Friday, 6 March 2020

দ্য ক্যাফে - ৩

উৎসব পরবর্তী আধো আলোকিত একটা ক্যাফে। জায়গাটা এ শহরের দুটি বড় বাজার সংলগ্ন দুটি ব্যস্ত রাস্তার চৌমাথায়। সপ্তাহান্তে এই ছোট্ট দোকানটিকে বসতে জায়গা পাওয়া কষ্টকর হয়ে যায় মাঝে মধ্যে। তবুও শীতের রবিবারের সন্ধ্যায় সেখানে লোকজন সেদিন কম। রবিবার বলেই হয়ত। শুক্র বা শনিবার হলে মানুষের বাড়ি ফেরার ব্যস্ততা থাকে না এখানে। রবিবারে তা নয়। সোমবার ভোর ভোর কাজের জায়গায় পৌঁছানোর তাড়ায় রবিবারের সন্ধ্যেটুকুও তাড়াহুড়োর কবলে পড়ে ছটফটায়। এমনই এক রবিবারের পড়ন্ত বিকেলে কোণের দিকে একটা ছোট্ট টেবিলে গিয়ে বসেছিলাম দুজনে। রোজকারের মতন নানান আবোলতাবোল বিষয়ে কথাবার্তা আলোচনা চলছিল। বাইরে বিকেল ফুরিয়ে সন্ধ্যে হয়ে আসছে। মরা মরা একটা হলদে আলো এসে পড়েছে কাঁচের বাইরে। কাঁচের ওপারে রাস্তা। তার ওপারে একটা ছোট্ট বাড়ি। এখন থেকে বাড়িটার পিছনের দিকটাই দেখা যায়। এতদিন এই ক্যাফেতে আসছি, কখনো বাড়িটার এইদিকে কাউকে আসতে দেখিনি। পিছনদিক বলেই হয়ত। এই ক্যাফেটার একটা আলাদা বিশেষত্ব আছে। বাঁদিকে একটু গেলেই এশিয়ান মার্কেট। আমাদের মত দেশীয় খাবার-দাবারের রোজকার কারবারিদের জন্য ওরিয়েন্টাল শাকসব্জী-মশলাপাতির প্রধান যোগানকেন্দ্র। ডাইনে কিছুটা এগোলেই বাকি রোজকার অন্য প্রয়োজনীয় গার্হস্থ্য জিনিসপত্রের বাজার। আর পুরো এলাকাটা জুড়েই বিভিন্ন দেশের খাবারের সম্ভার নিয়ে অজস্র সস্তার রেস্টুরেন্ট। আমাদের মত ইউনিভার্সিটির মানুষদের জন্য কম পয়সায় উদরপূর্তির নিখুঁত আয়োজন। এসব কারণেই ইউনিভার্সিটি অফ ওমাহা আর মেডিকেল সেন্টারের আমাদের মত ভিনদেশি ছাত্র ছাত্রী বা কর্মী দলের জন্য এই ক্যাফেটা বড়োই প্রিয়।
         
ওই পাশে দুটো টেবিল জোড়া লাগিয়ে একদল ছেলে কলকল করে বিদেশী ভাষায় কথা বলে চলেছে। ওরা এখানকার প্রতি রবিবারের নিয়মিত আড্ডাধারী। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একদেশ থেকে এখানে এসেছে। ওদের একজনকে চিনি। আমাদের ইনস্টিটুটেরই রিসার্চার। বাকিরা সম্ভবতঃ ইউনিভার্সিটি অফ ওমাহায় ছোট বড় কোনো কোর্স করতে এসেছে। ওরা কি ভাষায় কথা বলছিলো সে আমাদের বোঝার কথাও ছিল না। ভাষা না বোঝার একটা বেশ উপকার আছে। বক্তব্যের ওপর থেকে মনোযোগ সরে গিয়ে মানুষের ওপর মন পড়ে। মানুষ দেখার সেরা জায়গা এই ক্যাফেগুলো। এককাপ পানীয় নিয়ে এককোণায় বসে নিশ্চুপে বহু কিছুর সাক্ষী থাকা যায়। সামনের মানুষগুলো সম্পর্কে মনে মনে কিছু ধারণা করা যায়। এই যেমন এই ছেলেগুলির পরিচ্ছদ দেখে অনুমান হয় প্রত্যেকেই উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে এসেছে। অবশ্য নইলে দেশ ছেড়ে রিসার্চ করতে আসলেও, ব্যাচেলার বা মাস্টার্স ডিগ্রি করতে কোন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে ছেলেমেয়েরা এদেশে আসে না। আমাদের দুজনের আলসেমি মাখা বিকেল শেষ হচ্ছিল নিরুত্তাপে। ওদের হাসাহাসি কথোপকথন আর উচ্ছলতা দেখতে দেখতে। সাথে ছিল দুইকাপ উষ্ণ তিতকুটে তরল।

প্রায় অন্ধকার হয়ে আসছে। একজন মানুষ এসে ক্যাফেতে ঢুকলেন। মানুষ দেখার একটা অলিখিত নিয়ম রয়েছে। দুইধরনের মানুষকে আর একজন মানুষ নজর করে দেখে। এক, যদি সেই মানুষটিকে দেখে যথেষ্ট সম্ভ্রমের উদ্রেক হয়। অর্থাৎ মানুষটিকে দেখে যদি নিজের চাইতে সামাজিকতায় বড় বলে  মনে হয় অথবা দুই, যদি মানুষটিকে দেখে সন্দেহের উদয় হয়। সন্দেহটা বেশিরভাগ সময়েই পোশাক দেখে অনুমিত হয়। এর বাইরে যাঁরা, তাঁরা তো নিতান্তই গড়পড়তা মানুষ। তাঁদের না আছে চোখ গোল গোল করে দেখার মতন আড়ম্বর। না আছে দুরছাই করার মতন মাটি সংলগ্ন নমনীয়তা। যদিও এসবের কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে বলে মনে হয় না। আমিও আর পাঁচজনার মতনই অজস্র ভুল ধারণার বশবর্তী সাধারণ একজন মানুষ দেখিয়ে। যে মানুষটি এসে ক্যাফেতে ঢুকলেন তাঁকে দেখে আমি বিনা দ্বিধায় দ্বিতীয় দলে ফেলে দিলাম। একগোছা ঝোলাঝুলি ব্যাগ। বেঢপ জ্যাকেট। এবং সন্ধ্যেবেলায় রোদচশমা ও টুপি। এমন ধারা মানুষকে নিঃসন্দেহেই সন্দেহ করা চলে, তাই না? আর সন্দেহ করার মতন হলেই তিনি পর্যবেক্ষণের বস্তু। সুতরাং আমার চোখও তাঁকে বিনা লজ্জায় অনুসরণ করে চললো। তিনি তিনটে টেবিল বদলালেন। কোথাও বসে তাঁর ভালো লাগলো না। অবশেষে চার নম্বর টেবিলে গিয়ে তাঁর অজস্র জিনিসপত্র নিয়ে থিতু হলেন। ঝোলা থেকে বেরোলো একটা বহুল ব্যবহৃত কফির কালচে দাগধরা কফিমগ। সেই মগ নিয়ে তিনি চললেন কাউন্টারে। ওতেই খানিকটা কফি ঢেলে দিতে বলবেন সম্ভবতঃ। তাঁর দিকে অনেকেই নজর পড়েছে এতক্ষনে। কাউন্টারের ছেলেমেয়েগুলোর তো বটেই। কিছু সমস্যা হলে ওদেরকেই সামলাতে হবে। এই ক্যাফেতেই একবার এক মহিলার পিছু ধাওয়া করে এসেছিলো একজন মানুষ। ক্যাফের বাইরে উল্টোদিকের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ধূমপান করতে করতে মহিলাকে চোখে চোখে রাখছিলো। তারপর ক্যাফের ভেতরে ঢুকে কিছু করার আগেই এই কাউন্টারের ছেলে মেয়েরা পুলিশে ফোন করে। আর আমাদের সামনেই মিনিট কয়েকের মধ্যে পুলিশ এসে মানুষটিকে ধমকে-ধামকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। এই মানুষটির হাবেভাবেও সাধারণ কিছু ছিল না। ফলত: সকলেই সতর্ক। আমাদের কফি শেষ হয়ে গিয়েছিলো। আমরাও উঠে পড়লাম। কারণ আমরা আরো বেশি সতর্ক।

বাইরে এসে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিয়েছি সবে। দেখলাম ক্যাফের দরজা ঠেলে দৌড়াতে দৌড়াতে আসছেন তিনি। মন বুঝলো নিশ্চয়ই কিছু গোলমেলে ব্যাপার। শীতকাল বলে গাড়ির কাঁচ তো তোলাই ছিল। আরো সিঁটিয়ে বসলাম। পিনাকী ততক্ষণে গাড়ির মুখ ঘুরিয়েছে। বেরিয়ে যেতে হবে এখন থেকে।মানুষটি সোজা এসে আমার জানলার কাঁচে টোকা দিচ্ছেন। হাতে একটা নোটবই। সেটা দেখিয়ে কি যেন বলছেন। এখানে এমন ঘটনার কথাও শুনেছি যে, ভবঘুরে মানুষরা এক-দুই ডলার চেয়েছে কারো কাছে এবং সেটি না পাওয়ায় সোজা গুলি করে মেরেছে। সেসব গল্প মাথায় চট করেই চলে আসে এই সব পরিস্থিতিতে। দোনোমোনা করে পিনাকীর হাজার 'না'-এর মাঝেও কেন জানিনা সেদিন জানলার কাঁচটা খুলে ফেলেছিলাম খানিকটা। তিনি হাতের নোটবইটা দেখিয়ে বললেন, "এটা তোমরা ফেলে যাচ্ছিলে।" আমরা যে টেবিলে বসেছিলাম তার পাশেই কাউন্টারের কোণের দিকে একটা কলমসহ এই সুন্দর নোটবইটা রাখা ছিল। সম্ভবতঃ আমাদের আগে কেউ এতে কিছু লিখছিলো, তারপর ফেলে চলে যায়। ওটা আমাদের নয়। সেকথা তাঁকে জানাতে তিনি বললেন, "ওহ, তাহলে ঠিক আছে। আমি ভাবলাম তোমরা ভুলে রেখে যাচ্ছ বুঝি। আসলে এরকম ব্যক্তিগত জিনিস একবার হারিয়ে গেলে দোকানে তো কিনতে পাবে না, তাই না? কত কি স্মৃতি, হয়ত কোনো মানুষের দেওয়া উপহার এটা।  তাই ভাবলাম দিয়ে আসি।  ঠিক আছে। তোমাদের নয় যখন তাহলে এসো।  তোমাদের দেরি করালাম বলে দুঃখিত। শুভরাত্রি।" এই বলে পিছন ঘুরলেন।

একবুক লজ্জা নিয়ে কাঁচটা বন্ধ করতে করতে দেখলাম এতক্ষনে পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে গেছে আমাদের চারপাশটা। গাড়ির হেডলাইটের আলো গিয়ে পড়েছে তাঁর ওপর। পিছন ফিরে হেঁটে ফের ঢুকে যাচ্ছেন আমাদের ফেলে আসা ক্যাফেটার দরজা ঠেলে। সেই বেঢপ জ্যাকেট গায়ে, অপরিষ্কার কফিমগ আর নোটবইটা হাতে করে নিয়ে।

   

Monday, 17 February 2020

#এই_সপ্তাহের_শেষে - 9

#এই_সপ্তাহের_শেষে
৯. মাইটোকন্ড্রিয়া আর কোষীয় বিবর্তন 
----------------------------------------
সেই যে নভেম্বর মাসের শেষাশেষি "মাইটোকন্ড্রিয়া আর মেদ" নিয়ে একদিন কথা বলছিলুম, তারপর তো অনেকদিন গপ্পগাছা হয়নি। সে অবশ্য আমারই দোষ। মন দিয়ে বেশ কিছু কাজকর্ম শেষ করে তারপর তাক তা ধিনা বলে একমাসের জন্য বাড়ি চলে গেলুম। আর বাড়ি গেলে বাপু আমি আর কাউক্কে চিনিনে। তারপর বাড়ি থেকে এসে এই দুসপ্তাহ হলো থিতু হয়ে বসেছি। এবার একটু গপ্প করা যেতেই পারে আপনাদের সাথে। হ্যাঁ কি যেন হচ্ছিলো? মাইটোকন্ড্রিয়া। তা মাইটোকন্ড্রিয়া ব্যাপারটা কি সেটা তো আগের গল্পেই বলেছি। ওই যে, #এই_সপ্তাহের_শেষে - র ৮ নম্বর গল্প, যার নাম নাকি "মাইটোকন্ড্রিয়া আর মেদ।"   

কিন্তু আজকের গল্প শুরু করার আগে, আগের দিন কোষ নিয়ে দুটো কথা বলেছিলাম, সেকথা গুলি আবার একবার না বললেই নয়। নইলে আজকের গল্প করা যাবে না। আপনারা ভুলে যান যদি, আপনাকে আমিই নয় মনে করিয়ে দিচ্ছি। আপনাকে কষ্ট করে আমার ওয়াল ধরে নেমে যেতে হবে না।  

আগের দিন যা লিখেছিলাম:

"মনে করুন একটা থকথকে জেলিজাতীয় জিনিস। রাসায়নিক দিয়েই বানানো। তবে মানুষের তৈরী কারখানায় নয়। প্রকৃতি নিজেই তৈরী করেছে। এবার মনে করুন সেই জেলি জাতীয় পদার্থটিকে দুটি পাতলা পর্দা দিয়ে মুড়ে রাখা হয়েছে। যাতে ওই জেলি বেরিয়ে আসতে না পারে। এটিই আপাতত ধরে নিন আমাদের কোষ। এবার মনে করুন, ওই পর্দা মোড়া জেলির মধ্যে আরো একটি ছোট সাইজের পর্দা মোড়া জেলি রয়েছে। ওই একই ধরণের ডাবল পর্দা। তা এই ঘরের মধ্যে ঘর কেন? কারণ আছে! ওই ঘরের মধ্যেকার ঘরের ভেতরে আছে অনেক ছোট ছোট বেঁটে মোটা সুতো। এমনি সুতো নয় রীতিমত মাঞ্জা মারা সুতো। একে অন্যের ঘাড়ে উঠে আছে বটে ওই ছোট্ট জায়গায় সবাই মিলে থাকতে হবে তো। কিন্তু ভীষণ পরিপাটি এরা। কেউ কারো সাথে জড়িয়ে পেঁচিয়ে নেই। এই সুতোগুলোর নাম ধরে নিন ক্রোমোসোম (Chromosome) আর এই মাঞ্জা মারা সুতোর ভেতরের আসল সুতোটা হলো গিয়ে আমাদের ডিএনএ (DNA) আর মাঞ্জাটা হলো গিয়ে এই ডিএনএ কে রক্ষা করার (এবং আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার) জন্য কিছু প্রোটিন। তাদের মধ্যে প্রধান ধরণের প্রোটিনগুলোর নাম ধরে নিন হিস্টোন (Histone) আর এই পর্দা ঘেরা ঘরের ভেতর ঘরটি, যেখানে এই ক্রোমোসোমগুলি গুটিসুটি মেরে বসে আছে সেটি হলো গিয়ে নিউক্লিয়াস (Nucleus)। আর নিউক্লিয়াসের বাইরের পর্দা ঘেরা জেলিটি হলো গিয়ে আমাদের কোষের সাইটোপ্লাজম বা সাইটোসল (Cytoplasm/ Cytosol)। 'সাইটো' মানে কোষ। কোষের সল্যুশন তাই সাইটোসল আর কি। তা এখন এই সাইটোসলে অনেক ধরণের জিনিসপত্র ওই থকথকে জেলির মধ্যে আটকে থাকে। আলাদা আলাদা তাদের কাজ, আলাদা আলাদা তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। বিভিন্ন তাদের নাম। তাদের সবার গল্প একদিনে বলা যাবে না। এখন একজনের কথা বলি, সে আবার নিজেও ওরকম ডাবল পর্দা ঘেরা একটা ছোট লম্বাটে গোল জিনিস। সংখ্যায় অনেক। সবাই মিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে সাইটোসলে। বহু বহু বছর আগে আমাদের পৃথিবীর যখন ছোটকাল, তখন নাকি এরা ছিল পুঁচকে এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া। তারা কোনো কারণে প্রাণী কোষে ঢুকে পড়েছিল। আর প্রাণী কোষও কোনো কারণে দেখেছিলো এদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে বের করে দেওয়ার থেকে সাথে রেখে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। অনেক উপকার করে ব্যাটারা। "সেই থেকে রয়ে গেছে।" কোষের কাজকর্ম চালাতে গেলে শক্তি লাগে তো? আপনার খাবার দাবার থেকে সেই শক্তি তৈরী করে এরা প্রধানত। এছাড়াও হাজার একটা কাজ করে এরা। যত দিন যাচ্ছে এই একদা পরজীবী এখন কোষের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই ছোট্ট জিনিসগুলির অপরিমেয় গুরুত্ব বোঝা যাচ্ছে। এদের নাম মাইটোকন্ড্রিয়া (Mitochondria)। এরা খানিক স্বনির্ভরও বটে। নিজের সংখ্যা কোষের মধ্যে নিজেরাই বাড়াতে পারে। মারাত্মক গুরুত্বপূর্ণ অংশ এরা কোষের।"

এই পর্যন্ত আগের গল্পে বলাই ছিল। তারপর তো সে মাইটোকন্ড্রিয়া কি করে শক্তি তৈরী করে আর আমাদের শরীরের মেদ তৈরী হওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে সেসব গল্প করেছিলাম। আজকে বরং একটু অন্য গল্প করা যাক। খুব মজাদার গল্প। গল্পটা হলো, ওই যে আগের দিন বলেছিলাম বা আজকেও পুনরাবৃত্তি করলাম না, যে, "মাইটোকন্ড্রিয়া ছিল পুঁচকে এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া। বহু বহু বছর আগে আমাদের পৃথিবীর যখন ছোটকাল, তখন নাকি তারা কোনো কারণে প্রাণী কোষে ঢুকে পড়েছিল। আর প্রাণী কোষও কোনো কারণে দেখেছিলো এদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে বের করে দেওয়ার থেকে সাথে রেখে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।" আজকে বরং সেই নিয়ে খানিক গপ্প করি। কি বলেন? 

মানে কথাটা হলো গিয়ে, হঠাৎ করে প্রাণীকোষ কেনই বা বাইরের একটা ব্যাকটেরিয়াকে নিজের ঘরে ঢুকতে জায়গা দিলো? তাও আবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে থেকে যাবার কড়ারে। আর মাইটোকন্ড্রিয়াই বা কেন স্বাধীনতা খুইয়ে শরণার্থী হিসেবে থেকে যেতে রাজি হলো? যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন নয় এটা? বলুন? 

আসল ব্যাপারটা বলি তবে। ওই যে কোষ বলছি, বিবর্তনের কাহিনী অনুসারে প্রথম যুগের কোষগুলির আবার ওই ভেতরের নিউক্লিয়াস টিউক্লিয়াস কিচ্ছুটি ছিল না। শুধু ওই ডবল পর্দা ঘেরা সাইটোসল। আর তার মধ্যে ডিএনএ গুলো ছত্রখান হয়ে রয়েছে। ঠিকঠাক নিউক্লিয়াস বলে কিছু নেই। এদের মতন কোষ এখনো দেখা যায় যদিও। যেমন নানান ব্যাক্টেরিয়া। এদের নাম বড়রা দিয়েছেন "প্রোক্যারিওটিক কোষ" 'প্রো' মানে আদিম অর্থে আর কি। আর এদের চাইতে যারা কিঞ্চিৎ লায়েক হয়েছে অর্থাৎ আমাদের বা গাছেদের দেহের কোষগুলি, তাদের ঠিকঠাক নিউক্লিয়াস আছে, তার সাথে সাথে মাইটোকন্ড্রিয়ার মতন আরো নানান সহায়ক জিনিসপত্র আছে তারা হলো গিয়ে "ইউক্যারিওটিক কোষ।" অর্থাৎ বিভিন্ন কাজ করার জন্য বিভিন্ন পর্দা ঘেরা জায়গা। সকলের সব কাজ ঠিকঠাক চললে, তবেই কিনা গোটা কোষটি ঠিকঠাক কাজ করবে। একদম সমবায় পদ্ধতি। এসব তো আমরা সবাই ইস্কুলে থাকতেই পড়েছি, তাই না? তাও বললাম এই কারণে যে মাইটোকন্ড্রিয়ার স্বাধীনতা খোয়ানোর গল্পে ঢুকতে গেলে এই এই শিবের গীতটা গাইবার দরকার আছে।        

এই যে বলছি বহু বহু বছর আগে মাইটোকন্ড্রিয়া প্রাণিকোষে ঢুকে পড়েছিল, এটা একটু ভুল কথা। আসল কথাটা হচ্ছে, প্রাণীকোষই নিজের স্বার্থে মাইটোকন্ড্রিয়াকে গিলে ফেলেছিলো। কারণটা বলি তবে। পৃথিবীর কৈশোর কালে আবহাওয়ায় অক্সিজেন বলে কোনো কিছু ছিল না। এক্কেবারে ছিলোনা বললে অবশ্য ভুল হবে। বিভিন্ন যৌগের সাথে যুক্ত অবস্থায়, পাথুরে ভূমির নানান খনিজের সাথে মিলে অক্সাইড তৈরী করে অবশ্যই ছিল। কিন্তু বাতাসে মুক্ত অক্সিজেন গ্যাস হিসেবে ছিল না। আমরা যা প্রতিটি প্রশ্বাসের সাথে চোঁ-চোঁ করে নিয়ে চলেছি প্রতি সেকেন্ডে সেই মুক্ত অক্সিজেন গ্যাস।আমাদের বর্তমানে বাতাসে অক্সিজেনের ভাগ মোটামুটি কুড়ি শতাংশ ধরতে পারেন। এই কুড়ি শতাংশ অক্সিজেনের কণামাত্র কমে গেলেই, মানে ওই পাহাড়ি জায়গায় গেলে-টেলে যেমন হয় আর কি, আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে। তাহলে তখন ওই অক্সিজেনবিহীন আবহাওয়ায় কোষ বাঁচত কি করে? গোদা বাংলায় বললে, শ্বাস নিত কি করে? পদ্ধতি ছিল। কি সেই পদ্ধতি? পদ্ধতি বলার আগে দুটো লাইনে বলে নিই বর্তমানে আমাদের শ্বাস নেওয়া মানে আসলে ব্যাপারটা কি। ব্যাপারটা আসলে কিছুই নয়, আমাদের খাবার দাবার থেকে শক্তি উৎপাদনের জন্য মানে ATP তৈরির  (গতদিনেই বলেছিজন্য একদম শেষ ধাপে একটি জারণ প্রক্রিয়া থাকে। মানে ওই যে ক্লাস এইটের বইতে জারণ-বিজারণ পড়েছিলাম না, সেই। আপনি দরকার নেই বলে একটি ইলেক্ট্রন ছাড়লেন, আর আমি, ভীষণ দরকার বলে সেই ইলেক্ট্রনটা টপ করে নিজের ঝুলিতে ভরে নিলুম। এবার আমি হলাম 'জারিত' বা oxidized আর আপনি হলেন গিয়ে 'বিজারিত' বা reduced আবার আমি যেহেতু oxidized হলাম আপনার দ্বারা, তাই আপনার oxidizing ক্ষমতা আছে। মানে আপনি ইলেক্ট্রন ছাড়তে পারেন। আপনার মতন এরকম একখানি oxidizing ক্ষমতাওয়ালা একটা মৌলের দরকার হবেই হবে শক্তি তৈরির শেষ ধাপে। এটিই হলো রেস্পিরেশন বা শ্বসনের কারণ। এটির দরকার না হলে এই চোঁ-চোঁ করে অক্সিজেন টানার বিশেষ কিছু দরকার নেই। কারণ অক্সিজেনের ওই জারণ করার বা oxidizing ক্ষমতা মারাত্মক। অর্থাৎ সে ইলেক্ট্রন ডোনার হিসেবে কাজ করে আমাদের শরীরে শক্তি উৎপাদনের সময়। 

এখন বাতাসে যখন অক্সিজেন ছিল না, কোষগুলি তাহলে তখন এই ইলেক্ট্রন কথা থেকে পেতো? পেতো প্রধানত সালফার বা নাইট্রোজেন থেকে। তখন পৃথিবীর বাতাস অনেকটা আগ্নেয়গিরির বাতাসের মতন ছিল ধরে নেওয়া যেতে পারে। আগ্নেয়গিরির আশেপাশে বা এখন যেমন অনেক উষ্ণ প্রস্রবণের আশেপাশে বেশ রঙিন পাথর বা জলে শ্যাওলার মত রঙিন সর দেখা যায় না? ওই রঙিন ব্যাপারটা হলো আগ্নেয়গিরির সালফারকে ব্যবহার করে শ্বাস নেওয়া সালফার ব্যাকটেরিয়ার দল। তো যা বলছিলাম। বাতাসে তখন সালফার ভর্তি। আমাদের আজকের কোষের পূর্বপুরুষরা তখন সালফার বা নাইট্রোজেন কে ব্যবহার করে দিব্য রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো অসুবিধা নেই। আস্তে আস্তে সূর্যের তেজ কমছে। জগৎ ঠান্ডা হচ্ছে। এবারেই আমাদের গল্পের শুরু। এমতাবস্থায়, কিছু অকালপক্ক ব্যাকটেরিয়া করলো কি, সূর্যের আলো, মাটিতে জমে থাকা কার্বনেট যৌগ গুলোকে ভেঙে কার্বন-ডাই-অক্সাইড আর দরকার মত সালফারকে ব্যবহার করে নিজেদের খাবার নিজেদের দেহেই বানিয়ে নিতে শুরু করলো। মানে গাছেদের আজকের সালোকসংশ্লেষ (Photosynthesis) পদ্ধতির এক্কেবারে আদিম অবস্থা। এ বার তো তারা মজা পেয়ে গেল, কারণ খাবারের কোনো অভাব হচ্ছে না। সুতরাং ঝাড়ে-বংশে বাড়তে শুরু করলো এই রাঁধুনে ব্যাকটেরিয়ার দল। এরা হলো সায়ানোব্যাকটেরিয়া (Cyanobactria) 

এইবার একখান মুশকিল শুরু হলো বুঝলেন। প্রাণঘাতী ঝামেলা। কিরকম? 

এই সায়ানোব্যাক্টেরিয়ার আশেপাশে যেসব অন্য কোষগুলি ছিল যাদের কিনা এই রান্না করার ক্ষমতা নেই, তারা পড়লো ঝামেলায়। এক তো সায়ানোব্যাক্টেরিয়ারা সংখ্যায় এতটাই বাড়ছে যে অন্যদের জায়গা ছেড়ে দিতে দিতে কোনঠাসা অবস্থা। যেমন হয় আর কি এখনো সব জায়গায়। উপরন্তু গোদের ওপর বিষফোঁড়া এই যে, এই নতুন রাঁধুনে সায়ানোব্যাক্টেরিয়ারা শুধু রান্নাই করে তা নয়। রান্না করার সাথে সাথে ভুসভুস করে অক্সিজেন ছাড়ে বাতাসে। রান্নায় উৎপন্ন সাইড প্রোডাক্ট। মুক্ত অক্সিজেন গ্যাস। গাছেরা সালোকসংশ্লেষ করতে গিয়ে যা করে আর কি। এর ফলে কিছুদিনের মধ্যেই বাতাসে মুক্ত অক্সিজেনের মাত্রা হু হু করে বাড়তে শুরু করলো। কারণ তখনও পর্যন্ত বাতাসের মুক্ত অক্সিজেনকে ব্যবহার করে শ্বাস নেওয়ার কেউ নেই। আগেই বলেছি অক্সিজেনের জারণ করার ক্ষমতা বা oxidizing power মারাত্মক। এখন এই জারণ ক্ষমতা তো "কবে আমাকে কেউ ATP তৈরীর জন্য ব্যবহার করবে, তবে আমি তাকে জারিত করবো"- এই আশায় বসে থাকবে না, তাই না? সে যাকে সুবিধে বুঝবে তাকেই জারিত করবে। সুতরাং এই বর্ধিত অক্সিজেনওয়ালা বাতাসে থেকে কোষেদের বাইরের দিকের পর্দার প্রোটিন, তারপর সেই অক্সিজেন ভেতরে ঢুকে ভেতরের নানান প্রোটিন, লিপিড, কার্বোহাইড্রেট যাকে পারল তাকেই দুমদাড়াক্কা oxidized করতে শুরু করলো। কেউ আর তার নির্দিষ্ট কাজ করতে পারছে না। কেউ বেশি করছে, কেউ কম করছে, কেউ একদম অকর্মন্যই হয়ে পড়ছে। কেউবা এমন ভুলভাল কিছু করছে তাতে কোষটির বেঁচে থাকাটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফল হলো মারাত্মক। কোষেদের সব কাজ কর্ম গোল্লায় গেছে। প্রবল অরাজকতা বলতে পারেন। এই অরাজকতার নাম 'oxidative stress'

এই গন্ডগোল এখনো আছে আমাদের শরীরে। তার মোকাবিলা করার হাতিয়ারও জোগাড় করেছি আমরা। সেসব গল্প নয় অন্য আর একদিন হবে। এখন যা বলছিলাম বলি। 

তা এই 'oxidative stress' এর মোকাবিলা তো করতে হবে। নইলে এই অক্সিজেনের জ্বালায় তো কোষেদের ভবলীলা সাঙ্গ হবার জোগাড়। কি করা যায়? নানান রকম কোষ তখন নানান পদ্ধতি প্রয়োগ করে নিজেদের বাঁচাতে চেষ্টা করছে।এমন সময়, একধরণের কোষ, যে কিনা প্রোক্যারিওটিক কোষের চাইতে একটু উন্নত প্রজাতির কোষেদের মধ্যে একজন, সে নজর করল যে এক ধরণের ব্যাক্টেরিয়াল কোষ, মানে নিচু জাতের প্রোক্যারিওট, সে ব্যাটা এই মারাত্মক oxidative stress কে তুশ্চু করে দিব্য বেঁচে থাকছে, বাচ্চাও পাড়ছে। এদের নাম "আলফা-প্রোটিও-ব্যাকটেরিয়া" (alphaproteobactria)। অন্যদের যেখানে সেই আবহাওয়ায় বেঁচে থাকাটাই দুস্কর। কারণ এই পুঁচকে ব্যাক্টেরিয়াগুলোর দেহে oxidative stress এর মোকাবিলা করার মত দরকারি উৎসেচক আছে। তারা সেটা তৈরী করতে পারে। সুতরাং তারা সহজেই oxidative stress জনিত মরণকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে পারে। ধীরে ধীরে সে ক্ষমতা তারা তৈরী করেছে। তো আমাদের এই উচ্চ বংশীয় কোষ, যার গোত্র নাকি ছিল গিয়ে 'আর্কিব্যাকটেরিয়া' (archaebacteria) বা সংক্ষেপে আর্কিয়া (archaea), এরা দেখলো, এই আলফা-প্রোটিও-ব্যাকটেরিয়াকে যদি ভুজুং ভাজুং দিয়ে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসানো যায় তাহলে তাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদেরকে বেশ বাঁচিয়ে নেওয়া যায়। সুতরাং এই আর্কিয়া বুদ্ধি করে আলফা-প্রোটিও-ব্যাকটেরিয়াকে বেমালুম গপ্ করে গিলে ফেললো। তার আগে অবশ্য "এস এস গর্তে এস, বাস করে যাও চারটি দিন, আদর করে শিকেয় তুলে রাখবো তোমায় রাত্রিদিন" বলে বেশ তোয়াজ করেছিল হয়তো। আর সেসব মুধু মাখা বাক্যে গলে গিয়ে আমাদের আলফা-প্রোটিও-ব্যাকটেরিয়া দিব্য হাসি মুখে আর্কিয়ার ঘরে গিয়ে উঠলো। আর যেমন হয়, আর্কিয়া সুচতুর ভাবে অতিথির পয়সায় ওষুধ খেয়ে যেতে লাগলো। মানে আলফা-প্রোটিও-ব্যাকটেরিয়ার তৈরী করা উত্সেচকের সাহায্যে নিজের oxidative damage মেরামত করে নিতে লাগলো। আর বর্ধিত অক্সিজেনওয়ালা আবহাওয়ায় দিব্যি অন্যদের বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বেঁচে রইলো। এই যে বিশেষ পরিবর্তন তার হলো তাকে সেজন্য নাম দেওয়া হয়েছে 'লোকীআর্কিয়া' (Lokiarchaea)। মানে ওই নর্স উপকথার দুস্টু ছদ্মবেশী দেবতা 'লোকী'-র নামে আর কি। আর এই বিশেষ ধরণের আলফা-প্রোটিও-ব্যাকটেরিয়া'-ই হলো আমাদের আজকের 'মাইটোকন্ড্রিয়া'।

এখন একটাই প্রশ্ন বাকি রইলো, মাইটোকন্ড্রিয়া কেন এই ব্যবস্থা মেনে নিলো? সে স্বাধীনতা খুইয়ে প্রথমে অন্যের অতিথি আর পরে পরাধীন শরণার্থী হয়ে রয়ে গেলো কেন? এর কারণ হলো, মাইটোকন্ড্রিয়ার স্বাধীনতা লোকীআর্কিয়া পুরোপুরি নষ্ট করেনি। বিজনেস স্ট্র্যাটেজি। বুঝলেন কিনা? পুরোপুরি মাইক্রোম্যানেজ করলে তো দুধেল গরু দড়ি ছিড়ে পালাতে চাইবেই। সুতরাং খানিক স্বাধীনতা দাও। মানে এই যে- তুমি নিজের মত সংখ্যায় বাড়তে পারবে, নিজের প্রয়োজনের বেশ কিছু প্রোটিন নিজেই তৈরী করতে পারবে, এইসব আর কি। আমায় বাপু ওই মহৌষধী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এর অ্যান্টি) উৎসেচকের সরবরাহ দিলেই চলবে। মাইটোকন্ড্রিয়া ভাবলো, মন্দ কি? বাইরে এত হয় ঝাপ্টার মধ্যে বেঁচে থাকার কষ্ট না করে বেশ একটা ঘর পাওয়া গেল। আর নিজের জন্য বানানো ওষুধ থেকে বাড়িওয়ালাকে খানিক নয় দেওয়াই গেল। সুতরাং সে লম্বা সময়ের জন্য অতিথি হত সম্মত হলো। কিন্তু আর্কিয়া বিজনেসটা বেশ ভালোই বুঝতো বুঝলেন। সে চুপিচুপি এমন ব্যবস্থা করলো যে, মাইটোকন্ড্রিয়ার বেশ কিছু ভীষণ দরকারি প্রোটিন "এই নাও এটা তোমার জন্য আমিই বানিয়ে দিচ্ছি" বলে তার দায়িত্ব নিলো। প্রথমে হয়ত মাইটোকন্ড্রিয়া ভেবেছিলো, ভালোই তো, খাটতে হচ্ছে না। কিন্তু পরে দেখা গেলো, ওই প্রোটিন গুলো তৈরী করার সমস্ত যন্ত্রপাতি আছে বা চলে গেছে আমাদের লোকীআর্কিয়ার কবলে। মাইটোকন্ড্রিয়া নিজে থেকে ওই প্রোটিনগুলো আর তৈরী করতে পারে না। আস্তে আস্তে সেই ক্ষমতা মাইটোন্ড্রিয়া থেকে আর্কিয়া নিজের কাছে নিয়ে নিয়েছে মাইটোকন্ড্রিয়াকে পুরোপুরিভাবে ঘরবন্দি করার ব্যবস্থা পাকা করতে। মাইটোকন্ড্রিয়া যতদিনে একথা বুঝতে পারলো ততদিনে সে অতিথি থেকে পঙ্গু শরণার্থী হয়ে গেছে। যে বাইরে গিয়ে একা বেঁচে থাকার ক্ষমতা হারিয়েছে। 

এই হলো গল্প। কেমন চেনা চেনা লাগছে না গল্পটা? 

সেই থেকে সেই লোকীআর্কিয়ার দেহে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে রয়ে গেছে মাইটোকন্ড্রিয়া। আর লোকীআর্কিয়া বিবর্তনের পথে চলতে চলতে নানান দরকারি জিনিস জড়ো করে পরিণত হয়েছে আজকের উন্নত ইউক্যারিওটিক কোষে। আর নতুন গল্প এই যে, নতুন আবিষ্কার বলছে- এই ঘটনা সেইদিন শুধু লোকীআর্কিয়ার দেহেই হয়নি। আরো অন্তত চারধরণের আর্কিয়া পাওয়া গেছে যাদের দেহে এই একইরকম পদ্ধতিতে মাইটোকন্ড্রিয়া ঢুকেছিলো। তাদের কি নামকরণ করা হয়েছে বলুন দিকি? খুব সোজা তো। 'লোকী' তো ছিলই। বাকিরা হলো -'থর', 'ওডিন', 'হেইমডেল' আর 'হেল'  

আচ্ছা আজ তবে আসি। অনেক গল্প হলো। 
ভালো থাকুন সক্কলে।
অর্পিতা   

Friday, 14 February 2020

এই_সপ্তাহের_শেষে-8

#এই_সপ্তাহের_শেষে
৮. মাইটোকন্ড্রিয়া আর মেদ
----------------------------
আজ একটু অন্য গল্প করি। ক্যান্সারের গল্পে ফিরে আসব পরের সপ্তাহেই। কথা দিচ্ছি। আর ফিরে তো আসতেই হবে। অনেক গল্প বাকি আছে ওই নিয়ে। কিন্তু আজ একটু অন্য গল্প করতে ইচ্ছে করছে। এমনই স্বাদ বদল ধরে নিন। তা আমাদের আজকের গল্পের নায়ক আমাদের দেহের কোনো একটি কোষ। কোনো ক্যান্সার কোষ নয় কোনো বড় মতলবি বাজে কোষ নয়। ছাপোষা সুন্দর টুকটুকে একটি বাচ্চা কোষ। কেমন? এখন এই 'কোষ-কোষ' তো অনেক দিন ধরেই বলছি। এই 'কোষ' ব্যাপারটা কি, কীই বা থাকে তার ভেতরে সেটি বলিনি। সংক্ষেপে বলে নিই কেমন, নইলে আবার গল্পের দেরি হয়ে যাবে। 

মনে করুন একটা থকথকে জেলিজাতীয় জিনিস। রাসায়নিক দিয়েই বানানো। তবে মানুষের তৈরী কারখানায় নয়। প্রকৃতি নিজেই তৈরী করেছে। এবার মনে করুন সেই জেলি জাতীয় পদার্থটিকে দুটি পাতলা পর্দা দিয়ে মুড়ে রাখা হয়েছে। যাতে ওই জেলি বেরিয়ে আসতে না পারে। এটিই আপাতত ধরে নিন আমাদের কোষ। এবার মনে করুন, ওই পর্দা মোড়া জেলির মধ্যে আরো একটি ছোট সাইজের পর্দা মোড়া জেলি রয়েছে। ওই একই ধরণের ডাবল পর্দা। তা এই ঘরের মধ্যে ঘর কেন? কারণ আছে! ওই ঘরের মধ্যেকার ঘরের ভেতরে আছে অনেক ছোট ছোট বেঁটে মোটা সুতো। এমনি সুতো নয় রীতিমত মাঞ্জা মারা সুতো। একে অন্যের ঘাড়ে উঠে আছে বটে ওই ছোট্ট জায়গায় সবাই মিলে থাকতে হবে তো। কিন্তু ভীষণ পরিপাটি এরা। কেউ কারো সাথে জড়িয়ে পেঁচিয়ে নেই। এই সুতোগুলোর নাম ধরে নিন ক্রোমোসোম (Chromosome) আর এই মাঞ্জা মারা সুতোর ভেতরের আসল সুতোটা হলো গিয়ে আমাদের ডিএনএ (DNA) আর মাঞ্জাটা হলো গিয়ে এই ডিএনএ কে রক্ষা করার (এবং আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার) জন্য কিছু প্রোটিন। তাদের মধ্যে প্রধান ধরণের প্রোটিনগুলোর নাম ধরে নিন হিস্টোন (Histone) আর এই পর্দা ঘেরা ঘরের ভেতর ঘরটি, যেখানে এই ক্রোমোসোমগুলি গুটিসুটি মেরে বসে আছে সেটি হলো গিয়ে নিউক্লিয়াস (Nucleus)। আর নিউক্লিয়াসের বাইরের পর্দা ঘেরা জেলিটি হলো গিয়ে আমাদের কোষের সাইটোপ্লাজম বা সাইটোসল (Cytoplasm/ Cytosol)। 'সাইটো' মানে কোষ। কোষের সল্যুশন তাই সাইটোসল আর কি। তা এখন এই সাইটোসলে অনেক ধরণের জিনিসপত্র ওই থকথকে জেলির মধ্যে আটকে থাকে। আলাদা আলাদা তাদের কাজ, আলাদা আলাদা তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। বিভিন্ন তাদের নাম। তাদের সবার গল্প একদিনে বলা যাবে না। এখন একজনের কথা বলি, সে আবার নিজেও ওরকম ডাবল পর্দা ঘেরা একটা ছোট লম্বাটে গোল জিনিস। সংখ্যায় অনেক। সবাই মিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে সাইটোসলে। বহু বহু বছর আগে আমাদের পৃথিবীর যখন ছোটকাল, তখন নাকি এরা ছিল পুঁচকে এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া। তারা কোনো কারণে প্রাণী কোষে ঢুকে পড়েছিল। আর প্রাণী কোষও কোনো কারণে দেখেছিলো এদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে বের করে দেওয়ার থেকে সাথে রেখে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। অনেক উপকার করে ব্যাটারা। "সেই থেকে রয়ে গেছে।" কোষের কাজকর্ম চালাতে গেলে শক্তি লাগে তো? আপনার খাবার দাবার থেকে সেই শক্তি তৈরী করে এরা প্রধানত। এছাড়াও হাজার একটা কাজ করে এরা। যত দিন যাচ্ছে এই একদা পরজীবী এখন কোষের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই ছোট্ট জিনিসগুলির অপরিমেয় গুরুত্ব বোঝা যাচ্ছে। এদের নাম মাইটোকন্ড্রিয়া (Mitochondria)। এরা খানিক স্বনির্ভরও বটে। নিজের সংখ্যা কোষের মধ্যে নিজেরাই বাড়াতে পারে। মারাত্মক গুরুত্বপূর্ণ অংশ এরা কোষের।  

আজকের গল্পে এই মাইটোকন্ড্রিয়ারই প্রধান ভূমিকা। তাই এই শিবের গীত গাইলাম। তাহলে এবার গল্পে ঢুকে পড়া যাক সরাসরি। আগেই তো বললাম, মাইটোকন্ড্রিয়া আমাদের শরীরে শক্তির জোগান দেয়। অর্থাৎ খাবার থেকে শক্তি (ল্যাবের ভাষায় ATP) তৈরী করে। এখন এই ATP তৈরী করতে গিয়ে তার দরকার পড়ে অক্সিজেনের। অর্থাৎ আমাদের শ্বাসবায়ুর সাথে আমরা খেয়াল না করেই যা টেনে নিই। মাইটোকন্ড্রিয়ার এই অক্সিজেন টেনে নেওয়ার ক্ষমতাকে (Oxygen Consumption Rate, OCR) বেশ কিছু ক্ষেত্রেই মাইটোকন্ড্রিয়ার কর্মক্ষমতা বলে বিবেচনা করা হয়। অন্তত শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে তো বটেই। একটি নির্দিষ্ট সময়ে মাইটোকন্ড্রিয়ার এই OCR অত্যন্ত সুচারুরূপে মাপা সম্ভব। এখন মনে করুন, আপনি যখন শুয়ে-বসে আছেন অর্থাৎ Resting phase এ আছেন তখন আপনার অভ্যন্তরীণ শারীরিক কার্যকলাপ চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্য বা নড়াচড়ার জন্য যতটুকু শক্তি লাগে তাকে তৈরী করতে মাইটোকন্ড্রিয়ার কিছু পরিমাণ অক্সিজেন লাগে। এটিকে মেপে দেখলেন। এটি হলো গিয়ে আপনার Basal OCR, এবার ধরুন, আপনি বেজায় ছোটা-দৌড়া করলেন, জিমে গিয়ে খুব খানিক নড়াচড়া করলেন। তখন আপনার অনেক বেশি শক্তি দরকার। সে শক্তি যোগান দিতে তখন মাইটোকন্ড্রিয়ার অনেক বেশি অক্সিজেনের দরকার পড়ল। সে হু হু করে অক্সিজেন টানতে লাগলো। এবার এই অবস্থায় OCR সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালো। একে নাহয় বলুন Maximal OCR। 

এবার ছোট্ট একটা বিয়োগ অঙ্ক কষতে হবে। এই Maximal OCR থেকে Basal OCR বাদ দিয়ে দিলে কি পড়ে থাকে? যা পড়ে থাকে সেটা হলো, দরকার পড়লে সাধারণ স্থিতাবস্থা থেকে কতটা বেশি অক্সিজেন আপনার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াগুলি টানতে পারে। তাইতো? একে আমরা বলবো রিসার্ভ ক্যাপাসিটি (Reserve Capacity)। 

এখন মনে করুন, কোনো কারণে আপনার শরীরের কোষগুলির মাইটোকন্ড্রিয়ার কর্মক্ষমতা কমে গেল তখন কি হবে? সাধারণ বসে থাকা অবস্থায় যতটুকু শক্তি দরকার সেটি তৈরী করতে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন টেনে নিতে তাদের বিশেষ কোনো অসুবিধা হবে না। কিন্তু হঠাৎ করে খুব বেশি শক্তি দরকার হলে তারা কিন্তু সেই পরিমাণে অক্সিজেন টেনে নিতে পারবে না। এইবারে আগের ফর্মুলা অনুসারে Basal OCR একই রকম থাকলেও Maximal OCR এর পরিমাণ কমে যাবে। তাই তো? তার ফলে আমাদের Reserve Capacity ও কমতে থাকবে। এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি সে উৎপন্ন করতে পারবে না। অর্থাৎ এই রিসার্ভ ক্যাপাসিটির পরিমান মাপলে বোঝা যেতে পারে আপনার মাইটোকন্ড্রিয়া কতটা সুস্থ আছে। এই পর্যন্ত ঠিক আছে তো?

এবার মনে করুন, যদি মাইটোকন্ড্রিয়া অসুস্থ হয়, তবে আপনার শরীরে খাবার থেকে যে পরিমানে শক্তি উৎপন্ন হবার কথা ছিল সেটা হতে পারবে না। মাইটোকন্ড্রিয়া ঠিকঠাকভাবে অক্সিজেন টানতে না পারায়। ফলে আপনার খাবার যেমনকার তেমনই শরীরে জমতে থাকবে। আর শরীর ভাববে, বাহ্ বেশ তো, এর তো তবে শক্তি তৈরীর প্রয়োজন নেই। তাহলে এই খাবার গুলো নিয়ে কি করি? জমিয়েই রাখি বরং পরে কাজে লাগবে। সুতরাং ফ্যাট হিসেবে জমতে শুরু করল। আপনি ভাবলেন, এইরে মোটা হয়ে যাচ্ছি! খাওয়া কমিয়ে দেওয়া যাক। ঝপ করে কোনো বিশেষজ্ঞের সাথে কোনো পরামর্শ না করে, ইন্টারনেট দেখে খাওয়া কমিয়ে দিয়ে বসলেন। শরীর ভাবলো, এই রে? এতো দেখছি দুর্ভিক্ষ গোছের কিছু শুরু হয়েছে বুঝি। শরীরকে তো টিকিয়ে রাখতে হবে। নইলে আকালের বাজারে সব কোষ কলাগুলো না খেতে পেয়ে মরবে তো। এবার সে কি করলো? আপনি যা খাচ্ছেন প্রাণপণে সেসব জমিয়ে যেতে লাগলো। আপনি যতটুকুই খান না কেন মেদ আর কমে না! কি জ্বালা রে বাবা! এবার আপনি প্রাণপণে জিমে গিয়ে ধাঁই-ধাঁই করে ওজন তুলে, পাঁই-পাঁই করে দৌড়ে তিন মাসেই তিরিশ কেজি ওজন কমিয়ে ফেলবেন ঠিক করে বসলেন। এবারেও আপনি কোনো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়াই ইন্টারনেটের গুরুগিরিতে শুরু করে দিলেন। প্রথম দুএকদিন যেতে না যেতেই আপনার হাঁফ ধরছে, বুকে ব্যাথা করছে। চার দিনের দিন পায়ে এমন ব্যাথা করছে যে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। কারণ আপনার পেশিতে তো কোনো শক্তিই তৈরী হচ্ছে না। ব্যায়াম করার উৎসাহ পাবেন কি করে? অক্সিজেন কাজে লাগছে না, বুকে হাঁফ ধরবে না কেন? উপরন্তু জোর করে ক্ষতিগ্রস্ত মাইটোকন্ড্রিয়ার দিয়ে বেশি কাজ করতে গেছেন দৌড়াদৌড়ি করে। ফলে তারা শক্তি তো তৈরী করেইনি কারণ সেখানেই তাদের গলদ রয়েছে, উপরন্তু অতিরিক্ত অব্যবহারযোগ্য অক্সিজেন থেকে তৈরী করে ফেলেছে ভুরি ভুরি Reactive Oxygen Species বা সংক্ষেপে ROS। এ এক বিচ্ছিরি ধরণের জিনিস। সাধারণ অবস্থায় এটি তৈরী হয় অল্প পরিমাণে। আর সেটা অত্যন্ত দরকার শরীরের বহু দরকারি কাজ করতে। কিন্ত প্রয়োজনের চেয়ে এতটুকু বেশি হলেই এই ROS এর মত বিষ আর হয়না শরীরে। আমি এর সম্পর্কে পরে একদিন বলব গুছিয়ে। এর কথা বলতে শুরু করলে থামা যাবে না। এখন এই ROS যত বেশি তৈরী হবে তত আরো বেশি করে মাইটোকন্ড্রিয়াগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে। আর সেই ক্ষতিগ্রস্ত মাইটোকন্ড্রিয়া থেকে তৈরী হবে আরো বেশি বেশি ROS এ এক সাংঘাতিক আত্মঘাতী চক্র। এই অতিরিক্ত ROS শরীর থেকে কমিয়ে ফেলাই মাইটোকন্ড্রিয়াকে সুস্থ রাখার একটা প্রধান উপায়। এটুকু আপাতত বলি। পরে এই নিয়ে বিস্তারিত গপ্প করা যাবেখন। 

সুতরাং, না খাওয়া কমিয়ে, না দৌড় ঝাঁপ করে কিছুতেই মেদ কমছে না। মেদ জমার আরো একশো আটটা কারণ থাকা স্বত্ত্বেও এই মাইটোকন্ড্রিয়া সুস্থ আছে না নেই সেইটি আগে থেকে জানতে পারলে বেশ হয় তাই না? তাহলে আসল সমস্যার একটা নতুন কারণ বোঝা যায়। এই কথাটি বলবো বলেই ওপরের ওই সব Basal OCR, Maximal OCR, Reserve Capacity ইত্যাদি এতসব হাবিজাবি বকলাম। এবার মন করুন এই OCR মাপার মেশিন ক্লিনিকে ক্লিনিকে চলে এলো। আপনি প্রতিমাসে একবার করে মেপে নিলেন আপনার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়া কেমন আছে, ঠিক করে কাজকর্ম করছে কিনা। যেই না দেখলেন Reserve Capacity কমছে অমনি ভাবলেন মোটা হবার সম্ভাবনা বাড়ছে। আপনি অমনি সতর্ক হয়ে গিয়ে এ মাইটোকন্ড্রিয়াকে সুস্থ করার চেষ্টা শুরু করলেন। মানে শরীরের বাড়তি ROS কমিয়ে সঠিক লেভেলে আনার চেষ্টা করতে লাগলেন (কি করে? সেটা পরে বলবখন)। বেশ ভাল না ব্যাপারটা? কিন্তু এসব হতে হতে আরো অনেক বছর। এই সবে কালকেই কনফারেন্স এসে এই গল্প শুনলাম। এসব FDA approved হয়ে ক্লিনিকে ক্লিনিকে আসতে বহু বছর লাগবে এখন। ততক্ষণ সন্ধ্যের খিদেটা ছোলাসেদ্ধ, শশা, পেঁয়াজ, ধনেপাতা, কাঁচালঙ্কা দিয়ে মুড়ি মাখা চলুক বরং। পিৎজ্জা, পাস্তা, এগরোল, মুঠো মুঠো চিনি আর অপরিমেয় তেল গোল্লায় পাঠানো যাক। ভাল ফ্যাট শরীরে আসুক। মাইটোকন্ড্রিয়াকে সুস্থ রাখতেই হবে। কেমন।

আচ্ছা আজ তবে আসি। পরের সপ্তাহে আবার কথা হবে। 
ভাল থাকুন সব্বাই।
অর্পিতা         

Sunday, 9 February 2020

দ্য ক্যাফে - ২

কিছু কিছু দিন ভালো মন্দ মিশিয়ে কেটে যায়। দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুই মগজে কিছুটা ছাপ ফেলবার আগেই কি করে যেন সন্ধ্যে নেমে আসে। খারাপ লাগে, মনে হয় একটা দিন নষ্ট করলাম। কিন্তু তবুও মনস্থির করে কোনো কিছুতে একটানা মন দেওয়া হয়ে ওঠে না। আজ সেরকমই একটা দিন। কাজ হয়নি তা নয়। যা করবো বলে ভেবেছিলাম সমস্তই খাতায় কলমে শেষ করেছি ঠিকই। কিন্তু তবুও সে কাজের কোথাও যেন আমি ছিলাম না। আমার মত অন্য আর একজন যন্ত্রের মত করে যাচ্ছিল। সবচাইতে ব্যাথার কথা যন্ত্রের মত ভেবেও যাচ্ছিলো কি? ওহ যন্ত্র তো আবার নাকি ভাবতে পারে না। আসল কথাটা হলো ভাবার জন্য মাথা ছাড়াও আরও অন্য কিছু একটা লাগে। কি যে লাগে সেটা এই মুহূর্তে লিখে উঠতে পারছিনা। সেটা আপাতত নেই।  তাই বললাম যন্ত্রের মতো ভেবে যাওয়া।

সন্ধ্যে হতে চলেছে। সকলে বাড়ি যাচ্ছে। আমিও চলে যেতে পারি। কাজ নেই আপাতত। কিন্তু তাও যাচ্ছিনা। পনের মিনিট হাঁটলেই ঘরের বিছানায় গড়ানো কে আটকায়? এই সন্ধ্যে পৌনে ছটায় কেমন একটা আকাশ-খাই পাতাল-খাই গোছের খিদে পায় প্রতিদিন। আজও পাচ্ছে। কিন্তু একটুও ইচ্ছে করছে না ক্যাফেটেরিয়া পর্যন্তও এগিয়ে যাই। কিছু কিছু সময় থাকে যখন অপরিসীম মানসিক কুঁড়েমির কাছে খিদে-তেষ্টা সব হার মানে। ল্যাবের চেয়ারটা অসহ্য লাগছিলো। ব্যাগ গুটিয়ে নিচের কফিশপের সামনে এসে বসেছি। অন্ধকার থাকতে এরা দোকান খোলে। তাই সাড়ে চারটে বাজলেই ঝাঁপ বন্ধ করে দেয়। তবে পরিষ্কার করা, সারাদিনের হিসেবে নিকেশ করার জন্য আরও কিছু সময় এদের থাকতে হয়। আমি যখন সাড়ে পাঁচটা নাগাদ এলাম এখানে তখনও দুজন ছিল। আলো জ্বালিয়ে কিসব খুটুর খাটুর করছিলো ভেতরে। তারপর চলে গেল। আপাতত অন্ধকার কাউন্টার। তবে এই সামনের জায়গাটা কখনো অন্ধকার হয়না। হাসপাতালের ভেতরের কফিশপে বসার এই মজা। আমার পাশের টেবিলেই একজন বসে ল্যাপটপে কিছু একটা শো দেখছেন। মাঝে মাঝে খুকখুক করে হাসছেন। বয়স্ক মানুষ। হয়তো কেউ ভর্তি আছে এখানে। বা অন্য কোনো কারণে অপেক্ষা করছেন এখানে বসে। টেবিলে একটা খালি হয়ে যাওয়া হাফ স্যান্ডউইচ এর প্যাকেট আর দুটো ঠান্ডা ফুল ফ্যাট দুধের প্লাস্টিকের বোতল। মনে হয় অনেকক্ষন বসে আছেন এখানে। একবার উঠে গিয়ে খালি দুধের বোতলে জল ভরে নিয়ে আসবেন বলে ড্রিঙ্কস ডিস্পেন্সারটার সামনে গেলেন। কিন্তু ততক্ষনে ওরা কফির কাউন্টার বন্ধ করে দিয়েছে বলে সে মেশিনটাও আজ রাতের মতো মৃত হয়ে পড়ে রয়েছে। আমার পিঠের দিকের হলওয়েটা দিয়ে গেলেই খাবার জলের কল। বলে দিলেই হতো। কেজানে কেন বললাম না? মাঝে মাঝে কি যে হয়! কারো সাথে কথা বলতে হবে মনে হলে গর্তে গিয়ে সেঁধুতে ইচ্ছে করে। 'সেঁধুতে' শব্দটায় মনে পড়লো, জ্যেঠুমনির কাছে কোনো এক রোগী এসেছিলেন। তাঁকে পরীক্ষা করার সময় জিভ দেখাতে বলেছে জ্যেঠুমনি। পরীক্ষা শেষ। জ্যেঠুমনি তাঁকে বলছে-"জিভটা ঢুকিয়ে নাও।" কিন্তু জিভ আর ভেতরে ঢোকাচ্ছেন না তিনি। শেষে তাঁর সাথে যিনি এসেছিলেন তিনি বললেন-"জিভটা সাঁধ করিয়ে নাও।" তখন জিভ ঢুকলো ভেতরে। গ্রামের মানুষের প্রিয় ডাক্তারবাবু সেদিন নতুন শব্দ ব্যবহার করতে শিখেছিলেন। আরো অনেক গল্পের সাথে সাথে এই গল্পটাও অনেকবার শুনেছি জ্যেঠুমনির কাছে। খুব মজা করে বলত। অনেকবার শোনা থাকা স্বত্বেও প্রতিবারই খুব মজা করে শুনতাম। গল্পগুলো নিজেকেই মনে রাখতে হবে এবার। আর মনে করিয়ে দেওয়ার লোক নেই।   

পাশের টেবিলের মানুষটির অপেক্ষা শেষ হলো। ল্যাপটপ গুটিয়ে, খালি প্যাকেট, বোতলগুলো ট্র্যাশ ক্যানে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। চেয়ারের পিঠ থেকে জ্যাকেটটা নিয়ে গায়ে গলিয়ে মাথায় একটা সাধারণ টুপী পরে নিলেন। বাইরে এখন দু ডিগ্রি সেলসিয়াস। সাথে হাওয়া। এই ঠান্ডায় এই টুপিতে কিকরে হবে? অবশ্য আমার ভারতীয় মন এসব ভাবছে। উনি এখানকার মানুষ এই ঠান্ডায় ওঁনার বিশেষ কিছু মনে হবে না হয়ত। আমি ওঁনার বয়সটাও যোগ করছি এই হিসেবের মধ্যে। মৃদু পায়ে বেরিয়ে গেলেন মানুষটি। 

বাইরে এতক্ষনে অন্ধকার হয়ে গেছে। 






          

Wednesday, 5 February 2020

দ্যা ক্যাফে -১

একটু দূর থেকে কিছু বা কাউকে নজর করার মধ্যে বেশ একটা নেশা আছে। যেমন দুজন মানুষের মধ্যে সম্পর্ক। ধরা যাক, একটা কফির দোকান। এককাপ কফি নিয়ে বুঁদ হয়ে বসেছিলাম। আশেপাশে সামনে দূরে বেশ কিছু মানুষ। কেউ কফি খাচ্ছেন, কেউ অন্য কিছু করছেন। কেউ কারো সাথে কথা বলছেন, কেউ একা নিজের সাথে নিজেকে সঙ্গ দিচ্ছেন। এদের প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের নিশ্চয়ই একটা সম্পর্ক আছে। আছেই। এই যে আমি এককাপ কফির সাথে বসে আছি, আমার সাথে এই চেয়ার টেবিল বা কাগজের পাতলা কফি কাপটার কি কোনো সম্পর্ক নেই নাকি? হলোই বা ভেতরের তরলটা শেষ হওয়া পর্যন্ত আমাদের সম্পর্ক, কিন্তু শেষ না হওয়া পর্যন্ত তো ও আমায় সঙ্গ দিচ্ছে। আমি ওকে নিয়ে দেখছি আর চারপাশটার সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিতে চাইছি। পারছি না ঠিক করে। সব কিছু কি আর পারা যায়?   

একটু দূরে হাসপাতালের সদর দরজার সামনের বৈঠকখানা। আমরা অবশ্য লবি বলি। লবির বাংলা কি বৈঠকখানা হতে পারে? না বোধহয়। বৈঠকখানার মধ্যে একটা সম্পন্ন গৃহস্থালীর আতিথেয়তার গন্ধ থাকে। লবিতে তার লেশমাত্র নেই। হাসপাতালের লবিতে থাকে উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা। দুটি শব্দ এক হতে পারে না। আমার সামনে লবি, বাঁয়ে রেস্তোরাঁ। এই জায়গাটিতে অনেকসময়ই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সুরের আয়োজন করেন। কখনো পিয়ানো, কখনো ভায়োলিন, কখনো অন্য কিছু। সুর যে আমাদের উদ্বেগ কমায়, সুর যে আমাদের মধ্যে জাঁকিয়ে বসে থাকা অযথা অসুখকে নরম করে, সুর যে আমাদের জমে থাকা কান্নাকে বাইরে বের করে এনে আমাদের সুস্থ করে, স্থিরচিত্তে চিন্তা করার শক্তি যোগায় সেকথা আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রমাণিত। যতই মিউসিক থেরাপিকে অল্টারনেটিভ থেরাপির তকমা দিয়ে তাকে ব্রাত্য করে রাখা হোক না কেন, নাকউঁচু আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ জায়গা যে আসতে চলেছে অদূর ভবিষ্যতে, একথা সত্যি। এই আয়োজন তারই অঙ্গ। মূলত রোগীর বাড়ীর লোকজনকে দুঃসহ দিনে সুস্থ রাখতে এই আয়োজন। পাগল করা ভায়োলিনের সুরে হাসপাতালের এই কফিশপে বসে রোগীর বাড়ির লোককে খাওয়া ফেলে হাউহাউ করে কাঁদতে দেখেছি। আমি অসম্পূর্ন মানুষ। জানিনা এরকম জায়গায় কি বলে তাঁকে সান্ত্বনা দিতে হয়। দেওয়া আদৌ যায় কিনা তাই-ই জানি না। তার কাঁধে হাত রাখতে পারিনি। তার বদলে অপ্রস্তুত হয়ে কফির কাপ হাতে আস্তে আস্তে উঠে চলে গেছি। 

রেস্তোরাঁর সামনের জায়গাটায় দেখেছিলাম একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা হার্প বাজাচ্ছিলেন। এর আগে আমি হার্প দেখিনি কখনও। নামটাও জানতাম না। ছবিতে দেখেছিলাম। আমার কেমন যেন একটা ধারণা ছিল এই তারযন্ত্রটির বর্তমানে আর কোনো অস্তিত্ব নেই। এসব ইতিহাসের যুগে চলত বুঝি। কত কিছুই তো আর নেই। আর চলে না। আমরা খুঁজিও না তাই। কেমন একটা রূপকথা রূপকথা ব্যাপার আছে বিশালাকায় যন্ত্রটির মধ্যে। এমনই একদিন দিনের মাঝে কফি খেতে এসে আমার সে ধারণা ভেঙে গিয়েছিলো। কফি হাতে হাঁ করে শুনছিলাম। বলা ভালো গিলছিলাম। কি রাজকীয় ভঙ্গিমায় অনায়াসে বাজিয়ে চলেছেন ওই রূপকথার রূপসী তারযন্ত্রটিকে। মুখে মৃদু হাসি। সেদিন কেন জানিনা খুব একটা কেউ শুনছিলো না ওঁনার বাজনা। খুব একটা জনপ্রিয় বাজনা নয় বলেই কি? কে জানে! কেমন যেন মন খারাপ লাগলো।

এমন একটা বিশাল আল্পনার মতন যন্ত্র। দেখলেই মনে হয় সমুদ্দুরের তলা থেকে উঠে আসা মৎস্যরাজকন্যার হাতের বাজনা বুঝি। তার সামনে অবনত মস্তকে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। নির্বাক শ্রোতা হওয়া যায়। তার ঢেউ এর মতন শারীরিক বিভঙ্গের রূপতাপস হওয়া যায়। কিন্তু তাকে অশ্রুত রেখে এমন অবমাননা করা যায় কি? 

   

Friday, 31 January 2020

একটি পথ এবং একটি অনুভব-২

প্রথম পর্বের পর

রোদ বাড়ার সাথে সাথে গরম বাড়তে লাগলো। আমরা নিয়মিত হাঁটিয়ে নই। আমাদের গরম জামাকাপড় আস্তে আস্তে বোঝা হয়ে যেতে লাগলো। পরতের পর পরত খুলতে খুলতে এগোচ্ছিলাম। অনেক জায়গায় গোড়ালির ওপর পর্যন্ত তুষারে ডুবে যাচ্ছে। পথের বর্ণনা বিশেষ দেব না। ছবি থেকে কিছুটা আন্দাজ পাবেন। যেটা বলব বলে বসেছি, সেটা পথের বর্ণনা নয়। অন্য কিছু। যেকথাটা আগের পর্বের প্রথমে বলার চেষ্টা করছিলাম, সেটি হলো, কিছুদিন ধরে কোনো বিষয়ে খানিক উৎসাহ জাগলে সে সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে এমনিই খানিক উৎসাহ জাগে। উৎসাহের চোটে কিছু প্রস্তুতি নিশ্চয়ই হয় কিন্তু তা যথেষ্ট কিনা সেটা আসল রঙ্গমঞ্চ ছাড়া বোঝার উপায় নেই। 

আমরা পিচ্ছিল বরফঢাকা পথে লাঠি আর জুতোর ট্রাকশনের দৌলতে মোটামুটি সহজেই এগোচ্ছিলাম। তবে যাঁরা ট্রাকশন ছাড়া এগোচ্ছিলেন তাঁদের বেশ কিছু ক্ষেত্রেই অসুবিধা হচ্ছিলো বুঝতে পারছিলাম। আবার নাতিকে পিঠের ব্যাগে বসিয়ে দাদু দৃপ্ত পায়ে আমাদের ছাড়িয়ে উঠে যাচ্ছিলেন এও দেখছিলাম। আর ভাবছিলাম, আমাদের মা বাবারা কেবলই নিজেদের অপারগ ভাবেন। এতটা না পারলেও অনেক কিছুই তাঁরা পারবেন। দোষটা আমাদেরই, আমরাই তাঁদের আলোটা দেখাতে পারিনা। 

পায়ে পায়ে অনেকটা উঁচুতে উঠে এসেছিলাম। বেশ চড়াই। নিচে ভার্জিন রিভারকে প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। দুই পাহাড়ের মধ্যে সাদা তুষারময় একটা অবতল ভূমিতে কোথায় কে জানে মুখ লুকিয়ে বয়ে চলেছে। এতক্ষন রাস্তায় কোথাও ছায়া ছিল না। গরমকালে যাঁরা আসেন, তাঁদের জন্য এই জায়গাটা উটার রোদ্দুরে এতখানি চড়াই ভেঙে উঠে আসার পর মরুভূমি পেরিয়ে আসার মতোই ব্যাপার। রোদের রাজ্য পেরিয়ে পাহাড়ি রাস্তা বাঁক নিলো। একটা লোহার ছোট্ট ব্রিজ পেরিয়ে সামনে পাহাড়টার পিছনে এসে পড়লাম। এ জায়গাটাকে এই রাস্তার মরুদ্যান বলে বলে শুনেছি। কারণটা আগেই বললাম। এখন থেকে বেশ খানিকটা রাস্তা সমতল। সরু রাস্তা কিন্তু চড়াই নেই। এবার আমাদের এই ডানদিকের পাহাড়টার গা বেয়ে পিছনে পৌঁছে, উত্তরদিক দিয়ে পর পর জিগজ্যাগ চড়াই রাস্তা পেরিয়ে পাহাড়টার মাথায় পৌঁছাতে হবে। সমতল রাস্তাটা সহজেই পেরিয়ে গেলাম। এবার চড়াইটা ভাঙতে বেশ কষ্ট হল। মাঝে মাঝে এক-দু মিনিট দাঁড়িয়ে পড়ছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উঠে পড়লাম ওপরে। উঠেই চোখ ঝলসে গেল। এতক্ষন পাহাড়ের গায়ে এত পুরু বরফ ছিল না।  কিন্তু এখানে পাহাড়ের মাথায় পুরু তুষারের আস্তরণ। কখনো কোনো জায়গায় হাঁটু ছুঁই ছুঁই বরফ। চকচকে সূর্য্যের আলো সাদা তুষারে পড়ে শতগুনে তার ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়ে চারিদিক ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। প্রাণ জুড়িয়ে গেল। একসাথে এতটা চড়াই ভাঙার পর জায়ণের তুষার মোড়া রূপ দেখে কোনো কষ্ট অনুভূত হচ্ছিলো না। 

এই জায়গাটা আসলে তিনটি পাহাড়ের সঙ্গমস্থল। একটি হলো আমরা যে পাহাড়ের পিছন দিক দিয়ে হেঁটে তারপর উত্তরদিকে দিয়ে চড়াই বেয়ে ওপরে উঠেছি। দ্বিতীয়টা হলো সামনে বাঁদিকের চড়াইটা।  এই পাহাড়ের গা দিয়ে ওয়েস্ট রিম ট্রেলটা শুরু। দুদিনের পথ। আর তৃতীয়টি হলো Angel's Landing. যেখানে উঠবো বলেই এ যাত্রা আমাদের জায়ণ অভিযান। সামনের চোখ ধাঁধানো আলোর প্রান্তরটা পেরিয়ে ওই যে সামনে খাড়াই দাঁড়িয়ে আছে Angel's Landing. দুপাশ বেমালুম চাঁছাপোঁছা। বেয়াক্কেলের মত সরু তার প্রস্থ। আর এই সরু গা বরাবর লোহার মোটা চেন লাগানো। সেই ধরে ধরে উঠতে হবে বাকি রাস্তাটা। নইলে সিধে নিচের ভার্জিন রিভারের উপত্যকায় সলিল সমাধি। একসাথে একটিই পা ফেলার জায়গা। সুতরাং এখন থেকে বাহুল্যের কোনো জায়গা নেই। হাঁটতে হাঁটতে গরমের জন্য একটা জ্যাকেট খুলে ফেলেছিলাম। চেনের সামনে পর্যন্ত পৌঁছে সেটাই পেতে পা ছড়িয়ে বসে পড়লাম। এতক্ষন বসার জন্য এতটা জায়গা ছিল না। সরু রাস্তা বেয়ে কেবল উঠে এসেছি। অনেকেই বসে আছেন। আসলে Angel's Landing এ ওঠা শুরু করার আগে একটু শক্তি সঞ্চয় করে নিচ্ছেন বা বলা ভালো নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছেন। আমরাও বসলাম। ব্যাগ থেকে আপেল, কলা, শুকনো ফল বের করে খেলাম। জল খেয়ে, মন ভরে চারিপাশের ছবি তুলে ক্যামেরা, মোবাইল সব বন্ধ করে পিঠের ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলাম। কারণ একদম ওপরে পৌঁছাবার আগে আর ছবি তোলার জন্য দুটো হাত খালি থাকবে না। হাঁটার লাঠি দুটোও ভাঁজ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে দেওয়া গেলো। এদের আপাতত কোনো কাজ নেই। তারপর দুজনে দুজনকে "হবেই হবে" বলে উৎসাহ দিয়ে Angel's Landing এর চড়াই এর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। 

আমাদের বাঁহাতে চেন। আমাদের একমাত্র অবলম্বন এই রাস্তায়। এই চেনের ভরসাতেই শয়ে শয়ে লোক Angel's Landing এ ওঠেন। আমরাও এসেছি। কিন্তু সমস্যাটা অন্য। সমস্যাটা ওই পর্বতারোহীর সংখ্যায়। শয়ে শয়ে মানুষ যদি ওঠেন এবং নামেন ওই সরু পথ বেয়ে, তাহলে আপনি যখন উঠবেন তখন একসাথে অন্তত পক্ষে দশ জন উঠবেন এবং দশজন নামবেন। যে পথে আগেই বলছি একটার বেশি দুটি পা একসাথে ফেলার জায়গা নেই, সেখানে ওই দশ-দশ কুড়ি জনের ওই জটলাটা ঠিক কি দাঁড়াবে আশা করি আন্দাজ করতে পারছেন। উপরন্তু এই কুড়ি জনের প্রত্যেকের অন্তত একটি হাত থাকবে চেনে ধরা। নইলে গন্ডোগোল। এখন এসব ক্ষেত্রে মানুষজনকে ধৈর্য্যশীল এবং সভ্য হতেই হয়। এতো আর হাওড়া স্টেশন নয়, যে কারণ না থাকলেও, স্রেফ অভ্যাস বলে হন হন করে হাঁটতে গিয়ে অন্যের পা মাড়িয়ে, চশমাতে ধাক্কা মেরে বেরিয়ে যাবেন। একজন অন্যেকে উঠতে বা নামতে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করতেই হয়। নইলে ওই সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পের বাসের সামনে ভেড়ার পালের মত অবস্থা হবে। আরো একটা সমস্যা আছে এই মুহূর্তে। সেটি হলো বরফ। বরফে এই ট্রেক করা আমাদের সাধ্যের মধ্যে নয়। কিন্তু গতকালের সারাদিনভর তুষারপাত আমাদের সামনে সেই চ্যালেঞ্জটা খাড়া করেছে। কোথায় পা ফেলবো? পুরোটাই তো সাদা ঝুরো বরফ। এই ট্রেলের যে ছবি বা ভিডিও দেখেছি আগে, তাতে লাল পাথরের গায়ে মানুষ জনের পায়ে পায়ে রীতিমত ধাপ তৈরী হয়ে গেছে দেখেছিলাম। সেসবে পা দিয়ে উঠে যাওয়া সোজা। কিন্তু সেসব তো এখন হাঁটু পর্যন্ত বরফের তলায়। আন্দাজে পা ফেলতে হবে। আর ভুল জায়গায় পা পড়লে....। অর্থাৎ, একটা পা ফেলে সেই পা টি যতক্ষণ না শক্ত পাথরে পৌঁছোচ্ছে ততক্ষন পরের পা গেঁথে রাখতে হবে। আর হাতের ওই জীওনকাঠি চেনটিকে ছাড়লে চলবে না। মনে হচ্ছিলো হবে না। কিন্তু এতটা এসে চেষ্টা না করেই ফিরে যাবো? 

বাঁহাতে চেনটাকে শক্ত করে ধরে পা বাড়ালাম। পিছনে পিনাকী। সামনে জনাতিনেক মেয়ে। একসাথে কোনো এক ইউনিভার্সিটি থেকে এসেছে। ছোট ছোট জিগজ্যাগ বাঁক। আর চেন একবার বাঁদিকে তো পরের বাঁকেই ডানদিকে। প্রথম বাঁক পেরোলাম। দ্বিতীয় বাঁকে এসেই আটকালাম। সামনের বাঁকের চেনটা ডানদিকে। আর সেটা একটু দূরে। এই বাঁকের বাঁহাতের চেনটা ধরা অবস্থায় ডানহাত বাড়িয়ে পরের চেনটা ধরা যাচ্ছে না। কারণটা আমার উচ্চতা। আমার হাত অতটা লম্বা নয়। শেষে কিছুটা লাফিয়েই ধরে ফেললাম চেনটা। ধরার পরে বেশ কনফিডেন্স বাড়লো। তরতর করে পরের বাঁকটা পর্যন্ত উঠে গেলাম। এবারে সামনের চেনটা ধরে কিছুটা সমতল, চড়াই নেই। মনে হচ্ছে আস্তে আস্তে সময় নিয়ে ধীরে ধীরে এগোলে এভাবে বেশ অনেকটাই যেতে পারব। পিছনেই পিনাকীর উঠে আসার কথা আমার মত করেই। কিন্তু পিছনে তাকিয়ে দেখি পিনাকী নেই। সে অনেকটা নিচে দ্বিতীয় বাঁক থেকে তৃতীয় বাঁকের জায়গাটায় আটকে আছে। এটা আমি ভাবিনি। জীববিজ্ঞানের নিয়মেই আমার চাইতে পিনাকীর শারীরিক শক্তি বেশি। আমার চাইতে উচ্চতা প্রায় একফুট বেশি। তাহলে ও বাঁ হাতের চেন ছেড়ে ডানহাতের চেনটা ধরতে পারলো না কেন? চেষ্টা করছে। পারছে না। ওর পেছনে আরো পাঁচ-সাতজন দাঁড়িয়ে আছে চেন ধরে। ও না উঠলে তারাও উঠতে পারবে না। আমি কিছুটা নেমে এলাম। কিন্তু হাত ধরে টেনে তুলে আনা যাবে না এই ঢালু বরফে। ওকে বলছি একটু লাফিয়ে আমার মত করে চেনটা ধরতে। ও লাফাতে ভয় পাচ্ছে। কারণ ওর পিঠের ব্যাগ। আমার পিঠে একটা পাতলা ব্যাগ তাতে একটি ছোট্ট জলের বোতল, কিছু খাবার আর মোবাইল। কিন্তু পিনাকীর পিঠে ক্যামেরা এবং তার সরঞ্জাম বাবদ একটি মোটামুটি বড় ব্যাগ। তার ওজনের জন্য পিনাকী লাফিয়ে চেনটা ধরতে পারছে না। কিছুটা ভয়ও পাচ্ছে। পাওয়াটা স্বাভাবিক। বরফে কোথায় যে পা ফেলছি জানি না। ও বেচারা কনফিডেন্সটাই পাচ্ছে না। আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম যে নেমে যাব। এপথে আর সব কিছু না হলেও চলে কিন্তু নিজের প্রতি বিশ্বাস না থাকলে সে মানুষটাকে জোর করে ওপরে নিয়ে যাওয়া চরম বোকামি। অতবড় ব্যাগ নিয়ে এপথে আসা আর একটা মারাত্মক বোকামি। আর ওই ব্যাগ নিচে রেখে যাওয়া যাবে না। সুতরাং........। 

আমি অনেকটা উঁচু থেকে ওকে দেখছি। কি অদ্ভুত অসহায় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে না এই মানুষটা প্রচন্ড ধৈর্য্য ধরে যেকোনো টেকনিক্যাল ট্রাবলশুট করতে পারে। মনে হচ্ছে না এই মানুষটা অসাধারণ সব ভিডিও এডিটিং করেও তাতে সামান্য খুঁত ঠিক করতে পারছে না বলে নির্মমভাবে তাকে ডিলিট করে দিতে পারে। মনে হচ্ছে না এই মানুষটাই সামান্য একটা বুকলেট, যা কেউ দুবার হাতে নিয়ে দেখবে না, তাকে নিখুঁত করে বানাতে সারাদিন ল্যাবে কাজ করার পর সারারাত জাগতে পারে। কেবল তার সৃষ্টিকে নিখুঁত করবে বলে। আমার চাইতে অনেক কিছুই এই মানুষটা অনেক ভালো করতে পারে, কিন্তু এই ডানহাতের চেনটা সে ধরার সাহস আর জোর পাচ্ছে না। কি অসহায় চোখ! আমায় বললো, "তুই উঠে যা। আমি নিচে অপেক্ষা করছি।" ওর চোখ সোজা আমার দিকে। আর সে ভাষা আমি জানি। ও ভাবছে-ওর জন্য আমি উঠতে পারছি না। আমি ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবারের মত Angel's landing থাক। পরে কখনও হবে। এতটা পথ একসাথে এসে বাকিটা একা যাওয়া যায়না। যেতে নেই। আমায় নামতে হবে। আমাদের নামতে হবে।

নামব বললেই তো নামা সহজ নয়! এত জনের পায়ে পায়ে পথ পিচ্ছিল হয়েছে। ওঠার সময় অসুবিধা হয় না। কিন্তু নামার সময় প্রায় পিছলেই নামতে হচ্ছে। বসে পড়লাম। বরফে পিছলে হুড়মুড় করে পিনাকীর কাছ পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম। ওখানে ততক্ষনে জটলা তৈরী হয় গেছে একটা। এর হাতের তলা দিয়ে ওর মাথার পাশ দিয়ে চেন আঁকড়ে ধরে, কিছুটা হেঁটে, কিছুটা পিছলে অবশেষে নেমে এলাম দুজনে।

পিনাকী একদম চুপ করে গেছে। ওর মন খারাপ আমার চেয়েও বেশি। কারণ ও ভাবছে-ওর জন্য আমি যেতে পারলাম না। সত্যিই হয়ত আরও কিছুটা উঠতে আমি পারতাম। অনেকেই কিছুটা উঠে তারপর নেমে আসছে। হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র একদম ওপর পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে। আমি ভাবিনি যে ওপর অবধি পৌঁছাবো। কিন্তু আরো কিছুটা যেতে পারব এই বিশ্বাস ছিল। তিন চার মাস ধরে ফুসফুসের জোর বাড়িয়েছি এটার জন্যই। হিমালয়ের আরও কত কত কঠিন পথে যাচ্ছেন আমাদের দেশের কত মানুষ। আর আমি এই ছোট্ট একটা পাহাড়ের মাথায় উঠতে পারলাম না! সুতরাং মনটা যে দমে আছে সেকথা সত্যি।

কিন্তু যেকথা পিনাকী জানে না সেটি হলো, এই আপাত পরাজয় আমায় মারাত্মক দুটি কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। এক, আমি এই Angel's landing এর চড়াইটাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিইনি। তাই সেও আমায় তার বুকে জায়গা দেয়নি। আমাদের নেওয়া প্রস্তুতি এর জন্য যথার্থ ছিল না। নইলে এতবড় ব্যাগ নিয়ে আসার মত ভুল আমরা করতাম না। প্রথমেই যে বলছিলাম না, "প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি" -র কথা এই "প্রয়োজনীয়" কথাটির যথার্থ মান বিচার করাটাতেই আমাদের গোড়ায় গলদ ছিল। আমাদের আবার আসতে গেলে 'সত্যিকারের' প্রস্তুতি নিয়ে তবেই আসতে হবে।
আর দুই, সামনে এগিয়ে যাবার সুযোগ এবং অনুমতি থাকলেই সবসময় সামনে এগিয়ে যেতে নেই। টিমের বাকি সদস্যও যতক্ষন না সেই অবস্থায় এসে পৌঁছাচ্ছে ততক্ষন অপেক্ষা করার, ফিরে আসার ধৈর্য্য অন্তত আমার আছে। এটা কি পরাজয় হলো তবে? হিমালয়ের দেশের মেয়েকে Angel's landing পরাজিত করবে এমন সাধ্যি কি তার আছে? তার সর্বোচ্চ উচ্চতায় উঠে সেখান থেকে চারিদিক দেখতে পারিনি ঠিকই তবে পরবর্তী ক্ষেত্রে যেকোনো কাজে 'যথার্থ প্রস্তুতি' আর প্রয়োজন পড়লে পিছিয়ে আসার অমূল্য এক অনুভব সে দিয়েছে আমায়।

নিচে নেমে ওয়েস্ট রিম ট্রেলের শুরুর জায়গাটায় উঠে Angel's landing এর দিকে তাকিয়েছিলাম। রোদে তাকানো যাচ্ছে না ভালো করে। সরু পথটা দেখা যাচ্ছে না ভালো করে।  কালো কালো কিছু জীব নড়াচড়া করছে সাদা তুষারের মাঝে। ওরা মানুষ, আমাদের মত। কেউ উঠবে, কেউ পারবে না আমাদের মত। কিন্তু সকলকেই Angel's landing কিছু না কিছু বলবে। সেকথা শুনতে পাওয়াটাই বোধহয় জয়। মনে গেঁথে নেওয়াটাই ভিক্ট্রি। এই একান্ত কানাকানিটুকু শুনতে পাবার লোভেই বার বার পাহাড়-নদী-জঙ্গল ভেঙে হাঁটা। ঝরাপাতায়, কনকনে তুষারে, মাতাল সমুদ্রের হাওয়ায় বুক পেতে থেবড়ে বসে থাকা। একজন্মেই নিযুত জন্মের খিদে মিটিয়ে নেবার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা।


(শেষ)
            

Monday, 27 January 2020

একটি পথ এবং একটি অনুভব-১

কিছু কিছু সময় পরাজয় প্রয়োজন। তাতে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে মিথ্যে ধারণা গুলোর একটা হিল্লে হয়। আর মাথা পরিষ্কার হলে পরাজয়ের ক্ষোভ মিটিয়ে, প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহ করে, ফের লক্ষ্য স্থির করে এগিয়ে যাবার খিদে জাগে মনে। বললাম বটে- "প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহ করে", কিন্তু এই 'প্রয়োজনীয়' কথাটিই ভারী মারাত্মক। কতটা প্রস্তুতি যে ঠিক 'প্রয়োজন', সেটি আন্দাজ করে ওঠা দুস্কর হয়ে পড়ে। 
কোনো একটি জায়গায় পড়েছিলাম, "Getting better isn't easy. There are no shortcuts. No cheat codes, No quick fixes. It's only work." 
অল্প একটু চেষ্টায় নিজেকে একটু ঠেলে তুলতে পারলেই মনে হয়-এই তো বেশ খানিক পথে এসেছি  বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু তাতে অনেকটা পথ হাঁটা গেলেও সর্বদা শেষ রক্ষা হয়না বোধহয়। তবে আরো একটা বিষয় বারংবার দেখেছি যে খুব খানিক চেষ্টা করলে কোনো না কোনো ভাবে শেষ মুহূর্তে অবিশ্বাস্যভাবে সাহায্য এসে যায়। কি করে জানিনা। 

গেল নভেম্বরের কোনো এক দুপুরে আমরা ভরপুর তুষারপাতের মধ্যে উটা -র জায়ণ ন্যাশন্যাল পার্কে এসে পৌঁছেছিলাম। জায়ণের উত্তরদ্বার দিয়ে জায়ণে ঢোকার একটা অসাধারণ সুবিধা আছে। সেটি হলো, পথটি মারাত্মক রকম সুন্দর। কিন্তু অসুবিধাটি হচ্ছে- যদি কোনো কারণে রাস্তাটি বন্ধ থাকে তবে বেশ অনেকটা পথ মানে প্রায় আড়াই ঘন্টা উজিয়ে এসে তবে ঠিকঠাক লোকালয় পাওয়া যাবে থাকা বা পেট্রোল নেবার জন্য। শীতের তুষারপাতের জন্য অনেকসময়ই এই পথটি বন্ধ থাকে।সুতরাং এই পথে পা বাড়াবার আগে আমরা খোঁজ নিয়েছিলাম যে পথটি খোলা কিনা। খোলাই ছিল, কিন্তু দিনের শুরুতে চকচকে রোদ্দুর মাখা আকাশের নিচে চলতে শুরু করে বেলা বাড়ার সাথে সাথে যতক্ষণে আমরা জায়ণের উত্তরদ্বারে গিয়ে পৌঁছলাম, ততক্ষনে অবিশ্রান্ত তুষারপাতে দুধসাদা চারিধার। এবং জায়ণের উত্তরদ্বার ঠিক বন্ধ হবো হবো। রাস্তা পরিষ্কার না করে পর্যটকদের গাড়িকে যেতে দেবে না। তাতে বিপদ হতে পারে। বেশ কয়েকটা গাড়ির জটলা গেটের সামনে। আর একটা ইলেক্ট্রনিক বোর্ডে ঝলমল করেছে লেখা "Road closed due to heavy snowfall." অনেক দূর থেকেই পড়া যাচ্ছে। তবুও আশায় আশায় সামনে এগোলাম। এতগুলো গাড়ি কি করছে তবে রাস্তা বন্ধ যদি? ঢুকতেই একজন ফ্লুরোসেন্ট রঙের জ্যাকেট পরা মানুষ এসে জিজ্ঞাসা করলেন আমরা ভেতরে যেতে চাই কিনা। সে আর বলতে? সমস্বরে "হ্যাঁ" বলতেই ভগবানের দূত বললেন, "এস তবে, আমার গাড়ির পেছনে পেছনে। আমরা দশটা গাড়িকে ছাড়ছি। এরপর আজকের জন্য রাস্তা বন্ধ।" ভদ্রলোক রেঞ্জার। রাস্তা পরিষ্কার হবার খবর পেয়ে শেষ দশটা গাড়িকে এস্কর্ট করে রাস্তাটুকু পার করে দেবেন। এটি তাঁর কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। আর আমরা সেই সাকুল্যে দশটি গাড়ির লাইনের নয় নম্বর গাড়িটি। আমাদের পেছনেই একটি গাড়ি এসে ঢুকেছিলো আর পেছনের গেটটি সেদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। অর্থাৎ আর পাঁচটি মিনিট দেরি হলে, বা আমরা ছবি তুলতে দাঁড়িয়ে গেলে সেদিনের জন্য আমাদের এই রাস্তা বন্ধ হয়ে যেত। আর আমাদের সেদিনের রাতের আস্তানায় পৌঁছাতে গেলে পিছন ফিরে আরও অন্তত তিনঘন্টার রাস্তা যেতে হতো। 

তারপর আর কি? রেঞ্জারের গাড়ির পেছনে পেছনে দশটি গাড়ি গুড়গুড় করে সেই ভয়ঙ্কর সুন্দর রাস্তাটি ভয়ে এবং বিস্ময়ে আস্তে আস্তে পার হয়েছিলুম সেইদিন। তাই বলছিলাম আর কি যে খুব করে চাইলে আর চেষ্টা করলে শেষ মুহূর্তে একটা সহায় জুটেই  যায়। 

সেদিন আমরা জায়ণের কিছু জায়গা দেখে রাতের আস্তানায় ফিরে গিয়েছিলাম। এই রাস্তা খারাপ থাকার জন্য আমাদের সেদিনের ঘোরার সময় এবং তালিকা থেকে কিছু কাটছাঁট করতে হয়েছিল। তাতে আমাদের বিশেষ ক্ষোভ ছিল না কারণ আমাদের জায়ণ ভ্রমণের প্রথম এবং প্রধান আকর্ষণ ছিল 'Angel's landing'. অর্থাৎ 'Angel's landing' নামের একটি অর্ধচন্দ্রাকৃতি পাহাড়ের মাথায় চড়া। নিয়মিত পর্বতারোহন করেন যাঁরা তাদের কাছে এটি হয়তো শীতের রোদে পিঠ দিয়ে ধর্মতলায় ঘুরে বেড়ানোর মতোই মনে হতে পারে কিন্তু আমাদের মতন নব্য এবং শখের হাঁটিয়েদের পক্ষে এটি বিশেষ সহজ সাধ্য নয়। বিশেষত আগের দিনের ঐরকম তুষারপাতের পর। যাই হোক, আমরা ভোর চারটেয় বেরোলাম এবং জায়ণের টুরিস্ট ইনফরমেশন সেন্টারে পৌঁছে গেলাম পাঁচটায়। এখান থেকেই জায়ণের ভেতরে যাবার বাস ছাড়বে। তখনও অন্ধকার। আমাদের আগে দুজনমাত্র পৌঁছেছেন। বাসস্ট্যান্ডে বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে আলো ফুটলো। সামনে সূর্যের প্রথম কমলা- হলুদ আলো এসে পড়লো লাল পাথরের দৈত্যাকার পাহাড়ে। সে পাহাড় তখন গতদিনের তুষারপাতের ফলে লাল-সাদা আল্পনায় পরিণত হয়েছে। আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। অসাধারণ সুন্দর এই জাতীয় উদ্যান। 
আস্তে আস্তে আরো নানান দেশীয় পর্যটক এসে জড়ো হচ্ছেন বাসস্ট্যান্ডে। ভেতরে যাবার জন্য এদের নিজস্ব বাস ছাড়া অন্য কোনো গাড়ির অনুমতি নেই। সুতরাং বাসস্ট্যান্ডই সকলের গতি। অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে থাকার পরও যখন বাস এলো না, তখন চিন্তা বাড়তে লাগলো। এমন তো হবার কথা নয় কোনো আগাম নোটিশ ছাড়া। বেলা যত বাড়বে Angel's landing -এ ওঠা তত বিরক্তিকর এবং কষ্টকর হবে গরম এবং রোদের জন্য। আমরা উসখুস করছিলাম। এমন সময় একজন পার্ক অফিসিয়াল এসে জানালেন যে বাস আপাতত বন্ধ। পার্কের ভেতরের রাস্তা পরিষ্কার করতে শুরু করেছেন ওঁনারা। রাস্তা পুরোপুরি পরিষ্কার না হলে বাস চালানো যাবে না। কাল দুপুরের পর থেকে প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত অবিশ্রান্ত তুষারপাত হয়েছে। প্রধান সড়কগুলি রাতেই পরিষ্কার করে দেওয়ায় আমরা সাতসকালে এখানে এসে পৌঁছাতে পেরেছি। কিন্তু ভেতরের রাস্তাতে এখন পরিষ্কারের কাজ চলছে।মনটা দমে গেল। আমাদের এবারের জায়ণ অভিযানের অন্যতম কারণ হলো Angel's landing. এই অবস্থায় সেটিই না মাঠে মারা যায়। এই বাসস্ট্যান্ড থেকে Angel's landing এর হাঁটা শুরু করার পয়েন্টটি অন্তত পাঁচ মাইল পথ। এর কিছুটা পর্যন্ত নিজেদের গাড়িতে যাওয়া যাবে। তারপর থেকে বাইরের গাড়ির প্রবেশ নিষেধ। মনস্থির করে সেখান থেকেই বাকিটা হাঁটব স্থির করলাম। সেই মত গাড়ি নিয়ে কিছুটা এগিয়ে এসে তারপর বাসরাস্তা ধরে ঢিমে তালে হাঁটতে শুরু করলাম। বাঁদিক দিয়ে বয়ে চলেছে ভার্জিন রিভার। লাল পাথরের খাড়াই পাথুরে দেওয়াল ডাইনে বাঁয়ে। আমাদের পরিকল্পনায় এই অতিরিক্ত পাঁচ মাইল হাঁটাটা ছিল না। কিন্তু পরিস্থিতি যখন বলছে তখন হাঁটতে হবেই। ঠিক করলাম কোনো তাড়াহুড়ো করবো না। পুরো রাস্তাটার সৌন্দর্য্য শুষে নিতে নিতে এগোবো। তাতে যদি পুরোটা পৌঁছাতে না পারি তবে তাই সই। ফিরে আসব। কিন্তু কোথাও পৌঁছাতেই হবে এই লক্ষ্যে এগোলে তাতে মোহভঙ্গ হবার সম্ভাবনাই বেশি। উপরন্তু পৌঁছাতে হবে এই তাড়ায় রাস্তাটির সৌন্দর্য্যও হাতছাড়া হয়ে যায়। তাই আমাদের কোথাও পৌঁছানোর তাড়া ছিল না। রাস্তার প্রতিটি বাঁকে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে হয়, এতই সুন্দর জায়ণ। Angel's landing এ উঠবো বলে আমরা কয়েকমাস ধরে নিজেদের মতন কিছু প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। নইলে আমাদের এতটা রাস্তা হাঁটার মত শারীরিক সক্ষমতা ছিল না। প্রায় ঘন্টা খানেক রাস্তা ধরে হাঁটার পর পিছন থেকে বাস এলো। আপাতত কিছুটা রাস্তা পরিষ্কার হয়েছে তাই সেপর্যন্ত বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। যে পর্যন্ত চালু হয়েছে সেটি এখন থেকে আর একটি স্টপেজ। আর তার পরের স্টপেজটিই আমাদের Angel's landing এর হাঁটাপথের শুরু। অর্থাৎ বেশিরভাগ রাস্তাটি আমরা হেঁটেই চলে এসেছি। তাও যতটুকু শক্তি সঞ্চয় করা যায়, এই ভেবে বাসে করে পরের স্টপেজে এসে পৌঁছলাম। এটি জায়ণ লজ। এখানে এদের প্রধান থাকার জায়গা। জায়ণ লজের রেস্টুরেন্টে ঢুকে কফি দিয়ে কিছুটা ক্যাফিন শরীরে ঢুকিয়ে নিলাম। আর একটা কাজ করেছিলাম যেটি সেদিন আমাদের প্রচন্ড সহায় হয়েছিল পরবর্তী হাঁটার ক্ষেত্রে। সেটি হলো, দুজনে দুজোড়া shoe traction কিনে জুতোয় লাগিয়ে নিয়েছিলাম। আগের দিনের অল্প রাস্তার হাঁটাহাঁটিতেই বুঝেছিলাম তুষারপাতের পর শক্ত হয়ে গেছে বেশ কিছু জায়গাতেই। ফলে তার ওপরে হাঁটা কষ্টকর। ভয়াবহ রকম পিচ্ছিল বেশ কিছু জায়গা। shoe traction এক্ষেত্রে ত্রাতা। জুতোর গ্রিপ বাড়াবে। 

কফি খেয়ে, জুতোয় ট্রাক্শন লাগিয়ে লাঠি বাগিয়ে এবার আসল হাঁটা শুরু হলো। জায়ণ লজ থেকে বেরিয়েই মোলাকাত হলো একটি শিং ওয়ালা হরিণের সাথে। সাতসকালে দুই তিনজন শিংবিহীন বৌ নিয়ে বরফ খুঁড়ে ঘাসপাতা দিয়ে ব্রেকফাস্ট করতে বেরিয়েছে। তাদের বিদায় দিয়ে বাঁদিকে একটা ছোট্ট কাঠের সেতু। সেটি পেরিয়েই ভার্জিন রিভারকে ডানহাতে রেখে চড়াই শুরু। বরফে সম্পূর্ণ ঢাকা সরু পায়ে চলা পথ। ঝুরো বরফে হাঁটতে আপাতত কোনো সমস্যা নেই। আমাদের যা গতি তাতে আমরা খুশি। কারো কারো থেকে বেশি। তাঁদের আমরা পেরিয়ে চলেছি। কারো কারো থেকে কম। তাঁরা আমাদের পেরিয়ে চলেছেন। আমরা জল খেতে খেতে, শুকনো ফল চিবোতে চিবোতে আর ছবি তুলতে তুলতে আঁকাবাঁকা সরু চড়াই পথ হেঁটে চলেছি Angel's landing এর দিকে। রোদ বাড়ছে ক্রমশঃ। 

(পরের পর্বে গল্পের শেষ)