Monday, 26 June 2017

বর্তমান

ভাল মন্দের হিসেব কষেছ মেয়ে?
পুষেছ নীতির মালা?
তাই তো তোমার ঘর নেই কোনো,
নেই কেউ শোনবার।

দেশ তো তোমার নেই জানতাম,
ছিলোও না কোনোকালে।
আগু পিছু?
সেও গেছে বুঝি?
পথ নেই ফেরবার?

পলকে হারালে অতীত তোমার,
পলকে ভবিষ্যৎ।
সামনে কেবল একপদ ভূমি,
সত্য বর্তমান।

Sunday, 21 May 2017

পিদিমের আলো

সপ্তাহভর টাপুরটুপুর, আকাশের মুখ ভার।
মেঘমাখানো বিকেলবেলায়, গৃহস্থালির হার।
মেঘের গায়ে চু কিত কিত, জানলাতে মন গোল্লাছুট।
ছোট ছোট ছোট ছুট্টে গিয়ে, ছোট্টবেলার ছক্কা পুট।
মেঘের গায়ে সাপ লুডো নেই, মেঘের রঙ কালো।
ঘরের কোনে আজ বিজলিবাতি, নেই পিদিমের আলো।

Sunday, 9 April 2017

প্রত্যাশা

মৃতবৎসা মায়ের তৃতীয় এবং
শেষ গর্ভের সন্তান আমি।
জন্মের সময় থেকেই
আমার কাছে
কারও কোনো প্রত্যাশা ছিল না
কেবল বেঁচে থাকা ছাড়া।
পুত্র বা কন্যা,
বুদ্ধিমান বা বোধহীন,
সৌন্দর্য বা কদর্যতা,
দায়িত্বশীল বা দায়িত্বহীন
কোনোকিছুরই আশা করেনি কেউ
শুধুমাত্র আমার
জীবিত থাকা ছাড়া।
কন্যারূপে,
বন্ধুরূপে,
স্ত্রীরূপে
আমিও হয়ত তাই
কারও কোনো
প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব
নিইনি কোনোদিন।
কেবল বেঁচে আছি।
দুমড়ে বেঁকে যাওয়া পিঠ,
আর আদ্যন্ত স্বার্থপরতা সম্বল করে
আজও জীবিত আছি
প্রবলভাবে।

Wednesday, 29 March 2017

বৃষ্টিভোর


আজ ভোরে জানলা খুলতেই তার সাথে দেখা। সে যে আছে, কিংবা বলা যায়, বহুক্ষণ থেকেই ছিল, তা জানলা খোলার আগে অনুভবই করিনি। কোলাহলবিহীন তার উপস্থিতি। জানলা খুলেই দেখি, আজকের দিনটির মলিনতা মুছিয়ে ধুয়ে মেজে চকচকে করে রেখেছে সবকিছু সে। গাছপালারাও স্নান সেরে নিয়েছে ভোর রাত্রেই। ঝাঁকড়া চুল থেকে বাড়তি জল ঝরিয়ে নিয়ে সবাই মিলে জানালো 'সুপ্রভাত'। প্রভাতের তখনও অল্প দেরি আছে আসার। ভাবলাম বুঝি, সে এসে চলে গেছে ঘুমের মধ্যেই, তার আসা যাওয়ার সংবাদ ঘুমের পরত ভেদ করে এসে পৌঁছোয়নি আমার কানে। ভুল ভেবেছিলাম। ঝরঝর নৃত্যে তখনও অবিরল তার প্রভাতীবন্দনা। মরজগৎ  জেগে উঠেছে, উছলিত হয়ে উঠেছে সে বন্দনায়। কেবল আমি ছাড়া। জানালার ভেতরে দাঁড়িয়ে আর একটু হলে সদ্য নিদ্রত্থিতা আমি বেমালুম অস্বীকারই করে বসেছিলাম তার প্রবল উপস্থিতিকে। কেবলমাত্র তার উপস্থিতিজনিত কোলাহলটুকু নেই বলে। নিজেদেরই তৈরী করা শব্দনিরোধ জানালায় নিজেই প্রায় বঞ্চিত হচ্ছিলাম জগতজোড়া এই আনন্দময় প্রভাতফেরী থেকে। কতকিছুই যে এইরকম ভাবে নজরানা না দিয়ে মুখলুকোয় তার হিসেব কে রাখে। উপস্থিতির কোলাহলমুখরতার দিকেই বুঝি কেবল আমার একনিষ্ঠা। লাজুক কোলাহলবিমুখ আনন্দের উপস্থিতি তাই হারিয়ে যায় প্রতিদিনের অহেতুক শব্দময়তায়।

Monday, 27 March 2017

চাহিদা




ক্ষুধার প্রয়োজনে অন্নসংগ্রহ, 
অন্ন অন্বেষণের ক্লান্তিতে নিদ্রা, 
আর শারীরিক প্রয়োজনে মৈথুন 
শুনেছি আদিকালে এই ছিল 
জীবনের চাহিদা। 

এই তিন চাহিদা পূরিত করে, 
অনায়াস অর্জিত শান্তিতেই যাপিত হচ্ছিলো
আদিমানবীর জীবন। 

তারপর, কেমনকরে যেন, 
কোন এক দুর্বিপাকে, 
ক্ষনিকের জন্য 
শান্ত জলাশয়ে বিম্বিত হলো 
তারই শ্যামলী মুখচ্ছবিখানি।
প্রেমে পড়লো সে তার আপন লালিমার। 
আর সেই প্রাগৈতিহাসিক মুহূর্তে 
রচিত হলো বুঝি 
আত্মরতির ইতিহাস। 

কেবল আহার- নিদ্রা- মৈথুনে 
শান্ত রইল না জীবন।
কেবলই ভালোবাসতে ইচ্ছে হলো 
সেই প্রাগৈতিহাসিনীর। 
ক্রমশঃই সেই নব জাগরিত নরম প্রেম, 
সঞ্চারিত হয়ে চললো দিগন্তের দিকে। 
এতদিনে তার প্রয়োজন পড়েছে প্রসাধনীর।
আলুলায়িত রুক্ষ কেশপুঞ্জ 
শাসিত হয়েছে নবকবরীর আল্পনায়। 
বসন্তে সেখানে উঠেছে 
রক্ত-পলাশগুচ্ছ।  
সে পলাশ তার কানে দিয়েছে 
তার প্রিয় আদিমানবের সুরের সন্ধান। 
শিহরিত হয়েছে তার গলার ঝিনুকমালা।
দিগন্তরেখা স্পর্শ করতে গিয়ে 
অনন্ত সেই প্রেম, 
ছুঁয়েছে আদিমানবের হৃদয়। 
আর সেই ক্ষনেই রচিত হয়েছে 
যুগলজীবনের নতুন চাহিদা। 

সৌন্দর্যপ্রিয়তার চাহিদা। 
জীবনের সৌন্দর্যরূপ 
পরস্পরে ভাগ করে নেওয়ার চাহিদা। 
কেবল বেঁচে থাকার জন্য নয়, 
ভালবাসার জন্য বেঁচে থাকার চাহিদা।

আর সেদিন থেকেই 
আহার- নিদ্রা- মৈথুনকে 
যোজনক্রোশ পিছনে ফেলে-
দীপ্যমান হয়ে দাঁড়িয়েছে 
জীবনের উজ্জ্বলতম চাহিদা, 
ভালবাসা।।


Sunday, 26 March 2017

ব্রহ্মনাদ


প্রানের জন্ম কি শব্দ থেকে?
ব্রহ্মনাদ শব্দটি সঠিক কি অর্থবাহক?
হাজার হাজার নারী পুরুষের কোন অন্তরীন অতল থেকে উতসারিত আনন্দ,
বীণার তানরূপে তুলেছে ঝঙ্কার।
সৃষ্টি করেছে আদিম ব্রহ্মনাদ।
সৃষ্টি করেছে প্রাণ।
সৃষ্টি  করেছে শ্রী।

সমষ্টিগত সেই শ্রীনাদের পুনরারম্ভে
আজ কি পুনরাগমন হবে না সেই আদিম শ্রীয়ের?
পুনরায় জেগে উঠবেন না কি সেই আদিমাতা?
সৃষ্টি করবেন না কি নতুন প্রাণ?

তিলে তিলে মিলন হচ্ছিল
নিমীলিত অজস্র হৃদয় আর
নবকল্পের সেই নবব্রহ্মনাদের।
অপার্থিব সেই সংগমে জেগে উঠেছে
প্রতিটি প্রানের প্রতিটি সুপ্ত সুর।
সৃষ্টি হয়েছে নতুন এক সরগম।
নবকল্পের বীজ জেগেছে অনাদি নিদ্রা ভঙ্গ করে।
দিবাকরকে উষার অর্ঘ্য নিবেদনের সময়াসন্ন যে।

সমষ্টির আহবানে
আদিমাতা ধারণ করেছেন বরাভয়মুদ্রা।
জেগেছে সমস্ত সত্বা।
সমস্ত আগল ছিন্ন করে
সুরপ্লাবিত হয়েছে জগত।
ব্রহ্মনাদের আবাহনে
তরল হয়ে মিশে যাচ্ছে আজন্মের প্রস্তরীভূত আমিত্ব।

এতদিনে হল জন্ম।
আর নেই ভয়।

Saturday, 25 February 2017

আজকের ভোর




 সামনের জানলা তার ওপারে রাস্তা। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের পূর্ব সীমানা। রাস্তার ওপারে একটা বাড়ি। বেশ বড় বাড়ি। কিন্তু কখনো এই বাড়ি থেকে কাউকে বেরোতে বা ঢুকতে দেখিনি। আসলে এটা বাড়িটার পিছনের দিক। সামনের দিকে বড় দরজা, বাড়ির সামনে একটা বিশাল গাছ। নাম জানিনা।তাতে একটা দোলনা বাঁধা থাকতে দেখেছিলাম একদিন। তাইতেই বুঝেছিলাম বাড়িতে একটি ছোট সদস্যও আছেন। বাড়ির পিছনের দিকটাতে বিশেষ কেউ আসেনা। একটু জঙ্গুলে মতো। শীতকাল ছাড়া বোঝাই যায় না এখানে একটা বাড়ি আছে। জঙ্গলে ঢাকা থাকে। বাড়িটা একটু উঁচুতে। তাই শীতকাল ছাড়া অন্য সময়, যখন প্রচুর সবুজে বাড়িটা ঢেকে থাকে, তখন মনে করে নিতে খুব একটা কষ্ট হয় না যে, আমার জানলার ওপারে রাস্তা আর রাস্তার ওপারে সবুজে ঢাকা পাহাড়। আমি বুঝি হিমালয়ের কোনো শান্ত গ্রামে আছি।ভাবতে দোষ কি?

এই মুহূর্তে, শীতের দাপটে সব পাতা ঝরে, বাড়িটার পিছন দিকটা ন্যাড়া করে, জঙ্গলের গাছগুলো শুধু অজস্র হাত বাড়িয়ে উর্দ্ধমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আরএই সুযোগে বাড়িটার ফাঁক দিয়ে পূর্বদিকের একফালি আকাশ আমার সামনে ফুটে উঠেছে। আস্তে আস্তে ফর্সা হচ্ছে আকাশ। রাস্তাটা দিয়ে ক্যাম্পাস সিকিউরিটির গোবদা গাড়িগুলো রাতের শেষ টহল দিয়ে গেলো একটু আগে। তখন আলো ফোটেনি। আলো ফুটতে শুরু করতে না করতেই, রাস্তার পাশের হাঁটার রাস্তাটা পরিষ্কার করে দিয়ে গেলো বরফ সাফ করার ছোট গাড়ি নিয়ে। মানুষ চলাচল শুরু হবার আগে হাঁটার রাস্তা পরিষ্কার থাকা জরুরি। অবশ্য স্বাস্থ্যসন্ধানী দৌড়বাজরা ছাড়া বিশেষ কেউ হাঁটেনা এখানে। তাও এরা নাগরিক সুবিধা গুলো বেশ যত্নের সঙ্গেই রক্ষা করে। কাল সারাদিন তুষারপাত হয়েছে। সন্ধ্যে থেকে ক্ষান্ত দিয়েছিলো। বড় রাস্তাগুলো এখানে সাথে সাথেই পরিষ্কার করে দেয়। এই বরফ পরিষ্কার করার গাড়িগুলো তিন রকম হয় দেখেছি। শহরের সবচেয়ে বড় আর ব্যস্ত রাস্তাগুলো পরিষ্কার করতে হয় সাথে সাথেই। তার জন্য সবচেয়ে বড় আর ভারী গাড়ি লাগে। সামনের দিকে বেলচার মতো বিশাল চামচ নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। ছোট রাস্তা পরিষ্কার করার ছোট গাড়ি, আর রাস্তার পাশের হাঁটার রাস্তা পরিস্কার করার জন্য ছোট্ট গাড়ি। একটু আগে দৌড়াদৌড়ি করে তারই একটা আমার সামনের রাস্তাটা পরিষ্কার করে দিয়ে গেলো। গত বছর যখন এখানে প্রথম এসেছিলাম, এই রাস্তার বরফ পরিষ্কার করার গাড়িগুলো দেখে বেশ মজা পেয়েছিলাম। সবচেয়ে বড় গাড়িগুলো বেশ গাঁট্টাগোট্টা। চেহারাটা হুমদো মতো বলে আমরা ওগুলোকে মজা করে বলতাম, হুব্বাগাড়ি। বড় হুব্বাগাড়ি, মেজো হুব্বাগাড়ি , আর এখুনি যেটা দৌড়াদৌড়ি করছিলো সেগুলো ছোট হুব্বাগাড়ি। ছোট হুব্বাগাড়িগুলো খুব মজার। কেমন গুড়গুড়িয়ে চলে সব বরফ সরিয়ে রাস্তা করে দেয়।

লিখতে লিখতে চারদিকে আলো  ফুটে উঠছে। পূর্বদিকের একফালি আকাশে কমলা আভা লেগেছে। যদিও সূর্যোদয় দেখা এখান থেকে সম্ভব নয়। তাও বুঝতে তো পারছি যে এই শুরু হলো দিনের প্রথম ক্ষণ। সম্ভাবনাময় আরো একটা ভোর, মহাবিশ্বের উপহার, সক্কলের জন্য। 


রাস্তায় গাড়ি চলাচল এখনো শুরু হয়নি। আজ শনিবার, ছুটির দিন বলেই। অথচ ঘন্টা দুয়েক আগেও বেশ কয়েকটা গাড়িকে যাতায়াত করতে দেখেছি। রোজই দেখি। শেষরাতে অন্ধকারে কোথায় দৌড়ায় লোকজন কেজানে। হয়তো এয়ারপোর্ট যায়। তাছাড়া অত ভোরে আর কোথায় যাবে মানুষ। এখন রাস্তা ফাঁকা। শুধু সাদা রঙের একটা গাড়ি সারা গায়ে পাতলা তুষারের চাদর জড়িয়ে ঘুমোচ্ছে আমার জানলার সামনে। 

রাস্তার আলোগুলো নিভে গেছে। সামনের বাড়িটার জানলায় এখনো আলো জ্বলছে। শেষরাত থেকেই জ্বলছে।  দুটো কাঠবেড়ালি নেমে পড়েছে রাস্তায়। ওরা সারাদিন খেলা করে।  ছুটির দিনে মাঝে মাঝেই দেখতে পাই জানলা দিয়ে ওদের। ওরা ওই সামনের বাড়ির পিছনের জঙ্গলে থাকে। দুরন্ত ঠান্ডায়, বরফের মাঝেও খেলা করতে দেখেছি ওদের। প্রকৃতিদত্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ওরা। কি প্রাণশক্তি। সারাদিন দুটিতে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। খাবার খুঁজছে, খেলা করছে, মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা যে ছোটবেলায় ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা খেলতাম, ওই খেলাটা ওরা জানে। অবিকল ওই ভঙ্গীতে একে অপরের পিছনে দৌড়ায়। বেশ লাগে দেখতে। 


চারদিক আধোনীল থেকে সাদা থেকে ক্রমশঃ সোনালী হয়ে উঠেছে। চরাচর জেগে উঠেছে। আমিও তার সাথে মিলিয়েছি সুর। এবার শুরু হবে আমার আজকের দিন।