স্ত্রী বা দু একজন বন্ধু একসাথে চালাচ্ছেন ক্যাফেটি। বড় কোম্পানির ক্যাফে-চেনের কোনো কোনোটায় যাই না তা নয়, তবে শনি বা রবিবারের সকালগুলো তোলা থাকতো ছোট খাটো  কফিশপগুলোর জন্যই। কারণ প্রতিটা কফিশপের আলাদা আলাদা মেজাজ। তাদের কফিতে বা খাবারে একটু হলেও আলাদা আলাদা স্বাদ। শুধুমাত্র এককাপ চা বা কফি নিয়ে দেওয়াল ঘেঁষা একটা ছোট টেবিলে বসে পড়তে পারলেই হলো। ক্যাফের মেজাজ অনুসারে বাকি সকালটা মানুষ দেখেই কাটিয়ে দেওয়া যেত। আর সেখান থেকে মনে মনে তৈরী করে নেওয়া যেত একশ গল্প। কফির টানে যতটা না গল্পের টানেই ছিল আমার সেই সপ্তাহান্তের ক্যাফেটাইম। আমার সেই ক্যাফে-র গল্পে খানিক বাধা পড়েছে বর্তমানে স্বাভাবিকভাবেই। এখন আমাদের শনি রবিবার ওমাহার নানান কফিশপে বসে কফি সেবন বন্ধ। শেষবার গিয়েছিলাম মার্চ মাসের ১৪ বা ১৫ তারিখ। তারপর ১৬ তারিখ থেকে এখানে কোনো দোকানে বসে খাওয়া বন্ধ। চাইলে নিয়ে এসে খাওয়া যেতে পারে কিন্তু ওই এককাপ কফি তো প্রায় একই স্বাদে কখনো বা দোকানের চেয়ে বেশি ভালো স্বাদে ঘরে বসেই বানানো যায়। ওই ঘন্টা দুয়েক কফিশপে বসে সাপ্তাহিক ধীরলয়ে চলা দিনটাকে উপভোগ করাটাই তো ছিল আসল কথা। হাসপাতালের একতলার আমাদের প্রতিদিনের কফিশপটা যদিও এখনো খোলা। কালই ল্যাবে ঢোকার সময় হাসপাতালের সামনের দরজা দিয়ে ঢুকতে গিয়ে কোনাকুনি চোখ পড়ে গেলে দেখতে পেলাম। অবশ্য এটি খোলা না থাকলে যাঁরা এখন নিয়মিত কাজ করছেন তাঁদের খুবই অসুবিধা হবে। বাইরে থেকে বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। শুধু দেখলাম কফিশপের মেয়েরা সকলেই মাস্ক পরে আছে। 

তা যা বলছিলাম, কফির গল্প, ক্যাফের গল্প। একটি ছোট্ট দোকান আছে, দোকানটি চালান এক রিটায়ার্ড দাদু আর ঠাম্মা। স্বামী স্ত্রী। একদিনই তাঁদের দোকানে গিয়েছিলাম আমরা। দোকানটিতে তিনটি ছোট্ট কফিটেবিল। তাতে দুটি করে চেয়ার আর একটি ছোট পুরোনো গদিআঁটা সোফা। তাতেও জন দুই বসতে পারে। এছাড়া একচিলতে জানলার কাঁচ বরাবর একটি টানা বেঞ্চ গোছের কিছু। সাকুল্যে জন দশেক হয়ত বসতে পারে সে দোকানে। বাইরে থেকে দোকানটিকে দেখে ছোট্ট একটি বাক্সের বেশি কিছু মনে হবে না। কিন্তু সে দোকানের কাস্টমার রেটিং অনেক সাজানো দোকানের চেয়ে অনেক বেশি। কিছুটা কৌতূহল বশেই গিয়েছিলাম সে দোকানে। দেখলাম বিক্রেতা এবং খরিদ্দাররা সকলেই সকলের পরিচিত। সপ্তাহান্তে সকালের কফিটা তাঁরা হয়ত প্রায়শই এখানেই পান করেন। দাদু-ঠাম্মাও হাসিমুখে সকলের হাঁড়ির খবর নিচ্ছিলেন কফি বানাতে বানাতে। ঠিক জেন্ আমাদের পাড়ার চায়ের দোকানগুলির মত। বিক্রীবাটার প্রয়োজনে যতখানি, তার থেকেও মানুষের সাথে জুড়ে থাকার প্রয়োজনে টিকে আছে দোকানখানি। দোকানের একদিকের কাঠের দেওয়াল জুড়ে নানান পেন্সিল স্কেচ বা অয়েল পেন্টিং। ঠাম্মার নিজের আঁকা। কেউ কিনতে চাইলে বিক্রিও করেন। দোকানে পৌঁছতেই দাদু-ঠাম্মার আপ্যায়নের কোনো খেদ ছিল না। তবু জানলা ঘেঁষা একটি চেয়ারে বসে সামনে মুখ তুলেই দেওয়ালের সজ্জা দেখতে দেখতে একটু কিরকম যেন মনে হতে লাগছিলো সেদিন। এই 'কিরকম যেন' শব্দটাকে ঠিক করে ব্যাখ্যা করতে পারবো না। একটা অস্বস্তি, একটা উশখুশে মনোভাব। দোকানের অন্য দিকের একটা দেওয়াল জুড়ে কটা অদ্ভুত জিনিস। এই দোকানের কফি বিনস আসে যেসব কাঠের বাক্সে সেইসব বাক্সের ওপরের বিভিন্ন আকারের ছোট বড় ঢাকনাগুলিকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা। খুব চেনা সজ্জা পদ্ধতি। কফিবিনস আসে সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকা বা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে। ঢাকনার গায়ে সেইসব দেশের ছাপ। কখনো কাঠের ওপর স্প্রে পেন্ট দিয়ে, কখনো কাঠের ঢাকনার সাথে লাগানো ধাতব পাতের গায়ে খোদাই করে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইথিওপিয়া, কঙ্গো, কলম্বিয়া, চিলি। সেইসব মধ্য বা নিম্নবিত্ত দেশের নিতান্ত কেজো সামগ্রী দিয়ে আসর সাজিয়েছেন উচ্চবিত্ত দেশের কোনো এক দোকানী। দেখতে যে খারাপ লাগছে তা নয়, বরং দেওয়াল জুড়ে সুন্দর একটা কোলাজ তৈরী হয়েছে। ব্যাপারটা শৈল্পিক দিক থেকে বেশ দৃষ্টিনন্দনই। কিন্তু তবুও খুব বিত্তশালী কারো বাড়িতে গিয়ে পুরুলিয়ার বা ছত্তিশগড়ের মুখোশ বা বাংলার লাল-সাদা গামছা দিয়ে বানানো গৃহসজ্জার সামগ্রী দেখলে একইরকম অনুভূতি হয় আমার। মনে হয়, প্রতিদিন জবজবে করে নারকেল তেল মাথায় মেখে এইরকমই লাল-সাদা গামছা গায়ে পুকুরের দিকে দৌড়াতাম আমিও তো। আমিও সেই তাদেরই, গামছাটা যাদের জন্য নিতান্তই কেজো। গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রী, গৃহসজ্জার সামগ্রী নয়। আর সেই মুহূর্তেই কেন জানিনা গামছা যেখানে প্রয়োজন নয়, সজ্জার, সেই পরিস্থিতে আর নিজেকে মানানসই মনে হয়না। একখানি অদৃশ্য দেওয়াল কি করে যেন তৈরী হতে থাকে। গামছার সাথে তোয়ালের কোনো বিরোধ নেই। কোনোকালে ছিলোও না। একটা ব্যবহার করলে অন্যটা ব্যবহার করা যাবে না, এমনটাও নয়। তবুও দুটোই প্রয়োজনের। তবুও গামছা দিয়ে গৃহ বা সাজ সজ্জা করতে দেখলে কেমন একটা অনুভূতি হয়। আমার যা প্রয়োজনের তোমার তা ফ্যাশন। আমার যা নিতান্তই না হলে নয়, তোমার তা প্রয়োজনাতিরিক্ত গৃহসজ্জামাত্র। অচেনা জায়গার অস্বস্তিটা খোঁচাতে থাকে বেকুবের মত। নিজেকে নিতান্তই বেমানান, বিড়ম্বনার মনে হতে থাকে।

প্রায় এরকমই একটা অনুভূতি হয়েছিল মনে আছে প্রথম সেই দেওয়াল সজ্জা দেখার পর। একটু অস্বস্তি লাগছিলো। কিন্তু সে অস্বস্তি এতটাও তীব্র নয় যে সেখানে বসে থাকা চলে না। তেমন হলে তো এই তোয়ালের জীবন, তোয়ালে মোড়া সময়ে টিকতেই পারতাম না। সুতরাং ঠিক যতটা অস্বস্তি থাকলে কিবোর্ডে টাইপ করে এই লেখা লিখতে পারা যায়, আর ঠিক যতটা অস্বস্তি না থাকলে সেই প্রায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ঘরোয়া আপ্যায়নে উষ্ণ হয়ে সুস্বাদু কফি খেয়ে উঠে আসার সময়ে আবার একদিন সে ছোট্ট দোকানে আসার ইচ্ছে মনে জাগিয়ে রাখা যায়, ঠিক ততটাই অস্বস্তি নিয়ে কফি খেয়েছিলাম মনে আছে সেদিন।  

Friday, 6 March 2020

দ্য ক্যাফে - ৩

উৎসব পরবর্তী আধো আলোকিত একটা ক্যাফে। জায়গাটা এ শহরের দুটি বড় বাজার সংলগ্ন দুটি ব্যস্ত রাস্তার চৌমাথায়। সপ্তাহান্তে এই ছোট্ট দোকানটিকে বসতে জায়গা পাওয়া কষ্টকর হয়ে যায় মাঝে মধ্যে। তবুও শীতের রবিবারের সন্ধ্যায় সেখানে লোকজন সেদিন কম। রবিবার বলেই হয়ত। শুক্র বা শনিবার হলে মানুষের বাড়ি ফেরার ব্যস্ততা থাকে না এখানে। রবিবারে তা নয়। সোমবার ভোর ভোর কাজের জায়গায় পৌঁছানোর তাড়ায় রবিবারের সন্ধ্যেটুকুও তাড়াহুড়োর কবলে পড়ে ছটফটায়। এমনই এক রবিবারের পড়ন্ত বিকেলে কোণের দিকে একটা ছোট্ট টেবিলে গিয়ে বসেছিলাম দুজনে। রোজকারের মতন নানান আবোলতাবোল বিষয়ে কথাবার্তা আলোচনা চলছিল। বাইরে বিকেল ফুরিয়ে সন্ধ্যে হয়ে আসছে। মরা মরা একটা হলদে আলো এসে পড়েছে কাঁচের বাইরে। কাঁচের ওপারে রাস্তা। তার ওপারে একটা ছোট্ট বাড়ি। এখন থেকে বাড়িটার পিছনের দিকটাই দেখা যায়। এতদিন এই ক্যাফেতে আসছি, কখনো বাড়িটার এইদিকে কাউকে আসতে দেখিনি। পিছনদিক বলেই হয়ত। এই ক্যাফেটার একটা আলাদা বিশেষত্ব আছে। বাঁদিকে একটু গেলেই এশিয়ান মার্কেট। আমাদের মত দেশীয় খাবার-দাবারের রোজকার কারবারিদের জন্য ওরিয়েন্টাল শাকসব্জী-মশলাপাতির প্রধান যোগানকেন্দ্র। ডাইনে কিছুটা এগোলেই বাকি রোজকার অন্য প্রয়োজনীয় গার্হস্থ্য জিনিসপত্রের বাজার। আর পুরো এলাকাটা জুড়েই বিভিন্ন দেশের খাবারের সম্ভার নিয়ে অজস্র সস্তার রেস্টুরেন্ট। আমাদের মত ইউনিভার্সিটির মানুষদের জন্য কম পয়সায় উদরপূর্তির নিখুঁত আয়োজন। এসব কারণেই ইউনিভার্সিটি অফ ওমাহা আর মেডিকেল সেন্টারের আমাদের মত ভিনদেশি ছাত্র ছাত্রী বা কর্মী দলের জন্য এই ক্যাফেটা বড়োই প্রিয়।
         
ওই পাশে দুটো টেবিল জোড়া লাগিয়ে একদল ছেলে কলকল করে বিদেশী ভাষায় কথা বলে চলেছে। ওরা এখানকার প্রতি রবিবারের নিয়মিত আড্ডাধারী। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একদেশ থেকে এখানে এসেছে। ওদের একজনকে চিনি। আমাদের ইনস্টিটুটেরই রিসার্চার। বাকিরা সম্ভবতঃ ইউনিভার্সিটি অফ ওমাহায় ছোট বড় কোনো কোর্স করতে এসেছে। ওরা কি ভাষায় কথা বলছিলো সে আমাদের বোঝার কথাও ছিল না। ভাষা না বোঝার একটা বেশ উপকার আছে। বক্তব্যের ওপর থেকে মনোযোগ সরে গিয়ে মানুষের ওপর মন পড়ে। মানুষ দেখার সেরা জায়গা এই ক্যাফেগুলো। এককাপ পানীয় নিয়ে এককোণায় বসে নিশ্চুপে বহু কিছুর সাক্ষী থাকা যায়। সামনের মানুষগুলো সম্পর্কে মনে মনে কিছু ধারণা করা যায়। এই যেমন এই ছেলেগুলির পরিচ্ছদ দেখে অনুমান হয় প্রত্যেকেই উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে এসেছে। অবশ্য নইলে দেশ ছেড়ে রিসার্চ করতে আসলেও, ব্যাচেলার বা মাস্টার্স ডিগ্রি করতে কোন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে ছেলেমেয়েরা এদেশে আসে না। আমাদের দুজনের আলসেমি মাখা বিকেল শেষ হচ্ছিল নিরুত্তাপে। ওদের হাসাহাসি কথোপকথন আর উচ্ছলতা দেখতে দেখতে। সাথে ছিল দুইকাপ উষ্ণ তিতকুটে তরল।

প্রায় অন্ধকার হয়ে আসছে। একজন মানুষ এসে ক্যাফেতে ঢুকলেন। মানুষ দেখার একটা অলিখিত নিয়ম রয়েছে। দুইধরনের মানুষকে আর একজন মানুষ নজর করে দেখে। এক, যদি সেই মানুষটিকে দেখে যথেষ্ট সম্ভ্রমের উদ্রেক হয়। অর্থাৎ মানুষটিকে দেখে যদি নিজের চাইতে সামাজিকতায় বড় বলে  মনে হয় অথবা দুই, যদি মানুষটিকে দেখে সন্দেহের উদয় হয়। সন্দেহটা বেশিরভাগ সময়েই পোশাক দেখে অনুমিত হয়। এর বাইরে যাঁরা, তাঁরা তো নিতান্তই গড়পড়তা মানুষ। তাঁদের না আছে চোখ গোল গোল করে দেখার মতন আড়ম্বর। না আছে দুরছাই করার মতন মাটি সংলগ্ন নমনীয়তা। যদিও এসবের কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে বলে মনে হয় না। আমিও আর পাঁচজনার মতনই অজস্র ভুল ধারণার বশবর্তী সাধারণ একজন মানুষ দেখিয়ে। যে মানুষটি এসে ক্যাফেতে ঢুকলেন তাঁকে দেখে আমি বিনা দ্বিধায় দ্বিতীয় দলে ফেলে দিলাম। একগোছা ঝোলাঝুলি ব্যাগ। বেঢপ জ্যাকেট। এবং সন্ধ্যেবেলায় রোদচশমা ও টুপি। এমন ধারা মানুষকে নিঃসন্দেহেই সন্দেহ করা চলে, তাই না? আর সন্দেহ করার মতন হলেই তিনি পর্যবেক্ষণের বস্তু। সুতরাং আমার চোখও তাঁকে বিনা লজ্জায় অনুসরণ করে চললো। তিনি তিনটে টেবিল বদলালেন। কোথাও বসে তাঁর ভালো লাগলো না। অবশেষে চার নম্বর টেবিলে গিয়ে তাঁর অজস্র জিনিসপত্র নিয়ে থিতু হলেন। ঝোলা থেকে বেরোলো একটা বহুল ব্যবহৃত কফির কালচে দাগধরা কফিমগ। সেই মগ নিয়ে তিনি চললেন কাউন্টারে। ওতেই খানিকটা কফি ঢেলে দিতে বলবেন সম্ভবতঃ। তাঁর দিকে অনেকেই নজর পড়েছে এতক্ষনে। কাউন্টারের ছেলেমেয়েগুলোর তো বটেই। কিছু সমস্যা হলে ওদেরকেই সামলাতে হবে। এই ক্যাফেতেই একবার এক মহিলার পিছু ধাওয়া করে এসেছিলো একজন মানুষ। ক্যাফের বাইরে উল্টোদিকের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ধূমপান করতে করতে মহিলাকে চোখে চোখে রাখছিলো। তারপর ক্যাফের ভেতরে ঢুকে কিছু করার আগেই এই কাউন্টারের ছেলে মেয়েরা পুলিশে ফোন করে। আর আমাদের সামনেই মিনিট কয়েকের মধ্যে পুলিশ এসে মানুষটিকে ধমকে-ধামকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। এই মানুষটির হাবেভাবেও সাধারণ কিছু ছিল না। ফলত: সকলেই সতর্ক। আমাদের কফি শেষ হয়ে গিয়েছিলো। আমরাও উঠে পড়লাম। কারণ আমরা আরো বেশি সতর্ক।

বাইরে এসে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিয়েছি সবে। দেখলাম ক্যাফের দরজা ঠেলে দৌড়াতে দৌড়াতে আসছেন তিনি। মন বুঝলো নিশ্চয়ই কিছু গোলমেলে ব্যাপার। শীতকাল বলে গাড়ির কাঁচ তো তোলাই ছিল। আরো সিঁটিয়ে বসলাম। পিনাকী ততক্ষণে গাড়ির মুখ ঘুরিয়েছে। বেরিয়ে যেতে হবে এখন থেকে।মানুষটি সোজা এসে আমার জানলার কাঁচে টোকা দিচ্ছেন। হাতে একটা নোটবই। সেটা দেখিয়ে কি যেন বলছেন। এখানে এমন ঘটনার কথাও শুনেছি যে, ভবঘুরে মানুষরা এক-দুই ডলার চেয়েছে কারো কাছে এবং সেটি না পাওয়ায় সোজা গুলি করে মেরেছে। সেসব গল্প মাথায় চট করেই চলে আসে এই সব পরিস্থিতিতে। দোনোমোনা করে পিনাকীর হাজার 'না'-এর মাঝেও কেন জানিনা সেদিন জানলার কাঁচটা খুলে ফেলেছিলাম খানিকটা। তিনি হাতের নোটবইটা দেখিয়ে বললেন, "এটা তোমরা ফেলে যাচ্ছিলে।" আমরা যে টেবিলে বসেছিলাম তার পাশেই কাউন্টারের কোণের দিকে একটা কলমসহ এই সুন্দর নোটবইটা রাখা ছিল। সম্ভবতঃ আমাদের আগে কেউ এতে কিছু লিখছিলো, তারপর ফেলে চলে যায়। ওটা আমাদের নয়। সেকথা তাঁকে জানাতে তিনি বললেন, "ওহ, তাহলে ঠিক আছে। আমি ভাবলাম তোমরা ভুলে রেখে যাচ্ছ বুঝি। আসলে এরকম ব্যক্তিগত জিনিস একবার হারিয়ে গেলে দোকানে তো কিনতে পাবে না, তাই না? কত কি স্মৃতি, হয়ত কোনো মানুষের দেওয়া উপহার এটা।  তাই ভাবলাম দিয়ে আসি।  ঠিক আছে। তোমাদের নয় যখন তাহলে এসো।  তোমাদের দেরি করালাম বলে দুঃখিত। শুভরাত্রি।" এই বলে পিছন ঘুরলেন।

একবুক লজ্জা নিয়ে কাঁচটা বন্ধ করতে করতে দেখলাম এতক্ষনে পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে গেছে আমাদের চারপাশটা। গাড়ির হেডলাইটের আলো গিয়ে পড়েছে তাঁর ওপর। পিছন ফিরে হেঁটে ফের ঢুকে যাচ্ছেন আমাদের ফেলে আসা ক্যাফেটার দরজা ঠেলে। সেই বেঢপ জ্যাকেট গায়ে, অপরিষ্কার কফিমগ আর নোটবইটা হাতে করে নিয়ে।

   

Sunday, 9 February 2020

দ্য ক্যাফে - ২

কিছু কিছু দিন ভালো মন্দ মিশিয়ে কেটে যায়। দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুই মগজে কিছুটা ছাপ ফেলবার আগেই কি করে যেন সন্ধ্যে নেমে আসে। খারাপ লাগে, মনে হয় একটা দিন নষ্ট করলাম। কিন্তু তবুও মনস্থির করে কোনো কিছুতে একটানা মন দেওয়া হয়ে ওঠে না। আজ সেরকমই একটা দিন। কাজ হয়নি তা নয়। যা করবো বলে ভেবেছিলাম সমস্তই খাতায় কলমে শেষ করেছি ঠিকই। কিন্তু তবুও সে কাজের কোথাও যেন আমি ছিলাম না। আমার মত অন্য আর একজন যন্ত্রের মত করে যাচ্ছিল। সবচাইতে ব্যাথার কথা যন্ত্রের মত ভেবেও যাচ্ছিলো কি? ওহ যন্ত্র তো আবার নাকি ভাবতে পারে না। আসল কথাটা হলো ভাবার জন্য মাথা ছাড়াও আরও অন্য কিছু একটা লাগে। কি যে লাগে সেটা এই মুহূর্তে লিখে উঠতে পারছিনা। সেটা আপাতত নেই।  তাই বললাম যন্ত্রের মতো ভেবে যাওয়া।

সন্ধ্যে হতে চলেছে। সকলে বাড়ি যাচ্ছে। আমিও চলে যেতে পারি। কাজ নেই আপাতত। কিন্তু তাও যাচ্ছিনা। পনের মিনিট হাঁটলেই ঘরের বিছানায় গড়ানো কে আটকায়? এই সন্ধ্যে পৌনে ছটায় কেমন একটা আকাশ-খাই পাতাল-খাই গোছের খিদে পায় প্রতিদিন। আজও পাচ্ছে। কিন্তু একটুও ইচ্ছে করছে না ক্যাফেটেরিয়া পর্যন্তও এগিয়ে যাই। কিছু কিছু সময় থাকে যখন অপরিসীম মানসিক কুঁড়েমির কাছে খিদে-তেষ্টা সব হার মানে। ল্যাবের চেয়ারটা অসহ্য লাগছিলো। ব্যাগ গুটিয়ে নিচের কফিশপের সামনে এসে বসেছি। অন্ধকার থাকতে এরা দোকান খোলে। তাই সাড়ে চারটে বাজলেই ঝাঁপ বন্ধ করে দেয়। তবে পরিষ্কার করা, সারাদিনের হিসেবে নিকেশ করার জন্য আরও কিছু সময় এদের থাকতে হয়। আমি যখন সাড়ে পাঁচটা নাগাদ এলাম এখানে তখনও দুজন ছিল। আলো জ্বালিয়ে কিসব খুটুর খাটুর করছিলো ভেতরে। তারপর চলে গেল। আপাতত অন্ধকার কাউন্টার। তবে এই সামনের জায়গাটা কখনো অন্ধকার হয়না। হাসপাতালের ভেতরের কফিশপে বসার এই মজা। আমার পাশের টেবিলেই একজন বসে ল্যাপটপে কিছু একটা শো দেখছেন। মাঝে মাঝে খুকখুক করে হাসছেন। বয়স্ক মানুষ। হয়তো কেউ ভর্তি আছে এখানে। বা অন্য কোনো কারণে অপেক্ষা করছেন এখানে বসে। টেবিলে একটা খালি হয়ে যাওয়া হাফ স্যান্ডউইচ এর প্যাকেট আর দুটো ঠান্ডা ফুল ফ্যাট দুধের প্লাস্টিকের বোতল। মনে হয় অনেকক্ষন বসে আছেন এখানে। একবার উঠে গিয়ে খালি দুধের বোতলে জল ভরে নিয়ে আসবেন বলে ড্রিঙ্কস ডিস্পেন্সারটার সামনে গেলেন। কিন্তু ততক্ষনে ওরা কফির কাউন্টার বন্ধ করে দিয়েছে বলে সে মেশিনটাও আজ রাতের মতো মৃত হয়ে পড়ে রয়েছে। আমার পিঠের দিকের হলওয়েটা দিয়ে গেলেই খাবার জলের কল। বলে দিলেই হতো। কেজানে কেন বললাম না? মাঝে মাঝে কি যে হয়! কারো সাথে কথা বলতে হবে মনে হলে গর্তে গিয়ে সেঁধুতে ইচ্ছে করে। 'সেঁধুতে' শব্দটায় মনে পড়লো, জ্যেঠুমনির কাছে কোনো এক রোগী এসেছিলেন। তাঁকে পরীক্ষা করার সময় জিভ দেখাতে বলেছে জ্যেঠুমনি। পরীক্ষা শেষ। জ্যেঠুমনি তাঁকে বলছে-"জিভটা ঢুকিয়ে নাও।" কিন্তু জিভ আর ভেতরে ঢোকাচ্ছেন না তিনি। শেষে তাঁর সাথে যিনি এসেছিলেন তিনি বললেন-"জিভটা সাঁধ করিয়ে নাও।" তখন জিভ ঢুকলো ভেতরে। গ্রামের মানুষের প্রিয় ডাক্তারবাবু সেদিন নতুন শব্দ ব্যবহার করতে শিখেছিলেন। আরো অনেক গল্পের সাথে সাথে এই গল্পটাও অনেকবার শুনেছি জ্যেঠুমনির কাছে। খুব মজা করে বলত। অনেকবার শোনা থাকা স্বত্বেও প্রতিবারই খুব মজা করে শুনতাম। গল্পগুলো নিজেকেই মনে রাখতে হবে এবার। আর মনে করিয়ে দেওয়ার লোক নেই।   

পাশের টেবিলের মানুষটির অপেক্ষা শেষ হলো। ল্যাপটপ গুটিয়ে, খালি প্যাকেট, বোতলগুলো ট্র্যাশ ক্যানে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। চেয়ারের পিঠ থেকে জ্যাকেটটা নিয়ে গায়ে গলিয়ে মাথায় একটা সাধারণ টুপী পরে নিলেন। বাইরে এখন দু ডিগ্রি সেলসিয়াস। সাথে হাওয়া। এই ঠান্ডায় এই টুপিতে কিকরে হবে? অবশ্য আমার ভারতীয় মন এসব ভাবছে। উনি এখানকার মানুষ এই ঠান্ডায় ওঁনার বিশেষ কিছু মনে হবে না হয়ত। আমি ওঁনার বয়সটাও যোগ করছি এই হিসেবের মধ্যে। মৃদু পায়ে বেরিয়ে গেলেন মানুষটি। 

বাইরে এতক্ষনে অন্ধকার হয়ে গেছে। 






          

Wednesday, 5 February 2020

দ্যা ক্যাফে -১

একটু দূর থেকে কিছু বা কাউকে নজর করার মধ্যে বেশ একটা নেশা আছে। যেমন দুজন মানুষের মধ্যে সম্পর্ক। ধরা যাক, একটা কফির দোকান। এককাপ কফি নিয়ে বুঁদ হয়ে বসেছিলাম। আশেপাশে সামনে দূরে বেশ কিছু মানুষ। কেউ কফি খাচ্ছেন, কেউ অন্য কিছু করছেন। কেউ কারো সাথে কথা বলছেন, কেউ একা নিজের সাথে নিজেকে সঙ্গ দিচ্ছেন। এদের প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের নিশ্চয়ই একটা সম্পর্ক আছে। আছেই। এই যে আমি এককাপ কফির সাথে বসে আছি, আমার সাথে এই চেয়ার টেবিল বা কাগজের পাতলা কফি কাপটার কি কোনো সম্পর্ক নেই নাকি? হলোই বা ভেতরের তরলটা শেষ হওয়া পর্যন্ত আমাদের সম্পর্ক, কিন্তু শেষ না হওয়া পর্যন্ত তো ও আমায় সঙ্গ দিচ্ছে। আমি ওকে নিয়ে দেখছি আর চারপাশটার সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিতে চাইছি। পারছি না ঠিক করে। সব কিছু কি আর পারা যায়?   

একটু দূরে হাসপাতালের সদর দরজার সামনের বৈঠকখানা। আমরা অবশ্য লবি বলি। লবির বাংলা কি বৈঠকখানা হতে পারে? না বোধহয়। বৈঠকখানার মধ্যে একটা সম্পন্ন গৃহস্থালীর আতিথেয়তার গন্ধ থাকে। লবিতে তার লেশমাত্র নেই। হাসপাতালের লবিতে থাকে উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা। দুটি শব্দ এক হতে পারে না। আমার সামনে লবি, বাঁয়ে রেস্তোরাঁ। এই জায়গাটিতে অনেকসময়ই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সুরের আয়োজন করেন। কখনো পিয়ানো, কখনো ভায়োলিন, কখনো অন্য কিছু। সুর যে আমাদের উদ্বেগ কমায়, সুর যে আমাদের মধ্যে জাঁকিয়ে বসে থাকা অযথা অসুখকে নরম করে, সুর যে আমাদের জমে থাকা কান্নাকে বাইরে বের করে এনে আমাদের সুস্থ করে, স্থিরচিত্তে চিন্তা করার শক্তি যোগায় সেকথা আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রমাণিত। যতই মিউসিক থেরাপিকে অল্টারনেটিভ থেরাপির তকমা দিয়ে তাকে ব্রাত্য করে রাখা হোক না কেন, নাকউঁচু আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা যে আসতে চলেছে অদূর ভবিষ্যতে, একথা সত্যি। এই আয়োজন তারই অঙ্গ। মূলত রোগীর বাড়ীর লোকজনকে দুঃসহ দিনে সুস্থ রাখতে এই আয়োজন। পাগল করা ভায়োলিনের সুরে হাসপাতালের এই কফিশপে বসে রোগীর বাড়ির লোককে খাওয়া ফেলে হাউহাউ করে কাঁদতে দেখেছি। আমি অসম্পূর্ন মানুষ। জানিনা এরকম জায়গায় কি বলে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে হয়। দেওয়া আদৌ যায় কিনা তাই-ই জানি না। তার কাঁধে হাত রাখতে পারিনি। তার বদলে অপ্রস্তুত হয়ে কফির কাপ হাতে আস্তে আস্তে উঠে চলে গেছি। 

রেস্তোরাঁর সামনের জায়গাটায় দেখেছিলাম একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা হার্প বাজাচ্ছিলেন। এর আগে আমি হার্প দেখিনি কখনও। নামটাও জানতাম না। ছবিতে দেখেছিলাম। আমার কেমন যেন একটা ধারণা ছিল এই তারযন্ত্রটির বর্তমানে আর কোনো অস্তিত্ব নেই। এসব ইতিহাসের যুগে চলত বুঝি। কত কিছুই তো আর নেই। আর চলে না। আমরা খুঁজিও না তাই। কেমন একটা রূপকথা রূপকথা ব্যাপার আছে বিশালাকায় যন্ত্রটির মধ্যে। এমনই একদিন দিনের মাঝে কফি খেতে এসে আমার সে ধারণা ভেঙে গিয়েছিলো। কফি হাতে হাঁ করে শুনছিলাম। বলা ভালো গিলছিলাম। কি রাজকীয় ভঙ্গিমায় অনায়াসে বাজিয়ে চলেছেন ওই রূপকথার রূপসী তারযন্ত্রটিকে। মুখে মৃদু হাসি। সেদিন কেন জানিনা খুব একটা কেউ শুনছিলো না ওঁনার বাজনা। খুব একটা জনপ্রিয় বাজনা নয় বলেই কি? কে জানে! কেমন যেন মন খারাপ লাগলো।

এমন একটা বিশাল আল্পনার মতন যন্ত্র। দেখলেই মনে হয় সমুদ্দুরের তলা থেকে উঠে আসা মৎস্যরাজকন্যার হাতের বাজনা বুঝি। তার সামনে অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। নির্বাক শ্রোতা হওয়া যায়। তার ঢেউ এর মতন শারীরিক বিভঙ্গের রূপতাপস হওয়া যায়। কিন্তু তাকে অশ্রুত রেখে এমন অবমাননা করা যায় কি?