Thursday, 4 January 2018

কেক


১৯৯৩-৯৪ সাল নাগাদ কলকাতা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে পশ্চিমবঙ্গের কোনো একটি গ্রামে বছর দশ-বারোর বালিকার জন্য কেক মানে ছিল বাপুজী কেক। নকল চেরির মোজাইক করা ময়দার চৌকোনা টুকরো আর ওপরে সবজে-লাল তেলতেলে কাগজের মোড়ক। তার স্বাদ যদিও তখনও অপূর্ব লাগতো, এখনো এই কেক-প্যাস্ট্রির দেশে একশো রকম কেক খেয়েও অপূর্ব লাগে। যদিও অনেকের মতে বাপুজী কেক জঘন্য। আমার মত উল্টো। ২৫শে ডিসেম্বর তখন ছিল আমবাঙালির কাছে কেক আর পিকনিকের উৎসব। আমাদেরও তাই ছিল। ঐদিন বাবা দোকান থেকে বা বেকারি থেকে একটু বড় সাইজের গোল বা চৌকো কেক আনতো। গঠনগত বা গুণগত দিক থেকে বাপুজী কেক এর সাথে তার বিশেষ তফাৎ না থাকলেও এই কেকগুলির একটা বিশেষ গন্ধ থাকতো। জানিনা কিসের। বড়দিন উপলক্ষে বিশেষ সুগন্ধী মেশানো হতো বোধহয়। আমার ভালো লাগতো না। কিন্তু ভালো লাগছে না বলে খাবোনা, এই মারাত্মক ঘটনা ঘটানোর মতন সাহস ছিল না তখন, তাই ওই শুকনো, ভালো না লাগা গন্ধের বড়দিন স্পেশাল কেক খেতেই হতো দুচার দিন ধরে। মনে মনে বাপুজি কেক খাচ্ছি মনে করে। তখন কেকের গুণগত মান নির্ণয়ের জন্য বাপুজি কেকের চেয়ে ভালো আর কোনো মাপকাঠির কথা আমার জানা ছিল না।

তা বাপুজী কেকই খাচ্ছিলাম। আমার সেই একনিষ্ঠ বাপুজী প্রেম প্রথম বারের জন্য টাল খেলো যখন মা আমাদের কোনো একজন সৌখিন রাঁধিয়ে আত্মীয়ার কাছ থেকে কেক বানানো শিখলো। কেক বানানো হবে চোখের সামনে? তাও আবার বাড়িতে? এতো অবিশ্বাস্য ব্যাপার। বেকিং পাউডার এলো বড়বাজার থেকে অফিসফেরতা বাবার ব্যাগে চড়ে। ডিম-ময়দা-চিনি এসব তো ছিলই। কিছু চালকুমড়োর মোরব্বা (টুটি-ফ্রুটির কাজ করবে), চেরি (রং করা করমচা, তখন ঐগুলোকেই চেরি বলে জানতাম) এসবও এলো অবিশ্বাস্য জিনিসটি তৈরী হওয়ার পর তার সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির কাজে লাগবে বলে। তার পর বহু অপেক্ষা আর "কবে বানাবে?" "কবে বানাবে?" বলে মা কে অবিরত বিরক্ত করার শেষে একদিন এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আগেকার রান্না ঘরে তখন বোধহয় গ্যাস আসেনি আমাদের বাড়িতে। কেরোসিনেই স্টোভ, কয়লার আঁচের তোলা (portable) উনুন আর কাঠের উনুনের যুগ চলছিল। কেরোসিনের স্টোভে বসানো হলো প্রেসার কুকার। তার ভেতরে secondary heating procedure এ বেকিং হবে বলে আর একটি তেল মাখানো শক্তপোক্ত অ্যালুমিনিয়ামের বাটি। সেই তৈলাক্ত বাটিতে রইলো ময়দা-ডিম- দুধ-চিনি-বেকিং পাউডার এর মহার্ঘ্য মিশ্রণ। এবার প্রেসার কুকারের ঢাকনা থেকে ভারী প্রেসার কন্ট্রোলার, মানে যাকে বাঙালির রান্নাঘরে "সিটি" বলে, সেটি খুলে দিয়ে কুকার ঢাকা দিয়ে দিব্য একটি ছোট খাটো ভারতীয় কেক ওভেন বানানো হলো। এই বার অপেক্ষা। এখনো মনে আছে, স্টোভের পাশে উবু হয়ে তীর্থের কাকের মতো বসে আছি আর ভাবছি কখন অমৃত প্রস্তূতি সমাপ্ত হবে আর সেখান থেকে একখণ্ড খসে পড়বে সোজা আমার রসনায়। আর বড়দিনের আগে পরে বন্ধুমহলের গালগল্পের আসরে আমার ঝুলি একধাক্কায় চড়চড়িয়ে "বাবা বড়দিনে কেক এনেছে " থেকে "বড়োদিনে মা কেক বানিয়েছে" -তে উত্তরিত হবে। সে অপেক্ষাটা বড্ড বেশি ছিল মনে পড়ে। মা থেকে থেকেই প্রেসার কুকারের ঢাকনা খুলে দেখে আর উলবোনার কাঁটা গেঁথে দেখে যে ভেতরটা এখনো তরল কিনা। আমিও সাথে সাথে চক্চকে চোখ নিয়ে উঠে আসি মায়ের পাশে আর প্রতিবারেই মা আর আমায় হতাশ করে উলের কাঁটার সাথে সাথে খানিকটা করে অর্ধতরল ময়দার মিশ্রণ উঠে আসে। তা সমস্ত অপেক্ষার মতোই ক্রমে একসময় শেষ হলো সেই অপেক্ষাও। স্টোভ নিভলো। কুকার ঠান্ডা হলো। কুকারের ঢাকনা খোলা হলো আর তিন জোড়া তৃষিত হৃদয় (আমার, মায়ের আর কাকিমার) ঝুঁকে পড়লো ছোট্ট অ্যালুমিনিয়ামের কুকারটার ওপর।

আর মুচমুচে উৎসাহ একসেকেন্ডেই ন্যাতানো মুড়িতে পর্যবসিত হলো।

এতদিনের দেখা সমস্ত কেকই সুন্দর বাদামি রং হয়। এই কেকের ওপরটা সম্পূর্ণ ফ্যাটফ্যাটে সাদা।  এ আবার কিরকম কেক? মায়ের কতটা খারাপ লেগেছিলো জানিনা। আমার চোখ ফেটে প্রায় জল আসার জোগাড়। যাই হোক, সেই কেক কাটা হলো। খেয়ে দেখি ওমা!!!!! দিব্যি স্বাদ। বাপুজি কোথায় লাগে! মায়ের মুখেও হাসি। যাক ব্যাপারটা একেবারে ফেলে দেবার মতো হয়নি তাহলে। তবে তো protocol এর main structure রেডী। ওপরের রঙের ব্যাপারটা নিয়ে protocol-এ কিছু fine tuning করতে হবে। সে তো করতেই হয় সমস্ত নতুন এক্সপেরিমেন্টে। ব্যাপারটি হলো, প্রেসার কুকার আর কেরোসিন স্টোভের কম্বিনেশন কেককে ওপর থেকে উত্তাপ না দিতে পারায়, ওপর দিকটা বেকড হয়েছে কিন্তু রং ধরেনি। যাই হোক, এরপর পরবর্তী কেকগুলোয় ক্রমে ক্রমে ভ্যানিলা ফ্লেভার, কমলালেবুর শুকনো খোসার গুঁড়ো দিয়ে অরেঞ্জ ফ্লেভার এসব যোগ হলো। আমি থাকতাম কেক বানানো শেষ হলে তাকে বাদাম আর চেরি (করমচা)-র টুকরো দিয়ে কনে সাজানোর কাজে। ক্রমে বাড়িতে কেক বানানোর ছোট ওভেন এলো। সেই ওভেন মায়ের সাথে সাথে একসঙ্গে বুড়ো হলো। এখনো দুই বৃদ্ধা সঙ্গিনী মিলে তারা প্রতি শীতে কেক বানিয়ে যাচ্ছে। আর একটু বড় হবার পর মায়ের সেই রেসিপি কে অল্প একটু আধটু পরিবর্তন- পরিবর্ধন করে আমিও নেমে পড়েছি মাঠে। বাপুজি এখন দ্বিতীয় স্থানে। 'মা' জী টাই ফার্স্ট।                               

এই বেলা আর একটি ছোট্ট ঘটনা বলতে ইচ্ছে করছে। সময়টা ছিল এই ২৫শে ডিসেম্বর থেকে পয়লা জানুয়ারির মধ্যে বা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ। তখন বৎসরান্তের এই পুরো সপ্তাহটা ছুটি থাকতো বলে মনে পড়ে না। ২৫শে ডিসেম্বর ছুটি। আর পয়লা জানুয়ারি ছুটি। আমার সেবছরই প্রথম হাই স্কুল। অর্থাৎ কিনা পঞ্চম শ্রেণী। স্কুলের টিফিন ব্রেকে আমি-সাবিনা-অপর্ণা-স্বাতী চারজনে প্রতিদিনের মতো রোদে পিঠ দিয়ে টিফিন খেতে বসেছি। ভাগাভাগি করে নাকে মুখে গুঁজে খাওয়া হবে যাতে খেলার জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়। তা সেদিন আর খেলা হয়েছিল কিনা মনে পড়ে না। কিন্তু অন্য একটা কারণে ওই দিনটা আমার মনে জ্বলজ্বলে হয়ে রয়েছে। সবার টিফিন বাক্স খুলে রোজকারের মতন বেরোলো রুটি-তরকারি, পাউরুটি-কলা-মিষ্টি বা মুড়ি-চানাচুর ইত্যাদি চেনা খাবার দাবার। অপর্ণার বাক্স খুলতেই ম্যাজিক। একি !!! হলদেটে সাদা হালকা ফুরফুরে কেক। বাপুজি- র থেকে শতগুণ নরম। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার, সেই নরম তুলতুলে কেকের ওপর সবুজ রঙের পুরু পরতটা কি? লালচে গোলাপি নকশা করা?

ক্রিম!!!!!!

ওটা ছিল প্যাস্ট্রি। আমরা তখন বলতাম ক্রিম কেক। অপর্ণার বাবা কলকাতা থেকে নিয়ে এসেছেন বড়দিন উপলক্ষে। এই ধরণের একটি বস্তূর অস্তিত্ব যে পৃথিবীতে আছে সেটা আমার জানা থাকলেও চর্মচক্ষে তা অবলোকন করার সুযোগ আমার তখনো হয়নি। এই তবে 'ক্রিম কেক?' ওখানে উপস্থিত অন্য কেউ 'ক্রিম কেক?' চোখে বা চেখে দেখেছিলো কিনা আমি জানিনা, আমি তার আগে চেখে তো দূরস্থান, চোখেও দেখিনি। সেদিন দেখলাম। চাখলাম। জ্ঞানবৃক্ষের নিষিদ্ধ ফলের মতো। মানবজন্মের প্রথম পাপের মতো। তারপর আর কি? পাপ করতেই থাকলাম। আজও করে চলেছি।সেদিনের সেই প্রথম 'প্যাস্ট্রিপ্রাশন' হবার পর বাড়ি এসে খুব সাধারণভাবে মাকে বলেছিলাম বটে অবিশ্বাস্য স্বাদের কথা কিন্তু এমন ভাবে, যাতে মা বুঝতে না পারে যে খাদ্যটি আমার বালিকা রসনায় অমৃতসমান মনে হয়েছে। কারণ কোনোদিন মুখে না বললেও সেই দশ এগারোর গ্রাম্যবালিকাটি কোনো ভাবে বুঝতো যে, বস্তূটি যতই সুস্বাদু হোক না কেন তার বাবার পকেটের পক্ষে খুব একটা স্বাস্থ্যকর নয়। তদুপরি, কোনো জিনিস ভালো লেগেছে বলে নির্লজ্জের মতো তার জন্য বায়না করাটা কোনো ভদ্রশিশুজনিত আচরণ নয় এটিও ততদিনে মগজে ঢুকে গেছিলো খুব ভালো করে। তাই কয়েক বছরের জন্য 'ক্রিম কেক' খাওয়ার পাপ কাজ থেকে নিজেকে সন্তর্পনে আগলে রেখেছিলাম। তারপর ২০০১ সালে কলকাতায় কলেজে ভর্তি হবার কয়েকমাস পর সপ্তাহান্তে বাড়ি যাবার আগে বাড়ির জন্য কিছু নিয়ে যাবার বাসনায় কি নেবো কি নেবো ভাবতে ভাবতে দেখি, পল্লবীর পিছন পিছন গিয়ে ঢুকেছি কোথায়?  না, কলেজপাড়ায় কাঁচ ঢাকা কেক-প্যাস্ট্রির দোকানে। আর কিছু ভাবতে হয়নি। পুরো কলেজজীবনে বাড়ি যাবার দিন আমার হাতে বেশিরভাগ দিনই থাকতো সেই 'ক্রিম কেক' বা প্যাস্ট্রির বাক্স।
                  

Friday, 29 December 2017

শুভ নববর্ষ


“The wound is the place where the Light enters you.”-Rumi


পিঠ সোজা করে বোসো একবার, বন্ধ করো চোখ, প্রবেশ করো নিজের ভিতরে, বুকের খাঁচা ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে থুতনি উঁচু করে তাকাও দেখি আকাশের দিকে, এবার একবার ফুসফুস খালি করে ত্যাগ করো দেখি সমস্ত আবর্জনা। 

করেছো? 

এবার সত্যি করে বোলো দেখি, মাথার ভিতরটা একটুও খালি হল কিনা? দুকাঁধে পেশিগুলো একটুও শিথিল হয়নি কি? দুই ভ্রূ এর মাঝের চামড়াতে একটা ভাঁজও কি কমেনি?

কি বলছো? 

জানিনা ঠিক কি পরিবর্তন হলো, কিন্তু ঠিক এর পরের শ্বাসটা মনে হলো যেন একটু বড় করে নিতে পারলাম। 

তবে তো উৎসব শুরু। 

তুমি যুদ্ধে জিততে শুরু করেছো যে। একটি একটি করে শ্বাস তোমার হয়ে কথা বলবে এভাবেই। তারপর শ্বাসের সাথে সাথে একটু একটু করে দেখবে গোটা ফুসফুসটা তোমার কথা শুনে চলছে। তারপর একদিন দেখবে পুরো শরীরটা, যেখানে তুমি রয়েছো এতগুলি বছর ধরে, সে তোমার কথা শুনতে শুনতে ক্রমশঃ তুমি হয়ে উঠেছে। আর অনুভূতিগুলো যেগুলো এতবছর ধরে পুতুল নাচন নাচিয়ে চলছিল তোমায়, একদিন তাদের কান ধরে শাসন করে, লাটাইয়ের সুতোর ডগায় বেঁধে হুস করে দিয়েছো আকাশে ভাসিয়ে। 

সত্যি বলছি। একটা শ্বাস যদি বুকভরে নিতে পারো, এ সবই পারবে তুমি। একবার বিশ্বাস করে বুক চিতিয়ে চোখটা বন্ধ করে দেখোই না। 

দুঃখ, দুঃসময়, প্রবঞ্চনা, একাকিত্ব, অপ্রেম, অনিশ্চয়তা এতো কিছু পেরিয়ে চলেছো তুমি, এখনো তো দিব্য বেঁচে আছো, নিজেও কি ভেবেছিলে পার হতে পারবে নড়বড়ে সাঁকোটা? 

কিন্তু পেরিয়ে তো এলে? বা পার হবার বার জন্য সাহস করে প্রথম পা টা তো ফেলেছো দেখতে পাচ্ছি। তবে অর্ধেক যুদ্ধ তো জিতেই গেলে প্রায়। কি বললে, যন্ত্রনায় ছিঁড়ে পড়ছে মন? শরীর আর চলছে না? ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে জীবন? জানি তো।  হচ্ছে তো।  তোমার-আমার-ওর-সক্কলের। যন্ত্রণার প্রকার কেবল তোমার-আমার-ওর-সক্কলের মৌলিক। জীবন মৌলিক তাই যন্ত্রণাও মৌলিক। মৌলিক যোদ্ধার জীবন যাপন। জীবন। যুদ্ধটা কেবল অমৌলিক। সত্যিটা হলো, প্রতিনয়ত প্রতি সেকেন্ডে যুদ্ধটা জিতে চলেছি তুমি-আমি-ও-সক্কলেই। প্রতিদিনের ওঠা নামায়। নইলে আজও জানলা দিয়ে সূর্য্যাস্তের লাল আলো চোখে পড়লে একবার চোখ বন্ধ করে সে আলোটা চোখে মেখে নাও কেন তুমি? আজো খানসাহেবের আঙ্গুল সরোদ  ছুঁলে ঈশ্বর এসে স্পর্শ করেন কেন তোমার হৃদয়? আজও কেন নেই রাজ্যের বাসিন্দা কারো যুদ্ধজয়ের গল্প শোনার শেষে তোমার চোখ ভিজে আসে? আজও কেন আরো একবার চেষ্টা করতে ইচ্ছে করে? জিতেছ  বলেই তো? ওই যে কবে প্রথম শ্বাসটা নিয়েছিলে চেষ্টা করে দেখবে বলে, সেইদিনেই জিততে শুরু করেছিলে নিজেও বোঝোনি। বুঝিনি- বোঝেনা। তুমি-আমি-ও-সক্কলে।  

নতুন বছরে নতুন যুদ্ধের রসদ পেয়েছো তো আগের আগের সমস্ত বছরের যুদ্ধ গুলো থেকে? ব্যুহসজ্জাও সম্পন্ন হয়েছে নিখুঁতভাবে? হয়েছে।  তোমার-আমার-ওর সক্কলের অজান্তেই।  এস তবে আরেকবার ব্রহ্মক্ষণে দরজা খুলে দাঁড়াই ভৈরবী আলোয়, নতুন যুদ্ধের আবাহনের অপেক্ষায়। জিতবো বলে। বুক পেতে ক্ষতটা গ্রহণ করবো বলে। সেই ক্ষতপথে ভৈরবী আলোর সবটুকু বুকের ভেতর গ্রহণ করবো বলে। বেঁচে উঠবো বলে। আরও একবার। তুমি- আমি- সক্কলে। একসাথে। ভিন্ন ভিন্ন পথে। 

ভাগ্যিস ক্ষতরা থাকে সক্কলের জীবনে, নইলে আলোরা যে বাইরেই মাথা কুটে মরতো (“The wound is the place where the Light enters you.”-Rumi)।  

শুভ নববর্ষ।    




Saturday, 8 July 2017

ফিরে আসছ প্রেম?

ফিরে আসছ প্রেম?
বদ্ধ ঘর রয়েছে তোমার অপেক্ষায়।
তুমি এসে খুলে দাও সবকটা জানলা।
শীতল বাতাস এসে ভরে দিক ঘর।
এতদিন রোদ ঢোকেনি এঘরে।
তুমি সাথে করে একছিটে রোদ্দুর আনতে যেন ভুলো না।
ছড়িয়ে দেব ঘরে।

তাড়াতাড়ি এস প্রেম।
একজোড়া চায়ের কাপের একটা
হারিয়েছে উষ্ণতা।
অন্য কাপটি যে ছিল অনুপস্থিত।
এইকয়দিন খঞ্জনা দুটিও ছিল নিখোঁজ।
জানলার বাইরে নরম আদর
চুইঁয়ে পড়ছিল না তো, তাই।
খঞ্জনাদুটি আসে যে ওই
আদরটুকুনিই খুঁটে খেতে।
প্রেম, আসবার সময় আঁচলা ভরে খানিক আদরও এনো, কেমন।
ঘর উপচে খানিক দেব
জানলার বাইরে ছড়িয়ে।

ফিরে আসছ প্রেম?
সাবধানে এসো,
তাড়াহুড়ো নেই কোনো।
তাড়াতাড়িতে ভুল করে
যেন ভুল ঠিকানায় যেও না।
তোমার জন্য যত্ন করে
শান্ত ভোরের আলো, নিস্তব্ধ চকচকে দুপুর
আর শিরশিরে হাওয়া মাখা সন্ধ্যা রেখেছি সাজিয়ে।
ঠিক যেমনটি তুমি চেয়েছিলে।
তুমি এসে সব দেখে বুঝে নিও,
নিজের মতন করে।
আর হ্যাঁ প্রেম, আসার সময়
খানিক বৃষ্টিও এনো সাথে করে।
ঠিক ততটুকুন, যতটা লাগে
অপ্রেমকে আপাদমস্তক ভিজিয়ে দিতে।

Monday, 26 June 2017

বর্তমান

ভাল মন্দের হিসেব কষেছ মেয়ে?
পুষেছ নীতির মালা?
তাই তো তোমার ঘর নেই কোনো,
নেই কেউ শোনবার।

দেশ তো তোমার নেই জানতাম,
ছিলোও না কোনোকালে।
আগু পিছু?
সেও গেছে বুঝি?
পথ নেই ফেরবার?

পলকে হারালে অতীত তোমার,
পলকে ভবিষ্যৎ।
সামনে কেবল একপদ ভূমি,
সত্য বর্তমান।

Sunday, 21 May 2017

পিদিমের আলো

সপ্তাহভর টাপুরটুপুর, আকাশের মুখ ভার।
মেঘমাখানো বিকেলবেলায়, গৃহস্থালির হার।
মেঘের গায়ে চু কিত কিত, জানলাতে মন গোল্লাছুট।
ছোট ছোট ছোট ছুট্টে গিয়ে, ছোট্টবেলার ছক্কা পুট।
মেঘের গায়ে সাপ লুডো নেই, মেঘের রঙ কালো।
ঘরের কোনে আজ বিজলিবাতি, নেই পিদিমের আলো।

Sunday, 9 April 2017

প্রত্যাশা

মৃতবৎসা মায়ের তৃতীয় এবং
শেষ গর্ভের সন্তান আমি।
জন্মের সময় থেকেই
আমার কাছে
কারও কোনো প্রত্যাশা ছিল না
কেবল বেঁচে থাকা ছাড়া।
পুত্র বা কন্যা,
বুদ্ধিমান বা বোধহীন,
সৌন্দর্য বা কদর্যতা,
দায়িত্বশীল বা দায়িত্বহীন
কোনোকিছুরই আশা করেনি কেউ
শুধুমাত্র আমার
জীবিত থাকা ছাড়া।
কন্যারূপে,
বন্ধুরূপে,
স্ত্রীরূপে
আমিও হয়ত তাই
কারও কোনো
প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব
নিইনি কোনোদিন।
কেবল বেঁচে আছি।
দুমড়ে বেঁকে যাওয়া পিঠ,
আর আদ্যন্ত স্বার্থপরতা সম্বল করে
আজও জীবিত আছি
প্রবলভাবে।

Wednesday, 29 March 2017

বৃষ্টিভোর


আজ ভোরে জানলা খুলতেই তার সাথে দেখা। সে যে আছে, কিংবা বলা যায়, বহুক্ষণ থেকেই ছিল, তা জানলা খোলার আগে অনুভবই করিনি। কোলাহলবিহীন তার উপস্থিতি। জানলা খুলেই দেখি, আজকের দিনটির মলিনতা মুছিয়ে ধুয়ে মেজে চকচকে করে রেখেছে সবকিছু সে। গাছপালারাও স্নান সেরে নিয়েছে ভোর রাত্রেই। ঝাঁকড়া চুল থেকে বাড়তি জল ঝরিয়ে নিয়ে সবাই মিলে জানালো 'সুপ্রভাত'। প্রভাতের তখনও অল্প দেরি আছে আসার। ভাবলাম বুঝি, সে এসে চলে গেছে ঘুমের মধ্যেই, তার আসা যাওয়ার সংবাদ ঘুমের পরত ভেদ করে এসে পৌঁছোয়নি আমার কানে। ভুল ভেবেছিলাম। ঝরঝর নৃত্যে তখনও অবিরল তার প্রভাতীবন্দনা। মরজগৎ  জেগে উঠেছে, উছলিত হয়ে উঠেছে সে বন্দনায়। কেবল আমি ছাড়া। জানালার ভেতরে দাঁড়িয়ে আর একটু হলে সদ্য নিদ্রত্থিতা আমি বেমালুম অস্বীকারই করে বসেছিলাম তার প্রবল উপস্থিতিকে। কেবলমাত্র তার উপস্থিতিজনিত কোলাহলটুকু নেই বলে। নিজেদেরই তৈরী করা শব্দনিরোধ জানালায় নিজেই প্রায় বঞ্চিত হচ্ছিলাম জগতজোড়া এই আনন্দময় প্রভাতফেরী থেকে। কতকিছুই যে এইরকম ভাবে নজরানা না দিয়ে মুখলুকোয় তার হিসেব কে রাখে। উপস্থিতির কোলাহলমুখরতার দিকেই বুঝি কেবল আমার একনিষ্ঠা। লাজুক কোলাহলবিমুখ আনন্দের উপস্থিতি তাই হারিয়ে যায় প্রতিদিনের অহেতুক শব্দময়তায়।