Tuesday, 17 March 2015

ভাগ্যিস!

মাত্র ছয় বছরেই যে জেনে ফেলেছে
কেমন হয় নারীখাদকের নখ,
ভাগ্যিস সে আমার কন্যাসমা,
কন্যা নয়।

জীবন উপান্তে দাঁড়িয়ে
শান্তির ছায়া বিতরণ করতে এসে
ছিন্নভিন্ন হলো যাঁর নারীজীবন
ভাগ্যিস তিনি আমার নিজের পিতামহী নন।

ভাগ্যিস আমার স্বামীর নাম
অভিজিৎ নয় বলে
তাঁর রক্তে স্নান করে
ক্রোধে বন্যা হয়ে যেতে হয়নি আমায় এখনো।

ভাগ্যিস আমার মা কে
ধর্ষিতা মৃতা কন্যার শব কোলে চেপে
একযমুনা কান্না নিয়ে
নিথর চোখে বিচারসভায়
দাঁড়াতে হয়নি এখনো।

তাই তো কালও আমি
নরম কম্বলের ওম নিয়ে
নিশ্চিন্তে পাশ ফিরেছিলাম।
ভাগ্যিস।  

Sunday, 15 March 2015

প্রবাস, অনাবাস ও ভারতবর্ষ

কিছুদিন আগে পুরোনো রেকর্ডেড একটি ইন্টারভিউ দেখছিলাম। প্রশ্নকর্তার প্রশ্ন ছিল প্রাদেশিকতাকে ছাপিয়ে কোনো একজন ভারতে জন্মগ্রহণকারী মানুষ হিসেবে আমরা নিজেদের কতটা পূর্ণাঙ্গ ভারতীয় হিসেবে মনে করি? একজন সমাজসচেতন লেখিকা হিসেবে তাঁর মতামত কি? এই প্রশ্নের উত্তরে সাক্ষাৎকারদাত্রী শোভা দে একটি কথা বলছিলেন যেটা আমার বর্তমান সময়ে বড়ই প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। বিষয়টি হলো, তাঁর মতে, ব্রিটিশ যুগের আগে ভারতবর্ষে অর্থাৎ মানচিত্র অনুসারে যে ভূখন্ডকে আমরা ভারতবর্ষ বলে চিহ্নিত করি সেটির কোনো সামগ্রিক অস্তিত্বই ছিল না। ব্রিটিশ বানিজ্য তরী এসে ঠেকেছিল এমন ভারতের উপকূলে যার উত্তর দিকে বেশ কিছুটা অংশ বাদ দিলে বাকি পুরোটাই ছোটো ছোটো খন্ডিত মেজো সেজো রাজপরিবারের দখলে। তাদের মধ্যেও আবার পারস্পরিক বিবাদ, পারিবারিক ক্ষমতাদখলের যুদ্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি। আর উত্তরপশ্চিম দিক থেকে মাঝে মাঝেই অস্তগামী মোঘলদের লুটপাট, অরাজকতা আর সেনাবিদ্রোহের ঘটনা। সুতরাং সে সময় সম্পূর্ণ ভারতবর্ষ বলতে ব্যাপারটা ঠিক কি সেটি একজন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ধারণাতেই ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা আস্ত ত্রিভূজাকৃতি ভারতবর্ষটাই ছিল না সেসময়। সুতরাং প্রাদেশিকটাই তখন জাতীয়তা। তারপর আত্মকলহরত এতবড় সোনার খনি ভূখন্ডটিকে নেতৃত্ব এবং সুরক্ষা দেবার মতন কোনো সুযোগ্য লোকের অভাবে কি করে ব্রিটিশ বণিককুল নিজের খাস উপনিবেশ বানিয়ে ফেলল সে তো সবাই জানে। ইংরেজরা এদেশের জন্য ভালো মন্দ মিশিয়ে অনেক কাজ করেছে। তার মধ্যে একটি হলো ভারতবাসীর মধ্যে পরিপূর্ণ ভারতের একটি ধারণা ঢুকিয়ে দিয়ে যাওয়া। তার আগে অযোধ্যা রাজ্য ছিল, বারানসীর রাজা ছিলেন, হায়দ্রাবাদের নিজাম ছিলেন, মহিশূর রাজ্য ছিল। কিন্তু জয়পুরের রাজপরিবারকে খাজনা প্রদানকারী কোনো কৃষক নিজেকে বাংলার কোনো কৃষকের সাথে তুলনায় আনতে পারতেন কি? তাঁর কাছে জয়পুরের রাজ্য সীমানাই তাঁর দেশ। কিন্তু ব্রিটিশ এই দেশ ছেড়ে যাবার পর দেখা গেল প্রায় প্রতিটি ভারতবাসীর মনে নিজের দেশ সম্পর্কে ধারনাটা আমূল বদলে গেছে। এত বছরের ঔপনিবেশিক শাসনে দেশী-বিদেশী সংবাদপত্র, রেডিওস্টেশন এবং সর্বোপরি দীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলন ভারতবাসীকে শিখিয়ে দিয়ে গেছে- এই যে দেখছ সবুজ কাশ্মীর উপত্যকা এ তোমার, ওই যে দূরে গুজরাটের নোনাভূমি ওটাও তোমারই, ওই যে দেখছ দক্ষিণের অবোধ্য ভাষাভাষী লোকটি, ও আর তুমি কিন্তু একই দেশের অন্নগ্রহণকারী। সুতরাং ভারতবাসী নিজেকে পূর্ণাঙ্গ ভারতবাসী বলে চিনতে শিখলো মাত্র এই সেদিন। অথচ একজন কাশ্মীরি-গুজরাটি-তামিল বা বঙ্গভাষী মানুষের মধ্যে 'আমরা ভারতবাসী' এই বোধটি ছাড়া কতটা পার্থক্য বেড়ে ওঠার মধ্যে। ভাষা-আবহাওয়া-খাদ্যাভ্যাস কোনকিছুই কারো সাথে মেলে না। ভারতবর্ষের বাইরে থাকা একটি ভারতবাসীর বরং নিজেকে পরিপূর্ণ ভারতীয় বলে ভাবাটা খুব সহজ। বিদেশের কোনো একটি দেশে ভাষা-আবহাওয়া-খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির সাথে তার এতটাই তফাৎ হয়ে পড়ে যে সে ভাবতে বাধ্য হয় সে প্রথমে ভারতীয়, তার পরে সে তার প্রদেশের। ফলে ভারতে বসবাসকারী ভারতীয়দের চেয়ে ভারতের বাইরে থাকা ভারতীয়দের জাতীয়তাবোধ হয়ত তাদের প্রাদেশিকতার চেয়ে বেশিই হয়। 

ব্যাপারটা আমার মতে খানিকটা এরকম, ধরা যাক আপনার বাড়িতে পারিবারিক কলহ চলছে। ঝগড়াঝাঁটির সময় মাথা ঠিক নেই, দুপক্ষের পারস্পরিক দোষারোপে গলাবাজি তুঙ্গে। ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, কি নিয়ে ঝগড়া সেইটিই গেছেন ভুলে। কেবল গালাগালির উত্তরে গালাগালি উদগীরণ চলছে। এমতাবস্থায় যদি আপনারই বাড়ির অন্য একজন সদস্য বাড়ির বাইরে থেকে হঠাৎ এসে পড়েন, তিনি হয়ত এই অস্থির, অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও যেহেতু তিনি নিজে সরাসরি সেই গলাবাজিতে যুক্ত নন তাই প্রথম প্রশ্নটা তিনি এটাই করবেন যে, "ঝগড়াটা হচ্ছে কি নিয়ে?" যেটি সেই মুহূর্তে হয়ত সবচেয়ে সঠিক প্রশ্ন। পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির মধ্যে দুজনেই আসল সমস্যাটা থেকে এত দূরে চলে গেছেন যে সমস্যাটির সমাধানের রাস্তা তো দূরস্থান, নিজেদের পারস্পরিক ঐক্য যা বাড়ির সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়, সেইটিই ডুবে যেতে বসেছে। এখন, যিনি বাইরে থেকে এলেন তিনি যদি বিচক্ষণ হন তবে তাঁর পক্ষে তৃতীয় পক্ষ হিসাবে সমস্যাটিকে বাইরে থেকে দেখে, সমস্যাটির সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্ত মানুষের বা বিষয়ের ভালো মন্দ বিচার করে রায় দেওয়াটা অনেক বেশি নিরপেক্ষ বা সময়োপযোগী হবে বলে মনে হয়। আর এই মানুষটি যদি বাড়িরই সদস্য হন তবে তো বাড়ির অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলি সম্পর্কে আরো বেশি ওয়াকিবহাল হবেন। ফলে আরো সঠিকভাবে সমস্যার সমাধান করাটা সহজ হবে। তবে পুরো বিষয়টিতে একটি সমস্যা রয়েই যায়। সেটি হলো, বাইরে থেকে আসা ঘরের লোকটিকে নিজের বলে মনে করার মানসিক বাধা। ঘটনা অনেকসময়ই এরকম হয় যে, কলহরত পক্ষ থেকে অন্য পক্ষকে শুনতে হয় যে, "তুমি বাইরে থেকে এসে আমাদের সমস্যার সমাধান কি করে করবে? তুমি তো এখানে ছিলেই না, আমাদের সমস্যাটা তো তুমি জানোই না। অতএব চুপ থাকো।" কিন্তু সত্যিটা হলো এই যে বহিরাগত ঘরের লোকটি যেহেতু ঘরটিও চেনে ভালো করে, আবার বাইরের পরিবেশটিও দেখেছে। এবং বর্তমানের সমস্যাটিকে ঠিক একটু দূর থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছে সেই হয়ত সহজে সমাধানের রাস্তাটি দেখতে পারবে। তাকে বহিরাগতর তকমা দিয়ে বাইরে ঠেলে দিলে ঘরের পরিবেশ তো স্বচ্ছ হবেই না উপরন্তু আরো ঘোলাটে হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।         

এই উদাহরণের মতই বলা যায় যে, দূর থেকে নিজের দেশকে দেখলে বোধহয় ভালো মন্দ সবটাই চোখে পড়ে সহজে। একজন ভারতবাসী ভারতবর্ষে থেকে তার ভালো মন্দ সব কিছুর সাথে জাপটে জীবনযাপন করতে করতে সমস্ত কিছুতেই এত অভ্যস্ত হয়ে পড়েন যে, যেসব সমস্যা একটু সচেতন হলেই সমাধান করা সম্ভব সেগুলিকে সমস্যা বলে মনেই করেন না। যেমন ধরুন 'স্বচ্ছ ভারত অভিযান'। হঠাৎ করে কোনো একজন বলল বলে আমাদের মনে পড়ল সত্যিতো আমরা বড়ই অপরিচ্ছন্নতার মধ্যে বাস করছি। সুতরাং রোববার দিন লুচি-বেগুনভাজা দিয়ে প্রাতরাশ সেরে বহুমূল্য জিন্স আর জুতো পরে হাতে গ্লাভস আর মুখে মাস্ক পরে ঢেকুর তুলতে তুলতে ঝাঁটা হাতে পাশের রাস্তাটা যেটা নাকি আমারই বারান্দা থেকে ছুঁড়ে ফেলা আবর্জনায় নোংরা হয়ে ছিল এতদিন, সেটাতে ঝাড়ু মারতে শুরু করলামআর পুরো সময়টা মোবাইলের ক্যামেরা তাক করে একজন বসে রইলো। রবিবার সন্ধ্যের মধ্যে ঝাঁটা হস্তে-গ্লাভস-মাস্ক পরিহিত আমার সমাজ সচেতন মুখটি ফেসবুকের কল্যানে দিক-বিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ফেসবুক থেকে 'স্বচ্ছ ভারত অভিযান' এর ঢেউ কমে গিয়ে অন্য কিছুর ঢেউ শুরু হলেই আমার ঝাঁটা-অভিযানের ইতি। আর সেই আমিই যখন বিদেশে গিয়ে সেখানকার লোকজনকে দেখলাম নিজের রাস্তাটুকু পরিচ্ছন্ন রাখতে ডাস্টবিন না থাকলে লজেন্সের মোড়কটা পর্যন্ত সকলে ব্যাগে করে বয়ে বেড়াচ্ছে এবং তাতে কোনো অতিরিক্ত বাহাদুরি বা দেখনদারি নেই, তখন গিয়ে আমার মগজে ঢুকলো যে পরিচ্ছন্নতাটা শ্বাস নেবার মতন একটা খুবই মৌলিক বিষয়। আর নার্সারী স্কুলের দিদিমনির মতন কাউকে এসে নিয়ম চালু করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা নয়, বা ফেসবুকে পরিচিত-অর্ধপরিচিত সকলের কাছে বাহবা পাওয়া নয় এই মৌলিক বিষয়টিই মগজস্থ-হৃদয়স্থ করাটিই হলো সবচেয়ে কার্যকরী ব্যাপার ভারতবর্ষকে পরিচ্ছন্ন করার ক্ষেত্রে। ভারতবর্ষের বাইরে গিয়ে তো এই বিষয়টি আমার মগজে ঢুকলো কিন্তু আমার একার দ্বারা কি করে এই ব্যবস্থা কার্যকরী করা সম্ভব? মা ষষ্ঠীর দয়ায় আর আমাদের উদাসীনতার কল্যানে জন্মানো কোটি কোটি ভারতবাসীকে কি করে বোঝানো সম্ভব তোমার নিজের কারণেই রাস্তায় গুটখার পিকটা তোমার ফেলা উচিত নয়? দিনের শেষে পেটভরে খেতে পাওয়াটাই যেখানে শেষ কথা সেই মানুষটিকে কি ধরে বসে মহাভারত বোঝানো যায়? নাকি বোঝানো উচিত? সুতরাং আমি হাত পা গুটিয়ে বসে রইলাম। অথচ আমি এটুকু করতে পারতাম যে আমার মা-বাবা-ভাই-বোন বা আমার ছেলেমেয়েকে 'স্বচ্ছ ভারত অভিযান' না বোঝালেও তাঁদের মনে পরিচ্ছন্নতার মৌলিক প্রয়োজনীয়তাটুকু গেঁথে দিতে পারতাম। আমার বিশ্বাস তাঁদের কাছে যেহেতু আমার কথার মূল্য আছে সেহেতু তাঁরা প্রথমে আমার কথা রাখতে পরে ধীরে ধীরে ক্রমশঃ শ্বাস নেবার মত মৌলিক কারণেই লজেন্সের মোড়কটা ব্যাগে করে বাড়ি নিয়ে আসবেন ডাস্টবিনে ফেলবেন বলে। এভাবেই হয়ত পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস তৈরী হবে আর কে বলতে পারে একদিন এই ভাবেই ধীরে ধীরে বাকি আর সকলকে দেখে কোনো মতে নিজের খাবার জোগাড় করা মানুষটি দিনশেষে খাবারের খালি ঠোঙ্গাটা নিজের পাশেই ফেলে না রেখে উঠে গিয়ে দূরের ডাস্টবিনটায় ফেলে এসে নিজের ফুটপাথের বিছানায় শুতে যাবেন। 

নিজের বাড়ি পরিষ্কার করার জন্য নার্সারীর বাচ্চাদের মতন 'এই তুমি ক্লাস নোংরা করলে কেন? কান ধরে দাঁড়াও" বলে ফাইন বা শাস্তির ভয় দেখাতে হবে এর মতন লজ্জার আর কি আছে? তাহলে তো বলতে হয় আমরা বড়ই হইনি, এখনো নার্সারীরই বাচ্চা। তার চেয়ে বিদেশের উদাহরণ দেখে যদি বোঝা যায় কোনখানটিতে মাত্র একটু নজর দিলেই পরিস্থিতির বেশ খানিকটা পরিবর্তন সম্ভব, তবে ক্ষতি কি? দিন কয়েক আগে জন্মসূত্রে জার্মান একজন বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিকের সামনে বসে তাঁর কাজের কথা শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল।কোনো বিশেষ আশা নিয়ে হয়ত আমি শুনতে যাইনি সেই লেকচার। কিন্তু গিয়ে একটা মূল্যবান অভিজ্ঞতা হলো। নিজের কাজের কথা শুরু করার আগে তিনি যে জায়গায় কাজ করেন সেই জায়গা, সেই দেশ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত মনোগ্রাহী একটি সর্বাঙ্গীন ধারণা আমাদের দিলেন। সেদেশের অর্থনীতি, শিল্প, সেই শিল্পের ব্যাপকতার ফলে সেদেশের জনগনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা, সে সমস্যার সমাধানে সে দেশের সরকারের পদক্ষেপ, সেই পদক্ষেপের ফলে প্রতিষ্ঠিত গবেষনাগার, সেই স্বাস্থ্যগত সমস্যা নির্মূল করতে সেই গবেষণাগারের গবেষনার মূল লক্ষ্য সবই এলো একে একে। আরো একটি ব্যাপার তিনি বললেন, তাঁদের দেশের নতুন প্রজন্মকে আবশ্যিক ভাবে অন্তত দুই বছর ফেলোশিপ দিয়ে বিদেশের কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয় পড়াশুনার জন্য। তা শুধুমাত্র ডিগ্রীর জন্য নয়। তার সাথে নিজের দেশকে আরো ভালো করে জানার জন্য। তিনি বললেন একথা, স্পষ্টাক্ষরে, নিজমুখে। অবাক হচ্ছেন? আমাদেরও ভ্রূ কুঁচকে গিয়েছিল প্রথমে। কিন্তু সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একজন হর্তাকর্তা হিসেবে তাঁর ব্যাখ্যাটি আমার যথেষ্ট মনে ধরেছে। তাঁর ব্যাখ্যাটি হলো, মানুষ দেশের বাইরে গিয়েই ঠিক করে নিজের দেশকে চিনতে শেখে। কারণ ভারতবর্ষে আমায় কেউ জিজ্ঞাসা করবে না যে তোমার দেশটি কেমন? ফলে একজন অত্যন্ত সাধারণ ভারতবাসী হিসেবে আমি নিজের দেশের খুঁটিনাটি জানার তাগিদও অনুভব করব না। কিন্তু সেই আমিই যদি বিদেশে কোনো একজনের প্রশ্নের সম্মুখীন হই যে, ভারতবর্ষ দেশটি কেমন? সেদেশের মানুষরা কি একই রকম করে ভাবে? নাকি এত বড় দেশের এত প্রদেশভেদে বদলে যায় তাদের ভাবনা? কোন জায়গার কি বৈশিষ্ট্য? কি ইতিহাস? কি অর্থনৈতিক মূলনীতি? তাহলে? সেই পরিস্থিতিতে আমার দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার মতন সেই মুহুর্তে যখন আর কেউ নেই, সে মুহুর্তে তখন আমায় ভাবতে হবে বৈকি? পড়াশুনা করতে হবে বৈকি? অথচ এদেশে থাকাকালীন সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই মাথায় আসবে না আমার। আজ প্রায় আড়াই বছর হতে চলল আমি বাংলা ছেড়ে হরিয়ানায় আছি। এখন যদি কেউ আমায় জিজ্ঞাসা করে বাংলা বা হরিয়ানার ঠিক যে জায়গায় তুমি ছিলে বা আছো ঠিক সে জায়গার আঞ্চলিক ইতিহাসটি একটু বল তো বাপু। বা হরিয়ানার এই অঞ্চলের চাষীদের সবজি ফলনে ঠিক কি ধরণের সমস্যা আছে বল দেখি। আমি তো অথৈ জলে পড়ব। আমি জানিই না। কারণ আমি জানবার কোনো চেষ্টাই করিনি কোনদিন। কারণ এই প্রশ্নের সম্মুখীনই হতে হয়নি আমায় কোনদিন। যা আমায় হতে হবে হয়ত বিদেশের কোনো মানুষের কাছে কোনো এক সন্ধ্যার ঘরোয়া আড্ডায়। তখন অন্তত আমি জানবার চেষ্টা করার কথা ভাবব। সুতরাং দেশের বাইরে গিয়ে সরাসরি সমস্যার মধ্যে না ঢুকলেও দেশের জন্য টান হেতুই হোক বা বিদেশে সঠিক ভাবে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করার তাগিদেই হোক মানুষ নিজের দেশকে জানার চেষ্টা অন্তত করে। ফলে প্রথমে যা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেই সূত্রই বলি, ভারতে বসবাসকারী ভারতীয়র চেয়ে বিদেশে বসবাসকারী একজন ভারতীয় এর পক্ষে প্রাদেশিকতার উর্দ্ধে উঠে নিজেকে ভারতীয় ভাবাটা অনেক সহজ। ফলে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে একজন মারাঠি তার বিহারী বন্ধুর সাথে সান্ধ্য আড্ডায় বসে "তুমি বিহারি, কেন তুমি আমাদের মহারাষ্ট্রে থাকবে? এস তোমায় লাঠিপেটা করে নয়তো বোমা মেরে তাড়াই মহারাষ্ট্র থেকে"- এ ধরণের বালখিল্যপনার অসারতা নিয়ে অনায়াসেই সহমতে আসতে পারে। অথচ এ বিষয়ে রাজনৈতিক বালখিল্যদের বালখিল্যতার এক্কেবারে কেন্দ্রবিন্দুর মধ্যে পড়ে ভারতে বসবাসকারী কোনো মারাঠি তার বিহারী বন্ধুর সাথে সহমতে আসতেই হয়ত বেশ কিছুটা সময় নিয়ে নেবে। 

উপরোক্ত এই বিশিষ্ট বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিকটির বৈজ্ঞানিক কাজ বর্ণনার পূর্ববর্তী এই ভাষণটুকু থেকে আমার একটি কথা মনে হয়েছে যে, কোনো সমস্যার সত্যিকারের সমাধানের জন্য প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো আগে সমস্যাটির কেন্দ্রবিন্দু থেকে একটু সরে এসে তৃতীয় পক্ষের দৃষ্টি দিয়ে সমস্যাটির মূল বোঝার চেষ্টা কর। সময় দাও। তাড়াহুড়ো কোর না। তাতে ভুল পথে চালিত হবার সম্ভাবনা থেকে যায়। তারপর নিরপেক্ষতা দিয়ে বিচার করে সর্বাঙ্গীন একটি সুষ্ঠু সমাধান খুঁজে বের করে তারপর সমস্যাটির মূলে ঝাঁপিয়ে পড়। নিজের সাধ্যমত সবশক্তি দিয়ে তার মূলটিকে ধরে নাড়িয়ে একেবারে উপড়ে ফেলার চেষ্টা কর। নইলে ওই ঘরোয়া বিবাদের মত কাদা ছোঁড়াছুঁড়িই সার। জল ক্রমশঃই ঘুলিয়ে উঠবে, মাছের নাগাল আর পাওয়া যাবে না। তা সে যে ধরণের সমস্যাই হোক না কেন। 
  

Wednesday, 11 March 2015

মনুষ্যকুলের শ্রেণীবিভাগ এবং ফেসবুকের স্টেটাস

ফেসবুকের স্টেটাস আপডেট আপাতত হ্যাপি নিউ ইয়ার, অভিজিত চক্রবর্তী, বাৎসরিক বাংলাভাষা বন্দনা, অভিজিত রায় হত্যা, 'ইন্ডিয়াস ডটার', হ্যাপি হোলি, বাৎসরিক নারীবন্দনা পেরিয়ে এখন বিশ্বকাপ ক্রিকেটে থিতু হয়েছে। অবশ্যই তা কিছুদিনের জন্য। এটা আমাদের মস্ত গুণ যে আমরা ভীষণ জঙ্গম। এঁটুলির মতন কোনো একটি  বিষয়ে আটকে থাকা, ও আমাদের পোষায় না। A থেকে Z পর্যন্ত সমস্ত সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়ে কথা না বলে কি থাকা উচিত? আমরা সমাজবদ্ধ জীব না? পিঁপড়েদের মত। হুলুস্থুল দেশী-বিদেশী বিষয়ে যদি কথাই না বলতে পারলাম তবে দিনের মধ্যে পঁচিশ ঘন্টা ফেসবুকে চোখ লাগিয়ে বসে থেকে কি ছাতার মাথা লাভ হলো রে বাবা? সোজাসুজি কেউ আমার মতামতের তোয়াক্কা যে করে না সে তো হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছি এতদিনে। তা বলে মতামত দেব না? গণতান্ত্রিক অধিকার বলে কথা। তা মতামত প্রকাশের এত সুন্দর একটি ব্যবস্থা থাকতে বিছানায় শুয়ে, টয়লেটে বসে আঙ্গুলের একটু নাড়াচাড়া করলেই যদি বিশ্বব্রম্ভান্ডের আপামর জনগনকে আমার বিচক্ষনতার দাপট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করে ফেলা যায় তবে আর কেন লোকের মুখোমুখী চাট্টি কথা বলে সমস্যায় পড়ি? সুতরাং ফেসবুক স্টেটাস আপডেট জিন্দাবাদ।  

ফেসবুক স্টেটাস আপডেট বিচার করে কিন্তু সুন্দর একটি শ্রেণীবিভাগ করে ফেলা যায় আমাদের। মানে সমগ্র মনুষ্যকুলের। কেমন করে? বলছি।
  

এবার একটু বিশদে বলি? বেশ।  প্রথম থেকে শুরু করা যাক কেমন।

সারা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে যদি আমি দুই ভাগে ভাগ করি তবে একটি ক্ষুদ্র অংশ থাকবে প্রথম ভাগে। যাঁরা ফেসবুক ব্যবহার করেন না। তাঁদের মধ্যে আবার দুটি ভাগ।  


১.ক: যাঁরা ফেসবুক সম্পর্কে মোটেই উত্সাহী নন: হয় তাঁরা পারেন না, নয় তাঁদের ভালো লাগে না ফেসবুক ব্যাপারটাকে। তাঁদের সম্পর্কে আমার কোনো বক্তব্য নেই। 

১.খ: যাঁরা অন্যের ফেসবুক সম্পর্কে বেজায় উত্সুক: তাঁরা নিজেরা একটি একাউন্ট খুললেই পারেন। 'আমি সকলের চেয়ে আলাদা' এই আহ্লাদে একাউন্টটি খোলা হয় না। কিন্তু সকলের খবর জানা চাই। তাই 'দেখি দেখি অমুকে কি বলল' বা 'তমুকে কোথায় বেড়াতে গেল' বলে পাশের জন ফেসবুক খুললেই হামলে পড়েন। সত্যি বলছি এরকম লোক দেখেছি সামনে থেকে। আরে ভাই তুমিও খোল একটা একাউন্ট। কেউ তো কামড়ে দেবে না তোমায়। "নাহ, কি হবে? এসব আমার পোষায় না।" বলে উদাস জ্ঞানী মুখ করে বসে থাকে। 'কি আর হবে? এখন যা হচ্ছে। সকলের খবরাখবর জানতে পারবে"-বলে দেখেছি। উত্তর এসেছে, "এই তো তোদের থেকে জানতে পেরে যাই।" আশ্চর্য প্রজাতি। কি আর বলব। 

আর যাঁরা ফেসবুক ব্যবহার করেন তাঁদের মধ্যে স্টেটাস আপডেট হিসেব করলে আমি তো স্পষ্ট ছয়টি প্রজাতি দেখতে পাচ্ছি। একে একে বলছি। আরো কোনো প্রজাতি থেকে থাকলে ভুলটা ধরিয়ে দেবেন প্লিজ। 

২.ক:  আপডেট: +; চিন্তাভাবনা: +; অ্যাকশন: +: এঁনারা হলেন করিতকর্মা প্রজাতির মানুষ। যেকোনরকম সামাজিক, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত টালমাটালে চটপট বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেন। ঝটপট ফেসবুকে আপডেট দিয়ে ফেলেন তারপর বিষয়টির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। যেমন ধরুন যাদবপুর থেকে অভিভাবক তাড়াতে হবে, ঝপ করে চিন্তা করলেন 'ঠিকই তো বাচ্চাগুলো তো ঠিক কারণেই গলা ফাটাচ্ছে।' সুতরাং চট করে কলরব হয়ে গেল মানে স্টেটাস আপডেট এলো আর পরদিনই আপনি ব্যানার হাতে রাস্তায়। সত্যি করিতকর্মা। স্বাধীনতাপূর্ব যুগ হলে এঁনারা নিশ্চয়ই বৃটিশের চক্ষুশুল হতেন। 

কিংবা ধরুন হঠাৎ একদিন সকালে গলার কাছটায় কিরকম যেন একটা গুজগুজ করছে বলে ঘুম ভেঙ্গে দেখলেন সবকিছু কেমন যেন লাগছে। কি যেন একটা বলার আছে। গুরগুর করছে ভেতরটা। কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না ব্যাপারটা কি। কিছুক্ষণ পরে যেই পাশের লোকজন সকালে 'গুড মর্নিং' এর জায়গায় 'সুপ্রভাত' বলল অমনি আপনার টং করে মনে পরে গেল "ওহো! আজ তো একুশে ফেব্রুয়ারী।" অমনি আপনি বাংলা ভাষার অতীত, ভবিষৎ, বর্তমান নিয়ে ভয়ানক রকম চিন্তিত হয়ে উঠলেন আর সাথে সাথে একটা সাড়ে পঞ্চান্ন লাইনের স্টেটাস আপডেট দিয়ে চরাচরকে বাংলা ভাষা সম্পর্কে উদ্দীপ্ত করেই ছাড়লেন। পুরো দিনটাই আপনি বঙ্গভাষার জন্য উত্সর্গ করে ফেললেন। 

অর্থাত শুধু ভাবনা বা আপডেটেই আটকে থাকেন না এঁনারা কাজও সেই অনুযায়ী করেন। এঁনারা হলেন প্রথম প্রজাতি।     

২.খ: আপডেট: +; চিন্তাভাবনা: +; অ্যাকশন: - : এঁনারা হলেন দ্বিতীয় প্রজাতি। চটপট চিন্তা করেন। ঝটপট আপডেট দেন কিন্তু মাঠে নেমে গোল দেন না। মানে, যাদবপুর থেকে অভিভাবক তাড়াতে হবে, ঝপ করে চিন্তা করলেন 'ঠিকই তো বাচ্চাগুলো তো ঠিক কারণেই গলা ফাটাচ্ছে।' সুতরাং চট করে কলরব হয়ে গেল মানে স্টেটাস আপডেট এলো কিন্তু রাস্তায় কি আর নামা যায়? ওটা তোমরাই করো। আমি না হয় পেছন থেকে সাপোর্ট করছি। 
বা ধরুন 'ইন্ডিয়াস ডটার' এর হয়ে ঝড় তুলে ফেলবেন স্টেটাসে। লিখিত বাদ-প্রতিবাদে পাতার পর পাতা ভরে যাবে। সত্যি সত্যি বিষয়টি নিয়ে না ভাবলে এত যুক্তি আসে না কলমে থুড়ি কিবোর্ডে। কিন্তু ঘরোয়া জটলায় কেউ কোনো মহিলার পোশাক নিয়ে সরস মন্তব্য করলে চুপ করে থাকা বা হ্যা হ্যা করা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না তাঁদের।   

এঁনারাও মহার্ঘ্য প্রজাতি।

২.গ: আপডেট: + ; চিন্তাভাবনা: - ; অ্যাকশন: - : এই তৃতীয় প্রজাতিটির মধ্যে বড়বড় মহাপুরুষরা পড়েন। তাই অনেক সম্মান নিয়ে এঁনাদের কথা লিখতে বা পড়তে হবে। এঁনারা "আমায়ও এই বিষয়ে বলতে হবে" এই ভাবনায় এত বেশি বিভোর হয়ে থাকেন যে, যে বিষয়ে বলতে চাইছেন, সেটি সম্পর্কে আদ্যপান্ত ভাবার আর সময় পান না। ঝটপট আপডেটটা দিয়ে ফেলেন। সকলেই বলছে, অতএব আমার কি আর চুপ করে থাকা চলে? সমাজ সংসার সম্পর্কে আপডেটেড না থাকা একজন বোকা হাঁদা ভাববে না তো সকলে? অতএব সকালে বিকেলে বাজার চলতি বিষয় নিয়ে আপডেট দিয়ে যাও। 

ধরুন পশ্চিমবাংলার মাঠেঘাটে গরম ঘামে জন্ম থেকে ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত কাটিয়ে আমি হঠাত করে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের কোনো এক শীতল দেশে কয়মাস কাটিয়ে অঢেল বরফ টরফের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেশে ফিরে আমার গ্রাম সম্পর্কে প্রথম আপডেট এই দিলাম যে, "so hot and humid here, I hate this." আপনি কি করবেন? এসব ক্ষেত্রে পড়ার পরেই সুস্থ জনগনের প্রথম প্রতিক্রিয়া বোধহয় ভসভসিয়ে খানিকটা হাসি ছাড়া আর কিছুই আসবে না। তারপরেও যদি আমি অভিজিত রায় হত্যা বা 'ইন্ডিয়াস ডটার' এর মতন বিষয়েও আমার মতামত জানাই, সেটার মধ্যে কতটা বিবেচনাবোধ বা বিচক্ষণতা বা সচেতনতা আর আশা করা যায়? তবুও আমি আপডেট দিতে ছাড়ি না।   

সাধারণত 'সাহারায় সীতাহরণ' থেকে শুরু করে 'হন্ডুরাসে হাহাকার' বা 'বোর্নিওর বিভীষিকা' তা সে যাই হোক না কেন পৃথিবীর জনপ্রিয় কোনো বিষয়ই ছাড়া পায়না এই তৃতীয় গোষ্ঠীর হাত থেকে। সকল বিষয়েই এঁনারা প্রাজ্ঞ। সমাজ, রাজনীতি, কূটনীতি, সাহিত্য, বিজ্ঞান, সঙ্গীতকলা, খেলাধূলা, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র প্রভৃতি পৃথিবীর সকল বিষয়েই একজন মানুষের এত জ্ঞান যে একজীবনে কি করে হয় এ এক রহস্য আমার কাছে। প্রণম্য এঁনারা। 

যাক গে। পরের প্রজাতিতে যাওয়া যাক। 

২.ঘ:  আপডেট: - ; চিন্তাভাবনা: + ; অ্যাকশন: - :  এঁনারা দার্শনিক পর্যায়ভুক্ত। সব দেখেন, সব বোঝেন, কিন্তু কেউ 'যানতি পারে' না। সকলে ভাবে বুঝি ইনি ঘুমোচ্ছেন আদতে কিন্তু চিন্তাভাবনার চাষ চলে মনের মধ্যে সর্বক্ষণ। সমস্ত পার্থিব বিষয়ে এঁনারা ভাবনাচিন্তা করেন এবং উপরোক্ত সকল পর্যায়ভুক্ত জনগনের মতো স্টেটাস আপডেটটা আর দিয়ে উঠতে পারেন না। এত বেশি ভাবনা ভাবতে হয় যে ক্লান্তিতে আর কিবোর্ডে আঙ্গুল সরে না। কিন্তু কে কি আপডেট দিল আর তাতে কি কি ভুল আছে, কি কি অবান্তর চিন্তার ফসল সেই সব আপডেট, কিভাবে লোকজনের মগজের চিন্তাভাবনাগুলোকে সঠিক দিশা দেওয়া যায় এই সব ভাবতে গিয়ে আর বাকিদের আপডেটের খুঁত ধরতে গিয়ে এঁনাদের আর নিজেদের ভাবনাগুলো ফলপ্রসূ করা তো দূর, নিজেদের আপডেটটাই সময়মত দেওয়া হয়ে ওঠে না।   

২.ঙ: আপডেট: - ; চিন্তাভাবনা: + ; অ্যাকশন: + : এঁনারা চার নম্বরদের মতনই চিন্তা ভাবনা করেন। সাথে সাথে যেখানে যেমন দরকার কাজটাও করেন। আপডেট ইত্যাদি তুশ্চু জিনিসের ধার এঁনারা ধরেন না। কর্মবীর। ২.খ তে যেমন বললাম সেরকম পরিস্থিতিতে পড়লে অর্থাৎ ঘরোয়া জটলায় কেউ কোনো মহিলার পোশাক নিয়ে সরস মন্তব্য করলে চুপ করে থাকা বা হ্যা হ্যা করা তো দূরস্থান সেই দণ্ডেই মন্তব্যকারী বা কারিনীর এঁদের হাতে দুর্দশার অন্ত থাকে না। আর ইনি যেহেতু আপডেট তত্ত্বে বিশ্বাসী নন তাই জটলাকারীরা তো জানে না এঁনার স্টেটাস কি। সুতরাং ভুল মানুষের কাছে বেফাঁস মন্তব্যে বেচারাদের ল্যাজেগোবরে অবস্থা হয়। 

২.চ: আপডেট: - ; চিন্তাভাবনা: - ; অ্যাকশন: - : এই শেষ প্রজাতিটি সবচেয়ে ভালো থাকে। ফেসবুকে জন্মদিনের কেক কাটার ছবি লাগায়, নতুন রান্না করলে তার শৈল্পিক ছবি তুলে লাগায়, নতুন জামা কিনলে নতুন নতুন ভঙ্গিতে মুখ দেখায়, বাচ্চার প্রতি ঘন্টায় হাসা-কাঁদা-খাওয়া-পটি করার ছবি দেখায়, নামী জায়গায় বেড়াতে গিয়ে জায়গার তুলনায় নিজের নতুন সানগ্লাসের ছবি লাগায় তাতে ব্র্যান্ডের নামটা দেখা গেলে আরো ভালো। 

এঁনারা চারপাশের হালহকিকতের বিশেষ ধার ধারেন না। আপডেট থাকে মাঝে মাঝে। সেটা নিতান্তই ব্যক্তিগত।যেমন, বোর হচ্ছি, ঘুম পাচ্ছে, বেড়াতে যাচ্ছি, এই সিনেমা দেখছি, দেখে মাথায় ব্যথা করছে......ইত্যাদি ইত্যাদি। এতে সুবিধা হচ্ছে, বহুল প্রচলিত বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি তৈরী রাখতে গিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। সেলফি তোলার অনেক সময় পাওয়া যায়। কোনো ঝগড়ায় না থেকে কারো সাথে মনোমালিন্য হবার ভাবনা নেই। আর কোনো বিতর্কিত বিষয়ে খোলাখুলি মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে শেষে নিজের তৈরী কাঁচের স্বর্গতে পাটকেল পড়বার ভয় নেই। সবদিক থেকেই একদম সঠিক-নিশ্ছিদ্র-নিরাপদ ব্যাপার।

এই হলো গিয়ে আমার মতে ছয় প্রজাতির মনুষ্যকুল। কিছু বাদ দিয়ে গেলে বলবেন।

কি বলছেন? আমি কোন দলে পড়ি? পাগল নাকি? কোনোমতেই বলব না। সবগুলোর যেকোনো একটা হতে পারি। আপনি? 

Sunday, 8 March 2015

শিলাবৃষ্টি

আজকে নাকি কটকটে রোদ্দুর ওঠার কথা। আবহাওয়ার পূর্বাভাষ তাই বলছে। অথচ কাল রাত থেকে আবহাওয়া দপ্তরের ভাষায় বেজায় "বজ্র বিদ্যুতসহ ভারী বৃষ্টিপাত" হয়ে চলেছে। আজ সকাল থেকে আকাশ মেঘলা। বিকেল থেকে ঠান্ডা হাওয়া আর পশ্চিম দিক থেকে কালো মেঘের হুড়ুমদুড়ুমের চোটে বিকেল থেকে আর ঘরে থাকা গেল না। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই হলো। আর যার যা কাজ, পিনাকী ট্রাইপড-ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বেশ গুনগুনিয়ে ছবি টবি তুলছিল। হঠাত দেখি আঁই আঁই করতে করতে ডান গালে হাত ঘষতে ঘষতে লেজ গুটিয়ে সোজা ঘরের দিকে। 'কি রে কি হলো', টি হলো? বলতে বলতেই আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম। ধুপ ধাপ শিল পড়তে লেগেছে। আর হরিয়ানায় বিরল সেই শিলাবৃষ্টির জাঁদরেল মাপের প্রথম শিলটা সোজা এসে বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়টি বসিয়েছে সিধে আমার ঘরের নিবেদিতপ্রাণ আলোকচিত্রীর ডান গালে।

তার দিকে বিশেষ নজর আর দিতে পারলাম না। কারণ ততক্ষণে আমাদের বারান্দা আর সামনের মাঠ পেল্লায় মাপের শিলীভূত জলে সাদা হয়ে গেছে। ঠাস ঠাস শব্দে অবিরত শিল পড়ে চলেছে। দরজার বাইরে হাচিকো ভয়ে কাঠ হয়ে বসে আছে। এত বড় মাপের শিল বেচারা বোধহয় আগে দেখে নি। তাকে অভয় দিয়ে ঘরে বসানো হলো। থার্মোকলের বাক্স মাথায় দিয়ে কটা শিল কুড়োলামও। না না ছাতা ছিল আমার, কিন্তু যে সাইজের শিল পড়ছিল তাতে নতুন কেনা ছাতাটার ভেঙ্গে যাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল কিনা তাই আর ছাতা মাথায় দিয়ে বারান্দায় যাবার রিস্কটা নিলাম না আর কি। 

প্রায় দশ মিনিট ধরে আকাশ ভেঙ্গে পেল্লায় পেল্লায় মাপের শিলাবৃষ্টি হলো। আর আমাদের বোরিং ছুটির দিনটাকে দশমিনিটেই চাঙ্গা করে দিল। আমিও নিরাপদ দূরত্বে থেকে চাট্টি ছবি তুললাম। দেখুন কেমন সাদা হয়ে গেছে মাঠ। 



পিনাকীও গাল সামলে ছবি টবি তুলল। তারপর যখন শিলার মাপ আর তার পতনের ফ্রিকোয়েন্সি একটু কমে গেল তখন দেখি হাচিকো ঘরের এককোণে দেওয়াল ঘেঁষে কাঠ হয়ে বসে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বেচারাকে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার পরে কটা বড় বড় শিলা দিতে দেখি ব্যাটা চেটে চেটে খেল। ক্রিম বিহীন আইস ভেবে বোধহয়। বেচারা। আপাতত বৃষ্টিপত্র হয়ে চরাচর শান্ত। হাচিকো এখন ঘরের বাইরে বসে হাত পা চাটছে। এবার নিশ্চিন্তে ঘুমোবে মনে হয়। আমরাও একপেট ইডলি খেয়ে বুঁদ হয়ে বসে আছি। পিনাকী তবে মাঝে মধ্যেই দেখছি মহাভারত পড়তে পড়তে এখনো ডানগালে হাত ঘষছে। বেচারা!!               

Thursday, 5 March 2015

শেষ দোল

পৃথিবীটা জাহান্নম হয়ে যাবার আগে
চল না শেষ বারের মতন দোল খেলে নিই দুজনে। 

এখন কি আর দোল খেলে কেউ?
'হোলি হ্যায়' না? 
তাই সই 
রং তো বটে।  

আয় না সাজাই হরেক রঙের আবীর দিয়ে 
লালের সাথে নীল-সবুজ আর গোলাপী-হলুদ।

আমার প্রিয় হলুদ আবীর
কেমন যেন নরম লাগে দেখলে, হাতে নিলে। 
আয় না হলুদ আবীরে ভরিয়ে দিই তোর দুগাল 
তুই লাগাবি গোলাপী আবীর আমার দুগাল ভরে।

একশ রকম রং নিয়ে
চল না দোল খেলে নিই দুজন মিলে। 
এইবেলা 
এই শেষটি বারে। 

কাল থেকে তো একটাই রং
লাল, লাল আর শুধুই লাল। 

রক্তের রং লাল-ই তো হয়? 
তোর আমার সক্কলেরই?

Friday, 27 February 2015

পলাশ


পলাশের মতন করে বসন্তকে বোধহয় আর কেউ সংজ্ঞায়িত করতে পারে না শীতের শেষের ন্যাড়া গাছে কোথা থেকে যে আসে এত লাল রঙ, সে এক রহস্য। বসন্তের উপস্থিতি যেমন ক্ষণিকের, তার উপস্থিতিকে অবহেলা করলে সে অনাবধানে বিদায় নেয় আরও এক বছরের জন্য; তেমনিই পলাশের উপস্থিতিও মনে হয় ঠিক ওই কটি দিনের জন্যেই। সবুজের ফাঁকে ওই আগুনরঙা গর্বিত ভঙ্গিকে উপেক্ষা করার যদিও কোন উপায় নেই, তাও যদি কোনোভাবে তার উপস্থিতি অবহেলিত হয় তবে কোন ফাঁকে যে সে একরাশ অভিমান নিয়ে বিদায় নেয়, তার ঠিকানা পাওয়া যায় না। এমনিতে সারা বছর বড়ই বৈচিত্র্যহীন চেহারা পলাশগাছগুলির। বছরের মাত্র কটাদিনে তাই যেন সে পরিপূর্ণ সম্ভার নিয়ে ঘোষণা করে যে, পৃথিবীতে সকলের অগোচরে বসন্ত আসে। এখনও। 

পলাশ আমার বড় আদরের। বালিকা বয়সে বাড়ির পিছনের আধাজঙ্গলে একক অভিযানের সময় আবিষ্কার করেছিলাম একটি পলাশ গাছ। যদিও সেই দর্পিত লাল কলাপ গুচ্ছের নাম আমার জানা ছিল না তখন, হয়ত জানার প্রয়োজনও অনুভূত হয়নি কখনো। তবু সে সময়ও ঝরে পড়া সেই লাল পাপড়িগুলি আমি সংগ্রহ করতাম পরম যত্নে। আর পলাশের ক্ষণিকবাদিতার কথাও আমার সেই নিজস্ব গাছটির সূত্রে আমার জানা হয়ে গিয়েছিল পলাশের নাম জানার আগেই। পলাশের উপস্থিতির সময়টুকুতে বাড়িতে কোন অতিথি এলেই আমি টেনে-হিঁচড়ে তাঁকে নিয়ে যেতাম আমার সেই ‘লাল ফুলের গাছ’-টিকে দেখাতে। ‘আমার গাছ’ বলছি কারণ এই নয় যে, গাছটির বা গাছের মাটিটুকুর মালিকানা খাতায় কলমে কোন ভাবে আমাদের বাড়ির কুক্ষিগত ছিল। বস্তুত সে মালিকানা যে কার, সে আমি আজও জানিনা। কিন্তু কোন এক বসন্ত দুপুরে সেই আধাজঙ্গলে একক ভ্রমণে পলাশ গাছটির আবিষ্কর্তা আমার কাছে ছিলাম আমিই। সে গাছ বহুদিন ধরেই সেখানে আছে। হয়ত কেন নিশ্চিতরূপেই বলা যায় যে, সে গাছের অবস্থান কারও কাছে অবিদিত ছিল না। তাও একা একা সেই আধা জঙ্গলে যাবার অনুমতি পাবার পরে এক আকাশ ভর্তি সবুজের ফাঁকে লালে লাল গাছটিকে খুঁজে পাবার কৃতিত্ব যে আর কারও সাথে আমায় ভাগ করে নিতে হয়নি সেজন্যই বোধকরি আস্ত গাছটির মালিকানা সেই ছোট বয়সে কখন যেন একান্তই আমার নিজের হয়ে গিয়েছিল।

সে বয়সে বাড়ি থেকে বেঁধে দেওয়া আমার একক গতিবিধির সীমারেখার মধ্যে আর কোন পলাশ গাছ ছিল না। আর আজ থেকে কুড়ি পঁচিশ বছর আগেও পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে বসন্ত আসতো বেশ জানান দিয়েই। ফলে বিদায়ী শীত আর আগত গ্রীষ্মের মধ্যের ওই ‘কেমন যেন একটা’ অবর্ণনীয় হাওয়ার নামই যে বসন্ত, সেটা বুঝতে আমার ওই নিজস্ব পলাশ গাছটির মতন আর কোন মাপকাঠিই ছিল না আমার কাছে। অর্থাৎ, যেসময় আমার ‘লাল ফুলের গাছে’ ফুল ফোটে সেইটিই হল বসন্ত ঋতু। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক কাহিনীর বসন্তোৎসবে বা শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবে পলাশের ভূমিকা জানার বা হৃদয়ঙ্গম করতে পারার বয়সে পৌঁছানোর অনেক আগে থেকেই তাই আজও পলাশ আর বসন্ত আমার কাছে সমার্থক। বড় হবার সাথে সাথে নানান অহৈতুকি ব্যস্ততায় স্বভাবতই সেই বসন্ত দুপুরের নীরব সঙ্গীটির কুশল সংবাদ নেওয়া হয়ে ওঠেনি আর। কিন্তু পরে যেখানে যেমন ভাবে পলাশ গাছ দেখেছি আমার সেই ছেলেবেলার আগাছার জঙ্গলের একলা পলাশ গাছটির কথা আমার মনে পড়েছে। মনে আছে হাজারীবাগ অঞ্চলের জঙ্গলে দেখা একজঙ্গল পলাশ সমুদ্রের কথা। সেটা ছিল শেষ মার্চ বা প্রথম এপ্রিল। জম্মু তাওয়াই এক্সপ্রেসে জম্মুর দিকে যাচ্ছিলাম। মনে হয়েছিল পলাশ বনে আগুন লাগা বুঝি একেই বলে। আরও কাছ থেকে এই পলাশবন দেখতে মার্চ-এপ্রিল মাসে নিশ্চয়ই একবার অতিথি হব এই অঞ্চলে, এটি স্থির করতে আমার এক মুহূর্তও লাগেনি সেদিন। যদিও সে ইচ্ছেপূরণ হয়নি এখনও। তবে এখনও ওই সময় ওই ট্রেনলাইনের যাত্রীরা ডাইনে-বামে ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলের লাল মাটির সাথে রঙ মিলিয়ে দেখতে পাবেন কেমন করে নীল দিগন্তে ফুলের আগুন লাগে। সমতলের চেয়ে ওই রুক্ষ লাল মাটির অঞ্চলে সত্যিই ওদের মানায় ভাল।

দুদিন আগে ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে যেতে গিয়ে চোখে পড়লো রাস্তার ডাইনে ঝাঁকড়া চুলো সবুজ ধুলো পড়া বড় বড় সব গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো নিতে কোনমতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে সরু লিকলিকে একটি কিশোর পলাশ। আশেপাশের সমস্ত গাছে এসে পড়া ধূসর মালিন্যকে বিদ্রুপ করে প্রতিটি প্রশাখায় আগুন জ্বালিয়ে ঘোষণা করছে নিজের উপস্থিতি। হয়ত তা মাত্র কয়েকদিনের জন্যই। মনে হয়েছিল এ অর্থলিপ্সু ব্যস্ততার শহরেও বসন্ত আসে। এখনও। নীরবে। অগোচরে। কারও আবাহনের তোয়াক্কা না করেই।


Monday, 23 February 2015

সার্কাস-৪....শেষ পর্ব

সার্কাস-১, সার্কাস-২ এবং সার্কাস-৩ এরপর........




চারপাশে বরফ, দূরে পরিস্কার কিন্নর কৈলাস পর্বতমালা, আর শান্ত নীল আকাশ। এই হলো ফাগু। আমরা কুফরী থেকে মিনিট দশেকের মধ্যেই ফাগু এসে যখন পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যা নামছে। আর বরফে মোড়া হিমাচলপ্রদেশের সরকারী পর্যটকনিবাসের যেরকম অবস্থান ও সৌন্দর্য, শুধুমাত্র এই পর্যটকাবাসে দুটো দিন শান্তিতে কাটাবো বলেই ফাগুতে আসা যায়। আমাদেরও প্রাথমিক মনোভাব ছিল এটাই। ভেবেছিলাম মাঝের দিনটায় একটু শিমলাতে ঘোরাঘুরি করা যাবে। মাঝে কুফরীটা অতিরিক্ত পাওনা। ফাগুর অবস্থানটা এরকম যে শিমলা থেকে নারকান্ডার রাস্তায় এই ফাগুর পর থেকেই রাস্তাটি নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে। ফলে ফাগুর পরে আর বরফ নেই। আমরা ওই সন্ধ্যায় আমাদের সামনের দুই দিনের অস্থায়ী অবস্থান দেখে আগের দিনের ক্লান্তি, সদ্য ক্যামেরার ব্যাটারি হারানোর দুঃখ সব ভুলে গেলাম। হোটেলে ঢোকার রাস্তা-হোটেলের ঢালু ছাদ, সামনে-পিছনের চত্বর পুরু বরফে ঢাকা। আর ভেতরে হিমাচল পর্যটন এর উষ্ণ অভর্থনা। হোটেলের রিসেপশনে বড় করে লেখা আছে "No one can serves you Himachal better than us" কথাটি যে শুধুমাত্র বিজ্ঞাপনী দেখনদারি নয় সেটা হোটেলে ঢোকার সাথে সাথেই আমরা বুঝে গিয়েছিলাম। বড় বড় কার্পেট মোড়া ঘর, যেমন সরকারী গেস্টহাউসে হয়। কিন্তু এখানকার সবচেয়ে বড় পাওনা হলো ঘরের একদিকের দেয়াল জোড়া মস্ত কাঁচের জানলাটা। সেখান দিয়ে নিচে তাকালে পুরু বরফে মোড়া উঠোন। সেখানে সুন্দর চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা। চাইলে রোদে পিঠ দিয়ে, মোটা বরফের ওপর পা দিয়ে বসে প্রাতরাশ সেরে নেওয়া যায়।সোজা তাকালে ঝকঝকে কিন্নর-কৈলাস। আর ওপরে তাকালে মন ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া চকচকে নীল আকাশ। শুধু এককাপ কফি হাতে এই জানালাটির সামনে বসে থাকাটাই আমার কাছে যথেষ্ট কারণ আবার শীতকালে ফাগু আসার জন্য।



পরদিন সকালে চকচকে রোদে আমরা বেরোলাম চারপাশটা একটু ঘুরে দেখতে। তুষারশুভ্র কথাটার আক্ষরিক অর্থ বোধকরি হিমালয়ের এরকম ছোটখাটো গ্রামে আসলেই একমাত্র বোঝা যায়। চোখ ঝলসানো শুভ্রতা। আমাদের কোনো আইস বুট ছিল না। নিজেদের জুতোর মায়া ছেড়ে ঝুরো বরফে পা ডুবিয়ে হোটেলের পাশের রাস্তা দিয়ে উঠলাম অনেকটা। চারিদিক সাদা। আর ফাগু বাসস্ট্যান্ডের পর থেকেই দূরে যে রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে সেখানে গিয়েই বরফ শেষ। ওপরে উঠে চারিদিকটা দেখে আর কথা বলতে ইচ্ছে হলো না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম দূরের শুভ্রবসন হিমালয়ের দিকে চেয়ে। সিমলার পরে যে দেওদারের জঙ্গল শুরু হয়েছিল, ফাগুতেই তার শেষ। আমাদের বামদিকে ঘন জঙ্গল আর ডাইনে পরিষ্কার আকাশে হিমালয়। মাঝে সাদা মেঘের সাথে তাল মিলিয়ে নিজের জঙ্গমতা ঘোষণা করছে একলা একটি দেওদারের চূড়া। অদ্ভূত এক শিথিলতা আর শান্তি চারি দিকে। জানিনা সঠিক ভাবে ধ্যানমগ্নতা কাকে বলে। কিন্তু সেদিন সেই চকচকে রোদে সব মলিনতা গেছিল কেটে। চারিদিকের শুভ্রতার ছোঁয়া লেগেছিল মনে। আর উতল হাওয়ায় আকাশী রঙের আকাশে ঘন সবুজের সেই একলা দেওদারটি আমার মনে রেখে গিয়েছে চিরকালীন এক মুক্তির সাক্ষর। সবটুকু পরিপূর্ণতা পেল যখন সেই আকাশে উড়তে শুরু করলো একটি পাখি। হতে পারে পাহাড়ি চিল। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, সেদিনের সেই দেওদার আর দূরের হিমালয় এর দৃশ্যটি আমার কাছে অমলিন রয়ে যাবে আমার জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত।








 আমাদের সেদিন শিমলা যাবার কথা। অনিচ্ছা সত্বেও নেমে এলাম নিচে। আলগা বরফে গোড়ালি পর্যন্ত ডুবিয়ে ওঠানামা করেছি। অবিলম্বে বরফ না ঝেড়ে ফেললে এ যাত্রায় নিয়ে আসা একমাত্র জুতোটি যাবে ভিজে। দুজনে নিঃশব্দে জুতোর বরফ ঝাড়তে থাকি। ঘোর লেগেছিল মনের মধ্যে দুজনেরই। 

বারোটায় আমরা বেরোলাম সিমলার উদেশ্যে। ফাগু যেহেতু শিমলা-নারকান্ডা জাতীয় সড়কের ওপরেই অবস্থিত সুতরাং নারকান্ডা, রামপুর, সাহারান থেকে আসা সমস্ত বাসই ফাগুর ওপর দিয়ে শিমলা যায়। তাই আমাদের হোটেলের বয়স্ক রিসেপশনিস্ট আমাদের গাড়ি না নিয়ে বাসে যেতেই পরামর্শ দিলেন। গাড়িতে এখান থেকে শিমলা যেতে অন্তত বারোশ টাকা নেবে। আমরা দাঁড়ালাম বাসের জন্য, পেয়েও গেলাম তাড়াতাড়ি। সিটে গুছিয়ে বসে একটু এদিক ওদিক দেখতে দেখতেই কুফরী এসে গেল। দেখলাম সামনে একটু একটু করে গাড়ির ভিড় বাড়ছে। তখনও কিছু মনে হয়নি। কিন্তু এটিই ছিল আমাদের এবারের শিমলা ফাগু ভ্রমনের শেষ দুর্ভোগ। আধঘন্টা ধরে বোধহয় দশ-কুড়ি মিটার এগিয়েছি কি না কে জানে? আমরা দুই পর্যটক একবাস ভর্তি স্থানীয় লোকের মধ্যে হংস মধ্যে বক যথা হয়ে উশখুশ করতে লাগলাম। এখানকার স্থানীয় লোকজন যাঁরা বাসে ছিলেন তাঁরা দেখলাম সবাই খুবই ধৈর্যশীল। হয়তো পাহাড়ে থাকতে থাকতে ধ্বস ইত্যাদি প্রাকৃতিক কারণে রাস্তায় ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করার অভ্যাস তৈরী হয়ে যায় প্রথম থেকেই। মনে মনে অধৈর্য হলেও বাইরে তার বিশেষ প্রকাশ দেখলাম না। ক্রমশঃ সেই আধঘন্টাটা একঘন্টা-দেড়ঘন্টা ছাপালো। আমাদের বাস অগুন্তি ছোটো গাড়ির সমুদ্রে সাঁতরে সাঁতরে কোনো মতে একচুল একচুল করে এগোতে লাগলো। আমি অধৈর্য্য হতে হতে শেষে হল ছেড়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম থেকে উঠে আবার ঘুমোলাম, উঠে আবার ঘুমোলাম। আমাদের গাড়ি পাঁচ কিলোমিটারও এগোয়নি। ফাগু থেকে শিমলা মাত্র বাইশ-তেইশ কিলোমিটার রাস্তা। পরদিন ছাব্বিশে জানুয়ারির ছুটির জন্য দিল্লি-পাঞ্জাবের বিভিন্ন শহর-চন্ডিগড় (সঙ্গে বাঙালি তো আছেই) সমস্ত জায়গা থেকে সাপ্তাহান্তিক ছুটিতে নিজেদের গাড়ি নিয়ে বা গাড়ি ভাড়া করে জনগণ কুফরীতে বরফ দেখতে, মজা করতে গেছে। এই পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তারা শিমলা থেকে কুফরী ঢোকার মুখেই রাস্তার পাশে এত বরফ দেখে উল্লসিত হয়ে রাস্তার দুপাশে যেমন তেমন ভাবে গাড়ি থামিয়ে বরফে হুরোহুড়ি করতে লেগেছে। তাতে করে মাঝে রাস্তার যেটুকু অংশ বাকি আছে তাতে একটি গাড়ি কোনোমতে যেতে পারে কি না পারে। মাঝে মাঝেই সেই ফাঁকটুকুর মধ্যে "বাবান এদিকে আয়, এখানে দাঁড়া সোজা হয়ে" (ছবি তোলা হবে), "গৌতমদা টুপিটা খোল না বস", "রবীন্দর আরতি কে পাস ঠ্যাহারো না", "আরে ভাই সানগ্লাস তো প্যাহান কে পিকচার লো"........ইত্যাদি ইত্যাদিতে ভরে যাচ্ছে। গাড়ির স্রোত আর শেষ হয়না। আমাদের পরিকল্পনা ছিল বারোটায় ফাগু থেকে বেরোলে একটা নাগাদ সিমলার আপার ম্যালে পৌঁছে যাব। সেখানে কিছু খেয়ে দেয়ে নিয়ে পায়ে হেঁটেই ম্যাল রোড, কালিবাড়ি ইত্যাদি ইত্যাদি যাবতীয় দ্রষ্টব্য দেখে আবার পাঁচটা নাগাদ একটা গাড়ি নিয়ে ফাগু ফিরে যাব। কিন্তু আমাদের বাস কুড়ি মিনিটের রাস্তা আসতে সময় নিল সাড়ে তিন ঘন্টা। পৃথিবীর সমস্ত গাড়ি বোধহয় কুফরীতে আজ। পরে শুনেছিলাম কুফরীতে সেদিন পুরো পঁয়ত্রিশ হাজার গাড়ি ঢুকেছিল। এটি একটি রেকর্ড। বর্ষশেষের ছুটিতেও এত ভিড় হয়নি কুফরীতে।আমরা সাড়ে তিনটে নাগাদ শিমলা শহরে ঢুকতে পারলাম। আমার এক দিদি গল্প করেছিল, তার বিয়ের পরের দিন সন্ধ্যেবেলা নতুন শ্বশুরবাড়িতে তার প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। কিন্তু মাত্র একদিনের বউ, বেচারা কথাটা কাউকে বলতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ঘুমিয়ে পড়েছিল। সে ব্যাপারটা বর্ণনা করেছিল এরকম ভাবে, "খিদে পেয়ে পেয়ে, খিদে পেয়ে পেয়ে শেষে ঘুমিয়েই পড়লাম।" আমারও সেই অবস্থা। সকাল আটটায় খেয়ে এই বিকেল সাড়ে তিনটে পর্যন্ত আমার মস্তিস্ক আর কাজ না করতে পেরে শেষে ঘুমিয়েই পড়ল। শেষে সেই গাড়ির জঙ্গল আর রাস্তা জুড়ে ছবি তোলার আদেখলামির মিছিল শেষ করে আমাদের বাস শিমলা শহরে তো ঢুকলো। আমাদের বলে দেওয়া হয়েছিল সিমলার আপার আর লোয়ার ম্যাল সংযোগকারী লিফ্টের কাছে নামতে। কিন্তু এই বাস তো সেদিকে যাবে না। কোথায় নামব তবে? কথাটা বাসে পাড়তে না পাড়তেই বাস সুদ্ধু লোক হই হই করে মতামত দিতে থাকলো। সকলেই তাদের রাজ্যে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সাহায্য করতে চায়। সে এক বিশ্রী কান্ড। আমরা একবার করে কারো কথা শুনে নামব বলে দরজার দিকে এগিয়ে যাই। আবার পরক্ষণে অন্য কারো কথা শুনে ফিরে এসে সিটে বসে পড়ি। বাস শুদ্ধু লোক নিজেদের মধ্যে বাকবিতন্ডা করতে থাকে আমাদের কোথায় নামা উচিত সেই নিয়ে। আর আমরা কোলে হাতের ব্যাগটা আঁকড়ে ধরে একবার এর মুখের দিকে আর একবার ওর মুখের দিকে তাকাতে থাকি। তাঁরা সকলে মিলে যেকোনো একটা জায়গায় সহমত হলেই আমরা সেখানে নেমে যাই। শেষে আমারই পার্শ্ববর্তিনী হিমাচলী যুবতীটি আমায় আশ্বাস দেয় যে আমি যেন তাকে অনুসরণ করি, কারণ সে এমন একটি জায়গায় নামবে যেখান থেকে লিফট পর্যন্ত  বাস পাওয়া যায়। আমিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। ওমা দেখি শিমলা শহরের ঘর বাড়ি সব ছাড়িয়ে বাস চলেছে তো চলেছে। আরে কোথায় নামব? পুরো শিমলাই তো শেষ হয়ে গেল? লিফট কি শহরের বাইরে নাকি? সে আশ্বস্ত করলো আমাদের নামতে হবে 'ছোটো শিমলা' বলে একটি জায়গায়। আসলে আমরা একটি অর্ধচন্দ্রাকৃতি বাঁক নিয়ে শিমলা শহরের ঠিক পেছনে পৌঁছিয়ে গেছিলাম। নির্দিষ্ট জায়গায় তার পিছু পিছু নামলাম। সে আমাদের নতুন একটি বাস স্ট্যান্ড দেখিয়ে বলে গেল এখানেই বাস আসবে লিফটের জন্য। বাস প্রায় সাথে সাথেই এলো আর আমরাও দৌড়লাম। পিনাকী সামনের দরজায় উঠেছে। আমিও হাঁকুপাঁকু করে ওর পেছনে ছুটতে গিয়ে দেখি আমি আটকে গেছি। মানে আমার হ্যান্ডব্যাগের চেনের রানারের সাথে আমাদের পূর্ববর্তী বাস থেকে নামা বয়স্ক মানুষটির হাতের একপেটি হিমাচলী আপেলের বাক্সের দড়ি বিশ্রী বেকায়দায় জড়িয়ে গেছে। আপেলওয়ালা উঠতে চান এই বাসের পেছনের দরজায়, আমি উঠতে চাই সামনে। আপেলওয়ালাই শেষে হার স্বীকার করে আমার সাথে সাথে সামনের দরজায় উঠলেন। এদিকে পিনাকীর কাছে বাসের কন্ডাকটর পাঁচ টাকা খুচরো চেয়েছে বাসের ভাড়া বাবদ। তার কাছে না থাকায় পিনাকী আমায় বলছে দিতে। এদিকে আমি তো বাসে ওঠা ইস্তক নিজের ব্যাগকে আপেলের বাক্স থেকে আলাদা করতে পারছিনা। আমি আর আপেলওয়ালা দুজনেই টানাটানি চালিয়ে যাচ্ছি। পিনাকী এর বিন্দুবিসর্গ জানে না। সে বারবার বলছে টাকাটা দিতে। অগত্যা আমি শ্যাম ছেড়ে কুল সামলাতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে সিধা আপেলওয়ালার ঘাড়ে। বাসটা মোক্ষম সময় ব্রেক কষেছে। অনেক দুঃখিত টুঃখিত বলে উঠে দাঁড়িয়ে দেখি ব্যাগ আর আপেলের বাক্স এই রাম ধাক্কার চোটে অবশেষে আলাদা হয়েছে। যাক, যা হয় ভালোর জন্যই হয়। এইসব সেরে দেখি লিফট এসে গেছে। আর আমাদের দুজনের জন্য এই বাসে ভাড়া মাত্র পাঁচ টাকা। মানে দুজনের আড়াই আড়াই টাকা করে। ভারতবর্ষে এত কম ভাড়া আর কোথাও এখনো আছে কিনা জানিনা। বার বার কন্ডাকটরকে জিজ্ঞাসা করে নিশ্চিন্ত হলাম যে আমরা কোনো ভাবে ভুল বুঝে কম ভাড়া দিচ্ছি কি না।

এরপর লিফটের টিকিট কেটে লম্বা লাইন দিয়ে দুই ধাপ লিফট বেয়ে উপরে উঠে প্রথমেই পেটপুজো করা হলো। তখন প্রায় সাড়ে চারটে বেজে গেছে। অন্ধকার হতে বেশি দেরী নেই। তাড়াতাড়ি পা চালালাম ম্যালের দিকে। ম্যালে একটি স্থানীয় সঙ্গীত অনুষ্ঠান চলছিল। কি সুন্দর হিমাচলী লোকসঙ্গীতের সুর। কিন্তু আমাদের হাতে বেশি সময় ছিল না দাঁড়িয়ে শোনার। তাই ম্যালে একটা চক্কর মেরে সিধে চার্চের মধ্যে। সেদিন রবিবার। কয়েকজন সেই বিকেলেও প্রার্থনা করছেন। শান্ত পরিবেশ। কি মনে হলো, চার্চের একটা বেঞ্চে বসে মনে মনে "সরস্বতী মহাভাগে..." করে সরস্বতীর পুস্পাঞ্জলির মন্ত্রটা বলে মনে মনেই প্রজ্ঞার দেবীকে প্রসন্ন হবার প্রার্থনা জানালাম। সেদিন ছিল এই বছরের সরস্বতী পুজোর দিন। বসন্ত পঞ্চমী তিথি। যদিও দিনের শেষে খেয়ে দেয়ে অঞ্জলি, তাও আমার বিশ্বাস আমার অঞ্জলি নিশ্চয়ই পৌঁছেছে দেবীর কাছে।

চার্চ থেকে বেরিয়ে ওল্ড ম্যাল রোড ধরে পড়ন্ত লালচে রোদে হাঁটতে শুরু করলাম দুজনে। অদ্ভূত সব জীর্ণ ইউরোপিয়ান স্থাপত্যের বাড়ি। কিছু কিছু বসবাসের অযোগ্য এখন। হয়ত সেই ব্রিটিশ আমলের বানানো। মনে হলো কত ইতিহাস এখানে থেমে আছে। সেসব গল্প কথা থেকেই হয়ত বাড়িগুলোর ভূতুড়ে দূর্নামও জুটেছে। কৌতূহলে আরো সামনে থেকে দেখব বলে এগিয়ে গেলাম সেরকমই একটা বাড়ির দিকে। আমাদের দুজনকে কৌতূহলী হতে দেখে আমাদের পিছনে দেখি দাঁড়িয়ে পড়েছে আরো একটি দল। পড়ন্ত আলোয় সত্যিই কিরকম যেন থম মারা ভূতুড়ে লাগছিল বাড়িগুলোকে।          
পরিপাটি ছোট্ট শিমলা কালিবাড়ি দেখে আমরা যখন নিচের লক্কড়বাজার বাস স্টান্ডে নেমে এলাম ততক্ষণে অন্ধকার হতে শুরু করেছে। ফাগু যাবার বাস কখন আসবে জিজ্ঞাসা করায় জানা গেল, আসবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। সেই কিছুক্ষণটা যে ঠিক কতক্ষণ কেউই তার সঠিক উত্তর দিতে পারে না। আমাদের টেনশন বাড়তে লাগলো। আসতে চার ঘন্টা লেগেছে। যেতে কতক্ষণ লাগবে কে জানে? যে কটা গাড়ি কুফরীর দিকে গেছে সব কটা না হলেও বেশির ভাগই তো ফিরবে। সুতরাং এখুনি যাত্রা শুরু না করলে কুফরী পার হয়ে ফাগু পৌঁছাতে আমাদের মাঝরাত হয়ে গেলেও অবাক হব না। মিনিট পনেরো অপেক্ষা করে ভগবানকে ডাকতে শুরু করলাম। এবার একটা গাড়ি না হলেই নয়। এদিক ওদিক তাকিয়ে গাড়ির খোঁজ শুরু করলাম। দেখলাম ভগবান আমাদের কথা শুনেছেন। নিজে না এলেও একজন দেবদূত পাঠিয়েছেন আমাদের জন্য। আর সেই দেবদূত লক্কড়বাজার বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র অল্টো গাড়ির ড্রাইভার সেজে গাড়ির মধ্যে বসে গুটখা খাচ্ছেন। আমাদের মতন উদভ্রান্ত চেহারা আরো দুএকটা দেখতে পাচ্ছিলাম আশেপাশে। তারা গিয়ে সবেধন নীলমণি গাড়িটিকে নিয়ে ভেগে যাবার আগেই আমরা দৌড়ে গিয়ে পাকড়াও করলাম দেবদূতকে। তিনি এককথায় ন্যায্য মূল্যে আমাদের ফাগু পৌছে দেবার আশ্বাস দিলেন। তার রথে উঠে নিশ্চিন্ত হয়ে বসলাম। যাই হোক রাত দশটার মধ্যে অন্তত ফাগু পৌছে যাবই।

কিন্তু না আমাদের ভাগ্যে আর কোনো দুর্ভোগ ছিল না সে যাত্রা। অন্ধকার হয়ে যাওয়াতে কুফরীর থেমে থাকা গাড়িগুলো সব চলতে শুরু করে দিয়েছিল। অন্ধকারে তো আর ছবি তোলা যায় না ভালো। তাই রাস্তা আটকে বরফের ওপর বিভিন্ন বিভঙ্গে ছবিতোলার মাতলামিটা ফেরার সময় আর ছিল না। আমরা বেশ মসৃণ গতিতেই উল্টো দিক থেকে আসা কুফরী ফেরত গাড়ির মিছিলের দিকে তাকিয়ে গালাগালি দিতে দিতে আর আমাদের গপ্পে ড্রাইভারের সাথে গল্প করতে করতেই ফিরেছিলাম সেদিন। এই ড্রাইভারও সেদিন যাত্রী নিয়ে কুফরীতে এসে কি ঝামেলায় পড়েছিলেন সেই গল্প শোনাচ্ছিলেন। আমরাও আমোদ করে শুনতে শুনতে আসছিলাম।

হঠাৎই পিনাকী ডানদিকের জানলার দিকে আঙ্গুল তুলে বলল "দেখ দেখ।" দেখি নিচে শিমলা শহরের দীপাবলী আর দিগন্তে আকাশ জুড়ে গাঢ় কমলা রঙের একটা লাইন তৈরী হয়েছে সূর্যাস্ত পরবর্তী আলোয়। ওপরের আকাশ পরোপুরি বেগুনি। একটি দুটি তারা ফুটেছে সেখানে। আমাদের স্তব্ধতায় মুগ্ধতা আন্দাজ করে আমাদের ড্রাইভার বললেন "দাঁড়াব? ছবি নেবেন? ভালো ক্যামেরায় আসবে এই ছবি।" পিনাকীর হাতের ক্যামেরা দেখেই বোধহয় এই মন্তব্য। দুজনেরই গলা থেকে যান্ত্রিক ভাবে একবাক্যে "না" বেরোলো। কিছু কিছু ছবি বোধহয় তোলার চেষ্টা না করাই ভালো। ছবি তুলতে গিয়ে প্রকৃতিদেবীর প্রসাধনী মাখা সেই ক্ষনিকের মুহুর্তটা বুঝি হারিয়ে যাবে এই ভয় হয়। গত আটচল্লিশ ঘন্টায় আমি অমানুষিক ভিড় ঠেলে দিল্লির বাস স্ট্যান্ডে এসেছি। সেখান থেকে তিনটি গাড়ি বদলে সারারাত প্রায় না ঘুমিয়ে গুড়ের নাগরীর মতন টলতে টলতে শিমলা এসেছি। আমার ক্যামেরার ব্যাটারি খোয়া গেছে। সারাদিন জ্যামে রাস্তায় কাটিয়ে বিকেলে শিমলায় ঝটিকা সফর সেরেছি। এত প্রতিকূলতা সত্বেও প্রিয় সাথীর হাত ধরে দেখা ফাগু আমার কাছে কেবলমাত্র সকালের বরফের মাঝে নীল আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা একলা দেওদার গাছটি আর এই কমলা পাড় দেওয়া ঘন বেগুনী রঙের শাড়ি পরা সন্ধ্যাটুকুর জন্যেই হয়ত চিরজীবন অমলিন হয়ে থেকে যাবে।ঝিঁ ঝিঁ র ঝিম ধরা শব্দ আর মাঝে মাঝে কুফরী থেকে ফেরা ক্লান্ত ঘোড়া আর তাদের বাচ্চা সহিসদের দেখতে দেখতেই পৌঁছে গেলাম ফাগু। বাকি রাস্তাটা আমরা কেউ আর কোনো কথা বলিনি সেদিন।

কাল আমাদের ফিরে যেতে হবে।   

 (শেষ)