Saturday, 12 October 2019

#এই_সপ্তাহের_শেষে-1

#এই_সপ্তাহের_শেষে

১. কৈফিয়ৎ
---------------

নাহ, এবার ভাবলাম শুরু করেই ফেলি। অনেকদিন ধরেই ভাবনাটা ছিল। বলা ভাল, ভাবনাটা তৈরী হচ্ছিল, বিবর্তিত হচ্ছিল। কিন্তু ভাবনার প্রকাশ যে করতেই হবে, করাটা যে অত্যন্ত জরুরি, সে বিষয়ে কোনো দ্বিধাই ছিল না। কোনো একটি কাজ শুরু করার আগে সে সংক্রান্ত ভাবনার বীজটা থেকেই থাকে ভেতরে। কোনো একটা ঘটনায় সেই ভাবনাটা তীব্র হয়ে ওঠে। তারপর নানান ঘটনায় কাজটা শুরু করা একটা দায় হয়ে পড়ে।

ভাবনা বা কাজটা কী সেটা বলার আগে একটা কথা প্রথমেই বলি, এখানে আমি সোজা কথা সোজা এবং সপাটেই বলব। কোনো সাহিত্যসৃষ্টি, ভনিতা বা অপ্রয়োজনীয় বিনয় না করেই। করলে, যে উদ্দেশ্যে এই আয়োজন, সেটার গোড়াতেই গলদ রয়ে যাবে।

এবার ভাবনাটা তীব্র হয়ে ওঠার পেছনের ঘটনাটা বলি। ২০১৬ সাল জুলাই-আগস্ট মাস। ওমাহায় কাজ করতে আসার আট-নয় মাস পরের কথা। ড্রাইভিং টেস্ট দিতে গেছি। ওমাহায় পাবলিক বাস হাতে গোনা কয়েকটা চলে নির্দিষ্ট রুটে। সুতরাং, গাড়ি থাকাটা লাক্সারি নয়, বাজার দোকান করার জন্যই অত্যাবশকীয়। যেসব শহরে বাস ট্রেন চলে, সেখানে রিসার্চ স্কলাররা বিলাসিতা দেখাতে গাড়ি কেনে না। একাডেমিক রিসার্চ স্কলার বা পোস্টডক্টরাল ফেলোদের আর্থিক সামর্থ্য যা, তাতে বিলাসিতার জায়গাই নেই। তারা পুরোনো, ব্যবহৃত গাড়ি কম দামে কেনে। কেনে মানে, চার-পাঁচ বছরের কন্ট্রাক্টে, মাসিক কিছু ডলারের কিস্তিতে। আর কিছুটা ডাউন পেমেন্টের জন্য বেশিরভাগ সময়েই তাদের চেনাশোনা সিনিয়র বা ব্যাংক থেকে ধার নিতে হয়। আমরাও তাই করেছিলাম। এত কথা বলছি কি জন্য? কারণ, এই সিরিজের পাঠকদের মাথায় এইটা সর্বদা থাকা উচিৎ বলে আমার মনে হয়েছে যে, আমেরিকা (বা অন্য ইউরোপিয়ান দেশে) যারা রিসার্চ করতে আসে তারা টাকার গদিতে শুয়ে থাকে না। প্রথমে আসে কাজটা করবে বলে, অনেক ডলার রোজকার করবে বলে নয়। রিসার্চে টাকা রোজকার করা যায় না। একথা যেকোনো দেশে রিসার্চের জন্য বাজেটে বরাদ্দ টাকার পরিমাণ বা শতকরা ভাগ থেকেই  আপনারা যে কেউ, যে কোনো সময় মিলিয়ে নিতে পারেন। এবং সবচাইতে বড় কথা, এসব কথা জেনেই তারা রিসার্চ করতে আসে। কেন আসে, সে কথা অন্য আর একদিন বুঝিয়ে বলবখন। 

সুতরাং খেয়ে পরে বেঁচে থাকার রসদ সংগ্রহ করতেই ওমাহার মতন জায়গায় আমাদের মতন আজন্ম বাসে-ট্রেনে গলদঘর্ম হয়ে যাতায়াত করা লোকজনের গাড়ি চালানোর দরকার হয়ে পড়ে। মাস দেড়েক সিনিয়র দাদার কাছে হাতেখড়ি আর অভ্যাস করে একদিন ড্রাইভিং টেস্ট দিতে গেলাম। আমার পাশে বসে এক্সামিনার আমায় নিয়মমত সকালের ব্যস্ত রাস্তায় এদিক ওদিক ঘুরিয়ে, এমার্জেন্সি স্টপ করিয়ে, আরো যা যা ওদের নিয়ম আছে সেসব দেখে আধঘন্টা পর ফিরিয়ে নিয়ে এলেন। সেযাত্রা যদিও আমি লাইসেন্স পাইনি। কারণ, সমস্ত রাস্তাটা ঠিকঠাক চালিয়ে আসার পর ব্যস্ত চৌমাথায় প্রায় চোখের সামনে একটা এক্সিডেন্ট হতে দেখে ভয়-টয় পেয়ে আমি রাস্তার পাশে বাঁধানো জায়গায় (কার্ব বলে এখানে) গাড়ির একটা চাকা তুলে দিয়েছিলাম। স্বভাবতই পরীক্ষক আমায় ফেল করিয়েছিলেন। পরের মাসে আবার পরীক্ষা দিয়ে সসম্মানে অনুমতি পেয়েছিলাম। যাক সেসব অন্য গল্প। এ সিরিজের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। এই সিরিজের সাথে যুক্ত এর পরের অংশটি।

আমার ফেল করে ফিরে আসার পর পিনাকী গেল ওই একই পরীক্ষকের সাথে পরীক্ষা দিতে। আধঘন্টা পর ফিরে এলো হাসি মুখে। পাশ করেছে। এরপর থেকে মন দিয়ে শুনুন। গাড়িতে ওঠার সাথে সাথে পরীক্ষক পিনাকী জিজ্ঞাসা করেছেন, সে কি করে। পিনাকী বলেছে সে রিসার্চ করে। বিষয়টা প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার। এই একটি কথা শুনেই নাকি পরীক্ষক একেবারে আপ্লুত হয়ে পড়েছেন। ওমাহায় ভারতীয় রিসার্চ স্কলারের সংখ্যা নেহাত কম নয়। সুতরাং এই কথায় এত বিহ্বল হবার কি আছে? কারণটা পরীক্ষকের পরের কথায় পরিষ্কার হবে। "ওহ, প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার! খুব খারাপ ক্যান্সার, মরণ ব্যাধি তাইনা? আর TGF-beta এর জন্য দায়ী তাই না?" পরীক্ষকের বলা বাক্যটার প্রথম অংশে অবাক হবার মতন কিচ্ছু ছিল না। প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার যে মারণ ব্যাধি একথা সকলেই জানে। কিন্তু দ্বিতীয় অংশটায় অবাক হবার মতন যথেষ্ট মশলা রয়েছে। একজন মোটর ভেইকেল ডিপার্টমেন্টের রাজ্যসরকারী কর্মচারী প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার জানতে পারেন কিন্তু "TGF-beta" কথাটা জানবেন কি করে? পিনাকীও যথেষ্ট অবাক হয়েছিল। এতটাই অবাক হয়েছিল যে, গাড়ির সিটবেল্ট না লাগিয়েই ড্রাইভিং টেস্ট দিতে শুরু করে দিয়েছিল। অতঃপর পরীক্ষক ব্যাখ্যা করেছেন যে তিনি ইন্টারনেটে প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারের কথা পড়তে গিয়ে TGF-beta সম্পর্কে জেনেছেন। এবং তার পরে পুরো ড্রাইভিং টেস্টের রাস্তাটাই প্যানক্রিয়েটিক ক্যান্সার, রিসার্চ এইসব সংক্রান্ত কথাবার্তা বলেছেন এবং প্রায় বিনা প্রশ্নেই পিনাকীকে পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ ঘোষণা করেছেন। গল্প এখানেই শেষ। এবার কাজের কথা বলি। এই ঘটনা থেকেই তিন বছর পর আমার এই সিরিজের উৎপত্তি। কেন? বলছি।

এখন ভাবছেন তো, TGF-beta আবার কি? একটা বাক্যে বললে, আমাদের দেহের কোষ নিঃসৃত অসংখ্য অত্যাবশকীয় পদার্থের মধ্যে একটি, যা কোষকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে।  আর বেশি হলে শুধু প্যানক্রিয়াটিক কেন, অনেক রকম ক্যান্সার বা অন্য রোগও বাঁধতে পারে। কিন্তু আজকের লেখাটা এই TGF-beta নিয়ে নয়। ভয় পাবেন না। এবিষয়ে আপনাদের জ্ঞানদান করব না। তাহলে এই গল্প আপনাদের সামনে ফেঁদে বসলাম কেন? কারণটা আরো একটু বিশদ। আরো বেশি ভাবনার দাবি রাখে। 

ভাবুন, সরকারি অফিস কাজ করা একজন মানুষ, প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারের কথা জানতে ইচ্ছে হয়েছে বলে ইন্টারনেটে কিছু পড়াশুনা করেছেন। সেখান থেকে TGF-beta র নাম জেনেছেন। অর্থাৎ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু জানার থাকলে, জীববিজ্ঞান তেমন ভাবে না জানা মানুষও ইন্টারনেট থেকে পড়ে কিছুটা ধারণা করতে পারেন। এটা আশার কথা। কিন্তু সাথে সাথে ভয়েরও কথা। কারণ, এক, তিনি জানবেন না-যেখান থেকে তিনি পড়ছেন, সেটি নির্ভরযোগ্য উৎস কিনা। অর্থাৎ, টাইপ করা লাইনগুলির সত্যতা, বিশেষজ্ঞের দ্বারা যাচাই করার পর ওই ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে কিনা? আর দুই, যা পড়ছেন, আর যা বুঝছেন, দুটোই একই কিনা? যেমন এক্ষেত্রে, TGF-beta র ব্যাপারটা। TGF-beta কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া নয়, যে শরীরে এলো আর আপনার প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার হয়ে গেল। এর জন্যেই যে প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার হয় তার কোনো স্থিরতা নেই। কিন্তু ভদ্রলোক পড়েছেন, ভগবান জানেন কোন সোর্স থেকে, আর কনফিডেন্সের সাথে বলছেন যে TGF-beta থেকে প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার হয়। আমাদের দেশে আরো একটি সমস্যা এর সাথে যুক্ত হয়। সেটি হলো, আমাদের অনেকেরই ইংরাজিতে পড়বার অভ্যাস নেই। আর ইন্টারনেটের তথ্য প্রায় পুরোটাই ইংরেজিতে। মনে করুন, অতি অল্প পড়াশুনার সুযোগ পেয়েছে এমন একজন মানুষ, যাঁর হাতে স্মার্টফোন আছে, তিনি কেবল ভাষাটিতে সড়গড় নন বলেই গুগুল থেকে তার প্রশ্নের উত্তর পেলেও পুরোপুরি আত্মস্থ করতে পারবেন কি? ফলে আমাদের আশেপাশেই এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত unsupervised স্বাস্থ্যবিজ্ঞান সংক্রান্ত খবর পড়ে বিভ্রান্ত হন। 

এজন্যই এখন বহু চিকিৎসক অমূল্য সময় ব্যয় করে তাদের লেখা লিখছেন। মানুষ অনেক কিছুই স্পষ্ট জানতে পারছেন। কিন্তু তবুও একটি গ্যাপ এখনো আছে। সেটি হলো আমাদের মত মানুষরা ঠিক কি করি, কিভাবে করি, করে কি এমন ব্যাঙের মাথা উপকার হচ্ছে, সেটি সম্পর্কে বিশেষ কোনো লেখা আমার চোখে অন্তত পড়ে না। তার একনম্বর কারণ হলো, আমরা জানাতে আগ্রহী নই অনেক সময়েই। সময়ের অভাবে, লেখার ইচ্ছের অভাবে এবং অবশ্যিই পাঠকের উৎসাহের অভাবে কারণে। মানুষ জানতে চান না গবেষনা সম্পর্কে। কিন্তু পত্র পত্রিকা পড়ে বিজ্ঞানের অজস্র ভুল ব্যাখ্যা করেন অহরহ। অনেকসময়ই যার বিন্দুমাত্র সত্যতা থাকে না। আবার গুছিয়ে লিখলে সেটি একটু বেশি মাথা খাটাতে হবে বলে, "পরে পড়বখন" বলে পাশে সরিয়ে রাখেন। স্টিফেন হকিংস এর প্রকাশক তাঁর 'A brief history of time' প্রকাশের আগে তাঁকে বলেছিলেন, ওয়ান ফর্মুলা ইক্যুয়াল টু টেন থাউজেন্ড রিডার। মানে লেখায় একটি ফর্মুলা থাকা মানে ১০০০০ কম লোক বইটি কিনবে। এবং এই জন্য সে বইয়ের ভূমিকায় তাঁকে পাঠকদের আশ্বস্ত করতে লিখতে হয়েছিল, যে, E=mc^2 ছাড়া এই বইতে কোনো ফর্মুলা ব্যবহার করা হয়নি। 

আমাদের মুখ না খোলার কারণে বেশ কিছু বাজে এবং ভুল ধারণা চলে আসছে। তার দায় আমিও অস্বীকার করতে পারিনা। যেমন, 

১. আমারই আত্মীয়, বন্ধু, পরিচিত মহলে যদি এজাতীয় ধারণা চলে যে, "ক্যান্সার কোনো রোগ নয়, ভিটামিন-C এর অভাব। ড্র্যাগ কোম্পানি গুলো ব্যবসা করবে বলে এসব চালাচ্ছে।" তবে তার কিছুটা দায় আমারও বটে। এই ধারণাকে লালন করলে, অজস্র ক্যান্সার রিসার্চারের দিবারাত্র এক করে, টাকা-পয়সার তোয়াক্কা না করে, পুরো জীবনের পরিশ্রমকে কি পরিমাণ অপমান করা হয় সে ধারণা দেব বলে এই সিরিজের শুরু। 

২. "রিসার্চ আজকাল পুরোটাই মার্কেটিং আর কোম্পানিগুলো থেকে ফান্ডিং পাবার ধান্দা" এই বাক্যের সত্যতা আদপে কতটা সেটা আমার ট্রেনিং, শিক্ষানবিশির অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা দেওয়ার ইচ্ছেতেই এই সিরিজ। 

৩. নতুন গবেষণার (Bio-medical science) কথা গল্পাকারে শোনাবো বলেই এই সিরিজ। 

৪. এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর গুলির সত্যতা এবং অথেন্টিসিটি কিভাবে বিচার করতে হয়? কি তার মাপকাঠি? বায়ো-মেডিক্যাল রিসার্চের কোয়ালিটি কন্ট্রোল কিকরে করা হয়? কোনো কোম্পানির সে রেজাল্টে কারচুপি করার কোনো ক্ষমতাই যে নেই সেকথা ততক্ষণ বোঝানো সম্ভব নয়, যতক্ষনণ না গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো পদ্ধতিটা মানুষ জানছেন। নইলে অত্যন্ত কনফিডেন্সের সাথে যেকোনো একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত, যেকোনো একটি খবরে তিনি বিশ্বাস করবেনই। কারণ, ঠিক-ভুল বিচার করার পদ্ধতিটি তাঁর সামনে কেউ তুলে ধরছে না। 

মানুষ সমস্ত কিছু সম্পর্কে উৎসাহী, কেবল বিজ্ঞান বাদে। তার কারণ হিসেবে তাঁরা এই বাক্যটি খাড়া করেন-"আমরা তো সাধারণ মানুষ, আমরা কি বুঝবো?" এর মধ্যে আমাদের খুব খুব কাছের লোকেরাও আছেন। আসলে মাথা খাটাতে অনীহা। এত পরিশ্রম কে করে? হয়ত উৎসাহ দেখালে দেখতেন, যিনি বলছেন, তিনি অত্যন্ত সহজ করে গল্পাকারে বলছেন। পরিশ্রম ছাড়াই সঠিক তথ্য আপনার হাতে চলে আসত। 

আমি একটু আধটু জীববিজ্ঞান শিখেছি, শিখছি এবং আশা করছি ভবিষ্যতেও শিখব। সেই অভিজ্ঞতা আর ট্রেনিং থেকে আমি Bio-medical science এর গবেষণা এবং গবেষকদের কথা লিখব। যেমন পারি তেমনই লিখব। সপ্তাহে হয়ত একটাই লিখে উঠতে পারব (সেজন্যই সিরিজের নাম: 'এই সপ্তাহের শেষে')। প্রতিটি তথ্যনির্ভর লেখা reference সমেত লিখব। যা জানিনা, সেটা লিখব না। কিন্তু এটুকু নিশ্চয় করে আমি বলতে পারি, যা লিখব, তা ১০০% অথেন্টিকেটেড। কারণ সে ট্রেনিং আমার আছে।

সুতরাং আমি চেষ্টা করব। এবং আরো একটা কথা, আমি যেটুকু লিখি ফেসবুকে, কখনো বিশেষ কারণ ছাড়া কাউকে ট্যাগ করি না। তাতে আমার মনে হয়, জোর করে ঘাড় ধরে মানুষকে আমার লেখা পড়তে বাধ্য করছি নাতো? কিন্তু এই সিরিজের ক্ষেত্রে আমি বেশ কিছু মানুষকে ট্যাগ করব। কারণ, তাদের সূত্র ধরে এই লেখা বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছোবে। আর সেটাই আমার একমাত্র উদ্দেশ্য। তাতে যদি অন্তত এই হাস্যকর ভুলভাল ধারণাগুলির কিঞ্চিৎ বদল হয়। যদি কারো ট্যাগিংএর জন্য কিছুমাত্র অসুবিধা থাকে, নির্দ্বিধায় বলবেন। আমি ট্যাগ সরিয়ে নেব।   

পড়ুন। কিছু ভুল লিখলে শুধরে দিন। বাজে কথা বলছি মনে হলে, আপনার যুক্তি দিয়ে আমায় খণ্ডন করুন। যদি মনে হয়, আরো কিছু না বলা রয়ে গেল, জিজ্ঞাসা করুন। আমি না জানলে, আমার পরিচিত কেউ সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হলে তাঁকে টেনে এনে আমরা দুজনেই শিখে নেব। কিন্তু ঠিকটা না জেনে কোনো ধারণা করবেন না দয়া করে। বেসিক রিসার্চ সম্পর্কে উদাসীন থাকাটা আমার-আপনার দুতরফেরই লজ্জার। আমি আমার কাজ শুরু করলাম। আপনাকেও ডাক দিলাম হাতে হাত ধরার। 

ভাল থাকবেন সবাই।

অর্পিতা



   

Monday, 23 September 2019

খাঁড়ির গান-৩

খাঁড়ির গান-৩
------------------- 

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙলো ডানদিক থেকে আসা একরাশ আলোয়। ঝকঝকে সকাল। চোখ খুলতেই মনে হলো ইশ, সময় নষ্ট হচ্ছে। যদিও কিচ্ছুটি করব না বলেই এমনতর জায়গায় এসে থাকা। তাও বিছানায় শুয়ে শুয়ে হাত বাড়ানো দূরত্বের আটলান্টিককে অবহেলা করা কি যায়? বারান্দায় বেরিয়ে আসতেই মনে দুই রকমের অনুভূতি। প্রথম অনুভুতিটা হলো, "আহ!" আর দ্বিতীয়টি হলো "ইশ।" খুব ভাল কিছু অভিজ্ঞতা হলে সেটিকে একান্ত আপনজনের সাথে ভাগ করে না নিলে সে অভিজ্ঞতা পূর্ণতা পায়না কোনোমতেই। তা সেই যে এক সবুজ গঞ্জে দুটি ছোট ছোট বাচ্চাকে রেখে এসেছি, যাঁরা কিনা একদিন ছোট্ট আমিটাকে কোলে-কাঁখে করে বঙ্গোপসাগরের তীরে নিয়ে গিয়ে প্রথমবার আঙ্গুল দেখিয়ে শিখিয়েছিলেন, "ওই দেখ সমুদ্র", সেই দুটি মানুষের জন্য বড় মনকেমন  লাগলো। 
চোখ মুখ ধুয়ে পায়ে চপ্পল গলিয়ে নেমে এলাম নিচে। নিচে তখন ব্রেকফাস্টের শেষ পর্যায় চলছে। আমরা ছাড়া আরো যেসব অতিথি আছেন তাঁরা প্রায় সকলেই বয়স্ক মানুষ। পরে দেখেছি, বেশিরভাগ আমাদের মত বয়সের মানুষদের এস্পারেঞ্জার দিকটাই পছন্দ। ব্রেকফাস্টে নানান কিসিমের পাউরুটি-ফল-দুধ-সিরিয়ালস, আরো নানান কিছু। সাথে কফি। একবাটি ফল আর দুধ নিয়ে পিছনের উঠোনে বেরিয়ে এলাম। এর ঠিক উপরেই আমাদের ঘর-বারান্দা। এই উঠোনেই একটা মাঝারি গোছের সুইমিং পুল। তার পাশে ফাঁকা জায়গাটায় কয়েকটা চেয়ার। তারই একটা টেনে নিয়ে উঠোনের নিচু পাঁচিলের ওপরে খাবার রেখে বসলাম। চকচকে রোদ্দুর সামনের পাঁচিলে এসে মাথা কুটছে গাঢ় নীল সমুদ্র। আর দেড় বছর পরের প্রথম একটা কাজহীন দিন। অনুভূতিটা হয়ত "আহ" ছাড়া আর কোনো ভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারব না। খাওয়া শেষ করার আগেই পিনাকীও নেমে এলো নিচে। দুজনে বেশ কিছুক্ষন বসে রইলাম ঐভাবেই। ততক্ষনে খাওয়া শেষ করে অন্যান্য অতিথিরা বেরিয়ে পড়েছেন হোটেল ছেড়ে বেড়াতে। আমাদের কোথাও যাবার ছিল না। আমরা পায়ে পায়ে হোটেলের পিছনের বেড়া ঠেলে ভেজা বালিতে পা রাখলাম। হোটেলের পাঁচিল ঘেঁষে তিন-চারটি নারকেল গাছ, নীল আকাশ আর একসমুদ্র নীলের মাঝে সবুজের একটা রঙিন বৈপরীত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে নামলাম সেটি কোনো বিচ নয়। বাড়ির খিড়কি দরজা খুলেই যে পাশের পুকুরঘাটে নামবার রানা করা থাকে এটি সেই। কেবল তফাৎ এই যে, খিড়কি পুকুরটি খোদ আটলান্টিক। আমাদের বাঁদিকে ওই দূরে দেখা যাচ্ছে পুয়ের্তো রিকো। আর ডানদিকে ওই যে ছায়া ছায়া লাইন একটা, ঐটি ফ্ল্যামেঙ্কো। ওইটিতে থাকার জায়গা না পেয়ে আমরা ভাইকোয়েসে এসেছি। ভাগ্যিস। পুয়ের্তো রিকোর সানওয়ান ফেরিঘাট থেকে লঞ্চ আসছে ভাইকোইয়েসের ফেরিঘাটের দিকে। আর এতোলবেতোল হাওয়ার মধ্যে আটলান্টিক অক্লান্তভাবে তৈরী করে চলেছে একের পর এক ঢেউ। সাদা ফেনায় ভিজিয়ে দিচ্ছে আমাদের পা। তার সাথে কুচি কুচি অজস্র পাথর আর পাথরের মাথায় সামুদ্রিক গুগলি, শামুকদের জটলাকে। ছোট ছোট পাথরে বাসা বেঁধেছে ওরা। প্রতিটা ঢেউ এসে ধুয়ে দিচ্ছে ওদের বসবাসকালীন জমে ওঠা ক্লেদ। একসাথে অনেকজন একটা ছোট জায়গায় অনেকদিন ধরে থাকলে কেমন একটা আবর্জনা জড়ো হয় মন জুড়ে। এদের বোধহয় সেসবের বালাই নেই। প্রতিটা নতুন ঢেউতে ভেসে যায় বোধহয় ওদের আবর্জনা। বেশ কয়েকটা পাথর সামুদ্রিক শ্যাওলায় রঙিন হয়ে আছে। আর আছে লাল কালোর নকশাদার কি যেন একরকম পোকা। অপূর্ব সুন্দর দেখতে। ভালোবাসাবাসি চলছে ওদের নিজেদের মধ্যে দেখলাম। আমরা চপ্পল খুলে রেখে ভেজা বালিতে হাঁটছিলাম।  আমরা ছাড়া আর কারো পায়ের ছাপ নেই। আমরা হাঁটলাম। যদিও বেশি দূর যাবার নেই। যেহেতু এটি ট্যুরিস্ট বিচ নয়, আদতে কোনো বিচই নয়, তাই পারিপাট্যও নেই। বেশিদূর যাওয়া যায়না।  নারকেল গাছের ছায়ায় বসে বসে লঞ্চ বা নৌকার যাতায়াত দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, কতটা  চলতে হয়? সত্যিই  কি তার প্রয়োজনীয়তা আছে? এই যে গত কয়েকবছর ধরে পাগলের মতন করে ল্যাব আর বাড়ি করছি, সাংঘাতিক সায়েন্স করছি তা তো নয়, সায়েন্স করতে গেলে কি কি  জানতে হয়,  এসবের  সাথে পরিচিত হচ্ছি বলা চলে। আমাদের নিজের বিজ্ঞান দিয়ে, মেডিক্যাল সায়েন্সে সামান্যতম কিছু করতে হলে আমায় সারা জীবন কাজ করতে হবে তবে গিয়ে হয়ত কিছু কাজ করার সার্থকতা আসবে। না আসার সম্ভাবনাই বেশি। অথচ কি দৌড়টাই না দৌড়াতে হবে সে জন্য। কতটা ধৈৰ্য থাকবে? ভাবছিলাম। দেখছিলাম। সময় কাটাচ্ছিলাম। তারপর অনেক্ষন পর ভাবনা গুলোকে ওই আঘাটার বালিতেই এদিক ওদিক ছড়িয়ে রেখে উঠে পড়লাম।

বেলা বেড়েছিল। আগের দিন হোটেলে ঢোকার সময় কতগুলো ছবিছাবাওয়ালা লিফলেট জোগাড় করেছিলাম হোটেলের অফিস ঘর থেকে। এই ভাইকোয়েস ভ্রমণ সংক্রান্ত সব। ঘরে বসে পাতা ওল্টাচ্ছি, পিনাকী স্নানে। লিফলেটের বেশির ভাগই এস্পেরাঞ্জার দিকে গিয়ে ওয়াটার স্পোর্টস আর ওয়াটার এমুসমেন্ট সংক্রান্ত। দেখে পাতা মুড়ে আবার রেখে দিচ্ছি। এগুলি আমাদের বিশেষ কাজে লাগবে না। ওরই মধ্যে একটি লিফলেটে চোখ আটকালো। মুখ ছোট করে এককোনে বসেছিল সে। স্কুবা ডাইভিং, স্নরকেলিং এর চকচকে পোষ্টার নয়। সম্পূর্ণ অন্য প্রাকৃতিক ঘটনা। এখানে আসার আগে আমি অন্তত বিশেষ কিছু পড়াশুনা করে আসিনি। কারণ নির্জনতা আর সমুদ্র বাদে আমার চাহিদা কিচ্ছু ছিল না। মাঝে মাঝে চাহিদা কম থাকলে, প্রাপ্য ভাঁড়ার পূরণ করার দায়িত্ব প্রকৃতিদেবী নিজেই নিয়ে নেন। এ লিফলেটটিও সেরকম। ফোনের ইন্টারনেটের অবস্থা খুব খারাপ। তারই মধ্যে কোনো মতে একটু দেখে নিলাম ব্যাপারটি। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় ফুটছি। এ জিনিস না দেখে ভাইকোয়েস থেকে ফিরে যাবার কোনো মানেই হয় না। এক ধাক্কায় কিচ্ছু না করা ছুটিকে বিদায় দিয়ে দিয়েছি ততক্ষনে। পিনাকী কেন এখনো বেরোচ্ছে না বাথরুম থেকে? সে বেরোতে ব্যাপারটা বললাম। আমি স্নান করে তৈরী হচ্ছি যখন, ততক্ষনে সে লিফলেটের ফোন নম্বর গুলোতে ফোন করে করে একটা ট্যুর বুক করে ফেলেছে। আজই সন্ধ্যায়। কি কান্ড! এর জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিলাম না এতটুকুও। এই পড়ে পাওয়ার জীবনে এমন একটি প্রাকৃতিক বিস্ময় সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হবে তা ভাবিনি। বিষয়টা হলো, বায়োলুমিনিসেন্স বে (Bio-luminescence Bay)।

অর্থাৎ,  খুব সংক্ষেপে বললে, রেড ম্যানগ্রোভ অধ্যুষিত, ঈষৎ উষ্ণ অঞ্চলের সামুদ্রিক খাঁড়িতে যদি ডায়ানোফ্লাজেলেট (dinoflagellates) জন্মায় এবং সেই আণুবীক্ষণিক শৈবাল জাতীয় জীবের গা থেকে নীলচে নিয়ন আলোর মত হালকা আলো বের হয়, যদি কোনো ভাবে তারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এবং সেই খাঁড়ির যথেষ্ট গভীরতা থাকতে হবে। একটি দিক সমুদ্রের সাথে সংযুক্ত থাকলে ভাল। এখন ভাইকোয়েসের উত্তরে, যেদিকে আমরা আছি, সেদিকে  আটলান্টিক, দক্ষিণে ক্যারাবিয়ান উপসাগর।তার স্রোত উষ্ণতর এবং মাঝে মাঝে ভাইকোয়েসের মাটি ক্ষইয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। তাতে যেমন তৈরী হয়েছে অসংখ্য ছোট বড় বিচ তেমনই ছোট বড় খাঁড়ি। তার সবচাইতে বড়টি হলো mosquito bay, যার চারিপাশটা ম্যানগ্রোভ অরণ্যে ঢাকা। বেশ কিছুটা পরিধির মধ্যে মানুষের বসবাস নেই। এবং এই mosquito bay তে জন্মেছে অসংখ্য ডায়ানোফ্লাজেলেট। এখন আধো অন্ধকার রাতে যদি আপনি এই mosquito bay তে গিয়ে জলে হাত পা ডোবান, বা কোনো কিছু দিয়ে জলে আঘাত করেন, তাতে ওই ডায়ানোফ্লাজেলেটদের গায়েও আঘাত লাগবে এবং তারা নীলচে নিয়নের মতন হালকা আলো বিচ্ছুরণ করতে থাকবে। এখন এই আলোর পরিমাণ নির্ভর করবে জীবাণুদের সংখ্যা, আকাশে আলোর পরিমাণ  ইত্যাদির উপর। এই mosquito bay -র পরিধি এবং এর মধ্যে ডায়ানোফ্লাজেলেটদের সংখ্যা, এই bay কে বিশ্বের বৃহত্তম এবং উজ্জ্বলতম  Bio-luminescence Bay-এর তকমা  দিয়েছে। আবার সেই 'তর- তম' -র  হিসেবনিকেশ। অর্থহীন। এটি বৃহত্তম না ক্ষুদ্রতম নাকি অনুল্লেখযোগ্য মধ্যম, তাতে কিই বা যায় আসে? এটি প্রকৃতির একটি সম্পদ, যা তিনি দয়া করে আমাদের দেখার নাগালে রেখেছেন।লিফলেটে এটি সম্পর্কে দেখার পরেই আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম যে, এই bay তে যাবো। ভেইকোয়েসে যখন এসেই পড়েছি। সন্ধ্যা ছটায় ট্যুর। সান- বিচে গিয়ে রিপোর্ট করতে হবে তারপর ওদের গাড়িতে ওরা নিয়ে যাবে।

সমস্ত আলস্য কাটিয়ে উৎসাহে উত্তেজিত দুজনেই। তৈরী হয়ে হোটেল থেকে বেরোলাম। আবার সেই বাতিঘর, সারমেয়দের ঠেক পেরিয়ে ফেরিঘাটে পৌঁছে বাঁয়ে  এগোলাম। আমরা যাব একটি বাহন ভাড়া করতে। এই দ্বীপের ভেতরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য নিজস্ব একটি বাহন দরকার। আমরা ঠিক করেছি একটি স্কুটার ভাড়া করব। গাড়ি চালানোর চেয়ে অন্যরকম হবে। আর বড় মোটরসাইকেল হলে আমার চালাতে অসুবিধা। ছোট স্কুটার হলে আমিও চালাতে পারব। সেই মত বাজার এলাকার গির্জা এবং টাউন হলটিকে বাঁহাতে রেখে হাতে ছাপা ম্যাপ নিয়ে হাঁটছি। ফোনের ম্যাপের ওপর ভরসা করা যাচ্ছে না। ইন্টারনেট এই আছে এই নেই। পথে একজন আমাদের থামিয়ে স্প্যানিশে কিছু বললেন। আমাদের চেহারা দেখে ওঁনার দক্ষিণ দেশীয় মনে হয়েছে। বিনয়ের সাথে জানালাম যে আমরা ভারতীয় এবং আমরা স্প্যানিশ ভাষা জানিনা। বিশেষত আমায় দেখে অনেকেই স্প্যানিশ জানি ধরে নিয়ে কথা বলতে এসেছেন তারপরেও। যাই হোক, হাঁটতে হাঁটতে প্রথমে আমরা গেলাম গ্লাস বিচ। এটি হোটেল থেকে পায়ে হাঁটা পথ। এও সাধারণ জনবসতির মধ্যে একচিলতে বালির প্যালেট। কয়েকটা পুরোনো রেললাইনের পাতের মত লোহার বিম পড়ে আছে। আশেপাশের বাড়ি থেকে লোকজন আমাদের দেখছে। এখানে বাইরের লোক বেশি আসে না বুঝলাম। বেশিক্ষন ওখানে থাকতে ইচ্ছে করছিলনা।  হাঁটতে হাঁটতে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে ফিরে আসছি বাজার এলাকার দিকে। এখানেই অন্য আর একটি ব্যাংক এবং তার ATM থাকার কথা। গতকাল রাতে ওই বন্ধ ATM এর পাহারাদার তাই বলেছিলেন আমাদের। এলাকাটা দেখে মনে হয় পুরোনো ইউরোপিয়ান স্থাপত্যের মধ্যবিত্ত একটি উদাহরণ। পরিচ্ছন্ন, কিন্তু বাহুল্য বর্জিত। ছোট গ্রামের মত সবাই সবাইকে চেনে। সাইকেলে বা মোটরসাইকেলে যেতে যেতে হাত নেড়ে কথা বলা বা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে জটলা করা। একদম আমাদের চেনা দিনযাপনের ছবি। মার্কিনি বাহুল্য বা বাতুলতা কোনোটিই নেই। আমরা ATM খুঁজে টাকা তুললাম শেষ পর্যন্ত। ঠিক করলাম, যেখানে যেখানে কার্ড দিয়ে চলবে কিছুতেই সেখানে ক্যাশ খরচ করব না। নইলে গতকালের মত পরিস্থিতি হবে। এত কান্ড করেও শেষে যদিও আবার ক্যাশ কম পড়ে গিয়েছিল। সে গল্প নাহয় যথাসময়ে বলা যাবে। হাঁটতে ভাল লাগছিল আমাদের। ঘুরে ফিরে কয়েকটা মোড় আর কয়েকটি দোকানদানী। আমরা স্কুটার ভাড়া করার দোকানে এলাম। দেখেশুনে একটি বাহন পছন্দ করে ৫০ ডলার সিকিউরিটি ডিপোজিট দিয়ে যুদ্ধজয়ের মেজাজে বেরিয়ে আসছি, দোকানের ভদ্রলোক "আরে আরে করো কি? দাঁড়াও।" বলে আটকালেন। বললেন, "গাড়ির চারিদিক দেখে ছবি তুলে নাও। কোথাও কিছু চোট আছে কিনা গাড়ি নেবার সময় দেখে নেবে না? পরে যদি পুরোনো কোনো চোট দেখিয়ে আমি তোমাদের কাছে এক্সট্রা চার্জ করি?" এর আগে কোনো দিন গাড়ি ভাড়া করিনি দেশের বাইরে। জানলাম। শিখলাম গাড়ি ভাড়া করার অলিখিত নিয়ম। কে বলে শুধু মা বাবাই শেখান? আমাদের সারাজীবনে এরকম কত কত নিঃস্বার্থ শিক্ষক মিলে আমাদের তৈরী করেন কে তার হিসেবে রাখে?

স্কুটার আর দুটি হেলমেট নিয়ে হাসিমুখে তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরোলাম। পাশেই আর একটি বিস্ময় অপেক্ষা করেছিল। একটি ছোট্ট ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। নাম "হিমালয়ান ষ্টোর" বা ঐরকম কিছু। এখন মনে পড়ছে না। "হিমালয়ান" লেখাটা ছিল মনে আছে। আর মনে আছে দোকানের বাইরে দেওয়ালে প্রায় দুই মানুষ সমান হাতে আঁকা আমাদের বংশীধারী শ্রীকৃষ্ণের ছবিটি। কি কান্ড? এই মাঝসাগরের পুঁচকে দ্বীপেও বাঁশিওয়ালা বাঁশিটি হাতে মিটিমিটি হাসছেন আমার দিকে তাকিয়ে।বাড়িতে মায়ের প্রিয় ক্যালেন্ডারের গোপালের ছবিটি মনে পড়ল। হয়ত ইস্কনের সাথে সংযুক্ত কেউ এই দোকানটি খুলেছেন আমেরিকার মূল ভূখন্ড থেকে এসে। দোকানে কর্পোরেট ছাপ নেই। বাইরে দেখলাম দিব্যি ভারতীয় কুর্তি ঝোলানো রয়েছে কয়েকটি। দেখে শুনে দুজনের ভারী ফুর্তি হলো। চলতে চলতে দেখলাম আবহাওয়ার গুণে অজস্র জবা, টগর গাছ জন্মেছে রাস্তার ধারে ধারে এবং বাড়িগুলিতে। ছোট্ট পাঁচিলঘেরা বাড়ি, বাইরে লাল জবার গাছ , তার পাশে একটা লালচে বেড়াল উদাস মুখে বসেছিল। আমার ডাকে একবার চোখ ফিরিয়ে দেখলে, কিন্তু বিশেষ পাত্তা-টাত্তা দিলে না। মুখ ফিরিয়ে আবার চিন্তা করতে লাগল। একেবারেই আমাদের চেনা ঘরোয়া পরিবেশ এদিকটা।

বেলা অনেক হয়েছে। হাঁটাহাঁটি করে আর সমুদ্রের হাওয়ায় সকালের ফল আর দুধ কোথায় তলিয়ে গেছে। খেতে হবে কিছু। আমাদের দুজনের খাওয়ার দোকানদানি খুঁজে পেতে কোনোদিনই কোনো অসুবিধা বিশেষ হয়না। এখানে এসে ম্যাপ দেখে একখানা দোকানকে টার্গেট করে রেখেছিলাম কাল থেকেই। নাম অরোরাস চিকেন এন্ড গ্রিল। শুনতে আহামরি কিছু নয়। কিন্তু বলছে নাকি এখানকার স্থানীয় খাবার পরিবেশনায় এরা অনন্য। আর যেকোনো জায়গায় গিয়ে সেখানকার স্থানীয় খাবার না খাওয়া মানে বেড়ানো অসম্পূর্ন থাকা। সুতরাং আমরা ফোনের জিপিএস আর প্রিন্টেড ম্যাপ হাতে অরোরার খোঁজে বেরোলাম। ভেইকোয়েস ছিল সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের সময় আমেরিকার নানান যুদ্ধাস্ত্র এবং বোম্ব পরীক্ষার জায়গা। একসময় পুরো দ্বীপটিই US আর্মির দখলে ছিল। তার আগে পুয়ের্তো রিকোর মতোই স্পেনীয়দের থেকে আমেরিকান আর্মি দখল করে। ওই পুঁচকে দ্বীপ ভেইকোয়েস। তার ঠিক অর্ধেকটাই ন্যাশনাল ওয়াইল্ড লাইফ রিফুইজি। এবং সেই জঙ্গলের অনেকটা জায়গাই এখনো সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ। বিশ্বযুদ্ধের মাইন পরবর্তী সময়ে বিস্ফোরণ হয়ে এখানে অনেক অঘটন ঘটিয়েছে। সেই পুরোনো সময়ের সেনা বাঙ্কার আমরাও পরের দিন কিছু দেখেছিলাম। পরে বলছি সেকথা। যেজন্যে এত কথা এখন বলছি, আমরা এগোচ্ছিলাম ডানদিকে US হাইওয়ে ২০০ ধরে। এখন থেকে সমস্ত কিছুই প্রায় দ্বীপের ডানদিকে। বাঁদিকে ওই জঙ্গল অঞ্চল। সেখানে পরের দিন কিছুটা আমরা গিয়েছিলাম। হাইওয়ে-২০০ নামেই হাইওয়ে। আদতে ছোট্ট গ্রামের রাস্তা। কিছুটা চলার পর বাঁয়ে বেঁকে আমরা অরোরার খোঁজ পেয়ে গেলাম। অরোরার কাছে দেখি ফার্মার্স মার্কেট বসেছে। আমাদের খোলা বাজারের মত টাটকা সবজি ঠেলায় নিয়ে বিক্রি করছেন স্থানীয় বিক্রেতারা। যাঁরা বাড়ি ভাড়া নিয়ে বেশ কিছুদিনের জন্য এখানে থাকতে আসেন তাঁরা কিনে রান্না বান্না করতে পারেন। যদিও এলাকাটি একদম আমাদের বড় টুরিস্ট স্পটে পৌঁছোবার রাস্তায় দুপুরে খাবার বিখ্যাত ধাবার মতন। প্রচন্ড ভিড় দোকানে। সকলেই অরোরার নাম শুনে খেতে এসেছেন। আমরাও অর্ডার করে বেশ কিচ্ছুক্ষন পরে খাবার পেলাম। মেক্সিকান ধরণেরই খাবার। খেয়ে দেয়ে আরো এগোলাম এস্পারেঞ্জার দিকে। আমাদের হাতে আরো বেশ কিছুটা সময় আছে। ছটায় আমাদের রিপোর্ট করতে হবে সান বিচে। সান বিচ এস্পারেঞ্জাতেই। ভেইকোয়েসের পরিধি বরাবর একের পর এক সমস্ত ট্যুরিস্ট বিচ গুলোই ঐদিকে। আমরা সোজা এগোতে থাকলাম ২০০ নম্বর রাস্তা ধরে। হঠাৎ দেখি শুনশান রাস্তায় মাঝখান দিয়ে ছুটছে আমাদের স্কুটার। আর আমাদের দুপাশে ছুটছে একদল ঘোড়া। একদম বন্য। স্পেনীয় উপনিবেশের শুরু থেকেই ওদের সাথেই ঘোড়া এসেছিল এখানে। তারাই বংশানুক্রমে বেড়ে বেড়ে পুরো দ্বীপে বন্য ঘোড়ার বংশ এখন ফুলে ফেঁপে রয়েছে। তাদের সাথে সেই প্রথম মোলাকাতের পর থেকে যখন তখন এদিক ওদিক তাদের দেখেছি। চকচকে গা, বলশালী দেহ, স্বাধীন আর অপরিসীম দার্ঢ্য তাদের। বঙ্গদেশীয় চোখে শ্রদ্ধার উদ্রেককারী। রাস্তা ধরে একদম শেষে গিয়ে দেখি এখানে হাট বসেছে প্রায়। নতুন দীঘার মত ব্যাপারস্যাপার। সমুদ্র, মাছ, সামুদ্রিক খাবারদাবার, বিয়ার আর জলকেলির বিপুল আয়োজন। পরিবার, কুকুর, বেড়ালসহ অবসরপ্রাপ্ত মার্কিনিরা এসে বসেছে এখানে। ভাগ্যিস এখানে থাকার প্ল্যান করিনি। যাইহোক, কাল এইসব বিচগুলো ভাল করে ঘুরে দেখা যাবে। বেশ কিছুক্ষন এস্পেরাঞ্জায় এদিক ওদিক ঘুরেফিরে ছটা বাজার একটু আগেই গিয়ে পৌঁছলাম সান বিচে। এখান থেকেই আমাদের বায়ো-লুমিনেসেন্স বে তে নিয়ে যাবার কথা। সান বিচ অসম্ভব সুন্দর দেখতে। আজ এখানে থাকতে পারব না।  কাল আবার আসব। আপাতত ট্যুর কন্ডাক্টারদের বা তাদের কোনো অফিস খুঁজে পেতে হবে। এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে কোনো অফিস তো দূর, বাথরুম পর্যন্ত পেলাম না। একদম শুনশান বিচ। ঠিক জায়গায় এসেছি তো? একটাই স্বান্ত্বনা, কোনো টাকা পেমেন্ট করা নেই। ওরা হাতে হাতে ক্যাশ কালেক্ট করে নেবে বলেছিল ফোনে যখন বুকিং করছিলাম। সন্ধ্যে হয়ে আসছে, দুজনে দুটো হেলমেট হাতে ঝুলিয়ে ভ্যাবলাকান্তের মত দাঁড়িয়ে আছি বায়ো-লুমিনেসেন্স দেখার আশায় শুনশান বিচে। দূরে রাস্তার ধরে কতগুলি ঘোড়া চড়ে বেড়াচ্ছে এছাড়া আর কোনো প্রাণীর চিহ্ন নেই। দুজনে বুঝে উঠতে পারছিনা কি করব। এদিকে ছটা বাজে। চলে আসব কিনা ভাবছি, এমন সময় দেখি দূরে রাস্তা দিয়ে দুটো গাড়ি ঢুকছে।

(চলবে)
  
     

Saturday, 7 September 2019

খাঁড়ির গান- ২

খাঁড়ির গান- ২
---------------------
রাত আটটা সাড়ে আটটা নাগাদ আমাদের হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে দুচার ডলার কম নিয়েই গাড়ি তো চলে গেল। আমরাও অন্ধকারের মধ্যে ব্যাগ টেনে ক্যাশলেস অবস্থায় হোটেলের দরজার দিকে এগোলাম। এ পর্যন্ত তো আগেই বলেছি। প্রথম পর্ব লেখবার পর পিনাকী মনে করিয়ে দিল, হোটেলের নাম ছিল 'ব্র্যাভো বিচ রিসোর্ট'। ট্রিপ এডভাইসার বলছে এ অঞ্চলের সবচাইতে ভাল হোটেল। সুনাম তার বহিরঙ্গে বা তার বিলাসিতার নয়। তার অবস্থান এবং তার সার্ভিসে। সফল ব্যবসার যেটি একমাত্র মূলমন্ত্র। ব্র্যাভো বিচ রিসোর্ট ছোট্ট হোটেল। আগেই বলেছি এটি এক্কেবারেই স্থানীয় জনবসতির মধ্যে। এস্পেরাঞ্জার দিকের অপেক্ষাকৃত বড় হোটেলগুলির মত চাকচিক্য তার নেই। এই অঞ্চলে হোম স্টে কিছু আছে। কিন্তু হোটেল বলতেই এটিই। ছোট্ট দোতলা ধবধবে সাদা বাড়ি। একতলা দোতলা মিলিয়ে গোটা পনের ঘর হবে হয়ত। এ অঞ্চলের অন্যান্য বাড়ির মতোই দোতলার টানা বারান্দাটি খোলা। সিঁড়ির মাথায়ও কোনো ঢাকাঢুকির বালাই নেই। এই বিষয়টি পরের দুই দিন বড় ভাল লেগেছিল। কারণ খোলামেলাতেই আমরা অভ্যস্ত। এই ওমাহাতে আসার পরে ঠান্ডার দৌলতে বাড়িতে, ল্যাবে, গাড়িতে সর্বদা কন্ট্রোলড হওয়া চলাচলের ঠেলায় আমার বিরক্তির চুড়ান্ত। হোটেলটিতে ঢুকেই ডানহাতে ছোট্ট ঘরোয়া অফিসঘর। আর বাঁহাতে সরু একচিলতে বাগান। বাগান অবশ্য সব জায়গাতেই। যেখানেই একটুকরো জায়গা পেয়েছে সেখানেই সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে গাছপালা দিয়ে। উঠোনের ঠিক মাঝখানে বেশ বড় একটা গাছ। তার গোড়াটা বাঁধানো। বেশ বসে আড্ডা দেওয়ার মতন। সব কিছুই খুব চেনা চেনা পরিবেশ। অফিসঘরে আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছেন একজন ভদ্রমহিলা। আমাদের চাইতে একটু বেশি বয়স হবে।স্বামী-স্ত্রী মিলে রিসোর্ট চালান। আমাদের জন্যেই বসে ছিলেন। আমরা যেতেই আমাদের সব বুঝিয়ে দিয়ে পাততাড়ি গুটোলেন। রাতে খাবার ব্যবস্থা নেই এখানে। বললেন, চলো, "আমরা বাড়ি ফেরার সময় তোমাদের বাজার এলাকায় নামিয়ে দিয়ে যাবো। ওখানে কিছু খাবার পেয়ে যাবে।" ওঁনারা এখানে থাকেন না। রাতে নিজেদের বাড়ি ফিরে যান। হোটেলের পিছনেই আটলান্টিক ডাকছে। এমতবস্থায় কি আর তাকে উপেক্ষা করে খাবার-দাবারের দিকে মন যায়? তাঁদের নরম করে না বলেই সোজা হোটেলের ঘরে। নম্বর টিপে ঘর আনলক করেই প্রাণ জুড়িয়ে গেল। ঘরটি ছোট্ট। কিন্তু একটা দেওয়াল সম্পূর্ণ কাঁচের। আর সেদিকেই খোলা বারান্দা। বারান্দা থেকে ঠিক নিচে তাকালেই, নীল সুইমিং পুল। আর দৃষ্টি একটু ওপরে ওঠালেই আরো বড় সুইমিং পুল, আরো গভীর নীল, অতলান্ত আটলান্টিক মহাসাগর। জীবনে প্রথম বার আটলান্টিকের এত কাছে এমন একটা দ্বীপে থাকতে এসেছি। যত কম দিনের জন্যই হোক না কেন। আমরা হাতের জিনিসগুলো নামিয়েই সোজা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে। সারাদিনের পথশ্রম ধুয়ে নিয়ে গেল পাঁচ মিনিটেই। বেশ কিছুক্ষন পর নিচে নামলাম খাবারের সন্ধানে। এবং বাইরে বেরিয়ে অনেকদিন পর টর্চের অভাব অনুভব করলাম। আমাদের গেঁয়ো পথে সন্ধ্যের পর রাস্তায় বেরোলে টর্চ একটা হাতে নিয়ে বেরোনোটা একটা অভ্যাস। কিন্তু এখন আমরা শহুরে জীব। আমাদের অবশ্য প্রয়োজনীয় তালিকা থেকে টর্চ অনেকদিন হলো বাদ গেছে। ভেইকোয়েস সেকথা আবার মনে করালো। যে রাস্তা দিয়ে এসেছিলাম সেদিকেই হাঁটতে থাকলাম। আশেপাশের বাড়ি থেকে আসা আলোয় পথ চলছি পাড়ার গলির মধ্যে দিয়ে। মোড় ঘুরতেই ডানদিকে সমুদ্রের পাড়ঘেঁষে একটা বাতিঘর। এটিই এখন ভেইকোয়েসের সচল বাতিঘর। এখন তার কাছে যাবার উপায় নেই। আপাতত কিছু খাবার জোগাড় করতে হবে। রাত বেড়ে যাচ্ছে।  দোকানদানী বন্ধ হয়ে গেলে হরিমটর ছাড়া কিছুই জুটবে না। দোকানেও যদি কার্ড কাজ না করে তাহলে তো এমনিও হরিমটর। বাকি সব কালকের জন্য তুলে রেখে চটপট পা চালালাম। রাস্তাটা কখনো উঁচু কখনো ঢালু হয়ে এমন নেমেছে যে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে নামতে হচ্ছে। এরাস্তার দিনে পাঁচবার হাঁটাচলা করলে পাঁচদিনেই পেটের ফ্যাটসেল গুলো "এখন আসি হ্যাঁ" বলে নিজের রাস্তা দেখবে। রাস্তাটা গিয়ে যেখানে একটু চওড়া হয়েছে সেখানে কয়েকটা দোকান। তার মধ্যে একটি খাবার দোকান। সাথে সামনের দিকে বার। টিমটিমে আলো। একেবারেই স্থানীয়। সামনে কয়েক কদম আগেই ফেরি ঘাট।  দিনের শেষে ভেইকোয়েসের লোকজনের "অমুকদার চায়ের দোকান" এর মতন একটা ঠেক বলা চলে। এখানেই ঢুকব কিনা ভাবছিলাম। কিন্তু এখানে কার্ড কাজ না করার প্রভূত সম্ভাবনা। এবং প্রথম দিনেই না বুঝেশুনে এমন একটা ঠেকে ঢুকে পড়াটা কি উচিৎ হবে? এই একটা শহুরে ভাবনা থেকে বেরোতে পারিনি এখনো। আরও একটু এগিয়ে দেখবো ঠিক করলাম। এই সময় দেখি তিন চারটি হৃষ্ট-পুষ্ট সারমেয় দোকানের সামনে থেকে লেজ টেজ নেড়ে উৎসাহী মুখে হাসছে। যেকোনো ধরণের কুকুররাই আবার আমায় তাদের কুম্ভমেলার হারিয়ে যাওয়া বোন ভাবে। আমিও তাদের দেখলে পরে-"ওরে আমার বাঁদর-নাচন আদর-গেলা কোঁতকা রে" বলে হামলে পড়ি। বাড়ি থেকে এদেশে আসার পর যখন রাস্তাঘাটে তেনাদের সাথে যথেচ্ছ মুলাকাতে ভাঁটা পড়ল, তৎসময় হইতেই কিঞ্চিৎ মনোকষ্টে ভুগিতেছিলাম। তা সান্ধ্যকালীন ঠেকের সামনে এঁনাদের বন্ধুসুলভ আমন্ত্রণকারী হাসিমুখ দর্শন করিয়া পূর্বতন আহ্লাদ জাগিয়া উঠিল। যাক বাবা, এখানে রাস্তাঘাট এক্কেবারে ফাঁকা নয়। দুপেয়েদের জঙ্গলে চারপেয়েও কটা পাওয়া যাবে কথা বলার মতন। পরে দেখেছিলাম যে তারা সংখ্যায় 'কটা' মাত্র নয়, বেশ অনেক কটাই। সংখ্যায় এবং চেহারায় আমাদের দেশের মতোই। একই রকম আবহাওয়া, তাই চেহারাও আমাদের মতোই। আর এই দোকানটি তাদেরও রাত্রিকালীন ঠেক। সারাদিন পাড়াবেড়িয়ে সন্ধ্যায় দোকানে ফিরে  আসে। যাইহোক, আপাতত তাদের "পরে দেখা হবে ভাই, এখন খেয়ে আসি" বলে এগিয়ে চললাম। সামনে ফেরিঘাটের কাছে দেখি একখানা পুঁচকে বাড়ি। সেটি ব্যাঙ্ক। এত রাতে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাঙ্ক বন্ধ। বাইরে দেখি একখানা এটিএম মেশিনও দাঁড় করানো আছে। দেখেই তো রে রে করে ছুটে  গেলাম। কিন্তু যা হয়, মেশিন আপাতত অকেজো। মুষড়ে চলে আসছি, একজন বললেন, আরো এগিয়ে বাজারেলাকে নাকি আরো একটি ব্যাংক এবং এটিএম আছে। এগোচ্ছি, দেখি একখানা 'সাবওয়ে', মানে সুড়ঙ্গ নয়, স্যান্ডউইচ এর দোকান। ওই মুহূর্তে ওখানে 'সাবওয়ে' দেখতে পেয়ে বিশ্বাস করুন, মনে হলো, হাতে স্বর্গ পেলাম। সাবওয়ে তে কার্ড দিয়ে পেমেন্ট করা যাবেই যাবে।সুতরাং, এটিএম, টাকা তোলা ওসব পরে দেখা যাবে, আগে তো খাই। এরপর এটি যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলেই হয়েছে আর কি। সাবওয়েটি একদম সাগরের পার ঘেঁষে। বাইরে বসার জায়গাটির পাঁচিলে এসে ধাক্কা দিচ্ছে একের পর এক ঢেউ। একবার মনে হলো এখানে বসেই খাই। কিন্তু দুজনেরই হোটেলের ওই বারান্দাটির জন্য মন ছটফট করছিল। ফিরে আসারই মনস্থির করলাম। টাকা তোলাও কাল হবেখন। কাল সকালেও হোটেলেই ব্রেকফাস্ট। সুতরাং টাকা এখনই না তুললেও চলবে। দুজনে দুখানা সাবওয়ের প্যাকেট হাতে দুলোতে দুলোতে আবার হেঁটে হেঁটে চারপেয়েদের শুভরাত্রি বলে ফিরে চললাম। বারান্দায় বসে খেতে খেতে ভাবছিলাম মনে আছে যে, আমরা এই দুই নিতান্ত সাধারণ গেঁয়ো ছেলে মেয়ে এরকম রাতে, আটলান্টিকের ঘাড়ে চড়ে নৈশাহার সারছি এ কয়েকবছর আগেও খানিক অভাবনীয়  ছিল বটে। নৈশাহারে যদিও স্যান্ডউইচ। তাও।        













  

Monday, 19 August 2019

মূল-February 18, 2018

একটা পিচঢালা রাস্তা, মাঝে মাঝে অবশ্য ওপরের চামড়া উঠে গিয়ে হাড়গোড় বেরিয়ে এসেছে, চকচকে ছবির মতন রাস্তা সে নয় যদিও, তবুও কাকভোরে কুয়াশা মাখা সে রাস্তায় হেঁটে বড়ো আরাম পেয়েছি। হোকনা সে খানিক ভাঙাচোরা, তবুও তার দুইপাশের জমাট বাঁধা কুয়াশা, আদিগন্ত আধসবুজ-আধহলুদ ধানের ভারে নুয়েপড়া ধানক্ষেত, সে আমার নিজের, বড়ো প্রিয়, বড়ো আরামের।  আজও একবুক কষ্ট নিয়ে তার কাছে গেলে সে বুক পেতে দেবে আমার চোখের জল ধারণ এর জন্য। আমি জানি, আজও সে ফিসফিসিয়ে বাম কানে বলে উঠবে , "কেঁদে নে মেয়ে, যতটা পারিস। সব পরাজয় এইখানে ফেলে উঠে দাঁড়া। কি বললি ? ফের পরাজয় এলে? আবার আসিস আমার কাছে। এ কান্নার জল শুকিয়ে যাবে ততদিনে আমার বুক থেকে। ফের ভিজিয়ে দিস নাহয় আমায়, তারপর উঠে দাঁড়াস। আরও একবার এর জন্য। আমি আছি তোদের সকলের জন্য।  চিরন্তন।"

আম মুকুলের গন্ধ নিয়েছো কোনোদিন, অমন কুয়াশা ভরা কাকভোরে? আমি নিয়েছি। মহূয়ার গন্ধে জগৎ মাতাল হয় শুনেছি। সে কি আমমুকুলের গন্ধের চেয়েও বেশি নেশার? কিশোরবেলার নেশাধরা দোলাচলে আরো নেশাড়ু হয়ে উঠতে সেই আমমুকুলের গন্ধের কোনো ভূমিকা কি নেই সত্যিই?

নতুন কাটা ধান, কুয়াশার আবছায়া, নেশাধরানো আমমুকুলের গন্ধ, আসন্ন দোলউৎসবের আবীর আর সদ্য কৈশোরের তাজা একটা মন, এই তো বসন্ত। আমার দেখা বসন্ত।

সূর্যাস্তের লালিমা দেখতে শেখায়নি কেউই।  শীতের শেষে, বাতাসে যখন হিম ফুরিয়ে যায়নি সেই বছরের মতন,তখন শিরশিরে হাওয়ায়, সদ্যকাটা ধানক্ষেতে বসে সন্ধ্যা নেমে আসা দেখেছি সেই কোন ছোট্টবেলায়। অজান্তেই কখন শিখে গেছি, অস্তগামী সূর্যদেব বিদায় নেন কেবল পরদিন আবার আমায় জাগাবেন বলে।  অশরীরী কেউ যেন বুকের মধ্যে বসে শিখিয়ে দিয়ে গেছে, "সে বিদায়বেলায় শান্ত থেকো। কোলাহল সন্ধ্যাসূর্যের জন্য নয়। অনুভব করো তার শেষ কিরণটুকু। শুষে নাও অন্তরে। আসন্ন রাত্রির পাথেয় কর তাকে।" মাঠের শেষে পড়শী গ্রামের গাছপালার আড়ালে চলে যেতেন সূর্যদেব। অপলক আমায় তাঁর কমলা-লাল আভায় আপাদমস্তক অবিচল করে দিয়ে। ফ্রকপরা সেই ছোট্ট আমি সেই তবে থেকেই সূর্যদেব এর বিদায়কালে আর বিদায়সম্ভাষণ টুকুও জানিয়ে উঠতে পারিনি কোনোদিন। সূর্যাস্তের রক্তিমাভা চোখে লাগলেই কেমন করে যেন ঝিমধরা চোখে কেবল তাকিয়ে থেকেছি, থাকি। শান্ত হয়ে আসে ভিতর-বাহির। আশেপাশের সমস্ত কিছু মুছে গিয়ে ভেসে উঠতে থাকে আমার আশৈশব এর সদ্যকাটা ধানক্ষেত, আর আমার কিশোরী চোখে দেখা অস্তগামী সূর্যদেব। যিনি বিদায় নিচ্ছেন কেবল ফিরে এসে আমায় জাগবেন বলে।

কুয়াশা মাখা-পাকা ধানক্ষেতের পাড় আঁকা-ভাঙা রাস্তা, বসন্তের আমমুকুলের গন্ধের নেশা, সন্ধ্যে নামার আগে, দিগন্তছোঁয়া ফাঁকা ধানক্ষেতে বসে সেদিনের মতো লাল-কমলায় সম্মোহিত হয়ে যাওয়া। এই আমার শৈশব-কৈশোর। এ কোনো কাব্য করে বলা কথা নয়, মধ্যাহ্ন সূর্যের মতো সত্যি। সত্যিকারের আমি। এখনকার আমির মূল। যে আজও আমার চোখের জলে বুক পেতে দেয়। মেরুদন্ড সোজা করার শক্তি জোগায়। যার কারণেই আজও সব পরাজয় সরিয়ে রেখে নিজেকে দেখি সম্মোহিতের মতো স্থির কি অপূর্ব এক সৃষ্টির সামনে।

http://ichhekhata.blogspot.com/2017/02/mul.html?m=0

Written on December 28th, 2017

“The wound is the place where the Light enters you.”-Rumi

পিঠ সোজা করে বোসো একবার, বন্ধ করো চোখ, প্রবেশ করো নিজের ভিতরে, বুকের খাঁচা ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে থুতনি উঁচু করে তাকাও দেখি আকাশের দিকে, এবার একবার ফুসফুস খালি করে ত্যাগ করো দেখি সমস্ত আবর্জনা।

করেছো?

এবার সত্যি করে বোলো দেখি, মাথার ভিতরটা একটুও খালি হল কিনা? দুকাঁধে পেশিগুলো একটুও শিথিল হয়নি কি? দুই ভ্রূ এর মাঝের চামড়াতে একটা ভাঁজও কি কমেনি?

কি বলছো?

জানিনা ঠিক কি পরিবর্তন হলো, কিন্তু ঠিক এর পরের শ্বাসটা মনে হলো যেন একটু বড় করে নিতে পারলাম।

তবে তো উৎসব শুরু।

তুমি যুদ্ধে জিততে শুরু করেছো যে। একটি একটি করে শ্বাস তোমার হয়ে কথা বলবে এভাবেই। তারপর শ্বাসের সাথে সাথে একটু একটু করে দেখবে গোটা ফুসফুসটা তোমার কথা শুনে চলছে। তারপর একদিন দেখবে পুরো শরীরটা, যেখানে তুমি রয়েছো এতগুলি বছর ধরে, সে তোমার কথা শুনতে শুনতে ক্রমশঃ তুমি হয়ে উঠেছে। আর অনুভূতিগুলো যেগুলো এতবছর ধরে পুতুল নাচন নাচিয়ে চলছিল তোমায়, একদিন তাদের কান ধরে শাসন করে, লাটাইয়ের সুতোর ডগায় বেঁধে হুস করে দিয়েছো আকাশে ভাসিয়ে।

সত্যি বলছি। একটা শ্বাস যদি বুকভরে নিতে পারো, এ সবই পারবে তুমি। একবার বিশ্বাস করে বুক চিতিয়ে চোখটা বন্ধ করে দেখোই না।

দুঃখ, দুঃসময়, প্রবঞ্চনা, একাকিত্ব, অপ্রেম, অনিশ্চয়তা এতো কিছু পেরিয়ে চলেছো তুমি, এখনো তো দিব্য বেঁচে আছো, নিজেও কি ভেবেছিলে পার হতে পারবে নড়বড়ে সাঁকোটা?

কিন্তু পেরিয়ে তো এলে? বা পার হবার বার জন্য সাহস করে প্রথম পা টা তো ফেলেছো দেখতে পাচ্ছি। তবে অর্ধেক যুদ্ধ তো জিতেই গেলে প্রায়। কি বললে, যন্ত্রনায় ছিঁড়ে পড়ছে মন? শরীর আর চলছে না? ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে জীবন? জানি তো।  হচ্ছে তো।  তোমার-আমার-ওর-সক্কলের। যন্ত্রণার প্রকার কেবল তোমার-আমার-ওর-সক্কলের মৌলিক। জীবন মৌলিক তাই যন্ত্রণাও মৌলিক।মৌলিক যোদ্ধার জীবন যাপন।  জীবন। যুদ্ধটা কেবল অমৌলিক। সত্যিটা হলো, প্রতিনয়ত, প্রতি সেকেন্ডে যুদ্ধটা জিতে চলেছি তুমি-আমি-ও-সক্কলেই। প্রতিদিনের ওঠা নামায়। নইলে আজও জানলা দিয়ে সূর্য্যাস্তের লাল আলো চোখে পড়লে একবার চোখ বন্ধ করে সে আলোটা চোখে মেখে নাও কেন তুমি? আজো খানসাহেবের আঙ্গুল সরোদ  ছুঁলে ঈশ্বর এসে স্পর্শ করেন কেন তোমার হৃদয়? আজও কেন নেই রাজ্যের বাসিন্দা কারো যুদ্ধজয়ের গল্প শোনার শেষে তোমার চোখ ভিজে আসে? আজও কেন আরো একবার চেষ্টা করতে ইচ্ছে করে? জিতেছ বলেই তো? ওই যে কবে প্রথম শ্বাসটা নিয়েছিলে চেষ্টা করে দেখবে বলে, সেইদিনেই জিততে শুরু করেছিলে নিজেও বোঝোনি। বুঝিনি- বোঝেনা। তুমি-আমি-ও-সক্কলে।

নতুন বছরে নতুন যুদ্ধের রসদ পেয়েছো তো আগের আগের সমস্ত বছরের যুদ্ধ গুলো থেকে? ব্যুহসজ্জাও সম্পন্ন হয়েছে নিখুঁতভাবে? হয়েছে। তোমার-আমার-ওর সক্কলের অজান্তেই।  এস তবে আরেকবার ব্রহ্মক্ষণে দরজা খুলে দাঁড়াই ভৈরবী আলোয়। নতুন যুদ্ধের আবাহনের অপেক্ষায়। জিতবো বলে। বুক পেতে ক্ষতটা গ্রহণ করবো বলে। সেই ক্ষতপথে ভৈরবী আলোর সবটুকু বুকের ভেতর গ্রহণ করবো বলে। বেঁচে উঠবো বলে। আরও একবার। তুমি- আমি-ও-সক্কলে। একসাথে। ভিন্ন ভিন্ন পথে।

ভাগ্যিস ক্ষতরা থাকে সক্কলের জীবনে, নইলে আলোরা যে বাইরেই মাথা কুটে মরতো (“The wound is the place where the Light enters you.”-Rumi)।

শুভ নববর্ষ

অর্পিতা

Sunday, 18 August 2019

রবিবারের সকালের মত

গত রবিবার বেশ মেঘ ছিল আকাশে। বৃষ্টিও ঝরছিল অঝোরে। আজ আবার এক রবিবার আমি জানলার দিকে পিঠ ফিরিয়ে দেওয়ালে থেকে দিয়ে বসে ল্যাপটপ খুলে টাইপ করছি অনেকদিন বাদে। ইয়ারফোন দিয়ে মাথায় গলে গলে পড়ছে রাগ দূর্গা। বাইরে ঝকঝকে রোদ্দুর। লিখতে ইচ্ছে করছে কিছু। কিন্তু কি লিখব? লেখার গল্প লিখতে ইচ্ছে করে।  কিন্তু সেসব অপ্রাসঙ্গিক আর ব্যক্তিগত। তাতে নতুন কোনো তথ্য নেই, আসলে নতুন কিচ্ছুটি নেই। আদ্যন্ত সাধারণীর রোজনামচা। আসলে কিছু লিখব বলে বাকি সব কিছু সরিয়ে গুছিয়ে বসা অনেকদিন পর। সময়ের দোহাই নয়, প্রশ্নটা ইচ্ছে আর প্রয়োজনের। এতদিন টুকরো টাকরা যা লেখার চেষ্টা করেছি সেসব আদতে লেখা নয়। দুয়েক কলম মনের কথা। ইচ্ছে করে গুছিয়ে সুন্দর কিছু লিখতে। কিন্তু আমি নিয়মানুবর্তী লিখিয়ে নই যে প্রতিদিন খাতা কলম খুলে নিয়ম করে নির্দিষ্ট সময়ে বসলেই কিছু না কিছু লাইন কলম বা কীবোর্ড বেয়ে বেরিয়ে আসবে। আর অমনি সেই বস্তুটি আগ্রহ নিয়ে অন্য আর একজন পড়বেন। আমি আসলে আর পাঁচজন মধ্যতিরিশের একজন সাধারণ মানুষ। যার বাকি অন্যদের মতন ছোটবেলায় ফিরে যাবার উপায় নেই। তাই সে মনখারাপ হলে ছোটবেলায় আশ্রয় খোঁজে। তার প্রতিদিনের এই অনন্ত চেষ্টা থেকে বেরিয়ে আসতে অচেনা মানুষদের জীবন থেকে গল্প খোঁজার চেষ্টা করে। তাদের লড়াই থেকে লড়াই করার রসদ জোটায়। আর পাঁচজনার মতোই। সকলেই কোনো না কোনো ভাবে এসবের মধ্যে দিয়ে যান আর সেসব দিয়ে কেউ মনে মনে মহাকাব্য লেখেন আর বিষ্মিত হন জীবনের অদ্ভুত সব প্লট বাস্তবে চাক্ষুষ করে। কেউ কেউ রং তুলি দিয়ে সেসব অভিজ্ঞতা ঢেলে দেয় ক্যানভাসে। কেউ সে জীবন জোড়া অভিজ্ঞতা ঢেলে দেন চলচ্চিত্র বানিয়ে। কেউ কেউ আবার যখন গান করেন বা নাচ, মনে হয়, সুর বা ছন্দ নয় তাঁর পুরো জীবনের শেখা বা অনুধাবন করা সমস্তটুকু তিনি ঢেলে দিচ্ছেন সেই সৃষ্টিতে। সেটি তখন আর কেবল সুর বা ছন্দ নয়, কোনো শ্রোতা বা দর্শকের প্রশংসাবাক্যের আশা বা দাবি নেই সেখানে। সেসব দেখলেই বোঝা যায়। জুড়ে নেওয়া যায় সেসব অনুভব নিজের অনুভূতির সাথে। আর লেখকরা সেই দিয়ে অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে বিরাট এক ছবি এঁকে চলেন। 

তবে মনে হয় প্রতিটি মানুষেরই জীবনে একটি মুখ্য বাক্যই বলার থাকে। সেটিই তার জীবনের প্রধান মন্ত্র। সেটির চারপাশেই আবর্তিত হয় তাঁর পুরো জীবন। সেই যে একটি সর্বদেশের সার্বজনীন প্রাচীন একটি ধারণা আছে না, যে, আমাদের প্রতিটি জন্মে কিছু না কিছু একটিমাত্র মূল মন্ত্র শেখা এবং জীবনে সেটি প্রয়োগ করার জন্যই আমরা সেই বারের জন্য জন্ম নিই। পুরো জন্মেই সেই বিষয়টির আশেপাশেই তাঁর আবর্তন ঘটে। জীবনের পজেটিভ বা নেগেটিভ অভিজ্ঞতা দিয়ে তাঁর সেই শিক্ষা পূরণ হয়। যাতে তিনি সেটি নিশ্চিত ভাবে জীবনের সাথে মিশিয়ে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন পরবর্তী লেশনের দিকে। কিন্তু সেই জন্মের জন্য বোধহয় তিনি এই একটিমাত্র বাক্যটি কেন্দ্রে রেখেই নানান সৃষ্টির বৃত্ত এঁকে চলেন। বেশ কিছু সময় পরে তাইই বোধহয় সেই স্রষ্টার সমস্ত সৃষ্টির মধ্যেই একটা মূলগত মিল আমরা প্রত্যক্ষ করি। সিনেমার ক্ষেত্রে এই আরো বেশি স্পষ্ট। কারণ তার চলমানতার কারণেই চলচ্চিত্রের তাৎক্ষণিক প্রভাব আমাদের মধ্যে বেশী। তাই একই পরিবেশক বা পরিচালকের দুই বা ততোধিক সৃষ্টির মধ্যেকার মিল এত চট করে চোখে পড়ে। আমাদের সবার জীবনেরই একই উদ্দেশ্য মনে হয়। কেবলমাত্র একটি বাক্য, একটি মন্ত্র শেখা এবং তাকে প্রয়োগ করা। বাক্যটা, মন্ত্রটা কেবল আলাদা আলাদা। তাই প্রত্যেকের জীবনের গল্প আলাদা, প্লট আলাদা। আমাদের কাজ কেবল বোধহয় হতাশা থেকে, সুখ থেকে, দুঃখ থেকে, প্রতীক্ষা থেকে, আনন্দ থেকে, না পাওয়া থেকে, অনেক পাওয়া থেকে, আলো থেকে, অন্ধকার থেকে, সারা জীবনের সমস্ত কিছু থেকে সেই একটি মাত্র বাক্যটিকে খুঁজেপেতে চিনে নেওয়া। তাকে আত্মীকরণ করা। জীবনে প্রয়োগ করা। তবেই আমাদের সাথে হয়ে চলা সমস্ত ঘটনার কার্যকারণ সম্পর্কে আমাদের সমস্ত অভিযোগ একটা উত্তর পাবে। আমাদের অভিযোগ করার আর কিচ্ছুটি বাকি থাকবে না।

লেখার গল্প লিখতে গিয়ে কতগুলি অগোছালো কথা লিখে ফেললাম। এসব হল, নিজের সাথে গল্প করতে বসা। অগোছালো লেখার এই একটি সুবিধা আছে, কোথাও পৌঁছানোর দায় নেই। শেষ করার তাড়া নেই। ধারাবাহিকতার নিয়মানুবর্তিতা নেই। বিষয়ও নেই, পুরোটাই নিজের সাথে প্রলাপ। তাই তর্কের অবকাশও নেই। কেমন এক দায়হীন আত্মকথন। ভেবে দেখেছি, আমার অলস মনের অলস লেখনীর সৃষ্টি তাই এত অগোছালো। রবিবারের সকালের মত। দায়হীন, তাড়াহীন। এই যে দুপুর একটা বেজে গিয়েছে। খাবার দাবারের জোগাড় নেই। ল্যাবের কিছু দায়-যা শনি-রবি বোঝে না। জীবনধারণের সাপ্তাহিক দায়িত্বপালন। সমস্ত কিছুকে সরিয়ে রেখে, কেবল বাংলা ভাষায় টাইপ করার স্বাধীনতা আর সুযোগ এই মুহূর্তে আছে বলে, একটা অদৃশ্য বুদ্বুদের মধ্যে ঢুকে কতগুলি অকিঞ্চিৎকর শব্দ পরপর বসিয়ে যাবার আর সেই সূত্রে নিজের সাথে দুদন্ড সময় কাটাবার মোহে এই এত শব্দের আয়োজন।     

Monday, 15 April 2019

অসমাপ্ত শত্রূতা



যাক আর কোনো ভয় নেই।  ঘাড়ের বাঁ দিকের ছোট্ট টিউমারটার সার্জিকাল রিমুভালের পর ডাক্তার তাইই বলেছিলেন অ্যাটর্নি মার্ক গরম্যানকে। মেলানোমা, বিশ্রী ধরণের স্কিন ক্যান্সার ছিল গরম্যানের। এরপর কেটে গেছে কোনো ঘটনাহীন আটটা বছর। ১৯৯৮ সাল। রুটিন ডাক্তারি চেক আপ এ গেছেন গরম্যান। পরীক্ষার পর ডাক্তারবাবুর ভ্রূ রীতিমত কুঁচকে উঠল। জিজ্ঞাসাই করে বসলেন, কি ব্যাপার মিস্টার গরম্যান, আপনার কি হঠাৎ পানাসক্তি ভীষণ বেড়ে গেল নাকি? পুরোনো মেলানোমা টিউমারটি বিশ্রী ভাবে তার রাজ্য বিস্তার করেছে গরম্যানের লিভারে। আশেপাশের অন্য অঙ্গেও ছড়ানোর চেষ্টা করছে। সাংঘাতিক প্রাণঘাতী এই মেলানোমা। ছড়িয়ে পড়লে, রোগ ধরাপড়ার ছয় থেকে দশ মাসের বেশি সময় দেয় না যুঝবার। গরম্যানের তখন সবে ঊনপঞ্চাশ। কেমন শান্ত হয়ে গেলেন গরম্যান।পৃথিবীর রূপ রস এত সীমিত ছিল তাঁর জন্য? 
বোনের কাছ থেকে খবর পেলেন হঠাৎ, কলোরাডোর কোন এক হাসপাতাল নাকি মেলানোমার চিকিৎসায় চলতি কেমোথেরাপির সাথে নতুন কি এক ওষুধ ব্যবহার করছে নাম ইন্টারলিউকিন-২, ডাকনাম-আইএল-২। ডুবন্ত মানুষের কুটোও ভরষা। পত্রপাঠ গোরম্যান মেরিল্যান্ড থেকে কলোরাডোর টিকিট কাটলেন। গোরম্যান যতক্ষণে কলরাডো পৌঁছবেন ততক্ষনে চট করে আমরা অন্য একটা গল্প একটু শুনে নিই কেমন? গল্পটা আইএল-২ এর। 

আমাদের শরীরের অসংখ্য ধরণের প্রোটিন থাকে। তাদের প্রত্যেকের জন্য নানান রকম নির্দিষ্ট ধরণের কাজ রয়েছে। আর তার ফলেই আমি, আপনি বা গরম্যান সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে চলে ফিরে বেড়াতে পারি। আর তার ভগ্নাংশের ভগ্নাংশ পরিমান এদিক ওদিক হলেই গন্ডগোল। হ্যাঁ এতটাই নিয়ন্ত্রিত আমাদের নিজেদের শরীর। এখন, এই আইএল-২ বস্তুটি কি? আইএল-২ হল এই অজস্র প্রোটিনের মধ্যে একধরণের প্রোটিন, যা কিনা তৈরী হয় টি-লিম্ফোসাইট বলে একধরণের শ্বেত রক্তকণিকা থেকে। এইরকম আরো নানান আইএল প্রোটিন আছে। সারা শরীরে নানা কাজে তারা ভীষণ ব্যস্ত। খুব সহজে বললে, এই আইএল-২ যদি শরীরে বেশি পরিমানে ঢোকানো যায় তবে উল্টে তারা এই টি-লিম্ফোসাইটকেই বেশি করে সক্রিয় করে তোলে। তা এই টি-লিম্ফোসাইট বেশি সক্রিয় হলে কি এমন হাতি-ঘোড়া লাভটা হবে শুনি? হাতি-ঘোড়া কি বলছেন মশাই? একেবারে ঐরাবৎ বা উচ্চৈঃশ্রবা বলা যেতে পারে। টি-লিম্ফোসাইট হল আমাদের শরীরের সেই মহার্ঘ্য কোষ যা আমাদের শরীরের কোয়ালিটি কন্ট্রোলার। শরীরের জন্য ক্ষতিকর যেকোনো রকম কোষকে খুঁজে নিয়ে তাকে বেমালুম গিলে ফেলে সে। অবশ্য চিনে নেবার জন্য আরো অন্যান্য বন্ধু বান্ধবদের সাহায্য লাগে। মানে অন্যান্য ধরণের রক্তকণিকাদের আর কি। সেসব এখন বাদ থাক বরং। গিলে ফেলার পর কি হল বলি। তারপর সেই গিলে ফেলা দুষ্টু কোষকে এক্কেবারে কীচক বধের মতন কুচি কুচি করে নষ্ট করে ফেলে, তাকে আমাদের শরীরের ডাস্টবিনের মধ্যে ফেলে, তবে তাদের ছুটি। হ্যাঁ রে বাবা আমাদের শরীরে প্রতিটি কোষে অসাধারণ একটি রিসাইকেল বিন সিস্টেমও আছে তো। আচ্ছা সে গল্পও নাহয় পরে হবে। আপাতত গরম্যানে ফিরতে হবে। তাহলে কি দাঁড়ালো? আইএল-২ বেশি থাকলে, টি-লিম্ফোসাইট বেশি করে এই আপদ বিদায়ের কাজটি করতে পারবে। সে বাইরে থেকে শরীরে ঢোকা বিচ্ছু জীবাণুই হোক বা গরম্যানের মতন বিগড়ে যাওয়া নিজের শরীরের কোষই হোক। এই আইএল-২ থেরাপি কাজ করেছিল গরম্যানের শরীরে। প্রায় পনের বছর গরম্যান ক্যান্সার ফ্রি জীবন কাটালেন। নিজেকে ভাগ্যবান মনে করা ছাড়া আর কিই বা করার ছিল তাঁর।  গোরম্যানের নিজের ভাষায় বললে, “Some doctors say my immune system is really smart, I just know I'm lucky.” 

এই আইএল-২ দিয়ে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে (ইমিউন সিস্টেম) ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র করার পদ্ধতিটিই  ইমিউনোথেরাপি (immunotherapy) হিসেবে ১৯৯২ তে প্রথম FDA (Food and Drug Administration) র মান্যতা পায়। সকলের শরীরের ইমিউন সিস্টেম সমান ভাবে সক্রিয় নয়, সুতরাং গরম্যানের শরীরে আইএল-২ কাজ করলেও আমার আপনার শরীরেও যে ঠিক একইরকম ভাবে কাজ করবে তার তো কোনো স্থিরতা নেই না। সুতরাং আরো অন্য অন্য ইমিউন ফ্যাক্টর খুঁজে বের করতেই হবে। মেলানোমা ছাড়াও অন্যান্য ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও ইমিউনোথেরাপির হাতিয়ার অন্য কোনো প্রোটিন। সুতরাং এই ক্যান্সার-ইমিউনোথেরাপি তে রিসার্চ, ইনভেস্টমেন্ট হু হু করে বাড়তে শুরু করল।তার পরবর্তী প্রায় একদশক কেটে গেছে আরো নতুন ইমিউন প্রোটিন খুঁজে বের করার জন্য। কিন্তু গরম্যানের মতন সাফল্য কোনোটাতেই আর আসেনি। বহু কোম্পানি, বহু সায়েন্টিফিক গ্রান্ট ব্যয় করেও কেবল হতাশারই ইতিহাস।

ইমিউনোথেরাপির আসল ইতিহাসের শুরু কিন্তু এর অনেক অনেক আগে। ১৮৯১ এর আগেই  ডাক্তাররা নজর করেছেন যে, কোনো ইনফেকশন হলে রহস্যজনক ভাবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারের প্রকোপ কমে যাচ্ছে। ১৮৯১ সালে, নিউয়র্কের সার্জেন ড: উইলিয়াম কোলে (William Coley) সেই অবজার্ভেশনের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে প্রথম রোগীদের টিউমারে ব্যাকটেরিয়া ইনজেকশন শুরু করেন। তাঁর আশা ছিল এই যে, বাইরের ব্যাকটেরিয়ার জন্য শরীরের ইমিউন সিস্টেম সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং সেই সক্রিয় ইমিউন সিস্টেম ব্যাকটেরিয়ার সাথে সাথে একই সঙ্গে টিউমারকেও ধ্বংস করবে। এইটি ছিল প্রথম পদক্ষেপ আজকের এই বিশাল ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপির জগতের। যদিও কোলের প্রচেষ্টা ছিল এক্কেবারেই একক। এবং সব চাইতে বড় কথা, ব্যাপারটা এতটা সোজা নয়। ইমিউন সিস্টেম সক্রিয় হল আর গপ করে ক্যান্সার কোষকে গিলে ফেলল, তা হয় নাকি? মনে করুন আপনার বাড়িতে চোর এলো। আর আপনার কুকুর তাকে চিনে ফেলে চেঁচাতে লাগলো এবং আপনি বন্দুক নিয়ে চোরকে আটকে দিলেন, আর চোর ধরা পড়ে গেল। এতই সোজা নাকি? চোর প্রথমেই এসে কুকুর আর ওই বন্দুকটার ব্যবস্থা নেবে তারপর নিজের কাজ শুরু করবে। ইমিউন সিস্টেম যেমন স্মার্ট, ক্যান্সার কোষ গুলি তার এক কাঠি বাড়া। তারা প্রথমেই নিজেদের এমনভাবে আড়াল করবে যাতে আপনার টি-লিম্ফোসাইট তাকে চিনতে না পারে। তারপর টি-লিম্ফোসাইট যাতে কাজ করতে না পারে তার জন্য কিছু প্রোটিন নিজের শরীরে তৈরী করবে ঢাল হিসেবে। মানে ওই কুকুর আর বন্দুকের কাজটাকে অকেজো করে দেওয়া আর কি। তার পর শুরু করবে নিজের বিধ্বংসী কাজ। তা এইসব বজ্জাত গুন্ডা প্রোটিন, যারা টি-লিম্ফোসাইটকে আটকে ক্যানসারকে বাড়তে সাহায্য করে, তাদেরকে কোনোভাবে আটকে দেওয়া যায় কিনা, ধ্বংস করা যায় কিনা তার প্রচেষ্টা চলছিলই অনেকদিন ধরে। এইরকম একটি ঢালস্বরূপ প্রোটিন হলো CTLA -4. অনেক বছরের অনেক ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর শেষে ২০১১ সালে FDA এই CTLA-4 কে নষ্ট করতে পারে এমন একটি ড্রাগকে বাজারে আসার অনুমতি দিল। বাজারে এল প্রথম ইমিউনোথেরাপিউটিক ড্রাগ Yervoy (ipilimumab)। 

অর্থাৎ ব্যাপারটা হল এরকম, শরীরের কোনো কোষ ক্যান্সার কোষে পরিণত হলে টি-লিম্ফোসাইট তাকে নষ্ট করতে ছুটে আসবে, ইতিমধ্যে ক্যান্সার কোষ এই CTLA-4 এবং আরো অন্য সব ঢাল বাগিয়ে বসে আছে টি-লিম্ফোসাইটকে আটকাবে বলে। ফলে টি-লিম্ফোসাইট আর নিজের কাজ করতে পারছে না। এমতাবস্থায় যদি Yervoy (ipilimumab) এর মতো কোনো ড্রাগ রোগীর শরীরে দেওয়া যায় তবে CTLA-4 কে আটকে টি-লিম্ফোসাইট আবার তার নিজের মত করে ক্যান্সার কোষ নষ্ট করতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা Yervoy এর লম্বা কার্যকারিতা। Yervoy নিয়ে তেরো বছর পর্যন্ত মেলানোমার রোগী নিরাপদ নিরাময় পেয়েছেন এই উদাহরণও আছে। সমস্যা হল অন্য জায়গায়।Yervoy কাজ করল মাত্র আট শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে। কারণ সকলের ইমিউন সিস্টেম সমান নয়। এবং CTLA-4 ছাড়াও আরো ঢাল আছে ক্যান্সার কোষের নিজেকে বাঁচাতে। এমনকি পনেরো শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে সাইড এফেক্ট দেখা গেল Yervoy নেবার পর। কারণ, কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সার কোষের সাথে সাথে সাধারণ নয় কোষকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে এই Yervoy। এখন উপায়? 

CTLA-4 এর মতোই ক্যান্সার কোষের আরো একটি ঢাল হল PDL-1।  প্রথম থেকেই কিছু গবেষক CTLA-4 এর সাথে সাথে PDL-1 এর বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন। Yervoy বাজারে আসার পাঁচ- ছয় বছরের মধ্যে এলো Nivolumab, PDL-1 এর কার্যকারিতার বিরুদ্ধ ড্রাগ। PDL-1 ইনহিবিটর, Nivolumab এর সুবিধা হলো, এটি  CTLA-4 ইনহিবিটর , Yervoy চেয়ে অনেক অনেক কম ক্ষতিকর নন-ক্যান্সার সাধারণ কোষের জন্য। অর্থাৎ এটি সাধারণ কোষের মধ্যে থেকে আরো ভালোভাবে ক্যান্সার কোষ কে খুঁজে নিয়ে তার PDL-1 প্রোটিনকে নষ্ট করে। এখন, CTLA-4 ইনহিবিটর এবং PDL-1 ইনহিবিটর, দুটোর মিলিত শক্তি আরো ভালো ভাবে সমর্থ হল ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে। ইমিউনোথেরাপিতে সাড়া দিলেন আরো বেশি সংখ্যক রোগী। সাফল্যের হার আরো একটু বাড়লো। এখন ক্যান্সারে ব্যবহৃত অন্য কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশন থেরাপির সাথে মিলিয়ে এই দুটি ইনিবিটরকে ব্যবহার করার চেষ্টা শুরু হল। মানে ব্যাপারটা দাঁড়ালো এরকম যে, অন্য এন্টিক্যান্সার ড্রাগগুলি শরীরে ঢুকে ক্যান্সার কোষকে মারবে, রেডিয়েশন থেরাপি ক্যান্সার কোষকে মারযেও সাথে সাথে ইমিউন ফ্যাক্টর গুলোকে টেনে ক্যান্সার এর জায়গায় নিয়ে আসবে। এবার এর সাথে CTLA-4 এবং PDL-1 ইনহিবিটর দিয়ে ক্যান্সার কোষের CTLA-4 এবং PDL-1 কে ধ্বংস করে তার চারপাশে নির্মিত সুরক্ষাবলয়টিকেও যখন ভেঙে দেওয়া হল তখন, শরীরের টি-লিম্ফোসাইটও তার সাথে হাত লাগালো ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে। এখন কিন্তু সাফল্যের হার আরো অনেক বেশি বেড়ে গেল। তবুও কিন্তু সমস্যা একটা রয়েই গেল, এই নানান কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশন বিভিন্ন রোগীর শরীরে বিভিন্ন রকম কাজ করে, এদের নানান সাইড এফেক্টগুলো তো রয়েই গেল।কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশনের অফ টার্গেট এফেক্টের জন্য তারা ক্যান্সার কোষ ছাড়া কিছুটা হলেও সাধারণ কোষকে নষ্ট করে তার ফলে টিউমার সাইজ ছোট হয়ে বা অনেক ক্ষেত্রে মিলিয়ে গেলেও অনেকের ক্ষেত্রেই তারা আবার ফিরে এলো, বা অন্য শারীরিক সমস্যা শুরু হল। যে সমস্যার সমাধান এখনো পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। পরবর্তী ধাপের চ্যালেঞ্জ এইটাই। গবেষকরা নানান দিক থেকে এই সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখনো সময় আসেনি সেই গল্প লেখার। হয়ত আরো পাঁচ বা দশ বছর পর আমাদের মুখে হাসি ফুটবে। আসার কথা এই যে, চিকিৎসায় সাড়া দেওয়া রোগীর শতকরা অনুপাতটা এখন অনেক অনেক বেশি। 

এর মধ্যে একটি প্রজেক্টের কথা না বললেই নয়। সেটি হলো, এডাপ্টিভ টি-সেল থেরাপি। মেরিল্যান্ডে ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে বৈজ্ঞানিক ড: স্টিভেন রোজেনবার্গ একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করলেন, যেখানে ক্যান্সার রোগীদের শরীর থেকে তাদের টি-লিম্ফোসাইট এবং খানিকটা ক্যান্সার কোষ বের করা হল। তারপর ওই টি-লিম্ফোসাইটের মধ্যে থেকে যারা ওই রোগীর ক্যান্সার কোষকে মারতে পারে তাদের বেছে নিয়ে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হল। তারপর সেই কোষগুলিকে ওই যে প্রথমে বলেছিলাম আইএল-২ (গরম্যানের চিকিৎসায়), তাই দিয়ে এক্টিভেট করে আবার রোগীর শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। এবং এই যাত্রায় ড:রোজেনবার্গ প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ মেলানোমা রোগীর টিউমার কমিয়ে দিতে, এমনকি কুড়ি শতাংশের সম্পূর্ণ নিরাময় করে দিতে সমর্থ হলেন।১৯৯৮ এ যখন গোরম্যানের চিকিৎসা শুরু হয় তখন মেলানোমা রোগীর আয়ু ছিল খুব বেশি হলে একটি বছর।  যাত্রাটা বড় কম দিনের ছিল না,  প্রায় দুই দশক। 

এডাপ্টিভ টি-সেল থেরাপির সবচেয়ে বড় সমস্যা হল টেকনিক্যালিটি। রোগীর দেহ থেকে টি-সেল বের করে এনে- ঝেড়ে -বেছে -এক্টিভেট করে আবার রোগীর দেহে সুষ্ঠ কোষগুলি ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে অনেক গুলো টেকনিক্যাল চ্যালেঞ্জ আছে।  ফলত চিকিৎসার খরচ বাড়ে এবং সাফল্যের হার একটু হলেও কমে। 

আরো একটি বিষয় হল, সমস্ত রকম ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ইমিউনোথেরাপি কাজ করবে না। কারণ খুব সোজা, আপনার টি-লিম্ফোসাইটকে তো ক্যান্সারের জায়গায় পৌঁছতে হবে, তবে তো ক্যান্সার কোষ সেই টি-লিম্ফোসাইটের বিরুদ্ধে CTLA-4, PDL-1 বা অন্য প্রোটিন দিয়ে নিজের চারপাশে সুরক্ষা বলয় তৈরী করবে, আর তখন আপনি এইসব প্রোটিন এর বিরুদ্ধে ইনহিবিটর ব্যবহার করে সেই সুরক্ষাবলয় ভেঙে টি-লিম্ফোসাইটকে জায়গা করে দেবেন ক্যান্সার কোষকে মারার। এখন টি-লিম্ফোসাইট যদি নাই পৌঁছায় তবে তো এই অস্ত্রে যুদ্ধে জেতা যাবে না মশাই। তখন অন্য উপায় ভাবতে হবে। সে আবার অন্য গল্প। কিন্তু হ্যাঁ, দুই দশকের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা গবেষণার পরে মেলানোমা, কিডনি বা ফুসফুসের ক্যান্সারের মতন ইমিউন কোষের সহজ বিচরণ ভূমি যেসব ক্যান্সার, তাতে এই ইমিউনোথেরাপি নিঃসন্দেহে দিনবদলের খবর এনেছে।

আর সেই দিনবদল হয়েছে কাদের হাত ধরে জানেন? এই দুই দশকের যাত্রাপথের প্রধান দুই কান্ডারী কারা বলুন দিকি? নিশ্চয়ই তাঁদের নাম আপনি জানেন। মানে খবরের কাগজে, টিভিতে দেখেছেন। আচ্ছা বলছি, জেমস এলিসন (James P Allison) আর তাসুকু হানজো (Tasuku Hanjo) এই নাম দুটো নিশ্চয়ই আপনার চেনা? তাই না? গতবছর মানে, ২০১৮ তে ফিজিওলোজি এন্ড মেডিসিনে নোবেলটা এঁনাদের দুজনের নামেই লেখা হল যে। সেই কোন ১৯৯০ সাল নাগাদ CTLA-4 এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন এলিসন, আর PDL-1 বিরুদ্ধে হানজো। তারপর তো ইতিহাস।  

১৯৯৮ এর গরম্যানের গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম। যখন তাঁর খাতায় কলমে আয়ু ছিল মাত্র এক বছর, ২০১৪-র সেই একই গোরম্যানের কথা বলি। গরম্যান ২০১৪-তে বারবার দুঃখ করেছেন যে মেলানোমা সাপোর্ট গ্রূপে পাওয়া তাঁর এক বন্ধুও যদি তাঁর সাথে ইমিউনো থেরাপির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নাম লেখাতেন। তাঁর অন্য আর এক বন্ধুর কাহিনী অবশ্য একদম বিপরীত। তিনি CTLA-4 ইনহিবিটর, Yervoy ট্রিটমেন্টে সম্পূর্ণ নিরাময় পেয়েছেন। গরম্যানের নিজের মেলানোমা? প্রতি দুই বছর অন্তর স্ক্যান করা হয়। এখনো কোনো সমস্যা নেই তাঁর। তাঁর নিজের ভাষায়, “My immune system has it under control.” 


'KNOCK CANCER OFF THE BOARD'