Friday, 29 December 2017

শুভ নববর্ষ


“The wound is the place where the Light enters you.”-Rumi


পিঠ সোজা করে বোসো একবার, বন্ধ করো চোখ, প্রবেশ করো নিজের ভিতরে, বুকের খাঁচা ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে থুতনি উঁচু করে তাকাও দেখি আকাশের দিকে, এবার একবার ফুসফুস খালি করে ত্যাগ করো দেখি সমস্ত আবর্জনা। 

করেছো? 

এবার সত্যি করে বোলো দেখি, মাথার ভিতরটা একটুও খালি হল কিনা? দুকাঁধে পেশিগুলো একটুও শিথিল হয়নি কি? দুই ভ্রূ এর মাঝের চামড়াতে একটা ভাঁজও কি কমেনি?

কি বলছো? 

জানিনা ঠিক কি পরিবর্তন হলো, কিন্তু ঠিক এর পরের শ্বাসটা মনে হলো যেন একটু বড় করে নিতে পারলাম। 

তবে তো উৎসব শুরু। 

তুমি যুদ্ধে জিততে শুরু করেছো যে। একটি একটি করে শ্বাস তোমার হয়ে কথা বলবে এভাবেই। তারপর শ্বাসের সাথে সাথে একটু একটু করে দেখবে গোটা ফুসফুসটা তোমার কথা শুনে চলছে। তারপর একদিন দেখবে পুরো শরীরটা, যেখানে তুমি রয়েছো এতগুলি বছর ধরে, সে তোমার কথা শুনতে শুনতে ক্রমশঃ তুমি হয়ে উঠেছে। আর অনুভূতিগুলো যেগুলো এতবছর ধরে পুতুল নাচন নাচিয়ে চলছিল তোমায়, একদিন তাদের কান ধরে শাসন করে, লাটাইয়ের সুতোর ডগায় বেঁধে হুস করে দিয়েছো আকাশে ভাসিয়ে। 

সত্যি বলছি। একটা শ্বাস যদি বুকভরে নিতে পারো, এ সবই পারবে তুমি। একবার বিশ্বাস করে বুক চিতিয়ে চোখটা বন্ধ করে দেখোই না। 

দুঃখ, দুঃসময়, প্রবঞ্চনা, একাকিত্ব, অপ্রেম, অনিশ্চয়তা এতো কিছু পেরিয়ে চলেছো তুমি, এখনো তো দিব্য বেঁচে আছো, নিজেও কি ভেবেছিলে পার হতে পারবে নড়বড়ে সাঁকোটা? 

কিন্তু পেরিয়ে তো এলে? বা পার হবার বার জন্য সাহস করে প্রথম পা টা তো ফেলেছো দেখতে পাচ্ছি। তবে অর্ধেক যুদ্ধ তো জিতেই গেলে প্রায়। কি বললে, যন্ত্রনায় ছিঁড়ে পড়ছে মন? শরীর আর চলছে না? ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে জীবন? জানি তো।  হচ্ছে তো।  তোমার-আমার-ওর-সক্কলের। যন্ত্রণার প্রকার কেবল তোমার-আমার-ওর-সক্কলের মৌলিক। জীবন মৌলিক তাই যন্ত্রণাও মৌলিক। মৌলিক যোদ্ধার জীবন যাপন। জীবন। যুদ্ধটা কেবল অমৌলিক। সত্যিটা হলো, প্রতিনয়ত প্রতি সেকেন্ডে যুদ্ধটা জিতে চলেছি তুমি-আমি-ও-সক্কলেই। প্রতিদিনের ওঠা নামায়। নইলে আজও জানলা দিয়ে সূর্য্যাস্তের লাল আলো চোখে পড়লে একবার চোখ বন্ধ করে সে আলোটা চোখে মেখে নাও কেন তুমি? আজো খানসাহেবের আঙ্গুল সরোদ  ছুঁলে ঈশ্বর এসে স্পর্শ করেন কেন তোমার হৃদয়? আজও কেন নেই রাজ্যের বাসিন্দা কারো যুদ্ধজয়ের গল্প শোনার শেষে তোমার চোখ ভিজে আসে? আজও কেন আরো একবার চেষ্টা করতে ইচ্ছে করে? জিতেছ  বলেই তো? ওই যে কবে প্রথম শ্বাসটা নিয়েছিলে চেষ্টা করে দেখবে বলে, সেইদিনেই জিততে শুরু করেছিলে নিজেও বোঝোনি। বুঝিনি- বোঝেনা। তুমি-আমি-ও-সক্কলে।  

নতুন বছরে নতুন যুদ্ধের রসদ পেয়েছো তো আগের আগের সমস্ত বছরের যুদ্ধ গুলো থেকে? ব্যুহসজ্জাও সম্পন্ন হয়েছে নিখুঁতভাবে? হয়েছে।  তোমার-আমার-ওর সক্কলের অজান্তেই।  এস তবে আরেকবার ব্রহ্মক্ষণে দরজা খুলে দাঁড়াই ভৈরবী আলোয়, নতুন যুদ্ধের আবাহনের অপেক্ষায়। জিতবো বলে। বুক পেতে ক্ষতটা গ্রহণ করবো বলে। সেই ক্ষতপথে ভৈরবী আলোর সবটুকু বুকের ভেতর গ্রহণ করবো বলে। বেঁচে উঠবো বলে। আরও একবার। তুমি- আমি- সক্কলে। একসাথে। ভিন্ন ভিন্ন পথে। 

ভাগ্যিস ক্ষতরা থাকে সক্কলের জীবনে, নইলে আলোরা যে বাইরেই মাথা কুটে মরতো (“The wound is the place where the Light enters you.”-Rumi)।  

শুভ নববর্ষ।    




Saturday, 8 July 2017

ফিরে আসছ প্রেম?

ফিরে আসছ প্রেম?
বদ্ধ ঘর রয়েছে তোমার অপেক্ষায়।
তুমি এসে খুলে দাও সবকটা জানলা।
শীতল বাতাস এসে ভরে দিক ঘর।
এতদিন রোদ ঢোকেনি এঘরে।
তুমি সাথে করে একছিটে রোদ্দুর আনতে যেন ভুলো না।
ছড়িয়ে দেব ঘরে।

তাড়াতাড়ি এস প্রেম।
একজোড়া চায়ের কাপের একটা
হারিয়েছে উষ্ণতা।
অন্য কাপটি যে ছিল অনুপস্থিত।
এইকয়দিন খঞ্জনা দুটিও ছিল নিখোঁজ।
জানলার বাইরে নরম আদর
চুইঁয়ে পড়ছিল না তো, তাই।
খঞ্জনাদুটি আসে যে ওই
আদরটুকুনিই খুঁটে খেতে।
প্রেম, আসবার সময় আঁচলা ভরে খানিক আদরও এনো, কেমন।
ঘর উপচে খানিক দেব
জানলার বাইরে ছড়িয়ে।

ফিরে আসছ প্রেম?
সাবধানে এসো,
তাড়াহুড়ো নেই কোনো।
তাড়াতাড়িতে ভুল করে
যেন ভুল ঠিকানায় যেও না।
তোমার জন্য যত্ন করে
শান্ত ভোরের আলো, নিস্তব্ধ চকচকে দুপুর
আর শিরশিরে হাওয়া মাখা সন্ধ্যা রেখেছি সাজিয়ে।
ঠিক যেমনটি তুমি চেয়েছিলে।
তুমি এসে সব দেখে বুঝে নিও,
নিজের মতন করে।
আর হ্যাঁ প্রেম, আসার সময়
খানিক বৃষ্টিও এনো সাথে করে।
ঠিক ততটুকুন, যতটা লাগে
অপ্রেমকে আপাদমস্তক ভিজিয়ে দিতে।

Monday, 26 June 2017

বর্তমান

ভাল মন্দের হিসেব কষেছ মেয়ে?
পুষেছ নীতির মালা?
তাই তো তোমার ঘর নেই কোনো,
নেই কেউ শোনবার।

দেশ তো তোমার নেই জানতাম,
ছিলোও না কোনোকালে।
আগু পিছু?
সেও গেছে বুঝি?
পথ নেই ফেরবার?

পলকে হারালে অতীত তোমার,
পলকে ভবিষ্যৎ।
সামনে কেবল একপদ ভূমি,
সত্য বর্তমান।

Sunday, 21 May 2017

পিদিমের আলো

সপ্তাহভর টাপুরটুপুর, আকাশের মুখ ভার।
মেঘমাখানো বিকেলবেলায়, গৃহস্থালির হার।
মেঘের গায়ে চু কিত কিত, জানলাতে মন গোল্লাছুট।
ছোট ছোট ছোট ছুট্টে গিয়ে, ছোট্টবেলার ছক্কা পুট।
মেঘের গায়ে সাপ লুডো নেই, মেঘের রঙ কালো।
ঘরের কোনে আজ বিজলিবাতি, নেই পিদিমের আলো।

Sunday, 9 April 2017

প্রত্যাশা

মৃতবৎসা মায়ের তৃতীয় এবং
শেষ গর্ভের সন্তান আমি।
জন্মের সময় থেকেই
আমার কাছে
কারও কোনো প্রত্যাশা ছিল না
কেবল বেঁচে থাকা ছাড়া।
পুত্র বা কন্যা,
বুদ্ধিমান বা বোধহীন,
সৌন্দর্য বা কদর্যতা,
দায়িত্বশীল বা দায়িত্বহীন
কোনোকিছুরই আশা করেনি কেউ
শুধুমাত্র আমার
জীবিত থাকা ছাড়া।
কন্যারূপে,
বন্ধুরূপে,
স্ত্রীরূপে
আমিও হয়ত তাই
কারও কোনো
প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব
নিইনি কোনোদিন।
কেবল বেঁচে আছি।
দুমড়ে বেঁকে যাওয়া পিঠ,
আর আদ্যন্ত স্বার্থপরতা সম্বল করে
আজও জীবিত আছি
প্রবলভাবে।

Wednesday, 29 March 2017

বৃষ্টিভোর


আজ ভোরে জানলা খুলতেই তার সাথে দেখা। সে যে আছে, কিংবা বলা যায়, বহুক্ষণ থেকেই ছিল, তা জানলা খোলার আগে অনুভবই করিনি। কোলাহলবিহীন তার উপস্থিতি। জানলা খুলেই দেখি, আজকের দিনটির মলিনতা মুছিয়ে ধুয়ে মেজে চকচকে করে রেখেছে সবকিছু সে। গাছপালারাও স্নান সেরে নিয়েছে ভোর রাত্রেই। ঝাঁকড়া চুল থেকে বাড়তি জল ঝরিয়ে নিয়ে সবাই মিলে জানালো 'সুপ্রভাত'। প্রভাতের তখনও অল্প দেরি আছে আসার। ভাবলাম বুঝি, সে এসে চলে গেছে ঘুমের মধ্যেই, তার আসা যাওয়ার সংবাদ ঘুমের পরত ভেদ করে এসে পৌঁছোয়নি আমার কানে। ভুল ভেবেছিলাম। ঝরঝর নৃত্যে তখনও অবিরল তার প্রভাতীবন্দনা। মরজগৎ  জেগে উঠেছে, উছলিত হয়ে উঠেছে সে বন্দনায়। কেবল আমি ছাড়া। জানালার ভেতরে দাঁড়িয়ে আর একটু হলে সদ্য নিদ্রত্থিতা আমি বেমালুম অস্বীকারই করে বসেছিলাম তার প্রবল উপস্থিতিকে। কেবলমাত্র তার উপস্থিতিজনিত কোলাহলটুকু নেই বলে। নিজেদেরই তৈরী করা শব্দনিরোধ জানালায় নিজেই প্রায় বঞ্চিত হচ্ছিলাম জগতজোড়া এই আনন্দময় প্রভাতফেরী থেকে। কতকিছুই যে এইরকম ভাবে নজরানা না দিয়ে মুখলুকোয় তার হিসেব কে রাখে। উপস্থিতির কোলাহলমুখরতার দিকেই বুঝি কেবল আমার একনিষ্ঠা। লাজুক কোলাহলবিমুখ আনন্দের উপস্থিতি তাই হারিয়ে যায় প্রতিদিনের অহেতুক শব্দময়তায়।

Monday, 27 March 2017

চাহিদা




ক্ষুধার প্রয়োজনে অন্নসংগ্রহ, 
অন্ন অন্বেষণের ক্লান্তিতে নিদ্রা, 
আর শারীরিক প্রয়োজনে মৈথুন 
শুনেছি আদিকালে এই ছিল 
জীবনের চাহিদা। 

এই তিন চাহিদা পূরিত করে, 
অনায়াস অর্জিত শান্তিতেই যাপিত হচ্ছিলো
আদিমানবীর জীবন। 

তারপর, কেমনকরে যেন, 
কোন এক দুর্বিপাকে, 
ক্ষনিকের জন্য 
শান্ত জলাশয়ে বিম্বিত হলো 
তারই শ্যামলী মুখচ্ছবিখানি।
প্রেমে পড়লো সে তার আপন লালিমার। 
আর সেই প্রাগৈতিহাসিক মুহূর্তে 
রচিত হলো বুঝি 
আত্মরতির ইতিহাস। 

কেবল আহার- নিদ্রা- মৈথুনে 
শান্ত রইল না জীবন।
কেবলই ভালোবাসতে ইচ্ছে হলো 
সেই প্রাগৈতিহাসিনীর। 
ক্রমশঃই সেই নব জাগরিত নরম প্রেম, 
সঞ্চারিত হয়ে চললো দিগন্তের দিকে। 
এতদিনে তার প্রয়োজন পড়েছে প্রসাধনীর।
আলুলায়িত রুক্ষ কেশপুঞ্জ 
শাসিত হয়েছে নবকবরীর আল্পনায়। 
বসন্তে সেখানে উঠেছে 
রক্ত-পলাশগুচ্ছ।  
সে পলাশ তার কানে দিয়েছে 
তার প্রিয় আদিমানবের সুরের সন্ধান। 
শিহরিত হয়েছে তার গলার ঝিনুকমালা।
দিগন্তরেখা স্পর্শ করতে গিয়ে 
অনন্ত সেই প্রেম, 
ছুঁয়েছে আদিমানবের হৃদয়। 
আর সেই ক্ষনেই রচিত হয়েছে 
যুগলজীবনের নতুন চাহিদা। 

সৌন্দর্যপ্রিয়তার চাহিদা। 
জীবনের সৌন্দর্যরূপ 
পরস্পরে ভাগ করে নেওয়ার চাহিদা। 
কেবল বেঁচে থাকার জন্য নয়, 
ভালবাসার জন্য বেঁচে থাকার চাহিদা।

আর সেদিন থেকেই 
আহার- নিদ্রা- মৈথুনকে 
যোজনক্রোশ পিছনে ফেলে-
দীপ্যমান হয়ে দাঁড়িয়েছে 
জীবনের উজ্জ্বলতম চাহিদা, 
ভালবাসা।।