Sunday, 3 May 2020

দ্য ক্যাফে - ৪

শনিবার বা রবিবারের সকালগুলো আমাদের কাটতো ওমাহার ছোট ছোট ক্যাফেগুলোতে। যেখানে পরিবারের স্বামী -স্ত্রী বা দু একজন বন্ধু একসাথে চালাচ্ছেন ক্যাফেটি। বড় কোম্পানির ক্যাফে-চেনের কোনো কোনোটায় যাই না তা নয়, তবে শনি বা রবিবারের সকালগুলো তোলা থাকতো ছোট খাটো  কফিশপগুলোর জন্যই। কারণ প্রতিটা কফিশপের আলাদা আলাদা মেজাজ। তাদের কফিতে বা খাবারে একটু হলেও আলাদা আলাদা স্বাদ। শুধুমাত্র এককাপ চা বা কফি নিয়ে দেওয়াল ঘেঁষা একটা ছোট টেবিলে বসে পড়তে পারলেই হলো। ক্যাফের মেজাজ অনুসারে বাকি সকালটা মানুষ দেখেই কাটিয়ে দেওয়া যেত। আর সেখান থেকে মনে মনে তৈরী করে নেওয়া যেত একশ গল্প। কফির টানে যতটা না গল্পের টানেই ছিল আমার সেই সপ্তাহান্তের ক্যাফেটাইম। আমার সেই ক্যাফে-র গল্পে খানিক বাধা পড়েছে বর্তমানে স্বাভাবিকভাবেই। এখন আমাদের শনি রবিবার ওমাহার নানান কফিশপে বসে কফি সেবন বন্ধ। শেষবার গিয়েছিলাম মার্চ মাসের ১৪ বা ১৫ তারিখ। তারপর ১৬ তারিখ থেকে এখানে কোনো দোকানে বসে খাওয়া বন্ধ। চাইলে নিয়ে এসে খাওয়া যেতে পারে কিন্তু ওই এককাপ কফি তো প্রায় একই স্বাদে কখনো বা দোকানের চেয়ে বেশি ভালো স্বাদে ঘরে বসেই বানানো যায়। ওই ঘন্টা দুয়েক কফিশপে বসে সাপ্তাহিক ধীরলয়ে চলা দিনটাকে উপভোগ করাটাই তো ছিল আসল কথা। হাসপাতালের একতলার আমাদের প্রতিদিনের কফিশপটা যদিও এখনো খোলা। কালই ল্যাবে ঢোকার সময় হাসপাতালের সামনের দরজা দিয়ে ঢুকতে গিয়ে কোনাকুনি চোখ পড়ে গেলে দেখতে পেলাম। অবশ্য এটি খোলা না থাকলে যাঁরা এখন নিয়মিত কাজ করছেন তাঁদের খুবই অসুবিধা হবে। বাইরে থেকে বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। শুধু দেখলাম কফিশপের মেয়েরা সকলেই মাস্ক পরে আছে। 

তা যা বলছিলাম, কফির গল্প, ক্যাফের গল্প। একটি ছোট্ট দোকান আছে, দোকানটি চালান এক রিটায়ার্ড দাদু আর ঠাম্মা। স্বামী স্ত্রী। একদিনই তাঁদের দোকানে গিয়েছিলাম আমরা। দোকানটিতে তিনটি ছোট্ট কফিটেবিল। তাতে দুটি করে চেয়ার আর একটি ছোট পুরোনো গদিআঁটা সোফা। তাতেও জন দুই বসতে পারে। এছাড়া একচিলতে জানলার কাঁচ বরাবর একটি টানা বেঞ্চ গোছের কিছু। সাকুল্যে জন দশেক হয়ত বসতে পারে সে দোকানে। বাইরে থেকে দোকানটিকে দেখে ছোট্ট একটি বাক্সের বেশি কিছু মনে হবে না। কিন্তু সে দোকানের কাস্টমার রেটিং অনেক সাজানো দোকানের চেয়ে অনেক বেশি। কিছুটা কৌতূহল বশেই গিয়েছিলাম সে দোকানে। দেখলাম বিক্রেতা এবং খরিদ্দাররা সকলেই সকলের পরিচিত। সপ্তাহান্তে সকালের কফিটা তাঁরা হয়ত প্রায়শই এখানেই পান করেন। দাদু-ঠাম্মাও হাসিমুখে সকলের হাঁড়ির খবর নিচ্ছিলেন কফি বানাতে বানাতে। ঠিক জেন্ আমাদের পাড়ার চায়ের দোকানগুলির মত। বিক্রীবাটার প্রয়োজনে যতখানি, তার থেকেও মানুষের সাথে জুড়ে থাকার প্রয়োজনে টিকে আছে দোকানখানি। দোকানের একদিকের কাঠের দেওয়াল জুড়ে নানান পেন্সিল স্কেচ বা অয়েল পেন্টিং। ঠাম্মার নিজের আঁকা। কেউ কিনতে চাইলে বিক্রিও করেন। দোকানে পৌঁছতেই দাদু-ঠাম্মার আপ্যায়নের কোনো খেদ ছিল না। তবু জানলা ঘেঁষা একটি চেয়ারে বসে সামনে মুখ তুলেই দেওয়ালের সজ্জা দেখতে দেখতে একটু কিরকম যেন মনে হতে লাগছিলো সেদিন। এই 'কিরকম যেন' শব্দটাকে ঠিক করে ব্যাখ্যা করতে পারবো না। একটা অস্বস্তি, একটা উশখুশে মনোভাব। দোকানের অন্য দিকের একটা দেওয়াল জুড়ে কটা অদ্ভুত জিনিস। এই দোকানের কফি বিনস আসে যেসব কাঠের বাক্সে সেইসব বাক্সের ওপরের বিভিন্ন আকারের ছোট বড় ঢাকনাগুলিকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা। খুব চেনা সজ্জা পদ্ধতি। কফিবিনস আসে সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকা বা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে। ঢাকনার গায়ে সেইসব দেশের ছাপ। কখনো কাঠের ওপর স্প্রে পেন্ট দিয়ে, কখনো কাঠের ঢাকনার সাথে লাগানো ধাতব পাতের গায়ে খোদাই করে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইথিওপিয়া, কঙ্গো, কলম্বিয়া, চিলি। সেইসব মধ্য বা নিম্নবিত্ত দেশের নিতান্ত কেজো সামগ্রী দিয়ে আসর সাজিয়েছেন উচ্চবিত্ত দেশের কোনো এক দোকানী। দেখতে যে খারাপ লাগছে তা নয়, বরং দেওয়াল জুড়ে সুন্দর একটা কোলাজ তৈরী হয়েছে। ব্যাপারটা শৈল্পিক দিক থেকে বেশ দৃষ্টিনন্দনই। কিন্তু তবুও খুব বিত্তশালী কারো বাড়িতে গিয়ে পুরুলিয়ার বা ছত্তিশগড়ের মুখোশ বা বাংলার লাল-সাদা গামছা দিয়ে বানানো গৃহসজ্জার সামগ্রী দেখলে একইরকম অনুভূতি হয় আমার। মনে হয়, প্রতিদিন জবজবে করে নারকেল তেল মাথায় মেখে এইরকমই লাল-সাদা গামছা গায়ে পুকুরের দিকে দৌড়াতাম আমিও তো। আমিও সেই তাদেরই, গামছাটা যাদের জন্য নিতান্তই কেজো। গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রী, গৃহসজ্জার সামগ্রী নয়। আর সেই মুহূর্তেই কেন জানিনা গামছা যেখানে প্রয়োজন নয়, সজ্জার, সেই পরিস্থিতে আর নিজেকে মানানসই মনে হয়না। একখানি অদৃশ্য দেওয়াল কি করে যেন তৈরী হতে থাকে। গামছার সাথে তোয়ালের কোনো বিরোধ নেই। কোনোকালে ছিলোও না। একটা ব্যবহার করলে অন্যটা ব্যবহার করা যাবে না, এমনটাও নয়। তবুও দুটোই প্রয়োজনের। তবুও গামছা দিয়ে গৃহ বা সাজ সজ্জা করতে দেখলে কেমন একটা অনুভূতি হয়। আমার যা প্রয়োজনের তোমার তা ফ্যাশন। আমার যা নিতান্তই না হলে নয়, তোমার তা প্রয়োজনাতিরিক্ত গৃহসজ্জামাত্র। অচেনা জায়গার অস্বস্তিটা খোঁচাতে থাকে বেকুবের মত। নিজেকে নিতান্তই বেমানান, বিড়ম্বনার মনে হতে থাকে।

প্রায় এরকমই একটা অনুভূতি হয়েছিল মনে আছে প্রথম সেই দেওয়াল সজ্জা দেখার পর। একটু অস্বস্তি লাগছিলো। কিন্তু সে অস্বস্তি এতটাও তীব্র নয় যে সেখানে বসে থাকা চলে না। তেমন হলে তো এই তোয়ালের জীবন, তোয়ালে মোড়া সময়ে টিকতেই পারতাম না। সুতরাং ঠিক যতটা অস্বস্তি থাকলে কিবোর্ডে টাইপ করে এই লেখা লিখতে পারা যায়, আর ঠিক যতটা অস্বস্তি না থাকলে সেই প্রায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ঘরোয়া আপ্যায়নে উষ্ণ হয়ে সুস্বাদু কফি খেয়ে উঠে আসার সময়ে আবার একদিন সে ছোট্ট দোকানে আসার ইচ্ছে মনে জাগিয়ে রাখা যায়, ঠিক ততটাই অস্বস্তি নিয়ে কফি খেয়েছিলাম মনে আছে সেদিন।  

Saturday, 2 May 2020

স্ব-অধীনা

স্ব-অধীনা 
অর্পিতা চ্যাটার্জী
 (বাতায়ন মার্চ-২০২০ সংখ্যায় প্রকাশিত)

শান্ত ভাবে মেয়েটা বলে যাচ্ছিলো অনেক বছর আগেকার একটা বীভৎস রাতের কথা। যে সময়ের কথা বলছিলো, সেসময় সে অঞ্চলের মানুষের নিরবিচ্ছিন্ন রাতের ঘুম ছিলোনা। মেয়েটারও ঘুম ভেঙেছিল সেদিন ভয়ঙ্কর একটা বিস্ফোরণের শব্দে। জানালা দিয়ে যা সে দেখেছিলো সেদিন, তাতে গভীর রাতের সেই বিস্ফোরণে সারা বাড়িটার সাথে কেঁপে উঠেছিল ছোট্ট সেই মেয়েটির ভেতরটাও। লাল-কমলা-ধূসর সমস্ত রং মিলে অদ্ভুত সম্পূর্ণ বৃত্ত একটা যেন। আর সাথে ওই ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের শব্দ। বাড়ির খুব কাছেই একটা মিসাইল পড়েছে। একটুর জন্য বেঁচে গেছে মেয়েটার বাড়ি আর তার পরিবার সেরাতের জন্য। সেদিন বাকি রাতটা সে ভগবানকে ধন্যবাদ জানিয়েছিল সেরাতটাই তার আর তার পরিবারের শেষ রাত ছিল না বলে। আর তার পরেই সেদিনের সেই মেয়েটা, আজকে যিনি  মধ্যবয়সিনী নারী, বলে যাচ্ছিলেন, সেরাতের সেই ধন্যবাদের জন্য আজও কেন তিনি লজ্জায় মরমে মরে থাকেন। সেরাতের মিসাইলের ধাক্কায় তাঁর পরিবার রক্ষা পেয়েছিলো ঠিকই, কিন্তু মিসাইলের ধাক্কায় মাটিতে মিশে গিয়েছিলো তার সাত বছুরে ভাইয়ের প্রাণের বন্ধুর বাড়ি। সাথে সাথে বাড়ির  বাসিন্দারাও। ভাইয়ের বন্ধু এবং তার বাবা বাড়ি এবং বাড়ির আর সমস্ত কিছুর সাথে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিলেন সেদিন। তারপর আরো আরো কত মানুষ, আরো কত কত কাছের পরিবার চোখের সামনে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো। একের পর এক যুদ্ধে ঘরছাড়া হলো আরো কতজন। সুন্দর সাজানো শহর ছাড়খাড় হয়ে গেল মানুষের তৈরী করা সমস্যায়। বলতে বলতে রাগে, লজ্জায়, হতাশায় কেঁপে উঠছিলো সেদিনের সেই মেয়েটা। নিজের দেশ ছেড়ে তাকে উদ্বাস্তু হতে হয়েছিল শুধু বেঁচে থাকার জন্য। তিরিশ বছর আগেকার ইরাকে সেদিন বেঁচে থাকাটাই দুস্কর ছিল সাধারণ মানুষের। অথচ সে দিনের সেই মেয়েটি তো সাধারণ ছিল না। তার তো নিরাপত্তার অভাব হবার কথা ছিল না। তবুও তো তাকে জীবনের প্রথম উনিশটা বছরের শৈশব, কৈশোর, পরিবার, স্বজন, বন্ধু, সমস্ত জীবনটাই সেখানে ফেলে রেখে ঘর ছাড়তে হয়েছিল। ইরাকী রাষ্ট্রযন্ত্রের অত্যন্ত কাছের একটি পরিবারের একজন হয়েও তার নিজের দেশ তাকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি। পালিয়ে আসতে হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এহেন মেয়ের মনে যে যুদ্ধ একটা বিশেষ স্থান দখল করে থাকবে তা অস্বাভাবিক নয়। ইরাকের মাটিতে বারংবার যুদ্ধ তাকে নিশ্চিন্ত উচ্চকোটির জীবনযাপন থেকে একধাক্কায় টেনে এনে বসিয়েছে যুদ্ধবিদ্ধস্ত ইরাকী উদ্বাস্তুর জীবনে। সে মেয়ের শয়নে স্বপনে জাগরণে সেদিন থেকে কেবল যুদ্ধ।

উনিশ বছর বয়সে কলেজের পড়া ছেড়ে মেয়ে চলল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। একা নয় মা-বাবার সাথেই। মায়ের জেদে মেয়েটাকে বসতে হলো বিয়ের আসরে। বাবার প্রচন্ড আপত্তি সত্ত্বেও, সে মেয়ে বিয়ে করল। বিয়ের কয়েক ঘন্টা আগে হবু বরের সাথে চুক্তি হলো তার। ইরাকের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাকে নিয়ে পালিয়ে এসেছেন তার পরিবার। তাকে বিয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রেখে সুস্থ স্বাভাবিক পড়াশুনা চালিয়ে যাবার জন্য এখানে এসেছেন। সুতরাং সে পড়াশুনা করবে, যা করতে চায় জীবনে তাই সে করবে। এই শর্তে বিয়ে করল সে, উনিশ বছরের মেয়ের বিয়ে নিয়ে, নববিবাহিত জীবন নিয়ে যা যা স্বপ্ন কল্পনা থাকা সম্ভব তার কিছুমাত্র ছিল না এই বিয়েতে। তবুও সেদিনের সেই পাথর হয়ে যাওয়া মেয়েটির মা, যিনি ছিলেন মেয়েটির এত বছরের জীবনে সবচাইতে ভরসার স্থল, তিনি নিজের কলিজাকে সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষের হাতে তুলে দিয়ে গেলেন? কেবলমাত্র তাকে যুদ্ধের বাইরে একটা সুষ্ঠ পরিবেশ দেবেন বলে। তিনিই ছিলেন মেয়েটির লোহার মত মনোবল অথচ শিশুর মতো সতেজ একটি জীবন গড়ে তোলার কারিগর। মেয়েটির মনে সেদিন কি চলেছিল কে জানে? তারপরের সেই স্বল্প বিবাহিত জীবনের প্রতিটি সেকেন্ডে তার বিয়ের শর্তভঙ্গ হতে দেখে, মানিয়ে নিতে নিতে স্বাধীনচেতা একটি সদ্যযৌবনা মেয়ের আত্মা কোথায় তলিয়ে গিয়েছিল কে জানে। পড়াশুনা হয়নি। কোনো কিছুর স্বাধীনতা তো দূর, মেয়েটির দাম্পত্যজীবন, যৌনজীবন সমস্তকিছুই তলিয়ে গিয়েছিল এই পরিবারের পুরুষ তন্ত্রের, পরিবারতন্ত্রের পেষণে। তখনও সে ভাবত একদিন সে ফিরবে তার সুন্দর অতীতের পরতে পরতে। কিন্তু মানুষের সহ্যসীমা পরীক্ষা করেন বোধহয় বিধাতা। পাথর হতে হতে বাকি ছিল বোধহয় তখনও। ততদিনে গালফ ওয়ার শুরু হয়ে গেছে। আর তার সাথে ছিন্ন হয়েছে মেয়েটির বাড়ির সাথে সমস্ত যোগাযোগ আর বাড়ি ফেরার স্বপ্ন। আর তার সাথে বেড়েছে তার দাম্পত্য জীবনের হতাশা।

দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে সমস্ত মানুষই তো শেষরক্ষা করার চেষ্টা করে। আর এ মেয়ে তো ভবিষ্যতের আগুন পেরিয়ে হেঁটে চলা ফিনিক্স। সেদিন রাতে বিছানায় ইরাকী রাষ্ট্রনায়কের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে, তার নৃশংসতার বিরুদ্ধে সমস্ত ক্ষোভ সমস্ত রাগ, সমস্ত প্রতি নৃশংসতা উগরে দিচ্ছিলো স্বামীটি এই ইরাকী মেয়েটির ওপর। প্রাণপণ বাধা দেওয়া সত্ত্বেও বিবাহিত স্ত্রী যখন, তখন তাকে ধর্ষণ করার অধিকার তো অলিখিতভাবে স্বামীটির ওপর বর্তায়ই তাই না? আর উদ্ধত একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত দেশের থেকে অনেক দূরে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে ঘৃণা, ক্ষোভ, রাগ হতাশা উগরে দেবার রাস্তা তো ধর্ষণ! বিপ্লবী বা সেনাদের দেশপ্রেমের সাথে ধর্ষণেচ্ছা যে সমানুপাতী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সারা পৃথিবীর সমস্ত দেশের সেনাবাহিনী এ কথার সাক্ষ্য দেবে। সুতরাং এই স্বামীটির যে নীতিগতভাবে এতটুকুও বিবেকে লাগেনি উনিশ কুড়ির এই অসামান্য সুন্দরী সদ্য বিবাহিত ইরাকী তরুণীটিকে সাদ্দাম হুসেনের প্রতিভূ মনে করে বিছানাতেই জবাই করার জন্য। এর পরে যদি যুক্ত হয় আরো একটি সত্য যে, সামনের মেয়েটি সাদ্দাম হুসেনের খুবই কাছের মানুষগুলির মধ্যে একজন, হুসেনকে কাকা সম্বোধন করার মত কাছের, তাহলে তো তাকে একেবারে মেরে ফেললেও বোধহয় কারো কিছু বলার থাকে না। হ্যাঁ, মেয়েটি যেকোনো একজন ইরাকী উদ্বাস্তু ছিল না। তার বাবা ছিলেন সাদ্দাম হুসেনের ব্যক্তিগত প্লেনের পাইলট এবং যুদ্ধ পূর্ববর্তী ইরাকের সিভিল এভিয়েশনের মাথা। সুতরাং সেই সূত্রে সাদ্দামের প্রাসাদেরই অংশ ছিল তার পরিবার। আর সেই সূত্রেই ইরাকী একনায়ক সাদ্দাম হুসেন মেয়েটির 'Amo' অর্থাৎ কাকা। আর সেদিনের সেই কুঁকড়ে যাওয়া মেয়েটিই আজকের আগুন যিনি আজ নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। যেইনাব সালবি (Zainab Salbi)।

যুদ্ধপূর্ববর্তী ইরাকে ইউরোপিয়ান ধাঁচে শিক্ষিত, স্বাধীন, উচ্চ নীতিবোধ সম্পন্ন, শিক্ষিত রুচির পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন যেইনাব। অর্থের অভাব ছিলো না উচ্চবিত্ত সেই পরিবারে কোনো দিনই। আর ছিল মায়ের থেকে পাওয়া অন্যায়কে সহ্য না করার কঠিন কিন্তু শান্ত-ধীর একটি জেদ। ইরাকে সময় বদলানোর সাথে সাথে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন চলে তাকে যেতেই হবে তার সাধের বাগদাদ ছেড়ে। কিন্তু এইরকম খাঁচার জীবন যাপন করতে জন্মাননি যেইনাব। প্রতি পদে ধর্ষিত হচ্ছিল তাঁর এতদিনের নীতিবোধ, রুচি, শিক্ষা। আর তার সাথে সাদ্দাম হুসেনের কাছের মানুষ হবার সাজা হিসেবে শুধু স্বামী নয়, প্রতিটি মানুষের বাঁকা ঘৃণা। সেদিনের সেই শেষ রাতে বিবাহিত স্বামীর দ্বারা নৃশংস ভাবে ধর্ষিত হতে হতে মন স্থির করে নিয়েছিলেন যেইনাব। আর নয় এবার  নিজের জীবন তাকে নিজেকেই তৈরী করে নিতে হবে। শরীর আর মনকে এক জায়গায় জড়ো করে প্রবল আঘাত করেছিলেন দুর্বিনীত লোকটির বিরুদ্ধে। তাতে যদিও জোয়ান লোকটির বিশেষ কিছুই হয়নি। কিন্তু অবাক হয়েছিল সে আঘাতটা আসতে দেখে। পাল্টা আঘাতটা আসতে পারে জানলে মানুষ আঘাত করবে কিনা দুবার ভাবে। আর সামনের প্রতিপক্ষ দুর্বল হলে মানুষ আঘাত করেই আনন্দ পায়। এতো সর্বৈব সত্য। সুতরাং এই পাল্টা প্রতিরোধ অপ্রত্যাশিত ছিল বলেই পৌরুষে লাগলো বেশি করে। এতটাই লাগলো যে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের অভিযোগে পরদিন সকালে পুলিশ এলো যেইনাবকে নিয়ে যেতে। স্বামীটি ভেবেছিলো, এতে করে বেশ ভয় দেখানো যাবে উদ্ধত মেয়েটিকে। কিন্তু মেয়েটিকে সে চেনেনি তখনও। সে মেয়ে তখন করণীয় ঠিক করে ফেলেছে। সমস্ত অভিযোগ বিনা কথায় মেনে নিয়ে মাথা উঁচু করে চলে গেল পুলিশের সাথে। কারণ, সেটিই সেদিন ছিল তার মুক্তির একমাত্র পথ। মায়ের পূর্বপরিচিত বান্ধবীর সাহায্যে পুলিশি ঝামেলা মিটিয়ে নিজের যতটুকু দামি গয়নাগাঁটি ইত্যাদি ছিল সমস্ত গুটিয়ে ঘর ছাড়লো সে মেয়ে। পথে নামলো রাজার দুলালী। বাড়ির সাথে যোগাযোগ তো আগেই ঘুচেছে। গালফ এর যুদ্ধ তখন তুঙ্গে।

যার কোনো দিন এতটুকু অর্থের অভাব ছিল না তারপর সে কি করে ওয়াশিংটনে পালিয়ে এসে মাথা গোঁজার ঠাঁই জোগাড় করল, কি করে নিজের খরচ চালাবার জন্য কি কি কাজ করল, কি করেই বা পড়াশুনা চালালো সে এক রুদ্ধশ্বাস রূপকথার গল্প। প্রতিপদে বাধা। কিন্তু যে মেয়েটি আজকের যেইনাব হয়ে উঠবেন সে মেয়েকে আটকে রাখতে বিধাতাও ভয় পাবেন বোধহয়। তবে এবার আর ভুল করেনি মেয়েটি। তার পরিবারের পরিচয়, সাদ্দাম হুসেনের সাথে তার পরিবারের সম্পর্ক সম্বন্ধে ঘুণাক্ষরেও কাউকে কিছু জানায়নি তার নতুন দুনিয়ায়। নয়ত, নতুন করে বাঁচতে চাওয়া এই পৃথিবীতে আবার তার প্রতি সকলে ছুঁড়ে দিত ঘৃণা। আর চিরকালীন সেই "পাইলটের মেয়ে" এই অভিধা পেরিয়ে নিজস্ব ব্যক্তিস্বত্তাকে কাউকেই চেনাতে পারত না মেয়েটি। আজকের যেইনাবের জায়গা জুড়ে রাজত্ব করত "পাইলটের মেয়ে"। আস্তে আস্তে শুকিয়ে আসছিলো ক্ষতটা। প্রাণোচ্ছল মেয়েটি পরিণত হয়েছিল ভয়ার্ত, সংবেদনশীল একটি মূর্তিমতি হতাশায়। কোনো পুরুষকে বিশ্বাস করা সম্ভব ছিল না সেদিন তার। তবুও প্রেম আসে। তবুও প্রেম এলো। বিশ্বাস ভাঙতে ভাঙতেও মানুষ আবার বিশ্বাস করে। আমাদের এই মেয়েটিও বিশ্বাস করার মত আর একটি মানুষ পেল। আমজাদ আতাল্লাহ। আমজাদের বন্ধুত্বে কোনো খাদ ছিল না। স্বদেশ বিচ্ছিন্না, ক্ষতবিক্ষত মনের, কুড়ি বাইশ বছরের যেইনাবের জীবনে প্রেম এলো অবশেষে।

এত কিছুর মধ্যেও যুদ্ধকে ভোলেনি মেয়েটি। যুদ্ধ তার সব কিছু নিয়েছে। তার পরিবার, তার স্বজন,  তার স্বদেশ। তাকে ভিটে ছাড়া করেছে নৃশংসভাবে হাজার হাজার উদ্বাস্তুর সাথে সাথে। Women for Women International তৈরী হলো যখন, মেয়েটির বয়স তখন মাত্র তেইশ। যে বয়সে মেয়েরা স্বপ্নের ডানার ভর করে স্বপ্নের দুনিয়ায় বাসা বাঁধে, সে বয়সে মেয়েটি স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিলো যুদ্ধ বিধ্বস্ত চুড়ান্ত অবহেলিত কিন্তু চুড়ান্ত বাস্তব এক দায়িত্ব। আর সেখান থেকেই শুরু হলো আজকের যেইনাবের যাত্রাপথ। পাথর থেকে আগুন হয়ে ওঠার সূচনা। আগুনে সেই মেয়ে তারপর হেঁটে যেতে লাগলো যুদ্ধবিদ্ধস্ত একের পর এক দেশে।  আফগানিস্তান থেকে সুদান থেকে কঙ্গো থেকে রোয়ান্ডা থেকে ইউক্রেন কোথায় নয়! কোথাও বিপ্লবী কোথাও অন্য দেশের সৈনিক উদ্দাম অত্যাচার চালাচ্ছে মেয়েদের ওপর। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির কথা বর্ণনা করতে গিয়ে উঠে আসে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির কথা। উঠে আসে অসংখ্য সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। কিন্তু উহ্য থেকে যায় একটা বিশেষ অংশের কথা। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে বেশি কিন্তু যুদ্ধের মধ্যেও যারা জীবনকে বাঁচিয়ে রাখে তারা কিন্তু এই অংশই।

মেয়েরা।

যেইনাব তুলে আনেন তাঁদের কথা যাঁরা বছরের পর বছর যুদ্ধবন্দী যৌনদাসীরূপে সেনাদের লালসার শিকার হন আবার তাদেরই জল, খাবার দাবার, গোলাবারুদ বয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হন। ভাসা ভাসা দেশপ্রেমের ধ্বজাধারীদের গালে সপাটে একটা থাপ্পড় কষিয়ে যেইনাবের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়-"'শান্তি' মানে যুদ্ধের শেষ নয়, শান্তি মানে জীবনের শুরু।" কেমন জীবন জানেন? এই যে আমি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে কিবোর্ডে কটা শব্দ টাইপ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত নারীদের জন্য ছদ্ম হাহুতাশ দেখাচ্ছি সেরকম লতানে জীবন নয়। শুধু ঋজু হয়ে বেঁচে থাকা। প্রতিদিনের খাওয়া পরা, স্কুল, কলেজ, হাসপাতালকে চালু রাখা। বোমা পড়লে বাচ্চাদের আগলে রাখা। তাদের মনে ভয় আর প্রতিহিংসার বীজ অঙ্কুরেই বিনিষ্ট করার চেষ্টা করে যাওয়া। এটাই তাঁদের জীবন। এটাই তাদের কাছে শান্তি। যেইনাব সংগ্রহ করেন এদের গল্প আর নির্মম উলঙ্গ সত্যিগুলো আমাদের ড্রয়িং রুমে ছড়িয়ে দিয়ে যান তার লেখায়, বক্তব্যে। দেশপ্রেম আর যুদ্ধের নায়কচিত গল্পের আড়ালে আসল রক্তাত সত্যটাকে আমাদের খাবার টেবিলে সাজিয়ে দেন। কি করবেন তখন? বীভৎসতার, নৃশংসতায় বমনোদ্রেক হবে আপনার? সেজন্য যেইনাব বলেন সে গল্প? না। অবশ্যই সেজন্য নয়। তিনি বলেন জীবনের গল্প। তিনি বলেন তাদের কথা যা জানলে আপনি নিজেকে আর ততটা অসহায় মনে করবেন না। যেইনাবের গল্প থেকে কটা গল্প শোনাই বরং।

আপনি জানেন, ইরাকে যখন মুহুর্মুহু বোমা পড়ত যেইনাবের ছোটবেলায়, যেইনাবের মায়ের মত অসংখ্য ইরাকী মা যেইনাব আর তার ভাইয়ের মত অসংখ্য ছোট ছোট বাচ্চাদের বুকের কাছে বসিয়ে পুতুলনাচ দেখাতেন? যাতে তারা বোমার শব্দের মাঝেও জীবনকে আগলাতে শেখে। যাতে তাদের কাছে বোমার শব্দটাই তাদের একমাত্র ছেলেবেলার স্মৃতি না হয়ে থাকে।  আপনি কি চেনেন ফরিদাকে? সৌদি আরবের এই অত্যন্ত সাধারণ রমণীর হয়ত খাতায় কলমে যুদ্ধে তাদের দেশকে রক্ষা করার কোনো রেকর্ড নেই। কিন্তু এই অসাধারণ রমণীকে চিনে রাখুন। বাচ্চাদের স্কুলের মিউজিকের শিক্ষিকা ইনি। পুরো যুদ্ধের সময়টায় একটা দিনের জন্য, হ্যাঁ, একটা দিনের জন্যও স্কুল বন্ধ করার কথা ভাবেননি। বোমার ভয় অগ্রাহ্য করে বাচ্চাদের উৎসাহ দিয়েছেন পিয়ানো আর অর্কেষ্ট্রায়। বুকের খাঁচা সোজা করে রুখেছেন যুদ্ধের ভয়কে, বাচ্চাদের মনে ঢোকার আগেই। যেমন তেমন করে নয়, যথাযথ ফরম্যাল পোশাক, হ্যাট, গ্লাভস পরে আনন্দ করে বাজাতে শিখিয়েছেন বাচ্চাদের। পুরো যুদ্ধের সময়টাতেই। বাচ্চাদের জীবন সচল রেখেছেন।

আর সেই প্যালেস্টিনীয় মহিলার গল্প শুনিয়েছেন যেইনাব। বহুদিন পরে একদিন সামান্য সময়ের জন্য সিজ ফায়ার হলেই যিনি সাথে সাথে ছুটে যান বাজারে। কিনে আনেন ফুল। যতখানি সম্ভব। বেক করেন কেক। যতগুলি সম্ভব। তারপর সানন্দে বিলি করেন পাড়া প্রতিবেশীকে। শুধু এইটুকু মনে করিয়ে দিতে যে, আজ এই মুহূর্তেই সিজ ফায়ার অর্ডার উঠে গিয়ে আবার বোমা বর্ষণ শুরু হলেও তার অন্তরে জীবনের সুরটা কোথাও মিলিয়ে যায় না। অন্তরসলীলা হয়ে বয়েই চলে।

যেইনাব মনে করিয়ে দেন আরো একজন মায়ের কথা। কঙ্গোলিজ  এই সাধারণ মহিলা অসাধারণ হয়ে ওঠেন যখন রাষ্ট্রবিপ্লবের শেষে women for women এর প্রচেষ্টায় তিনি ভোকেশনাল ট্রেনিং পান। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে নতুন বাড়িতে যুদ্ধের ভয় কাটিয়ে মাথা উঁচু করে নিজের খাটুনির রোজগারে বাঁচতে শেখেন তিনি। তবুও কোথাও একটা অতৃপ্তি তাড়া করে চলে তাঁকে। ভয় হয় বাচ্চাদের নিয়ে। ওদের মনে কোথাও ঘৃণা, দ্বেষ তৈরী হচ্ছে নাতো? চোখের সামনে তারা তাদের মাকে, বোনকে রাষ্ট্রবিপ্লবীদের দ্বারা ধর্ষিত হতে দেখেছে। বাবাকে আর নয় বছরের ছোট ভাইকে নৃশংসভাবে খুন হতে দেখেছে। বড় হয়েও তারা যদি প্রতিহিংসার প্রতিযোগিতায় নামে? সারা ছেলেবেলা জুড়ে কেবলই ঘৃণা পুষে রাখে? তাহলে তো এই যুদ্ধ কোনোদিন শেষ হবে না। চলতেই থাকবে বংশ পরম্পরা জুড়ে। তাই সে মা নিজে সব কিছু ভুলে হাসতে শেখে। আনন্দে পালা-পার্বনে নাচে পর্যন্ত। কেবল বাচ্চাদের মনে একটি সুন্দর ছোটবেলার স্মৃতি রোপন করার জন্য। যেইনাব তুলে আনেন এই মহিয়সী মায়ের কথা। বিশ্বশান্তির বিরাট নামডাকওয়ালা মহোৎসভায় এই নিরক্ষর যুদ্ধবিদ্ধস্ত ধর্ষিতা মায়ের ভূমিকা ঠিক কি একটু ভাবতে বলেন আমাদের।

যেইনাব তুলে আনেন সুদানের সেই মেয়েটির কথা। যার কাছে 'শান্তি' মানে- তার পায়ের নখ বাড়াতে পারা। বুঝলেন না তো? আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। বলছি বুঝিয়ে। যুদ্ধের পর যুদ্ধে যৌনদাসী হিসেবে ধরা পড়েছে সুদানী এই মেয়েটি। দিনের পর দিন সেনাদের সাথে পায়ে হেঁটে তাকে পেরিয়ে যেতে হয়েছে মাইলের পর মাইল পথ তাদের ভারী জিনিসপত্র বয়ে। এক দুই বছর নয়, কুড়িটি বছর।  দুই দশক। ভাবতে পারেন? ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে তার পা। পাথরের ধাক্কায় চলতে চলতে রক্তাত হয়ে ক্ষয়ে গেছে পায়ের আঙুলের নখ। যেইনাব তুলে এনেছেন সে মেয়ের গল্প যার কাছে 'শান্তি' মানে পায়ের নখ বাড়তে পারা। তাকে স্বনির্ভর করেছেন। তার পায়ের নখের পরিপ্রেক্ষিতে ভাবতে শিখিয়েছেন আমাদের যুদ্ধকে। যাতে গল্প সিনেমাতে যতই যুদ্ধকে মহিমান্বিত দেখানো হোক না কেন, যেইনাবের সাথে সাথে আমাদের ভাবতে অসুবিধা না হয় যে, যুদ্ধ ভয় ছাড়া আর কোনো কিছুরই জন্ম দেয় না। আর কিচ্ছু না। আর সে ভয় বিশ্বজনীন। সেখানে একজন কঙ্গোলিজ মায়ের সাথে সুদানি মায়ের বা ভিয়েতনামি মায়ের বা আফগানী মায়ের কোনো তফাৎ নেই। প্রতিদিন মরতে মরতে তারা তবুও প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছে উত্তর প্রজন্মের মধ্যে থেকে হিংসা-দ্বেষ-ভয়কে সমূলে ধ্বংস করার। যদিও যুদ্ধ মানে রাষ্ট্রনায়ক আর বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ রক্ষা। তবুও এর চাইতে কার্যকরী দীর্ঘমেয়াদী বিশ্বশান্তির পদ্ধতি কিছু আছে কি?

যেইনাব আমাদের শোনান যুদ্ধবিধ্বস্ত রোয়ান্ডার সেই মেয়েটির কথা। বিধ্বংসী বোমা বর্ষণের পরের দিন যেইনাব সেখানে রোজকার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে Women for Women International এর কর্মীদের নিয়ে যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছান এবং জিজ্ঞাসা করেন আর এক্ষুনি কি কি লাগবে তাদের, মেয়েটি নির্দ্বিধায় উত্তর দেয় -"একটা লাল টুকটুকে লিপস্টিক।" অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন এ কেমন বায়না? কিন্তু যুদ্ধের ধূসরতায় রং টাই তো একমাত্র কম পড়ে তাইনা? যুদ্ধের ভয়াবহতায় যেখানে কয়েক মুহূর্ত পরে বেঁচে থাকবো কিনা এটাই একমাত্র প্রশ্ন, সেখানে বর্তমানকে সাজিয়ে আনন্দে বেঁচে নেওয়াটাই তো জীবন। যেইনাব আমাদের শেখান যুদ্ধশান্তির জন্য এই নিরক্ষর, ধর্ষিতা, মেয়েদের এই অনমনীয় তীব্র বেঁচে থাকা শুধু নয় জীবনকে যুদ্ধের ওপরে তুলে চিবুক উঁচিয়ে বাঁচার স্পর্দ্ধা কতটা জরুরি।

যেইনাব তাদের Women for Women International এর আওতায় এনে সম্মানের সাথে বাঁচার রাস্তা দেখিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু আমাদের সাথে তাদের গল্প ভাগ করে নেওয়ার ফাঁকে নির্দ্বিধায় এটা স্বীকার করে নিয়েছেন, এই মেয়েরা তাঁর আজকের যেইনাব হয়ে ওঠার পেছনে কতবড় ভূমিকা পালন করেছে। তিনি এদের সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে বুঝেছেন, জীবনের সত্যিকে গোপন করার মধ্যে কোনো মহিমা নেই। এরা যদি পারে তিনি কেন গোপন করবেন তাঁর জীবনের মর্মান্তিক সত্যিকে? এতদিন পর্যন্ত সাদ্দাম হুসেনের সাথে তার পরিবারের সম্পর্ক সযত্নে গোপন রেখেছিলেন যেইনাব। ততদিনে ইরাকে যুদ্ধ শেষ হয়েছে। ইঁদুরের গর্তে মৃত্যু হয়েছে সাদ্দাম হুসেনের। একনায়কতন্ত্রের অবসান হয়েছে।  কিন্তু সাদ্দামের প্রতি সার্বজনীন ঘৃণা আজও এতটুকু কমেনি পৃথিবীর। আর সেই ঘৃণা একদিন তছনছ করে দিয়েছিল যেইনাবের দাম্পত্যজীবন। সার্বজনীন সেই ঘৃণা আর অগ্রহণযোগ্যতার ভয়ে আর "পাইলটের মেয়ে" পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে হবার ভয়ে তরুণী যেইনাব লুকিয়েছিলেন তাঁর পরিচয়। কিন্তু আজ এই আক্ষরিক অর্থেই ধ্বস্ত মেয়েরা বারংবার তাঁকে সাহস যোগালো তার জীবনের সত্য পরিচয় দেবার। সেদিনের সেই ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া  নির্বান্ধব যেইনাব নয়, আজকের যেইনাব লোহার মত কঠিন কিন্তু মায়ের মত কোমল। লৌহকঠিনতায় ভরা সভায় যিনি দাবি করেন শান্তিবার্তার দরদামের আসরে রাজনীতিবিদদের সাথে সাথে, সমাজ আর দেশ নিয়ন্ত্রকদের সাথে সাথে, পলিসি মেকারদের সাথে সাথে মেয়েদের আনতে হবে। আনতে হবে, ডাক্তার, নার্স, শিক্ষাবিদ আর সবাইকে যারা জীবনে বন্দুক ধরেননি। আনতে হবে তাদের যারা পিছনে থেকে যুদ্ধের ভয়াবহতাকে, প্রতিহিংসা পরায়ণতাকে তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে যেতে দেননি। এক দুই জনকে নয়, দরদামের টেবিলের পুরো পঞ্চাশ শতাংশ। আবার সেই যেইনাব এই মেয়েদের কথা বলতে গিয়ে ভরা সভায় চোখের জল সামলান।

যেইনাব তার জীবন দিয়ে আমাদের শেখান স্বাধীনতা মানে একটি দেশের শাসনতন্ত্র একনায়কতন্ত্র থেকে গণতান্ত্রিকতায় পরিণত হওয়া নয়। স্বাধীনতা মানে স্ব- অধীনতা। নিজের সমস্ত কিছুর দায়িত্ব নিজে বহন করা। মাত্র তেইশ বছর বয়সে যে মেয়ে Women for Women International গড়ে তুলেছিলেন নিজের হাতে, তাকে সারা পৃথিবীর যুদ্ধবিধ্বস্ত মেয়েদের আশ্রয়স্থল বলে সংজ্ঞায়িত করছিলেন, সেই সংস্থার দায়িত্ব নির্দ্বিধায় ছেড়ে দিয়েছিলেন, কেবল অফিসিয়াল কাজের চাপে। যে কারণে এই সংস্থার প্রতিষ্ঠা, মেয়েদের কাছে পৌঁছানো, সেই কাজটি নিজে গিয়ে করতে পারছিলেন না বলে। একে যেইনাব ব্যাখ্যা করেছেন বিশ্বাসভঙ্গ করা বলে। তাঁর মনে হয়েছে, এর ফলে মেয়েদের কাছে বসে তাদের গল্প শুনে তাদের জীবনকে সম্পূর্ণ কাছ থেকে দেখে তাদের উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করার সেই সঙ্কল্পে সময় দেওয়া যাচ্ছেনা। Authenticity-র মানে নতুন করে সামনে এসে দাঁড়ায় যেইনাবের কথা শুনলে। তার লেখা পড়লে। তাঁর শান্ত-স্মিত মুখের পেছনে সংকল্পের দৃঢ়তা দেখলে মানবতায় ভরসা করতে ইচ্ছে করে। আমার মতন কাগুজে সহানুভূতি নয়, সত্যিকারের স্ব-অধীনতা। অন্তরের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী সেদিনের সেই মেয়েটির জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে, উঠে দাঁড়াচ্ছে লক্ষ লক্ষ গুঁড়িয়ে যাওয়া মেয়ে সারা পৃথিবী জুড়ে। শিখে নিচ্ছে কাকে বলে অন্তরের স্বাধীনতা। শিখে নিচ্ছে "Freedom is an inside job" , হয়ে উঠছে স্ব-অধীন।

***********************************************************

What if I’m not sadness?
By zainab Salbi


What if I’m not sadness?
What if I’m not grief?
What if I’m not my victim’s story,
Nor am I my pain?

What if they are all part of me,
But not fully me?
What if I am just me?

What if I’m joy without reason,
Happiness in all seasons?
What if I am love for all?
What if I laugh for no reason and all reasons?
What if they are all part of me?

What if I don’t hate my enemy?
What if I forgive?
What if I see without judgment,
Love without reasons?
What if I give and receive without worry?
What if I can be all, and still be me?

What if this is it?
What if this is perfect?
What if I don’t doubt?
What if I just believe?

How would life be if I let it be?
How would I be if I accept fully me?
What will I be if today I am free?
What if this is the new story?

_____________________________________


যদি আমি দুঃখ না হই?
না হই যদি শোক?
নাইবা হলাম ধস্তজনের রোজনামচা,
কিংবা আপন দুঃখভোগ?

আবার ধরো,

রইল সবই আমার মাঝে
জানি, অনুভূতিরা দামী-
আমি রইলেম ঠিক যেমনটি
এইক্ষণের এই আমি?

খুশী হতে কারণ আমার
নাই যদি আর লাগে?
বছরভরের খুশীর মালা
নিই যদি আজ গলে?

বিশ্বপ্রেমের সংজ্ঞা যদি
লিখি নিজের চোখে?
অহোরাত্র হাসির রেখা
রয় যদি মোর মুখে?

এসব যদি সত্যি হতো?
সত্যই আমার মতো?

যারা আমার রক্ত ঝরাও,
ঘেন্না করো মোরে,
তোমায় দেখে ঘেন্না আমার
নাই যদি হয় মনে?

মনে করো, ক্ষমাই যদি
করি তোমায় এক্কেবারে?
রক্ত মুছে বন্ধু হবে?
চিরকালের তরে?

যা কিছু আমার বেঠিক-বেভুল,
যা কিছু আরও বাকি,
সব যদি আজ সামনে আসে?
হয় যদি সব ফাঁকি?

এসব নিয়ে তাও যদি আজ
আমায় ভালোবাসি?
সব জড়িয়েই নিজেই নিজের
প্রেমেই পড়ি যদি?

তোমার প্রতি আমার আলাপ,
না যদি হয় ঠিক সেরকম,
যেমন নাকি আমার প্রতি
তোমার আলাপন?

তার বদলে এমন যদি হয়-

যেমন কিনা তুমি আমার
সত্যিকারের আপন?

কেমন হবে সেই আমিটা?
সত্যিকারের মুক্তি যদি পাই?

সমালোচক নাই যদি আজ হই?
অদরকারেই প্রেম আসে আজ যদি?
দেওয়া-নেওয়ার হিসেব নাই যদি আজ নিলেম,
তবুও আজ সব মিলিয়েই আমায় খুঁজে পেলেম।

এটাই আর এইটাই যদি সত্যি হয়?
শ্বাশ্বত হয় এসব যদি?
অবিশ্বাসকে চুলোয় দিয়ে বিশ্বাসীই হই যদি,
জীবন তবে কেমন হবে এই যদির বাসর রাতে?
আমিই তবে কেমন হব পূর্ণ আমির সাথে?

এই আজকেই, আজকের আমি, মুক্তি যদি পাই-
কেমন হবে নতুন কাহন? যদি, যদির দেশে যাই?

Monday, 13 April 2020

".....now the priority is different."

".....now the priority is different."


দু এক দিন আগে হঠাৎই আবহাওয়া ঠান্ডা হওয়াতে কিছুটা তুষারপাত হয়েছে। আমার ডেরা থেকে ল্যাব বিল্ডিং পর্যন্ত পৌঁছাতে মিনিট পনের সময় লাগে। এর মধ্যে মাত্র মিনিট পাঁচেক বাইরে হাঁটতে  হয় বাকি পুরোটাই হাসপাতালের করিডোর ধরে হাঁটা পথ।  শীতকালে ওই পাঁচ মিনিট বাদে বাকিটা অসুবিধা হয়না বিশেষ। কিন্তু হাসপাতালের ভেতরের পথ এড়িয়ে বাইরে দিয়ে আসতে চাইলে পনের মিনিটের সোজাসাপ্টা পথটাই আরো খানিক বেড়ে যায় আর তার সাথে শীতের কামড়। গতকালও বড় কষ্ট হয়েছে কনকনে হাওয়া আর হিমাঙ্কের নিচে চলে যাওয়া তাপমাত্রায়। তাও নির্দ্বিধায় বাইরের পথটাই নিতে হচ্ছে। হাসপাতালের ভেতরের রাস্তা অপ্রয়োজনে এড়িয়ে চলারই নির্দেশ এসেছে গত সপ্তাহে। হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল দিকটায় গেলেই ওরা এখন একটা করে সার্জিক্যাল মাস্ক দিচ্ছে। গতসপ্তাহে এখানেই একটা রিসার্চ এর ফলাফল দেখে এই সতর্কতা নিচ্ছে ওরা। 

অথচ কয়েকসপ্তাহ আগেও কোনো কিছুই হয়নি এরকম একটা আবহাওয়া ছিল চারিদিকে। মনে আছে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আমাদের ল্যাবেরই একজন ছাত্র তার সাংহাইয়ের শহরতলীর বাড়িতে কয়েক বাক্স সার্জিক্যাল মাস্ক পাঠাচ্ছিল পোস্টে। ফেডেক্সের অফিসে তাকে নিয়ে গিয়েছিলাম। পঁচাত্তর না আটাত্তর ডলার লেগেছিলো শিপিং চার্জ। বেরিয়ে এসে বলেছিলাম "ওরে বাবা! এতো অনেক!" যে ছেলেটির সেরকম কোনো বন্ধু নেই, কোনো শখ আহ্লাদ নেই, কোনোক্রমে সেদ্ধ সবজি, মাংস, সাদা ভাত আর ফলমূল হলেই চলে যায়, সে ছেলেটি নির্দ্বিধায় বলে উঠেছিল, "Sometimes money is not important to consider, now the priority is different." এরকম একটা দার্শনিক উক্তি অমন একটা 'কিছুতেই কিছু আসে যায় না' টাইপের মানুষের মুখে গত চার বছরে সেই আমার প্রথম শোনা। অত্যন্ত অবাক হলেও, এখন বুঝতে পারি বিপদের সময় বাড়ির লোকের নিরাপত্তাটা কতটা অগ্রিম অধিকার নিয়ে আসে। তখন ওর স্বদেশেই কেবল বিপদ ছিল। আমার স্বদেশে ছিল না। তাই ও জানত, পড়তো, আপডেটেড থাকত সেই বিপদ সম্পর্কে। আমি থাকতাম না। সে বিপদ যে এদেশেও ঘাঁটি গাড়বে সে সম্পর্কে আজ থেকে দুই মাস আগেই সে ওয়াকিফহাল ছিল। সেই আসন্ন বিপদের গুরুত্ব বুঝে আগাম সতর্কতায় প্রায় তখন থেকেই হাসপাতালের বাইরে দিয়ে যাতায়াত করে। ওকে দেখে আমরা ভাবতাম 'ধুস বাড়াবাড়ি'। আসলে বিপদ যতক্ষণ না আমাদের ঘাড়ে চেপে বসে, আমাদের নিজেদের ব্যক্তিগত স্তরে ক্ষতি করে, ততক্ষন আমাদের সে বিপদ সম্পর্কে যা থাকে তা মেকি সহানুভূতি, সতর্কতা নয়। আমরাও তাই তখন থেকে সতর্ক হইনি। 

আমাদের এই ইউনিভার্সিটি অফ নেব্রাস্কা মেডিক্যাল সেন্টার যদিও ইউনাইটেড স্টেটস এর অন্য ইউনিভার্সিটিগুলো সতর্ক হবার আগে থেকেই একটু বেশি তৎপর ছিল। তার কারণ ওই ক্রুজশীপ থেকে এদেশীয় সমস্ত যাত্রীদের এখানেই আনা হয়েছিল কোয়ারেন্টাইন আর অবসারভেশন এর জন্য। গতবারে ইবোলার সময়ে এই ইউনিভার্সিটি এত ভাল কাজ করেছিল যে সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে এই ইউনিভার্সিটি বেশ ভাল একটা নাম এখন। কিন্তু সেসব যাত্রীদের সাধারণের নাগালের অনেক বাইরে বহু সতর্কতায় রাখা হয়েছিল সে নিয়ে আমাদের চিন্তার কোনো কারণ ছিল না। তারপর দিন বদলাতে থাকলো। পূর্ব উপকূলের রাজ্যগুলি বিশেষত নিউইয়র্কে মারণযজ্ঞ তখন সবে শুরু হয়েছে। আমাদের এই শহরেও ভয় আর আতংক বাড়তে থাকলো। নানা রকম খবর শুনি। জিনিসপত্র কিনে রাখতে শুরু করেছে অনেকেই। সব বন্ধ হয়ে গেলে রেঁধে খাবার জিনিস বাড়ন্ত হবে যে। কিন্তু তখনও বেশ অনেকের কাছেই ব্যাপারটা হাস্যকর নতুন একটা ব্যাপার। ফেসবুক, টুইটার ইন্সট্রাগ্রাম খুলে লোকে দেখাচ্ছে নানান মজা এই নিয়ে যে, লোকে টয়লেট সিট্ চেটে দেখাচ্ছে যে দেখো আমি কত সাহসী। আমার রোগের ভয় নেই। এদিকে সমস্ত সুপারমার্কেটে টয়লেট পেপার, কিচেন টাওয়েল, হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং সমস্ত রকমের ডিসিনফেক্ট্যান্ট বাড়ন্ত। একদিন বাজার করতে গিয়ে সারা শহর খুঁজে খুঁজে একটাও হ্যান্ড স্যানিটাইজার পেলাম না। আমাদের বাজার করতে যেতে দেরি হয়ে গিয়েছিলো। মোটামুটি সপ্তাহ দুয়েক রান্না-বান্না চলার মত বাজার করলাম। এটাও শুনলাম যে এখানে নাকি বন্দুক কেনার হিড়িক পরে গেছে। অর্থাৎ খাবার না পেলে আমি আমার খাবার লুঠ হবার থেকে বাঁচাতে বন্দুক কিনে রাখছি। শুনে কি প্রতিক্রিয়া আসা উচিৎ, আর কি দেখানো উচিৎ সেটা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। 

এরমধ্যে খবর পাচ্ছিলাম আস্তে আস্তে পূর্বদিকের শহর গুলির রিসার্চ ল্যাব গুলো বন্ধ হচ্ছে। বন্ধ মানে ওয়ার্ক ফ্রম হোম। কিন্তু যাদের বেঞ্চে এসে কাজ না করলে হবে না তারা কি করবে? অদ্ভুত এক দোলাচল। এদিকে আমি সদ্য একটা পেপার জমা দিয়েছি। সপ্তাহ দুই পরেই তার রিভিউয়ারদের কমেন্ট আসবে। তাঁদের মতামত অনুসারে আমায় যদি আরো বেশ কয়েকটা এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে হয় তাহলে আমি কি এই অবস্থায় কি করে করবো? যদিও এই অবস্থায় সকলেই সময় বাড়াচ্ছে। দেখা যাক। এদিকে ভারতেও সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। বাড়ির জন্য চিন্তা বাড়ছে। আমার বাড়ির অনেককেই এখনো নিয়মিত বাইরে বেরোতে হচ্ছে। সত্যি কথা বলতে কি রাতে ঘুম আসতে দেরি হচ্ছে। দিনের বেলা ল্যাবে গিয়ে নানান রকম খবর পাই, সাথে নেটের খবর তো আছেই। মার্চের ষোলো তারিখে এখানে জিম, বার, নাইট ক্লাব, রেস্তোরাঁ সমস্ত কিছুর ওপর দশ জনের বেশি লোক একসাথে জড়ো হওয়া বারণ হলো। তারপর এসব কিছুই বন্ধ হয়ে গেলো। রেস্তোরাঁ থেকে যদিও খাবার অর্ডার করার অপশন এখনো খোলা আছে। তবে পাবলিক হেলথ সম্পর্কে নিজের নিজের ধারণা মেনে কেউ এটাকে বেছে নিচ্ছেন, কেউ না। সারাদিন ইউনিভার্সিটির জিমটা সরব থাকত। গমগম করত ভোরবেলা আর সন্ধ্যাবেলা। এখন যখন জিমের পাশ দিয়ে রোজ হেঁটে আসি মনে হয় একটা মৃত্যুপুরী। তারপর আস্তে আস্তে ল্যাব বিল্ডিংয়ে রিসার্চারের সংখ্যা কমতে থাকলো। কেউ কেউ রাতের দিকে কাজ করতে শুরু করলো। কেউ খুব ভোরে এসে তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে চলে যাবার চেষ্টা করছে। আসলে যতটা মানুষের সংস্পৰ্শ এড়ানো যায়। আমাদের ল্যাবেরও সেল কালচার বা মাইক্রোস্কোপের্ ঘর গুলোতে একসাথে একজনের বেশি এখন ঢোকা বারণ। কারণ ঘরগুলো ছোট। ডিপার্মেন্টাল মিটিং গুলো জুম্ দিয়ে অনলাইনে হচ্ছে। প্রতিটা ল্যাব থেকে দুজনের নাম নিয়ে রাখা আছে এসেন্টিয়াল পার্সন হিসেবে যাতে যদি পুরোপুরি বন্ধ করতে হয় সব কিছু তাহলে এনিম্যাল হাউসের খাঁচায় রাখা ইঁদুরদের দেখাশোনা বা অন্য কিছু জরুরি প্রয়োজনে সেই দুটি মানুষ আসতে পারেন। আমাদের রিসার্চ করোনা বা সংক্রামক রোগ নিয়ে নয়। যাঁরা এই কাজ করছেন তাদের ল্যাবে এখন দিবারাত্র কাজ হচ্ছে হয়ত। মাঝে PPE র যোগান না থাকায় ব্যবহৃত PPE কি করে ডিসইনফেক্ট করে পুনরায় ব্যবহার করা যায় তার পদ্ধতি প্রকাশ করেছে আমাদের ইউনিভার্সিটি। বেশ কিছু এন্টিভাইরাল কম্পাউন্ডের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। আমাদের ইউনিভার্সিটিতেও চলছে। এত দ্রুত বায়োমেডিক্যাল রিসার্চকে আর কখনো প্রোমোট করা হয়নি আগে। সায়েন্টিস্টরা পাগলের মত কাজ করছেন। এত চেষ্টার ফল নিশ্চয়ই অতি দ্রুত সামনে আসবে। কিন্তু ততদিনে বড় বেশি প্রাণহানি হয়ে যাবে। এটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। 

গত সপ্তাহেও দেখেছি মাস দু তিনের বাচ্চাকে প্র্যামে নিয়ে মা ওয়ালমার্টে বাজার করছেন। চারটি শিশুকে নিয়ে বাবামা ছুটির মুডে বাজার করতে বেরিয়েছেন। শিশুটি সবজির আইলের ধাতব পাত হাত দিয়ে ঘষে পরে সেই হাতই মুখে দিচ্ছে। আমি দেখে আতংকিত হয়েছি। মনে মনে চেয়েছি কেন মানুষের হাঁটাচলা নিয়ন্ত্রণ করা হবে না যদি তাঁর নিজের দায়িত্বশীলতা না থাকে! কিন্তু এদেশে সেটি হওয়া সম্ভব নয়। ইতালির খবর শুনে শুনে হঠাৎ একদিন ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। প্যানিক। ততদিনে বিষয়টার ভয়াবহতা স্পষ্ট বুঝতে পারছি। একটা ইতিহাস তৈরী হচ্ছে যার চলন্ত কুশীলব আমরা। আমাদের আজকের বর্তমান, আমাদের আজকের চিন্তাভাবনা, আমাদের আজকের আচরণ আমাদের ভবিষ্যৎ তৈরী করছে। যা প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হবে ভবিষ্যতের পৃথিবীর জন্য। যার বহুমুখী প্রভাব থাকবে প্রতিটি দেশেই। আমাদের আজকের আচরণের ফলে উদ্ভুত পরিস্থিতির দায়ভার সেদিন নিতে পারবো তো? ভয় পাচ্ছি।

ভারতের লকডাউনের খবর পেয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছিলাম। যাক আমার বাড়ির লোকের আশেপাশে আসা লোকের সংখ্যা কমবে কিছুটা হলেও। কিছুটা হলেও কমবে তাঁদের অসুস্থ হবার সম্ভাবনা। এখানে কবে মানুষ সচেতন হবে জানি না। গত সপ্তাহে পার্কে অজস্র লোকে নাকি হাঁটতে, দৌড়াতে, গল্ফ খেলতে বেরিয়েছিল। ওমাহা নিউয়র্কের মত জনবহুল নয়। কিন্তু তাতেও ঝুঁকি কিছু কম নয়। নেব্রাস্কার সংখ্যাটা সরকারি ভাবে এখনো চারশোর আশেপাশে। কিন্তু বাড়তে কতক্ষণ? এই ঋতু পরিবর্তনে একটু আধটু গলা খুসখুস করলেই ভয় করছে। সারা পৃথিবীর সাথে সাথে আমরাও আশা নিয়ে আর আতংক নিয়ে বেঁচে আছি এখনো। আর বেঁচে আছি যখন, তখন যে কাজ করার জন্য বাড়ি ছেড়ে এখানে আসা, সে কাজটাই মন দিয়ে করে চলেছি প্রতিদিন। যতদিন সকালে উঠে ল্যাবে আসার সুযোগ পাচ্ছি। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে, মানুষের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে। এভাবে ভয়ে ভয়ে থাকতে ভালো লাগছে না। কিন্তু আপাতত এই পথই রয়েছে খোলা। ".....now the priority is different."
  

এর চাইতে ভালো, এর চাইতে আলোর পথের প্রত্যাশায়।



Sunday, 12 April 2020

আলোর খোঁজে





মানুষ আটকে থাকলে তার অভিমান বাড়ে। কেন আমার পাওনা চলাফেরায় বাঁধ দেওয়া হচ্ছে সেই নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়, প্রতিবাদ করে। তারপর এই বাঁধনের ফলে তার রোজকার জীবনে যে ভীষণরকম একটা অসুবিধা সৃষ্টি করা হচ্ছে সে বিষয়ে আশেপাশের সমস্ত লোকের অস্বস্তির কারণ হন। এই সাম্প্রতিক বাঁধন যে নিতান্তই দায় এবং কর্তব্য এটি বুঝতে খানিক সময় যায়। তারপর সেই নতুন রুটিনে মানিয়ে নেয়। বাঁধনের ঘেরাটোপের মধ্যে নিজের ভাললাগার বিষয় খুঁজে নেয়। যে কারণে জেলখানার গারদের পিছনে বসে যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত বন্দিরা পর্যন্ত একসময় বুক ভরে একটি শ্বাস নিয়ে ভাবে ঠিক আছে দেখি এখানে আর কি করা যায়। বন্দীদশাতেও সে বই লেখে, গান গায়, ছবি আঁকে! মানুষ নিজের নিজের জানালা ঠিকই খুলে নেয়। কেউ আগে কেউ পরে। তার আগে পর্যন্ত একটু বেসামাল, অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হয় বলে খানিক এদিক ওদিক দৌড়ে মরে এই যা! এই সত্যটি বোঝার জন্য এর চাইতে ভাল সময় বুঝি আর কোনোদিন ছিল না। প্রতিবাদ, পারস্পরিক দোষারোপ, কি করলে কি হতো এই সব বেসামাল দশা পেরিয়ে এখন কিছুটা থিতু হয়েছি আমরা। আপাতত এটুকু বেশিরভাগ মানুষের মগজে ঢুকেছে যে, এই ভাইরাসটি আর যাই হোক, "just like a flu" নিশ্চয়ই নয়। তাই একমাস যারা খানিক সতর্কতা নিচ্ছিলো তাদের দেখে যাঁরা আড়ালে বা ব্যক্তি বুঝে সামনেই ব্যাঙ্গের হাসি হেসেছিলেন তাঁরা নিজেরাই সৌভাগ্যবশতঃ সতর্ক হয়েছেন। নিজেদের সাথে সাথে আমাদেরও নিশ্চিন্ত করেছেন। 

এমতবস্থায় বেশ কিছু মানুষ কোনো কিছু পাবার আশায় না থেকে নিজেদের মতন ভেবে এমন কিছু কাজ করছেন যা কিছুটা হলেও এই অনিশ্চিত সময়ে আশা জাগায়। মনে হয়, মানুষের পুরোপুরি স্বার্থসর্বস্ব যন্ত্রবৎ হয়ে যেতে এখনো কিছু দেরি আছে হয়ত। সে কাজ তাঁরা হয়ত না জেনেই করছেন, সেকাজের যে বিশাল কিছু ব্যাপ্তি আছে তাও নয়, তবুও এসব ঘটনা কোথাও কিছু মানুষের কাছে বিপদের সময় আনন্দাশ্রু এনে দেয়। 

মাসখানিক আগের কথা বলছি। তখন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে মহামারী শুরু হয়েছে। নেব্রাস্কার প্রেইরীতে তখন তার ঢেউ তেমন ভাবে এসে পৌঁছায়নি। কেবল ডায়মন্ড প্রিন্সেসের এগারোজন যাত্রীকে এখানে এনে রাখা হয়েছে। এছাড়াও কয়েকজনের মধ্যে রোগ ছড়িয়েছে। কিছু মানুষ পৃথিবীর আর বাকি দেশগুলির খবরাখবর শুনে কিছুটা সতর্ক। বাকিরা সতর্ক লোকজনদের দেখে ব্যঙ্গ আর হাসির খোরাক পাচ্ছেন। এমন একটা সময় সব্জি বাজার করতে গেছি। কিনেছি বেশ কয়েকটা বড় বেগুন। দুহাত ভরে বেগুনগুলো নিয়ে প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরব বলে এগোচ্ছি, সবকটা বেগুন হাত ফস্কে মেঝেতে পরে গেল। ভ্যাবলার মতো কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে তুলতে যাব বেগুন গুলো, এমনসময় আমায় অবাক করে দিয়ে এগিয়ে এলেন একজন বয়স্ক মহিলা। কম করে ষাট বছর হবেই বয়স। আমার হাতে হাত লাগিয়ে সবকটা বেগুন কুড়িয়ে নিতে সাহায্য তো করলেনই, উপরন্তু একটা প্লাস্টিক নিয়ে মুখটা খুলে দাঁড়ালেন আমার সামনে। মিষ্টি হেসে বললেন, "I washed my hands, they are clean." অর্থাৎ এই সংক্রমণের সংসারে, আমি তাঁর হাত দিয়ে কুড়িয়ে দেওয়া বেগুন এবং এখন এই প্লাস্টিকের প্যাকেটের পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হতে পারি। আমি এতটাই হতভম্ব হয়েছিলাম যে একটি শুকনো ধন্যবাদ ছাড়া তাঁকে আর কিছুই বলতে পারিনি। যুক্তরাষ্ট্রের এই মিডওয়েস্টে একজন ষাটোর্দ্ধ স্বর্ণকেশিনী শুভ্রবর্ণা মহিলার পক্ষে নিজে থেকে একজন ভারতীয়কে সাহায্য করা, বিশেষত তার জিনিসপত্র স্পর্শ করে, এ খুব একটা সাধারণ বিষয় নয়। তাও আবার এই সংক্রমণকালে। আমায় গুছিয়ে দিয়ে তিনি চলে গেলেন। 

মা গতসপ্তাহে ফোনে বললো, অনেকদিন হয়ে গেল বাজারে গিয়ে ফল কিনতে পারে না সংক্রমণের ভয়ে। বাজারের ফলের দোকানদার অনেকদিন মাকে না দেখে কোনো একজনের হাতে প্রায় তিন সাড়ে তিন কেজি ফল পাঠিয়ে দিয়েছেন বাড়িতে। যাঁদের বাড়ির সাথে যে তার বিশেষ পরিচিতি আছে অনেকদিন ধরে এমনটাও নয়। মা তাঁকে তার প্রাপ্য মূল্য পাঠিয়ে দিয়েছেন যদিও, তাও এমন সময় অযাচিত এমন উপকার, এমন ভাবে মনে রাখা, কেবল প্রয়োজন মেটায় না ভরসা যোগায়। আশার কিরণ নিয়ে আসে।      

এবার গত সপ্তাহের আর একটা ঘটনা বলি। গতসপ্তাহে UNMC মানে আমাদের ইউনিভার্সিটি ঘোষণা করলো যে হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল দিকে গেলেই মাস্ক পড়তে হবে কারণ কোভিড রোগীদের ঘরের বাতাসে বেশ কিছুটা দূরেও ভাইরাসের RNA পাওয়া গিয়েছে। আমাদের মাস্ক ছাড়া একতলার লবিতেও যেতে নিষেধ করা হলো। আমরা সোজা রাস্তা ছেড়ে হাসপাতালের বাইরে দিয়ে ঘুরপথে পিছনের দরজা দিয়ে সোজা রিসার্চ বিল্ডিংয়ে ঢুকতে থাকলাম। কিন্তু সমস্যাটা হল তখন, যখন CDC ঘোষণা করলো যে, যে সমস্ত দেশে সাধারণ অবস্থায় মানুষজন সুস্থ অসুস্থ নির্বিশেষে মাস্ক ব্যবহার করেছে, সেসব দেশে সংক্রমণ কম হয়েছে। সুতরাং একটু মানুষজন বেশি থাকলেই মাস্ক ব্যবহার করা ভালো। এবার সকলের মধ্যে মাস্ক জোগাড় করার জন্য একটা ব্যস্ততা দেখা গেলো। হাসপাতালের প্রধান দরজা দিয়ে ঢুকলেই একটা করে মাস্ক দেয়া হতে থাকলো। অনেকে মাস্ক না থাকায় এমনিই ভয়ে ভয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকলো। অনেকেই আবার নাক মুখ ঢাকলো এনিমেল হাউসে কাজ করার জন্য রক্ষিত মাস্ক দিয়ে যা সার্জিক্যাল মাস্কেরই সমতুল। হঠাৎ একদিন আমাদের ল্যাব ম্যানেজার ল্যাবের সকলের জন্য একটা করে কাপড়ের তৈরী মাস্ক নিয়ে এসে হাজির। ওর মা আমাদের ল্যাবের সকলের জন্য নতুন কাপড় কিনে বাড়িতে বানিয়ে দিয়েছেন। তারপর ভালো করে কেচে, শুকিয়ে ইস্ত্রি করে নতুন প্যাকেটে করে ওর বাবার হাত দিয়ে ঐদিন সকালে ল্যাবের নিচে পৌঁছে দিয়েছেন। আমরা সবাই মিলে এই কদিন ওঁনার তৈরী ওই মাস্ক পরেই করিডোরে হাঁটাহাঁটি করলাম। সত্যি বলতে কি এটা আমি একেবারেই আশা করিনি। কেন করিনি সেসব কথা থাক। কিন্তু সমবেত বিপদ, বিশেষত যে বিপদে শুধু আমি বাঁচলে চলবে না, তুমি বাঁচলে তবে আমি বাঁচব- এমন বিপদে যে আশা না করা মানুষের কাছ থেকেও অযাচিত সাহায্য এসে পড়ে তা আর একবার দেখে অবাক হলাম। উনি আমাদের কোনোদিন দেখেননি। অথচ সকলের জন্য একটা করে মাস্ক বানিয়েছেন। কাপড়ের মাস্ক কতটা সুরক্ষা দেবে সে প্রশ্ন আসার আগে এটা মনে আসে যে, এই বিপদের দিনে ওঁনার পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল উনি সেটা করেছেন।  

আর আমাদের ল্যাবের সেই কাটখোট্টা ছেলেটি, যে বাঁধাকপি সেদ্ধ আর ভেড়ার মাংস খায় আর ভিডিও গেম খেলে বাড়তি বন্ধুহীন সময় কাটায়, সে হঠাৎ করে একদিন ব্যাগ থেকে একটার পর একটা প্যাকেট বের করতে থাকে। বড় বড় জিপলক ব্যাগ, প্রতিটা ব্যাগে দুটো করে N95 লেখা মাস্ক। যা এখন অনলাইনেও পাওয়া দুষ্কর। তার দেশে জানুয়ারি মাসেই যখন মহামারী ছড়িয়ে পড়েছিলো, তার ভয়াবহতা আঁচ করে সে জানুয়ারি মাসেই দুএক বাক্স এই মাস্ক কিনে রেখেছিলো। এখন আমাদের প্রয়োজনে সে ল্যাবের প্রত্যেককে দুটি করে ভাগ দিচ্ছে নিজের সুরক্ষা থেকে কাটছাঁট করে। এই ছেলেই ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নিজের দেশে, নিজের বাড়িতে একবাক্স মাস্ক পাঠিয়েছিল পঁচাত্তর ডলার শিপিং চার্জ দিয়ে। আমি শুনে বলেছিলাম- "ওরে বাবা সে তো অনেক!" সেদিন এই আপাত কাটখোট্টা ছেলেই বলেছিলো, "Sometimes money is not important to consider, now the priority is different."

হয়ত এই ছোট ছোট বিষয়গুলি অনেক মানুষের কাজে লাগার মতন কিছু নয়। কিন্তু দু পাঁচ জনের ছোট রোজকার গোষ্ঠীর মধ্যে এই ছোট ছোট যত্ন গুলিই তফাৎ তৈরী করে। ভালোবাসা আর ভরসা যোগায়। ধন্যবাদ দিয়ে এই প্রাপ্তিগুলিকে মাপা যায় না। আলোর আশায় বুক বেঁধে থাকি কেবল। মনে হয় এই তো বেঁধে বেঁধে আছি। হয়ত অলীক সুরক্ষার ভাবনা, কিন্তু তবুও কোথাও ভরসা জাগে। সামনের সোমবার থেকে দুই সপ্তাহের জন্য প্রয়োজন ছাড়া আমাদের ল্যাবে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। বাড়ি থেকেই যা করার করতে হবে। নেব্রাস্কায় সংক্রমণ বাড়ছে। শুক্রবার সমস্ত কিছু গুটিয়ে বিকেলে বাড়ি ফেরার রাস্তায় দেখলাম একটি মন ভালো করা ছোট্ট জিনিস। হাসপাতালের প্রধান প্রবেশপথের পাশে ছোটখাটো ফুলের গাছের জন্য যে ছোট জায়গা গুলি করা আছে তাতে তিনটে ছোটছোট রং করা পাথর। এ জিনিস আমি আগেও দেখেছি। মাউন্ট রাসমোরের কাছে কাস্টার বলে যে ছোট শহরটি আছে আর চার্চের সামনে রাস্তায়। শহরের বাচ্চারা ছোট ছোট পাথরে রং করে তাতে ছোট নোট লিখে রাখে। সেটি থ্যাংক ইউ নোট হতে পারে বা যেকোনো পজেটিভ বার্তা। সমবেত ভাবে কোনো একটি সংস্থা বা কোনো একদল লোককে ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা জানবার সাধারণ কিন্তু সুন্দর একটি আবেগঘন পদ্ধতি। আমাদের হাসপাতালের দরজার সামনে বাচ্চাদের হাতে রঙিন ওই তিনটুকরো পাথরের একটায় লেখা ছিল "It will be ok." অন্যটায় "Thank you." আর শেষেরটিতে শব্দহীন তিনটি রক্তিম হৃদয় কেবল। এই দুর্বিপাকে ওমাহা শহরের তিনজন মানুষ বা তিনজন ছোট শিশুর দেওয়া বার্তা এইমুহূর্তে ওমাহার সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালের কর্মীদের প্রতি। মন ভরে গেল। আশা করলাম এই প্রবেশ পথ রঙিন হয়ে উঠুক আরো। সেই রং প্রবেশ করুক ভেতরের প্রতিটি মানুষের মনে। মন ভালো না থাকলে শরীর লড়াই করতে পারে না যে। এ বৈজ্ঞানিক সত্য।

সুস্থতা আসুক, সেরে উঠুক আমার দেশ। সেরে উঠুক এ শহর। সেরে উঠুক পৃথিবী। 


           

Monday, 6 April 2020

প্রিয় জানালা




প্রিয় জানালা, গত কয়েকদিনের পর আজ তোমার গা ভর্তি রোদ্দুর। আয়তাকার শরীরের অর্ধেকটা জুড়ে নীল আকাশের ক্যানভাস। তাইতে ন্যাড়া গাছের আঁকিবুকি কাটা। আল্পনা যেন। মাঝে মাঝে দুচার জন মানুষ চলেছেন সাথে পোষ্য নিয়ে। কোথাও কোনো বিরুদ্ধতা নেই যেন। তাই না? সুন্দর একটি অলস দিন। অথচ তুমি জানো প্রিয় জানালা, কি ভীষণ বিরুদ্ধতায় দিন কাটছে আমাদের সক্কলের। অসুস্থতার আর মৃত্যুভয়ে বসুন্ধরা জর্জরিত। আরো বেশি অস্থিরতা যেন অনিশ্চয়তায়। কবে শেষ হবে এই বিরুদ্ধতার? আমার অসুখ আর সুস্থতার মাঝে তুমি ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছো আজ প্রিয় জানালা আমার। তোমার ভিতর দিয়ে যতটুকু দেখা যায় ততুটুকুই আজ পৃথিবী। অন্ততঃ আজকের জন্য তো বটেই। মারাত্মক এক বস্তু যাকে ঠিকঠাক জীব পর্যন্ত বলা চলে না সে কিনা আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীবের চলনে গমনে কঠোর এক শেকল পরিয়ে দিলে। যা কেটে বেরিয়ে পড়া মৃত্যুরই নামান্তর। কি অদ্ভুত পরিহাস শ্রেষ্ঠত্বের। এত খানি পরাজয় চোখের সামনে দেখেও তবুও সেই শ্রেষ্ঠ জীব শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই করে। তবুও সে অকিঞ্চিৎকর বিষয়ে অপরিসীম তর্ক করে গলা ফাটিয়ে। তবুও সে সকালের রোদে পুবমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে একবার ধন্যবাদ দেয় না যে আজকের সকালটাও সে দেখতে পাচ্ছে সে কেবল তার সৌভাগ্য বলে। এ তার পাওনার ঝুলিতে নাও থাকতে পারতো। আমার কষ্ট হয় প্রিয় জানালা আমার। মানুষের প্রতি মানুষের এত বিদ্বেষ! এতটা! মতানৈক্য হলে এমন দুর্দশার দিনেও একজন মানুষ আর একজন মানুষের প্রতি এতটা কলুষিত বাক্য ব্যবহার করতে পারে! কেবল মতের মিল হয়না বলে! এই তার শ্রেষ্ঠত্ব! এই তার স্থীর্য্য!

পৃথিবী থেকে মুখ ফিরিয়ে তোমার কাছে ফিরে আসি প্রিয় জানালা। তোমার আয়তাকার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে সকালের রোদ্দুর মেখে নিই কপালে, দুচোখে। মনে মনে বলি - হে, দিবাকর নীরোগ করো, পৃথিবীর অসুখে প্রলেপ দাও। প্রিয় জানালা, তোমার গায়ে হাত বুলিয়ে বাইরের পৃথিবীর স্পর্শ নিই। গত অক্টোবর মাসে ক্ষেত থেকে কুড়িয়ে আনা ছোট ছোট কুমড়ো গুলো, যেগুলো তোমার হেপাজতে রেখে নিশ্চিন্তে ছিলাম আমি, সেগুলোকে খেলনা মনে হয় জানো। তোমার ভিতর দিয়ে পিছন থেকে আসা রোদ্দুরে কমলা আলোর একটা ছোট্ট আবহ তৈরী করে রাখে ওরা প্রতি সকালে। বাইরের অসুখে ওরাও বুঝি অসুখী। শুকিয়ে হালকা হয়ে গেছে। অসুখের ছোঁয়াচ লেগে ছত্রাক বাসা বাঁধছে ওদেরও শরীরে। আর কত কতদিন যুঝতে পারবে ওরা জানিনা। আর কতদিন পৃথিবী যুঝতে পারবে জানিনা। মরে যাওয়ার আগে রয়ে যাওয়া কাজ, থেকে যাওয়া ইচ্ছে আর ফেলে যাওয়া মানুষের মুখ। এসব কিছুই একসাথে মরণটাকে সহজ করে দেয় না যে। মরে যাওয়া ভারী কঠিন। 

কবে কোন যুগ আগে তোমারই সঙ্গে গল্প করতে করতে তোমারই কোলের কাছে বসে বুঝি একটি ছবি এঁকেছিলাম। মনে আছে তোমার? সে ছবি শেষ করেছিলাম কিনা মনে পড়ে না। অসাবধানতায় তুলির ডগা থেকে খানিকটা রং গিয়ে পড়েছিল তোমারই পায়ের কাছে দেওয়ালে। তুমি বলেছিলে, "ইশ! দিলে তো খানিকটা রংকে এজন্মের সার্থকতায় না পৌঁছাতে?" দেওয়ালে সে ছবির রং আজও রয়ে গেছে। সে ক্যানভাসটা শেষ করতে ইচ্ছে করে। পুরোনো রঙের ওপরে নতুন রঙের প্রলেপ দিতে ইচ্ছে করে। অসুখ সারলে হলুদ আর কমলা রঙের বন্যা আনতে ইচ্ছে করে। ক্যানভাস জুড়ে সূর্য্য উঠবে আবার। ভারী ইচ্ছে করে। আমার সে প্রিয়জন ভারী সুন্দর একটা গাছ দিয়েছিলো আমায়। তুমি তো জানোই। তোমারই ডানদিকে রেখেছিলুম তাকে, রোদ্দুরের উষ্ণতায় স্নান করিয়ে দিতে। তখন আমার বাতাস নীরোগ ছিল। এই আকালেও তিন তিনটে পাতা গজিয়েছে তার নতুন করে। চকচকে সবুজ, গোল হয়ে গুটিয়ে আছে। ও বাড়তে চায় এখন। অফুরন্ত প্রাণ নিয়ে রোজ বলে- "কই হাত পা ছড়াবার একটা বড়সড় একটা জায়গা দিলে না যে আমায়?" তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে কেবল স্বান্ত্বনা দিই - "এই তো দিই, আর কটা দিন সবুর করে যা মাণিক, অসুখ খানিক উপশম হলেই......।"  

প্রিয় বাতায়ন আমার, আমার ছোট্ট গাছটিকে রোদ্দুর দিয়ে, প্রাণশক্তি দিয়ে, সাহস দিয়ে ততদিন সুস্থ রেখো। 

জীবনকে চোখের সামনে রেখে মৃত্যু যে ভারী কঠিন।   


Monday, 23 March 2020

বদল


একসাথে গাঁথা শব্দেরা যখন সুর খুঁজে পায় তখন কবিতা হয়ে ওঠে। পরপর রং জুড়ে জুড়ে ছবি হয়ে ওঠে।  আর পরের পর অনুভূতি যোগ করে করে গড়ে ওঠে একটা গোটা জীবন। বিচিত্র সব অনুভূতি, অযুত তার প্রভাব। এক একটি ঘটনা, এক একটি মন্তব্য মুহূর্তে বদলে দেয় একটি মানুষকে।  আগাপাশতলা। কখনো রাতারাতি, কখনো অতি ধীরে, একটু একটু করে সারা জীবন ধরে। আজন্মের ভীতু মানুষটি একরাতে ভয় সম্পর্কে বেমালুম উদাসীন হয়ে পড়ে। আবার কুড়ি বছরের ক্ষণিকবাদী মানুষটিই ষাট বছরে জীবনের আবহমানের চলমানতা অনুভব করে শান্ত দর্শকমাত্র হয়ে ওঠে।

আসলে বোধহয় বদলটা আসবে বলে আসে না। বদলটা চাও বা না চাও, হয়েই যায়। একজন মানুষ সারা জীবনে এতটুকুও বদলায়নি এমনটা হয়না। এবং আমার বিশ্বাস বদলটা ভালোর দিকেই হয়।  এখন তুমি বলবে বদলটা ভাল না খারাপের দিকে সে আমি জানছি কেমন করে? ভাল বা খারাপটা তো আপেক্ষিক। তা ঠিকই। অবশ্যই আমি বলব, আমার যেটুকু ভালো বলে মনে হয় সেটুকুই। এতে বিশেষ সমস্যা নেই। সমস্যাটা তখনই শুরু হয় যখন আমার ভালোটা আমি তোমার ওপর চাপিয়ে দিতে চাইবো। তাই না? আমার ভাবনাটা যতই যুক্তিযুক্ত হোক না কেন, ততক্ষণ তোমার সেটা চাপিয়ে দেওয়া বলেই মনে হবে যতক্ষণ না তুমি নিজে সেটাকে ভালো বা যুক্তিপূর্ণ বলে মনে করছ, তাই না? তার আগে পর্যন্ত তোমার যুক্তিটিকে টিকিয়ে রাখতে বা হয়ত নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রানপণে তুমি সেটার বিরুদ্ধে কথা বলে যাবে। স্থিতধী মানুষ বেশি নেই। যাঁর ক্ষমতা আছে আদ্যন্ত সঠিক যুক্তির কাছে নিজের ভুল বুঝতে পেরে আত্মসমর্পন করার। আমরা বেশির ভাগ মানুষই প্রথমে নিজের যুক্তিটা সঠিক মনে করেই যেকোনো বিষয়ে তর্ক করতে শুরু করি। তারপর তর্কের মাঝেই যুক্তি-প্রতিযুক্তির মাঝে পড়ে হয়ত কখনো নিজের যুক্তির ফাঁকটুকু নজরে আসে। মজাটা শুরু হয় তারপরেই। এতক্ষন পর্যন্ত যুক্তি তর্কের পর্যায় থেকে ব্যাপারটা "আমার যুক্তিকে হেরে যেতে দেব না" জাতীয় একটা আত্মরক্ষাসুলভ লড়াইয়ের চেহারা নিয়ে আসি আমাদের নিজেদের বাঁচাতে। আর কে না জানে যে আত্মরক্ষার সেরা উপকরণ হলো আক্রমণ। অর্থাৎ তখন আমরা প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে শুরু করি। আর যেহেতু ততক্ষনে আমাদের যুক্তির ভাঁড়ার শূন্য, অতএব আমরা যুদ্ধের নিয়ম ভুলে দাঁত নখ বের করে আঁচড়াতে থাকি। অসভ্যের মত "অমুকে তো করেছে, তাই আমিও করেছি।" "বেশ করেছি, আবার করব" ইত্যাদি বলে কৃতকর্মের সামনে যাহোক একটা ঢাল খাড়া করার চেষ্টা করি। আমরা সবাই এরকম। বিশ্বাস করো, তেমন তেমন পরিস্থিতিতে পড়লে তুমি, আমি প্রত্যেকে এরকম। কেউ ব্যতিক্রম নই। This is simple human nature, self-defense. এক্ষেত্রে, Defense to protect self opinion. আত্মধারণা সমর্থন। অনেকক্ষেত্রেই সেটি ভুল ধারণা। আর সেটি যে ভুল, আমরা সেটা খুব ভালো করে জানি মনে মনে। তবুও গলা ফাটিয়ে লড়ে যাই ওই basic human nature রক্ষার তাগিদে।

যাক গে যাক। এসবে তোমার বিশেষ কিছু দোষ দেখিনা। এতদিন মুখে রক্ত তুলে তর্ক করেছো, তারপর মনে মনে নিজের ভুল বুঝতে পেরে "হেঁ হেঁ, যাহঃ যাহঃ, এসব অনেক দেখা আছে" বলে ছদ্ম তাচ্ছিল্য করেছো,  আর সব শেষে "ও কেন করেনি? তাই আমিও করিনি" - এরকম ক্লাস টু এর বাচ্চাদের মতো যুক্তি খাড়া করে দুর্গ আগলানোর চেষ্টা করেছো। শেষকালে আর না পেরে ফাটিয়ে ঝগড়া করেছো। কিন্তু এবার তো পরিস্থিতি তোমায় সুযোগ দিয়েছে বদলানোর। নিজেকের খোলসটাকে বদলানোর। ওই যে আমি প্রথমেই বলছিলাম না, ঝপ করে একদিন সুযোগ চলে আসে নিজেকে বদলানোর। আগে পিছে কিছু ভাবার আগেই দেখবে সামনে বিশাল সুযোগের সমুদ্দুর। সেটা হাতছাড়া করার বোকামি কি তোমার না করলেই নয়? বাইরে তোমায় যতই লোকে গালাগাল করুক না কেন যে তুমি "মূর্খ", "গাড়োল", "কিছুই বোঝোনা", তার পর আরো কিসব পড়লাম- "আবোদা", "আবাল"-ইত্যাদি ইত্যাদি বাছাই করা নতুন-পুরোনো বিশেষণ, তুমি লোকটা আদপে কি সেরকম নাকি? মোটেওনা। বিশ্বাস করো, এসব বিশেষণ প্রয়োগ করে যাঁরা তোমায়  গন্ডমূর্খের একনম্বর উদাহরণ বলে দাগিয়ে প্রবল ধিক্কার আর ছ্যা ছ্যা করে মুখে মাস্ক পরে ঘরে খিল তুলছেন, তাঁরাও তার আগে দোকানে গিয়ে প্রয়োজনের অনেক অনেক অতিরিক্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার জিনিস আর হাত ধোয়ার জিনিস কিনে ঘর বোঝাই করেছেন। যাঁরা বলছেন তাঁরা, যাঁরা বলছেন না তাঁরা, যারা এসবের সমস্ত কিছুর ঊর্র্ধে কেবল কোনোক্রমে বেঁচে আছেন তাঁরা, তুমি আমি সক্কলে একই রকম গাড়োল। কেবল কে কোন বিষয়ে গাড়োলত্ত্ব প্রকাশ করবো সেই বিষয়ে খানিক তফাৎ আছে।

এই যেমন মনে করো, এখন তুমি নাক খুঁটে সেই হাতে এলিভেটরের সুইচ টিপলে আমি মুখে মাস্ক আর হাতে গ্লাভস পরে তোমার গলাটাই টিপে দেব। কিন্তু এই আমিই আবার সারা শহর ঘুরে গাড়ির ট্রাঙ্ক ভর্তি করে জিনিস কিনে ফ্রিজ বোঝাই করি। আমিই বা তবে এই পরিস্থিতিতে গাড়োল নই কেন? যদিও আমার যুক্তি আছেই এখানে যে "সবাই সব কিছু কিনে দোকান ফাঁকা করে দিলো, আমি তবে বোকার মতো কিনবো না কেন।" এরপর এই ধরো, আপিস-কাচারী-ইস্কুল-কলেজ বন্ধ বলে বাক্স প্যাঁটরা গুছিয়ে বেড়ু করতে চললুম। তারপর পুলিশের তাড়া খেয়ে, ফেসবুকের গুঁতো খেয়ে তারপর বুঝলুম যে "এহেঃ, কাঁচা কাজ হয়ে গেছে বড্ড। এখন ফেসবুকে ছবিও দেওয়া যাবে না। "ভয় পাইনা" বলে বাহাদুরিও নেওয়া যাবেনা। আসাটাই ফালতু হলে গেলো।" কেন যে আদপেই আপিস-কাচারী-ইস্কুল-কলেজ বন্ধ তার কারণটা ঠিক করে বুঝে নেব? ফুহঃ, অতো সময় নেই। তারপর ধরো একদিনের কারফিউ, সেই একটা দিন ঘরে বসে থাকতে আমার অসুবিধা হচ্ছে। তাই মনে করো পাড়ার চায়ের দোকানে গিয়ে আরো পাঁচজনের সাথে গুলতানি করতে করতে বর্তমান পরিস্থিতি কতটা ভয়ঙ্কর সেই আলোচনা যে করব একটু, তারও উপায় নাই বাপু? কে না কে এসে বলবে "এইও, চায়ের দোকান খুলেছো কেন? এই তোমরা এখানে জড়ো হয়েছো কেন? জানোনা কারফিউ?" আমি বাপু ফেসবুকে বাঘ মারা লোক, আমায় সহজে হারলে চলে? তাই আমার সামনে গামছা গায়ের লুঙ্গি পরা তুমি যদি মিনমিন করে বলো "চা খাবো না আমরা?" আমি চ্যাঁচাবো, "আমলার ছেলেকে জিজ্ঞাসা করো, ও কেন বেরিয়েছে, তাইলে আমি বলব।" তোমার থেকে বেশি জোরে চিৎকারটা আমাকেই করতে হবে তাই না? তুমি গামছা গায়ে, লুঙ্গি পরে আর আমি চশমা পরে ইন করে শার্ট-প্যান্ট। তুমি আমি দুজনেই গাড়োল। পরে অবশ্য ঘরে গিয়ে ফেসবুকের পাতায় তোমায় গাড়োল বলতে আমার একটুও আটকাবে না। কারণ আমি ছাড়া বাকি সবাই আমজনতা। আমজনতার মুণ্ডপাত করা আমার হক। এবার যদি মনে করো একমাস ঘরে থাকতে হয় তাহলে ভাইরাস কেন, স্নায়বিক রোগেই স্রেফ মরে যাবো।  

তবে আমি কিন্তু আশাবাদী। আমি মনে মনে স্থির বিশ্বাস করি, তুমি যতই গাড়োল হওনা কেন একখানা দারুন পরিস্থিতির সম্মুখে সময় তোমায় দাঁড় করিয়েছে। কেবল দর্শক হয়ে থাকবে না তুমি-এ আমি ঠিক জানি। নিজের সবজান্তা খোলসটিকে ফেলে দিয়ে ঠিক নিজেকে পরিবর্তন করবে জানি। আর ইয়ে ওই "ও কেন করেছে ? আমিও বেশ করেছি। ওকে আগে বকো, নইলে আমিও করবো।"- এই বস্তাপচা, মানে এই ক্লিশে, মানে এই ভীষণ পুরোনো ডায়লগটা না - ভাবে দেখলুম আর চলছে না বুঝলে। সব স্টাইলেরই তো একটা এক্সপায়ারি ডেট থাকে তাই না? ঐটা বরং বাদই দিয়ে দাও বুঝলে। "দেখ কেমন দিলুম" লুকটার জন্য আরো একটা ভীষণ কার্যকরী ডায়লগ বলি বরং চুপিচুপি। আগামী দিনে ভীষণ "ইন" হয়ে যাবে ব্যাপারটা। আগেভাগে বলি বরং। এই মনে করো, সত্যি সত্যি নিজেকে বদলে একদম ভেতর বাইরে এক করে দিলে। বুক বাজিয়ে সত্যি সত্যি ভালো হয়ে গেলে। তুমি নিজেই জানো ভালো বলতে আমি কি বলছি। সব আছে তোমার ভেতরে। কেবল করতে ভয় পাও। আজকে যারা গাড়োল বলছে কালকে তারাই পিষে মারবে বলে। কিন্তু প্রথম বাধাটা কাটিয়ে সাহস করে সঠিক পথে অন্যের অসুবিধা না করে লড়াইটা করে দেখাও দিকি একবার, সবাই বলবে "দেখেছো, লোকটার কলজের জোর! যা বলে তাই করে দেখায় কিন্তু। লড়াইটা দেখলে?"

জৈব মারণাস্ত্র ব্যাপারটা সত্যি কিনা, রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত সৎপ্রচেষ্টার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে কেবল থালা বাজানো আর কেমন ভুল পদ্ধতিতে কাশি ঢাকতে হবে এই নিয়ে খিল্লি করা, এবং আশ্চর্য সব গুজবের ভিডিও শেয়ার করার ফাঁকে ফাঁকে, এই ক্রাইসিস মিটে গেলে 'কেবল নিজেরটি ছাড়া কিছু বুঝিনা' এই মুখোশটা সরিয়ে ফেলে সত্যিকারের একজন স্বাস্থ্যসচেতন, নাগরিক-দায়িত্ব সচেতন, সুনাগরিক হয়ে দেখাও দিকি। আমি জানি তুমি ঠিক পারবে। কারণ আদতে তুমি সেরকমই। এই ক্রাইসিস তোমার মুখোশটা খুলে নিক এই শুভেচ্ছা রইলো। যেটা তুমি নানান ভয়ে কেবল খুলে উঠতে পারছো না।

এ লেখা যতক্ষণে তোমার চোখে পড়বে ততক্ষনে ওপরের স্ট্যাটিসটিক্স অনেকটাই বদলে যাবে, দুৰ্ভাগ্যবশতঃ খারাপের দিকেই। খুব বেশি না বদলানোটা তোমার হাতেই। এবার বোলো কতোটা শক্তিধর তুমি। ভেবে দেখো বদলটা আনবে কি না?

আর আমি? ধুর বোকা। আমি তো আগে থেকেই ভীষণ ভালো। আগেই তো বললাম। আমি বাদে বাকি সকলে তো আমজনতা। আর আমজনতারই তো সব দোষ এযাবৎ কাল পর্যন্ত যখন যা যা হয়েছে।

দোলখেলা

অন্য কিছু খুঁজতে গিয়ে হঠাৎই সেদিন একটা বাক্স পেলুম। যত্ন করে গুছিয়ে রাখা। কি যে রেখেছিলুম তাতে ভুলেই গেছি। তাড়াতাড়ি খুলে দেখি একটা রঙিন পুঁটুলি আর পুঁটুলির মধ্যে কত্ত রং। কালো মেয়ের কপালের টিপের মতন লাল, গোধূলির আকাশের মতন কমলা। আহির ভৈরব যখন বাজে, তখন যেমন রং হয় রোদ্দুরের, তেমনি এক হলুদ রং ও পেয়ে গেলুম সেখানে। আর ছিল প্রথম প্রেমের স্পর্শের মতন এক গোলাপি রং, আর মধ্যদিনের ঝকঝকে আকাশের মতন স্বচ্ছ এক আসমানী রং।

রঙের সাথে রং মিলিয়ে ছবি আঁকতে গিয়ে দেখি আঁকব কি তাই তো ঠিক করিনি। সাদা পাতায় রং দিয়ে আঁকিবুকি কেটেছি কেবল সারা সকাল জুড়ে। ছবি তো ফোটেইনি তাতে বরং সাদা পাতায় এতোলবেতোল আনাড়ি রঙের ছোপ। কোনো অবয়ব নেই তার। আমার খানিকটা রং আর সারাটা সকাল অপচয় হওয়া ছাড়া আর কোনো গল্প নেই তাতে।

রং দিয়ে দোল খেলতে গিয়ে দেখি দোল খেলার সাথীই নেই তো রং মাখাবো কাকে? নিজেই নিজের গালে রং মাখানো যায় বোলো? দোল খেলার সাথীরা সক্কলে বড় হয়ে গেছে। আমার মতন অঢেল সময়ই বা কৈ তাদের? রং মাখতে তাদের ভারী বয়েই গেছে।

কি করি ? কি করি? ভাবতে ভাবতে ভারী অভিমান হল, কার ওপরে তা বলতে পারবোনা বাপু। কেন এই রং দিয়েও একটা সুন্দর ছবি আঁকা হলো না? কেন কেউ নেই প্রাণভরে রং মাখাবার, রং মাখবার? এইসব আনাড়ি ছেলেমানুষী।  

ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল সেই একলা পলাশ গাছটার কথা। বেচারা সারা মরশুমে একলা একলাই রং মাখে। আশে পাশে আর কোনো গাছে রঙিন ফুল আসেনা যে। ঠিক করলুম, রং কে নিয়ে নির্বাসনে যাব সেই আধা জঙ্গুলে জায়গাটায়, সেই যেখানে আছে পলাশ গাছটা। যার ফুল কেউ তোলেনা, সুঁচ-সুতো দিয়ে জবাই করে গায়ে মাথায় গলায় নরমুণ্ড মালিকার মতন দোলাবে বলে। মুঠো মুঠো লালরং ছড়িয়ে দিলুম সেই একলা পলাশ গাছটার আশেপাশে। বাকি ন্যাড়াবোঁচা মামুলি আগাছাগুলোও নাহয় একদিনের জন্য রঙিন হলো। পলাশের সে কি খুশি। একা একা রঙিন হতে ভাল লাগে নাকি? পলাশ আমার রঙের বাক্স থেকে একমুঠো লাল আবির নিয়ে মাখিয়ে দিল আমারই দুগালে। 

এখনো তো অনেক রং বাকি বাক্স ভরে। কি করি? কি করি? ভাবতে ভাবতে সামনে দেখি সেই আউল-বাউল মানুষটা একলাটি দাঁড়িয়ে পথের ধারে। পথিকের একতারা আজ সুর ভুলেছে। আড়বাঁশিটি এসেছে ফেলে সেই কবেই তার নিজের ভিটেয়। ফেলে আসা ঘরের উঠোনের কোণে আজও অপেক্ষায় বুঝি সেই বাঁশি। বাঁশিটিকে আর একবার হাতে নিয়ে সুর তুলতে মন গিয়েছে চুরি। তাই সে পথ ভুলেছে। তারও তো একদিন একটা আপন ভিটে ছিল। ভিটে তো সেই কবে গেছে দূরে যেদিন থেকে সে পথ চিনতে নেমেছে পথে। ঘর গিয়েছে, সাথে সাথে রংও গেছে জানো? রংকে বললুম, এসো রং, সেই পথিকের খাঁচার ভেতর ঢুকে পড়ি বরং তোমায় নিয়ে। গিরিমাটি লেপা তার উঠোনের রঙে রং মিলিয়ে কমলা রঙের আল্পনা দিই পথের ওপর। সেই পুরোনো নকশা মেলাই তোমায় আমার আঙ্গুল দিয়ে জড়িয়ে নিয়ে। সারা পথ জুড়ে কমলা রঙের আল্পনা আঁকলুম দুজন মিলে। আঁকার শেষে দেখি একতারাটি তার কখন যেন আবার বাজতে লেগেছে। নতুন রকম সুর উঠেছে তাতে। ক্রমশঃ সেই সুর নেশার মতন দুলতে দুলতে আমার কপালে বুলিয়ে দিল রঙিন পালক। ওমা! দেখি সারা কপাল জুড়ে আমার কমলা রং। 

এত্ত এত্ত আল্পনা দিয়েও এখনো এতো রং বাকি আমার বাক্সতে। কি করি? কি করি? ভাবতে ভাবতে দেখি একটা মস্ত বড় বাড়ি। ভারী গম্ভীর বাড়ি। বাড়িটার চারপাশে মস্ত পরিখা কাটা। সামনে এগিয়ে দেখি, সে হল ভয়ের পরিখা। অনিশ্চয়তা আর হতাশার কুয়াশা দিয়ে দৃষ্টিপথ বন্ধ করে রেখেছে। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না সামনে। দেখিইনা কি হয় বলে দিলুম একমুঠো রং ছড়িয়ে সেই কুয়াশার দিকে। ওমা! যেইনা ছোঁড়া, রঙিন আবিরের ছোঁয়ায় টুক করে খানিকটা কুয়াশা গেল কেটে। ভয়, অনিশ্চয়তা আর হতাশার কুয়াশা দিয়ে রং কে দূরে রেখেছিল। তাইতো সামনে যা কিছু সব এক্কেবারে রংহীন। বাড়িটা, বাড়িটার সামনের সারি সারি মানুষ। সবকিছু রংহীন, বিষণ্ণ। কেন বলতো? বাড়িটা একটা হাসপাতাল। প্রিয়জন অসুস্থ হলে হাসপাতালের বাইরে সব সারি সারি অনিশ্চিত মুখের ভিড়ে, ভয় জড়ো হয়। অনিশ্চয়তা আর হতাশার মেঘ ঘনিয়ে আসে। তাইতেই তো বাড়িটার চারিদিকে অনিশ্চয়তা আর হতাশার কুয়াশায় মোড়া ভয়ের পরিখা তৈরিহয়েছে। রঙের প্রবেশ নিষেধ করতে। বিবর্ণ কুয়াশায় দিন দুবেলা রং হারানো মায়ের মুখ, প্রাণপণে রং খুঁজে ফেরে ইষ্ট-উপাসনায়। অপেক্ষা করে খেলতে খেলতে ঝিমিয়ে পড়া মেয়ের জন্য। কিংবা ধরো, রংহীন মেয়ে বাবার সুস্থতার অপেক্ষা দিয়ে সাদাকালো বিনুনি বানায়। কেন জানো? ভয় যেখানে বাসা বাঁধে, রং সেখানে থাকে না। কিংবা ধরো রং ফুরোলে অনিশ্চয়তা জন্ম নেয়। তাই তো সেখানে রঙের খুব প্রয়োজন। রং দিয়েই তো ওই কুয়াশায় নজর পথ আবার খোলা যায়। এই আমি যেমন করে রং দিয়ে পথ খুঁজলুম, তেমন করেই।
   
রংকে বললুম, তোমায় নিয়ে বরং নির্বাসনেই যাই হাসপাতালে বাইরে বসা এই সবার মাঝে, যেখানে ভয় আর হতাশায় বর্ণহীন করেছে আশা আর আনন্দকে। বাইরে থেকে রং না পেলে অসুস্থ মানুষগুলো যুঝবে কেমন করে বলো দেখি? যেই না তুমি বুকের মাঝের পদ্মটা ভেদ করে সোজা হৃদমাঝারের সুখ জাগালে, অমনি মনের অসুখ গায়েব। আর মনের অসুখ হার মানলে দেহের অসুখের আর জোর কি যে রং কে দূরে ঠেলে রাখে? যারা অসুখের বাইরে আছে, তাদের মনে রং পৌঁছতে না পারলে কেমন করেই বা ভয়, অনিশ্চয়তা আর হতাশার কুয়াশা কাটিয়ে অসুখের ভেতরে থাকা প্রিয়জনদের মনে রং পৌঁছে দেবে? 

তারপর সেই গোটা রঙের বাক্সটা দিলুম উপুড় করে বিবর্ণ মুখ গুলোকে রঙিন করতে। দেখি এইবার কেমন করে ভয়, অনিশ্চয়তা আর হতাশার মেঘ দিয়ে অসুখকে রঙের থেকে দূরে রাখতে পারে। যেই না এক একটা রংহীন মুখ রাঙিয়ে উঠতে শুরু করলো, সেই রং আমার গায়েও এসে লাগতে লাগলো।  ক্রমশঃই আমার সারা শরীর লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, গোলাপি, আসমানিতে রঙিন হয়ে উঠতে লাগলো। আশ মিটিয়ে দোল খেলব আজ। দেখি এইবার অসুখ পেরিয়ে আনন্দের দোলরং আসে কিনা।