Showing posts with label ভ্রমণ. Show all posts
Showing posts with label ভ্রমণ. Show all posts

Monday, 18 January 2021

খাঁড়ির গান -১

খাঁড়ির গান -১
------------------

লিখতে চেয়েছে অনক্ষর ছন্দ। অতিদূর সাগরের অচেনা খাঁড়িতে ভাসিয়েছে ভেলা অখ্যাত জ্যোৎস্নাবেলায়। আধোঘুমে সে রাতের উদাত্ত স্প্যানিশ গান গাওয়া অচেনা ছেলেটির স্বর ভেসে আসে। ঘুমোতে দেয়না, জাগিয়েও রাখেনা সারারাত। নিঝুম অতলান্তিকের খাঁড়িতে পথভুলে চলে যাওয়া ম্যানগ্রোভ ঝোপঝাড়ে। বৈঠার টান রুখতে অসফল সে গতি। এসবই জাগিয়ে রাখে। আধখানা চাঁদ শুধু মিশে যায় গাইয়ে ছেলেটির সুরে, নেশার মতন। অচেনা সাগরের, অচেনা খাঁড়িতে প্রাণপণে অনভ্যাসের বৈঠা বেয়ে তীরে ফিরে আসার লড়াই চালায় সেই দুটি ছেলেমেয়ে, যারা একদিন একসাথে দাঁড় বাইবে বলে সাগরে নেমেছিল। সাথে বয়ে নিয়ে চলে অচেনা স্প্যানিশ গানের চেনা চেনা সুর।জলের ছেলেটির গা ছুঁয়ে পিছু নেয় অতলান্তিকের জ্যোৎস্না। আরও অনেকদিন তাদের ঘুমোতে দেবেনা আর জাগিয়েও রাখবেনা বলে।

                                  *********************** **********************

ওপরের কথাগুলো যে অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে সে ঘটনার সময়কাল ২০১৬-র অক্টোবর মাস। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের বয়স তখন আমাদের মাত্র একবছর হব হব করছে।  তার আগের কয়েক বছরে  মানুষের কিছু কথাবার্তা বা ধ্যানধারণাকে অযথা বা প্রয়োজনাতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে নিজের কাছেই নিজের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছি। নিজের প্রতি আস্থা প্রায় শূন্য। সামান্য থেকে সামান্যতম কাজ করতে গিয়েও মনে হয়, পারব তো? কি করে সে অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছি সে অন্য গল্প। এই একবছরে নতুন সব কিছুর সাথে মানিয়ে নিতে নিতে, জীবন ধারণের নতুন নতুন শর্তপূরণ করতে করতে দিশেহারা অবস্থা। কেন এসব নিজস্ব কথা বলছি তার একমাত্র কারণ হল, এই সময়কার মানসিক অবস্থা সম্পর্কে একটা ধারণা দেওয়া। এখনকার সাথে তার তুলনা চলে না। আর এই প্রাককথনটি আজকের গল্পের সাথে অঙ্গাঙ্গি যুক্ত। এরকম একটা মানসিক অবস্থায়, কেবল একটু সুস্থির ভাবে দিনযাপনই একমাত্র কাম্য তখন। একটি পুরো দিনও যদি নির্ভুলভাবে সমস্ত কিছু ঘটে তবে মনে হয় আহঃ, পারলাম। এমতাবস্থায়, ওমাহা ছেড়ে কয়েকদিনের জন্য বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে হল। গত একবছরে আমরা কোত্থাও যাইনি। ওমাহায় এসে সকলে অন্তত শিকাগো ঘুরে আসে সপ্তাহান্তে।  আমরা যাইনি। এমনকি প্রতিটি ছুটির দিনও আমাদের কাছে কাজের দিন ছিল। ফলে বছরের শেষের দিকে কয়েকটা ছুটি নিতে এমনকি গাইড পর্যন্ত বলেছেন কয়েকবার। আমরা ঠিক করলাম বেরোবো। কবে বেরোবো ঠিক করলাম। কিন্তু এদিক ওদিন নানান জায়গা সম্পর্কে পড়ে কিছুই আর ভাল লাগে না।  কারণ প্রতিটা জায়গাতেই কিছু না কিছু করতে হবে গিয়ে, কোনো না কোনো সাংঘাতিক ভাল কিছু দেখতে হবে। নইলে নাকি সেসব জায়গায় যাওয়াই বৃথা। কিন্তু সমস্যা হলো আমরা কোথাও গিয়ে কিচ্ছুটি করতে চাই না। স্রেফ শুয়ে বসে আরাম করে জায়গাটা দেখতে চাই। অনেক খুঁজে পেতে একটি জায়গা দেখে মনে হলো এখানে অনেক কিছু দেখার নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পার্কের ভিড় নেই। ক্যাম্পার বা হাইকারদের লাইন নেই। আবার বড় শহরের বিলাসী দেখনদারিও নেই। টিক মার্ক দেবার মতন কিছুই নেই। আছে কেবল প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো একটি বুড়ো স্প্যানিশ দূর্গ।সেটি অবশ্য সত্যিই দ্রষ্টব্যঃ। তার কোথায় পরে আসছি। এছাড়া আছে উদাত্ত সমুদ্র। উত্তরে আটলান্টিক আর দক্ষিণে ক্যারাবিয়ান সাগর। বাকি সময়টা সমুদ্রের পাড়ে বসে কাটিয়ে দেওয়া যায়। দুজনেরই ভারী পছন্দ হল জায়গাটি। সমস্যা একটাই, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের মেনল্যান্ডের বাইরে। ঔপনিবেশিক অঞ্চল। এখন আমাদের মতন একাডেমিক ভিসা পকেটে নিয়ে সেখানে যাওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। একটু পড়াশুনা করে মনে হলো অসুবিধা হবে না। সুতরাং যাওয়া মনস্থ করলাম পুয়ের্তো রিকো (Puerto Rico)। মায়ামি থেকে প্রায় হাজার মাইল দক্ষিণ পূর্বে উত্তর ক্যারাবিয়ান সাগরের ছোট্ট দ্বীপ, ডোমিনিকান রিপাবলিক আর ইউ. এস. ভার্জিন আইল্যান্ডের মাঝামাঝি পাতলা একফালি দ্বীপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশ। 

এখন একটু দেখে শুনে নিতে গিয়ে দেখলাম, পুয়ের্তো রিকো থেকে একটি ফেরি সার্ভিস চালু আছে যেটা দিয়ে পুয়ের্তো রিকো দ্বীপভূমির শাসন ব্যবস্থার মধ্যে থাকা আশেপাশের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দ্বীপগুলোর সাথে পুয়ের্তো রিকোর প্রধান ভূমি খণ্ডের সাথে যোগাযোগ বজায় থাকে। এরকম দুটি দ্বীপ হল, উত্তর পূর্বে  ফ্ল্যামেঙ্কো-কুলেব্রা আর দক্ষিণ পূর্বে ভেইকোয়েস (Veiques, উচ্চারণটা অনেকটা 'ভেইকেস' আর 'ভেইকুয়েজ' এর মাঝামাঝি কিছু একটা। আমি বরং ভেইকোয়েস লিখি কেমন?)। মনে মনে ভাবছিলাম একদিন ফেরি করে ওই ছোট দ্বীপগুলোর একটায় একদিন কাটিয়ে আসলে কেমন হয়? যদিও বেশি কেউ যায়না হয়ত। প্রধানত, সাধারণ রোজকার জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের যোগান দেবার জন্যেই এই ফেরি। তার সাথে সাথে কিছু টুরিস্টও যাতায়াত করেন। এমন ভাবতে ভাবতে মনে হলো অমন একখানা দ্বীপেই গিয়ে কদিন  থাকি না কেন? আমাদের তো দেখার কিছু নেই। করার কিছু নেই। কেবল শোনার আছে। সমুদ্রের গান। সে ছোট দ্বীপই হোক বা বড়। কি যায় আসে? বরং যত ছোট জায়গা হবে তত কিচ্ছুটি না করার বিলাসিতার সুযোগ বেশি। ফ্লেমিঙ্কো অপেক্ষাকৃত বড় এবং একটু হলেও পরিচিত ভূখন্ড। তাই তাতে হোটেলপাতি আছে। এবং খোঁজ করে জানা গেল সেসব ভর্তি। আর যেসব জায়গায় এখনো ঠাঁই রয়েছে, সেসব জায়গায় পা দেবার মত পকেট আমাদের নেই। অগত্যা ভেইকোয়েসে খোঁজখবর শুরু হলো। খুব একটা আশাপ্রদ কিছু নয়। এখানে আরো কম, হাতে গোনা কয়েকটা হোটেল। অনেক খুঁজে, হোটেল পাড়ার সম্পূর্ণ উল্টোদিকে স্থানীয় বসতির মধ্যে একখানা হোটেলের দেখা পাওয়া গেল। যার চাহিদা এবং আমাদের পকেটের সম্বন্ধ আদায় কাঁচাকলায় নয়। বুকিং হলো কিন্তু সেসময় সত্যি বলতে কি একটু ভয় ভয়ই করছিল। এত ছোট্ট একটা জায়গায় স্থানীয় বসতির মাঝে, যেখানে সাধারণ টুরিস্ট যাবে না সেখানে একটা ছোট্ট হোটেলে থাকাটা কতটা ঠিক হবে সেই নিয়ে। যেমন হয় আর কি। কিন্তু দুটো বিষয়, এক, আর কোথাও জায়গা নেই।  এই জায়গাকে না বলে দিলে পুরো ভেইকোয়েসকেই না বলতে হয়। আর পুয়ের্তো রিকোর অপেক্ষাকৃত শহুরে জনপদে এসে থাকতে হয়। আর জীবনে প্রথমবার একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দ্বীপভূমিতে থাকার উত্তেজনায় খানিক ভাঁটা পড়ে। আর দুই, হোটেলটি যতই সাধারণ মানের হোক না কেন, হোটেলটির ঘর, ব্যালকনি, উঠোন আর আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝে কোনো ব্যবধান নেই। অর্থাৎ, বিছানায়, ব্যালকনিতে, উঠোনে দাঁড়িয়ে আপনি যা দেখবেন সেটি অতলান্ত আটলান্টিকের অগাধ নীল। আর মনে হলেই, উঠোনের বাঁশের নড়বড়ে দরজা খুলে আপনি যেখানে প্রথম পাটা ফেলবেন সেটি আটলান্টিকের বালি। টুরিস্ট স্পটের সাজিয়ে দেওয়া বালি নয়, আপনার বাড়ির কোনায় পুকুর ঘাটের মতন আটপৌরে বালি। আক্ষরিক অর্থেই শ্যাওলাপড়া আঘাটার কাদা মাখা পাথরে সাগরের ভেসে আসা ছোট ছোট মৃত জীবের আধপচা দেহ পড়ে থাকা পান্ডব বর্জিত সমুদ্র তীর। ঘরোয়া, নিজস্ব আটলান্টিক মহাসাগর তার গাঢ়তম নীল নিয়ে আপনার পায়ের পাতায় আছড়ে পড়ছে। দোতলায় বারান্দায় দাঁড়ালে একসারি নারকেল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে পুয়ের্তো রিকো থেকে ফেরী আসছে দেখা যায়। এসব অবশ্য তখন জানতাম না। তখন কেবল জানতাম আমরা একখানা থাকার জায়গা পেয়েছি এবং সেটা সমুদ্রের এক্কেবারে পাশে। সুতরাং অচেনা ছোট্ট জায়গায়, টুরিস্ট বৃত্তের বাইরে, স্থানীয় জনবসতির মধ্যে থাকার অজানা ভয়কে সরে যেতেই হলো।

আমরা যাবার প্রস্তুতি নিতে থাকলাম। দুই রকমের ভ্রমণ হয়। এক, যেখানে আপনি কেবল বেরিয়ে পড়বেন। বাকিটা গিয়ে ঠিক করা যাবেখন বলে। আর দুই, যেখানে আপনাকে আগে থেকে কে, কি, কেন, কবে, কোথায় সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জেনে তবে বেরোতে হবে। দ্বিতীয়টিতে খাটনি বেশি তাই আমার অপছন্দের। কিন্তু সময় বিশেষে দ্বিতীয় পদ্ধতিটিই কার্যকরী। প্রথম প্রটোকলটি সেখানে খাটাতে যাওয়া মানে যেচে বিপদ ডেকে আনা। বিশেষত এই ম্যাপে খুঁজে না পাওয়া জনপদে। একসময় দেখলাম দুজনে দুখানি পিঠের ঝোলা আর একটি ছোট সুটকেস নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগর আর ক্যারাবিয়ান সাগরের সঙ্গমের ছোট্টদ্বীপ ভেইকোয়েস এর খোঁজে বেরিয়ে পড়েছি। তখনও আমাদের সঠিক ধারণা নেই যে আমরা ঠিক কোথায় যাচ্ছি। অর্থাৎ, থিওরিটিক্যাল ধারণা হয়তো আছে কিন্তু সেতো ইন্টারনেটের থেকে ধার করা কিছু ধারণা। আসল জায়গাটা ধরা পড়েছিল আস্তে আস্তে। ওমাহা থেকে ভোরবেলার একটা ফ্লাইট নিয়ে পৌঁছেছিলাম হিউস্টোন। বেলা দশটা এগারোটা নাগাদ। তারিখ পত্র আজ আর মনে নেই। পুরোনো ফোল্ডার গুলো খুঁজলে হয়ত মনে পড়বে কিন্তু সে অবান্তর তথ্যের সাথে এ গল্পের বিশেষ যোগ নেই। হিউস্টোনের এয়ারপোর্ট ওমাহার ছোট্ট ডোমেস্টিক এয়ারপোর্টের চেয়ে অনেকখানি বড়। আমরা খাওয়া দাওয়া করে, বাথরুম সেরে পরবর্তী ফ্লাইটের গেটের দিকে যাওয়াই মনস্থ করলাম। এখন থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য San Juan, পুয়ের্তো রিকোর রাজধানী শহর। উচ্চারণটা যদিও অনেকটা 'সান- ওয়ান'। সেটাও অবশ্য পরে জেনেছিলাম। আরো একটি তথ্য এই লিখতে গিয়ে এখনই জানলাম যে, হিউস্টোন  থেকে ভেইকোয়েস যেতে এখন পুয়ের্তো রিকোতে না থামলেও চলে। সরাসরি আকাশ পথে খানিক হলেও যোগাযোগ বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ভূখণ্ডের সাথে। তিন বছর আগে সম্ভবত সেটি ছিল না। সময়ের সাথে সাথে সমস্ত জায়গাতেই যোগাযোগ, আধুনিকতা আসে। সে যত দরিদ্র, অবহেলিত অঞ্চলই হোক না কেন। এমনকি ঔপনিবেশিক অঞ্চল হলেও। উপনিবেশ পত্তনকারী দেশের সরকারের দায় থেকেই সে উন্নতি আসে। যাক, গল্পে ফিরই বরং। আপাতত হিউস্টোন থেকে সান ওয়ান এর ফ্লাইট ধরে আমরা এলাম পুয়ের্তো রিকো। চার- পাঁচ ঘন্টার ফ্লাইট। সুতরাং পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল। সান ওয়ান এয়ারপোর্টে সৌন্দর্য আর কার্যকারিতার মেলবন্ধন।অনেকটা যেন আমাদের কোচি এয়ারপোর্টের মত। অতীতের স্পেনীয় উপনিবেশ, ইতিহাস আর ক্যারাবিয়ান সাগরের দ্বীপভূমির সমস্ত বৈশিষ্ট নিয়ে সুন্দর এয়ারপোর্ট। এখন এখানে আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে। আমরা আজই যাব ভাইকোয়েস। প্রথমে যেভাবে ভেবেছিলাম, সেই ফেরি লঞ্চে করে আটলান্টিক বেয়ে ভেইকোয়েস পৌঁছাব সেই উত্তেজক ব্যাপারটিতে কিঞ্চিৎ বাধা পড়েছে। মানে, সান ওয়ানের ফেরিঘাট থেকে ভেইকোইসের দিকে দিনের শেষ লঞ্চটি ছাড়ার সময় আর আমাদের সান ওয়ান পৌঁছানোর সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সময়ের ব্যবধান বড়োই কম। এখন ওমাহা থেকে আসা আমাদের সুটকেসটি সংগ্রহ করে এয়ারপোর্ট থেকে ফেরিঘাট পৌঁছাতে পৌঁছাতে সে লঞ্চ যে ছেড়ে যাবেই সে ব্যাপারে আমাদের কোনো সন্দেহই ছিল না। সুতরাং আমাদের সে রাত্তির টুকু সান ওয়ানেই থেকে যেতে হত। তাতে ভেইকোয়েসের ভাগে আধবেলা কম পড়ে যায় আর আমাদেরও এক রাতের জন্য আর একখানা আস্তানার খোঁজ করতে হয়। এই দুটি বিষয় এড়িয়ে সেরাত্তিরেই ভেইকোয়েস পৌঁছানোর আরো একটা উপায় আছে।  সেটি হলো, সান ওয়ান এয়ারপোর্ট থেকেই ছোট্ট আট সিটের প্লেনে আধঘন্টার মধ্যে ভেইকোয়েস পৌঁছানো। ভাইকোয়েসে এই কিছুদিন আগে পর্যন্তও US আর্মির ঘাঁটি ছিল সেজন্য একটি ছোট্ট এয়ারপোর্টও আছে। সেখানে তখন কেবল ওই ছোট আট সিটের প্লেনই নামতে পারত। এখন জানিনা।আমরা আটলান্টিকের উপর দিয়ে ছোট লঞ্চে যাবার লোভ ছেড়েছিলাম কিছুটা হতাশ হয়েই। ভাবিনি জীবনে প্রথমবার আটলান্টিকের ওপর দিয়ে আট সিটের প্লেনে আধঘন্টার উড়ানও নতুন কিছু হবে আমাদের জন্য। হয়ত কিছুটা থ্রীলিংও। অন্তত টেক অফ এর সময়টা। সেই ছোট প্লেনের জন্য আমাদের সান ওয়ান এয়ারপোর্টের এক্কেবারে শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটা অংশে বেশ খানিক খান অপেক্ষা করতে হলো। আমাদের সাথে যাঁরা অপেক্ষা করছেন ভাইকোয়েস যাবেন বলে তাঁরা সকলেই প্রায় বয়স্ক মানুষ। অবসর জীবনে ক্যারাবিয়ান দ্বীপে যাচ্ছেন ছুটি কাটাতে। যেখানে কিছু করার নেই বিশেষ। সেখানে আমরা দুজন অপরিপক্কতার চুড়ান্ত দুটি নিদর্শন হয়ে বসে আছি। দু একজন দেখছেনও আমাদের।  বয়সোচিত স্বাভাবিক জায়গায় না গিয়ে আমরা এমন একটা মরা জায়গায় যাচ্ছি কেন? মানুষের কক্ষে এপ্রশ্ন আমাদের জন্য অস্বাভাবিক নয়। এতে আমরা অভ্যস্ত। আমাদের এক চৈনিক বন্ধু তো বলেই ফেলেছিল, "তোমাদের পছন্দ গুলো ঠিক অবসর প্রাপ্ত বয়স্কদের মত।" যাক যে সেকথা, ভেইকোয়েসের ছোট প্লেনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে এই ফাঁকে বরং পুয়ের্তো রিকো সম্পর্কে কটা গল্প করে নিই। আগেই বলেছি, পুয়ের্তো রিকো ছিল স্পেনীয় উপনিবেশ। সে বড় আজকের কথা নয়, সেই কলম্বাসের সময় থেকেই। নাহোক প্রায় পাঁচশ বছর আগেকার সময় থেকেই। তার পর ফরাসি, ওলন্দাজ, ব্রিটিশ কত জাতিই না চেষ্টা করেছে ভেইকোয়েস সহ পুয়ের্তো রিকো দ্বীপপুঞ্জকে দখল করার কিন্তু স্পেনীয়দের হাত থেকে তাকে সরাতে পারেনি। সেই নিয়ে কত যুদ্ধ, কতই না রক্তপাত। কিন্তু প্রশ্ন হল, ওই পুঁচকে একফালি দ্বীপের জন্য এত ঝগড়া ঝাঁটি, রক্তপাত কেন? কারণটা হল, এর অবস্থান। তখনকার পালতোলা জাহাজের যাত্রাপথ ঠিক হত সমুদ্রের বাতাসের এবং স্রোতের অনুকূলে। বাষ্প বা পর্বতীকালের ইলেকট্রিকের জলবাহনের যুগ তখনও অধরা। ইউরোপ থেকে পশ্চিমে উত্তর বা দক্ষিণ আমেরিকান ভূখণ্ডে আসতে গেলে আসার পথ ছিল উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটু দক্ষিণ দিয়ে। আর ফিরে যাবার পথটি ছিল একটু উত্তর দিক দিয়ে। বারমুডার কাছাকাছি অঞ্চল দিয়ে। কারণ সমুদ্র স্রোত সেকথাই বলে। এখন আসার রাস্তাটি ভাল করে দেখুন দিকি। স্পেন বা পর্তুগাল থেকে উত্তর আটলান্টিকের দক্ষিণ দিক দিয়ে আমেরিকা ভূখণ্ডের দিকে যাত্রা করলে প্রথম বড় দ্বীপটি কি? পুয়ের্তো রিকো। একমাস ধরে আটলান্টিকে কতে চলতে প্রথম যেখানে পায়ের তলায় জমি পেলেন, যেখান থেকে খাবার, জল, রসদ সংগ্রহ করে, পুরো ক্যারিবিয়ান সাগর পেরিয়ে আরো  ধনশালী, সোনার দেশ, পেরু বা মেক্সিকোর দিকে অভিযান করতে গেলে বা পূর্ব দখলীকৃত অঞ্চলে পৌঁছাতে গেলে প্রথম পড়বে পুয়ের্তো রিকো। সুতরাং এই দ্বীপটি দখলে থাকলে এদিক থেকে যেমন সুবিধা তেমনি, ইউরোপ থেকে আগত শত্রূ জাহাজকে ক্যারাবিয়ান সাগরে ঢুকে পেরু বা অন্যান্য জায়গায় পৌঁছে লুট করতে দেবার আগেই আটলান্টিকেই রুখে দেওয়া যাবে। সুতরাং এই পাহারাদার সদৃশ ছোট্ট ভূখণ্ডটির দিকে হাত বাড়িয়েছে সকলেই। কিন্তু অনেক গৃহবিপ্লব এবং যুদ্ধ সত্ত্বেও ১৮৯৮ এর আগে পর্যন্ত এই অঞ্চল থেকে স্পেনীয়দের সরাতে পারেনি কেউই। এমনকি এখানকার আদিবাসী তাইনো সম্প্রদায়ের বিপ্লব সত্ত্বেও। ১৮৯৮ এ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং স্পেনের যুদ্ধ শেষে প্যারিস চুক্তি অনুসারে এটি আমেরিকান উপনিবেশে পরিণত হয়. এবং ১৯১৭ থেকে পুয়ের্তোরিকানরা আমেরিকান নাগরিকত্ব পান।

যাকগে, ছোট প্লেনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে একগাদা কথা বলে ফেললাম। যেটা আজকাল চাইলে দু মিনিটেই জানা যায়।  যাই হোক, আর কথা না বাড়িয়ে দেখি প্লেন এলো কিনা। সময় হলে আমাদের পাশ দেখে লাইন করে ওয়েটিং লাউঞ্জ থেকে সোজা নিচে নামিয়ে দেওয়া হলো। এর আগে কোনো এয়ারপোর্টে এরকম পায়ে হেঁটে প্লেনে গিয়ে চাপিনি। নিদেন পক্ষে বাসে করে প্লেনের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমাদের পথনির্দেশকের ঠিক পিছনে লাইন করে সবাই গিয়ে দাঁড়ালাম। তখনও প্লেন আসেনি সেখানে। হাওড়া স্টেশনে বাসের জন্য লাইন দেওয়া মনে পড়ে যাচ্ছে। পথপ্রদর্শক আমাদের এবং আমাদের ব্যাগেদের সমান দুই ভাগে ভাগ করে দিলেন। ব্যাগ তার আগেই আরো একবার করে ওজন করা হয়ে গেছে। অর্থাৎ, প্লেনটিতে নির্দিষ্ট ওজনের বেশি নেওয়া যাবে না।  সুতরাং পারমুটেশন কম্বিনেশন করে দেখা গেল, আমরা এবং আমাদের ব্যাগ আলাদা প্লেনে যাবে। সবই এরকম ছোট্ট আট সিটের বাহন। তো সে বাহন এলো। ঠিক যেন অটোয় উঠছি বলে মনে হল।  পাইলটের ঠিক পিছনেই দরজা। এদিক ওদিক করে আরো সাতটা সিট্। উঠে বসলাম। নির্দেশিকা শোনানো হলো। বিশেষ কিছু শুনেছিলাম বলে মনে হয় না। প্লেন ছোট হবে জানতাম এরকম ছোট হবে আশা করিনি। আমার হতভম্ভ ভাব কাটছেই না। মনে হচ্ছে আটলান্টিকের ওপর দিয়ে লঞ্চে যাবার হতাশা কাটতে চলেছে। পিঠের ব্যাগটা বাসের মত পায়ের তলায় নিয়ে জাঁকিয়ে বসলাম। প্লেনের দরজা বাইরে থেকে পথপ্রদর্শক ভদ্রলোক বন্ধ করে দিলেন। একদম ম্যানুয়াল ব্যাপার স্যাপার। সম্ভবত উস আর্মির পুরোনো প্লেন এগুলো। জানিনা। একান্তই আমার মনে হওয়া। প্লেন গড়াতে শুরু করল।  গড়াতে গড়াতে সান ওয়ানের এয়ারপোর্ট এলাকা প্রায় পেরিয়ে এলো। কিন্তু স্পিড আর নেয় না। কি রে বাবা? ওই তো দেখা যাচ্ছে গাছের সারি, তার ওপাশেই সমুদ্র। উড়বে কখন? এতো রানওয়ে শেষ হয়ে এলো। পাইলটের ঠিক পিছনেই একজন তার পিছনেই আমি। হটাৎ দেখলাম, ডানহাতে পাইলট তার বাহনের কন্ট্রোলারের ওপর। আর বাঁহাত দিয়ে প্রাণপণে পাশের জানলার হ্যান্ডেল ধরে হ্যাঁচকা টান মারছেন। জানলা বন্ধ হচ্ছেনা। আর প্লেন গড়িয়েই যাচ্ছে থামছেনা। এদিকে সামনে গাছের সারি এগিয়ে আসছে। আমি ততক্ষনে নিশ্চিত যে এই প্লেন আর উড়বে না। আর এই মাঝসাগরের পুঁচকে দ্বীপেই আমার সমাধি হলো বুঝি। হঠাৎ মনে হলো আমিও প্রানপণে দুই পা দিয়ে পায়ের  নিচে রাখা ব্যাগটাকে চেপে ধরে আছি।  মরার আগে কুটোর মতন। শেষমেশ গাছের সারির গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ার ঠিক আগেই কেমন করে যেন জানলাও বন্ধ হয়ে গেল আর প্লেনও একটা ঘাসফড়িং এর মতন পুট করে হাওয়ায় ভেসে উঠল। কয়েক সেকেন্ড পরে যখন বুঝতে পারলাম  মরিনি, এখনো বেঁচেই আছি ততক্ষনে গাছের সারি পেরিয়ে পায়ের তলায় আটলান্টিক।

তার আগে আটলান্টিকের ওপর দিয়ে এসেছি একবারই। প্রথমবার যে ঢাউস এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানটি আমাদের দিল্লি থেকে প্রথম বারের জন্য শিকাগো পৌঁছে দিয়েছিল, সেই উড়ানের শেষ অংশটির কিছুটা। কিন্তু সেই যাত্রার পুরোটাই ছিল রাতের অন্ধকারে। শিকাগো এয়ারপোর্টে নামার আগে আকাশে লালচে আভা জেগেছিল মাত্র। সুতরাং আটলান্টিকের সাথে পরিকায় সে অর্থে এই প্রথম।ভয় কেটে যাবার পর জানলা থেকে নিচে আর সামনে দেখতে শুরু করলাম। পিছনে সান ওয়ান ডাকগা যাচ্ছে। দেখে মনে হলো এখানে না থেকে ভাইকোয়েসে থাকার সিদ্ধান্ত তা ঠিকই হয়েছে। সান ওয়ানের রাজধানীচিত কিছুটা হলেও আধুনিকতা আছে। যা হয়ত ভেইকোয়েসের নেই। মেঘ পেরিয়ে, সূর্যাস্ত পেরিয়ে, আর এক সাগর নীল পেরিয়ে আমাদের সেই ঘাসফড়িং ভেইকোয়েস পৌঁছে দিল যখন তখন সন্ধ্যা নেমেছে। পাইলট নিজেই নেমে দরজা খুলে দিলেন। লাফ মেরেই নেমে পড়লাম এবং তখন জানলাম যে এই জানলা বন্ধের গল্পটা রোজকারেরই। তাই উনি এত নির্বিকল্প চিত্তে বাঁহাতে জানলা ধরে টানতে পারছিলেন। বুঝলাম, আমাদের অভিজ্ঞতার এই শুরু। ভেইকোয়েস আমাদের আরো অনেক কিছুই দেবে। যা আদ্যন্ত নিজের প্রতি অনাস্থা রাখা একজন মানুষের পক্ষে এই চার্ পাঁচদিনে হজম করা একটু গুরুপাক। যাক পরের কথা পরে বলা যাবে। আপাতত ব্যাগ সংগ্রহ করে হোটেলে পৌঁছাতে হবে। ভেইকোয়েস এয়ারপোর্টটা হলো আদতে একটা দোতলা বাড়ি। ব্যাস আর কিচ্ছুটি নয়। ঢুকেই শেষ।  ঢুকেই দেখতে পেলাম ব্যাগ। নিয়ে বাইরে এসে দেখি বাইরে একটি মাত্র একটু হাইপাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে।  সেটিই এয়ারপোর্টের বাইরের একমেঅদ্বিতীয়ম আলো। তাতে বাইরের মিশকালো অন্ধকারের শোভা আরো বেড়েছে বই না। আর সেই আধো অন্ধকারে সাদা শার্ট পরে একটি গাড়িরই নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ। আমাদেরই অপেক্ষায়। জানতাম এখানে বাইরে কিছুটা পাওয়া যাবে না হোটেলে পৌঁছাবার জন্য। তাই আগে থেকেই এই ব্যবস্থা। নাম ধাম মিলিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে নিলেন। উঠেও বসলাম। এয়ারপোর্ট বাড়িটার ঠিক সামনে দিয়েই ডাইনে বামে আড়াআড়ি শুয়ে আছে একটা সরু রাস্তা। যার ডানদিকে গেলে ভেইকোয়েসের মেন্ টুরিস্ট এলাকা। যার নাম 'এস্পেরাঞ্জা', বাংলায় তর্জমা করলে হয়, 'আশা'। সেদিকেই সব দেখবার বা ঘুরে বেড়াবার মত বিচ। আর বাঁয়ে গেলে এখানকার স্থানীয় লোকজনের ঘরবাড়ি। আর সেদিকেই আমাদের গাড়ি চলতে  শুরু করল। আমাদের বাঁয়ে অন্ধকারের মধ্যে সাগরের থেকে একটা সাঁইসাঁই হওয়া আর শব্দ ভেসে আসছে। আর ডাইনে ঘন গাছপালা ঘেরা অন্ধকার জঙ্গলের মাঝে মাঝে একটা একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।  বাড়ির সামেন একটা করে মিটমিটে বাল্ব জ্বলছে। তাতেই সামনের রাস্তাটুকু একটু করে আলোকিত হচ্ছে। ঠিক যেন শীতকালে আমাদের বাড়ির রাস্তার মত। সেই একইরকম অন্ধকার। ও নাকি US territory. অর্থনৈতিক অগ্রগতি নাকি আধুনিকতা নাকি আদিম প্রাকৃতিক পরিবেশকে তার আপন জায়গায় থাকতে দেওয়া কোনটা যে দরকারি কে জানে। যাই হোক, চলছিলাম। অবিশ্বাস আমাদের মজ্জায় মজ্জায় গাঁথা হয়ে গেছে। আর অবিশ্বাস থেকেই ভয়। বার বার মনে হচ্ছে এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলের দূরত্ব কি সত্যিই এত দূর? নাকি......? ইন্টারনেট কাজ করছে না ঠিক করে ফোনে ঠিক করে দেখতেও পাচ্ছি না।  কিন্তু প্রতি বারের মত আমায় ভুল প্রমাণিত করে আমাদের উনি পৌঁছে দিলেন হোটেলের সামনে। হোটেলের নাম ভুলে গেছি। পরে মনে পড়লে বলবখন। নেমে ভাড়া দিতে গিয়ে ভেইকোয়েস আমাদের দিনের দ্বিতীয় চমকটা দিল। এখানে সমস্ত কিছুই ক্যাশে পেমেন্ট করতে হয়।  একদম আমাদের বাড়ির মত। এদিকে আমরা গত একবছরে মানিব্যাগ সাথে রাখা ভুলেছি। সবকিছুই কার্ড সোয়াইপ করে চলছে। আমরাও এখানে আসার আগে ভাবিনি আর কেউ বলেও নি যে, US এর সমস্ত জায়গা মানেই US এর শহর নয়।  সেখানেও অজ গ্রাম আছে। দুজনের ব্যাগ, সুটকেশ সমস্ত কিছু হাঁটকে কিছু ক্যাশ বেরোলো। কখনো কোনো কারণে তুলেছিলাম। সেসব যোগ করেও প্রায় তিন চার ডলার কম হল ওঁনার গাড়ির ভাড়ার থেকে। কিন্তু আমাদের আর কিচ্ছু করার নেই তখন। লজ্জায় কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, আপনার গাড়ির অফিসে গিয়ে কাল আমরা বাকি টাকাটা দিয়ে আসবো। আর আরো একবার আমায় লজ্জিত করে উনি বাকি টাকাটা না নেবার কথা বলেই চোলে গেলেন। আর দেবার দরকার নেই বলে। উনি বুঝতে পেরেছেন যে আমরা সত্যিই আতান্তরে পড়েছি। গাড়ি ঘুরিয়ে চোলে গেলেন আর পিঠে ব্যাগ আর হাতে সুটকেস নিয়ে আমি ভাবলাম এঁনাকেই নাকি কয়েক মিনিট আগে আমি ভয় পাচ্ছিলাম।

প্রথমেই বলেছি যে বিশ্রী একটা মানসিক অসুস্থ (অসুস্থই বলব) অবস্থায় আমি তখন। নিজের ওপর তো নয়ই, কারো ওপরেই বিশেষ ভরসা হয়না। এরকম অবস্থায়, অনভিজ্ঞ দুজনে রাতের অন্ধকারে, আটলান্টিক আর ক্যারাবিয়ান সাগরের মাঝের একটা নির্জন দ্বীপে সম্পূর্ণ ক্যাশলেস অবস্থায় এসে পৌঁছেছি। বেরোবার চক্করে বেশি কিছু করে ফেলিনি তো? আবার একটা অনিশ্চয়তা ফিরে আসছে মনে। ব্যাগ টেনে হোটেলের দরজার দিকে চলতে শুরু করলাম দুজনে। কাল যা হোক করে কোনো ব্যাংকের ATM থেকে ক্যাশ তুলতে হবে।  নইলে তো খাবার জলটুকুও কিনতে পারব না।

(চলবে)

Sunday, 9 August 2020

খাঁড়ির গান-৪

খাঁড়ির গান-৪
-------------------
সেই যে বলছিলাম না, Bio-luminescence Bay দেখতে যাব বলে দুজনে দাঁড়িয়েছিলাম ভেইকোয়েসের সান বিচের প্রায়ান্ধকার নির্জনতায়। আমাদের আশাহত হতে যখন আর একটুই বাকি আছে ,তখনই  বিচের রাস্তাহীন রাস্তা দিয়ে দুটি গাড়ি এসে পৌঁছালো নির্জন সান বীচে। এপর্যন্ত তো বলেই ছিলাম। তারপরের গল্পটা বলি। সেই গাড়ি থেকে নামলো দুতিনটি পরিবার। বাচ্চারা বা কমবয়স্ক মানুষ বিশেষ নেই। প্রত্যেকেই মধ্যবয়স অতিক্রম করেছেন। ক্রমে ক্রমে আরো দু-তিনটি গাড়ি এসে পৌঁছালো। আরো কয়েকজন সহযাত্রী বাড়লো। আমরা ততক্ষণ জিজ্ঞাসা করে জেনে নিয়েছি যে তাঁদের একই পথের যাত্রী। নিশ্চিন্ত হলাম। যাত্রীরা হাজির, কান্ডারীদের দেখা নেই তখনও। তারপর দেখলাম, একটি সাদা রঙের মিনিবাস, আর তার পেছনে পেছনে দুটি ট্রাক ঢুকছে। ট্রাকের পিঠে পনেরো-বিশটা কায়াক।  নিশ্চিন্ত। কান্ডারীরা এসে গেছেন। গাড়িগুলো ততক্ষণে একটা ঘাসহীন জায়গাকে পার্কিং লট বানিয়ে জটলা তৈরী করেছে। আর যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে হৈচৈ করছেন। প্রত্যেকেই জলে নামবার উপযুক্ত পোশাকে। মানে অন্তত ভিজে গেলে জুতো জামা তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে এমন পোশাকে। আর আমরা দুজন আপাদমস্তক সাধারণ জিন্স- টি-শার্ট-স্নিকার। জলে পড়ে গেলে ওই ভেজা জিন্সের আর জুতোর ভারেই ডুবে যাবো। এত সব ভাবিনি আগে। যাক গে যাক, যদি জলে পড়ি, যদি জামা-জুতোর ভারে ডুবে মরি, এত সব ভেবে Bio-luminescence Bay এর থ্রিলটাকে মাটি করব এমন বোকা আমি নই। মহানন্দে স্কুটারটাকে বড় বড় গাড়িগুলোর মাঝে দাঁড় করিয়ে লক করে দিলাম। সবাইকে নাম ধরে ধরে বাসে ওঠাচ্ছে লাল জ্যাকেট পড়া একটা ছেলে। সেইসঙ্গে টাকাও কালেক্ট করে নিচ্ছে। হেলমেটগুলো নিয়ে বাসে উঠতে দেখে আমাদের বললে, "এই সব লটবহর নিয়ে নৌকা বাইবে নাকি?" তখন ব্যাপারটা বুঝিনি। "কোথায় রেখে যাব?" "বাইকের হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে দাও।  কেউ নেবে না তোমার হেলমেট।" সত্যি নাকি? কতক্ষণের জন্য যাব তার ঠিক নেই, অন্ধকারে পড়ে থাকবে? তার পর আমাদের আরো অবাক করে দিয়ে বললে, "গাড়ির কাঁচ খুলে গাড়ি আনলক করে দিয়ে সবাই বাসে ওঠো। শুধু টাকাকড়ি, কাগজপতি নিয়ে।" সেকি? কি বলে রে বাবা! তারপর বিষয়টা ব্যাখ্যা করলে। এখানে গাড়ি চুরির মত বড় অপরাধ করার মতন কেউ নেই। গাড়ি আনলকড থাকলেও নিয়ে কেউ পালাবে না। এইটুকু জায়গায় গাড়ি চুরি করে পালাবে কোথায়? যেটুকু হয়, সেসব ছোটোখাটো চুরি। গাড়ির কাঁচ বন্ধ থাকলে বা লকড থাকলে তারা ভাবতে পারে যে, নিশ্চয়ই দামি কিছু আছে গাড়ির ভেতরে, তাই লক করা। তখন গাড়ির কাঁচ ভাঙলেও ভাঙতে পারে। তাই ফিরে এসে গাড়ি গোটা অবস্থায় পেতে হলে, কাঁচ খুলে আনলক করে যাওয়াই শ্রেয়। সম্পূর্ণ নতুন কথা আমাদের কাছে।

যাইহোক, আমাদের গাড়িও নেই কাঁচ খোলার প্রশ্নও নেই। হেলমেটদুটো স্কুটারের হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে দিয়ে বাসে উঠে পড়লাম। পছন্দ মত সিটে বসে আছি। বাকিরা একে একে বাসে ওঠার পর দেখা গেল বাসের সব সিট একেবারে ভরা। আমরা ছাড়া ভারতীয় মুখ একটিও নেই। ড্রাইভার বাস ছাড়লো। লাল জ্যাকেট, বাসের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে রইল। এতক্ষণে দেখলাম, তার পিঠে একখানা গিটার বাঁধা। তার বাকি সঙ্গীসাথীরা ট্রাকদুটি আর তাতে বাঁধা নৌকাগুলিকে নিয়ে আগেই এগিয়ে গেছে। সান বিচের বেলাভূমি পেরিয়ে বালি বিছানো পথ অন্ধকার জঙ্গলের দিকে। পথ বলতে ঘাস হীন বালি। এতক্ষনে আমাদের বাসও চলতে শুরু করলো। বাসের ভেতরের লাইট জ্বলছে। লাল জ্যাকেট আমাদের গাইড। বললো, "আমার নাম ড্যানিয়েল। তোমরা আমায় 'ড্যান' বলতে পারো। আমি তোমাদের একটা আশ্চর্য্য জিনিষ দেখাবো যা তোমরা কখনো দেখোনি। এ আমার দেশের বিস্ময়। তবে তার আগে কয়েকটা জিনিস তোমাদের বলে নেওয়া দরকার। এমন কিছু নয়। এই কায়াক চালানোর আর এই ট্রিপের কয়েকটা সতর্কতা।" এই বলে আমাদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে লাইফ জ্যাকেট দিয়ে দিলো। বললো, "বাস থেকে নেমেই এগুলো পরে নেবে। প্রত্যেকটায় একটা করে হুইসিল লাগানো আছে। দেখে নাও সকলের জ্যাকেটে আছে নাকি। না থাকলে আমায় এখনই বোলো আমি এখনই জ্যাকেট বদলে দেব।" চেক করে নিলাম। তারপর বললো, "প্রত্যেক দুই জনের জন্য একটা করে কায়াক। প্রথমজনের পিঠের দিকে মুখ করে পিছনের জন বসবে। মানে দুজনের মুখ যেন একই দিকে থাকে। কিছু সমস্যা হলে হুইসিল বাজাবে। তবে একটা কথা, হুইসিল তখনই বাজাবে, যখন তোমার  লাইফ রিস্ক দেখা দেবে। নইলে মোটেই নয়। কারণ হুইসিল শুনলেই আমি পুরো ট্রিপ ক্যান্সেল করে দেব। সুতরাং দায়িত্ব নিয়ে বাজাবে।" 

আমার চক্ষু চড়কগাছ। এ বলে কি রে? দুজনে একটা কায়াকে মানে? নিজেদেরই চালাতে হবে? এতক্ষণ দুর্দান্ত লাগছিল। এবার আমার সমস্ত উত্তেজনার বেলুন এখানে এসেই ফেটে গেল ফুস করে। আমরা ভেবেছিলাম, আমরা ট্যুরিস্টের মত গ্যাঁট হয়ে বসে থাকব আর আমাদের নৌকা চালাবার আলাদা লোক থাকবে। এতো দেখছি নিজেদেরই চালাতে হবে ওই প্লাস্টিকের কায়াকগুলো। তাও এই অপরিচিত অন্ধকারে। বাকি লোকেদের মধ্যে বিশেষ চাঞ্চল্য দেখা গেল না। ছোট থেকে প্রতি গরমের ছুটিতে আমরা যখন টিভিতে 'ছুটি ছুটি'  দেখেছি আর ফেলুদার গল্প পড়েছি সারা দুপুর ধরে, এই বাসের বাকিরা ঠিক সেই সময়টাতেই লেক বা নদীতে মাছ ধরেছে, কায়াকিং করেছে। তাদের কাছে কায়াকিং করা আর সাইকেল চালানো একই ব্যাপার। আর আমরা জীবনে পদ্মপুকুরে কলার ভেলাও নিজে হাতে চালাইনি। যদিও একবার অন্যের ভরসায় উঠে পদ্মপুকুরে সেযাত্রা সলিল সমাধি হতে বসেছিল প্রায়। আমার বুক ধুকপুক করতে লাগলো। আর এই কায়াকগুলো শুনেছি মহাবদ। দুই মাঝির হাতের দাঁড়ের ছন্দের এদিক ওদিক হলে দিব্বি কাত হয়ে হেলে পড়ে একদিকে। ভিডিও দেখেছি কত। আর কাত হলে দুজনেই যে টুপ্ করে জলে খসে পড়ব সে বিষয়ে নিশ্চিত। পিনাকী সাঁতার পর্যন্ত জানে না। ফলে ওই দুমনি শরীর যে ওই তুশ্চু লাইফ জ্যাকেটে ভাসবে না এ বিষয়েও আমি একশভাগ নিশ্চিত। আর আমি সাঁতার জেনেই বা কি করব? এ কি আমার পদ্মপুকুর বা সিংদের পুকুরে সাঁতার দেওয়া নাকি? mosquito bay এর একদিক ক্যারাবিয়ান উপসাগরে যুক্ত। সোজা ভাসতে ভাসতে দিক ভুল হয়ে সেদিকে গিয়ে পড়লেই মায়ের সাধের একমাত্র মেয়েটির গঙ্গা (সাগর) প্রাপ্তি ঘটবে। আর এই ঘুটঘুট্টি অন্ধকারে দিকভুল না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। 

হাতে একটা ছোট্ট জলের বোতল ছিল, কোঁৎ কোঁৎ করে অর্ধেক জল খেয়ে বাকিটা পিনাকীর দিকে বাড়িয়ে দিলাম। সে দেখি বলছে, "আরে দাঁড়ানা, দেখছি।" দেখার আর আছেটা কি? এখন সান বিচ থেকে জঙ্গলের ভেতর চলে এসেছি বেশ কিছুটা। টর্চ নেই। এখানে বাস থামিয়ে নেমে পড়লেও পিছনে ফেরাটা মুশকিল। এমন সময় শুনি ড্যানিয়েল বলছে, "সবার সব কিছু পরিষ্কার? কারো কোনো প্রশ্ন আছে?" সবাই উল্লাস ধ্বনি দিয়ে জানিয়ে দিলো সবাই এক্কেবারে রেডি। আমাদের মুখ দেখে ড্যানিয়েল কিছু বুঝতে পেরেছিলো কিনা জানিনা। জিজ্ঞাসা করলে, "এখানে কায়াক একবারও চালায়নি এমন কেউ আছে?" সটান হাত তুলে দিলাম। এটা দেখে যদি আমাদের ওর সাথে একটা বড় বোটে নিয়ে নেয়। আমাদের হাত তোলা দেখে বাস সুদ্ধ সবকটা মুন্ডু দেখি আমাদের দিকে ঘুরে গেছে। অবাক বিস্ময় প্রতি জোড়া চোখে। যেন দুটো মঙ্গল গ্রহের জীব এইমাত্র এই মিনিবাসের সিটে উঠে বসেছে। আমার বিন্দুমাত্র লজ্জা হচ্ছিল না তাতে অবশ্য। প্রাণের চেয়ে লজ্জা অনেক পরের ব্যাপার। ড্যানিয়েল দেখলাম দুসারি ধপধপে দাঁত বের করে হেসে বলছে-" আরে কোনো ব্যাপারই নয় কায়াক বাওয়া। ডানদিকে যেতে গেলে বাঁদিকে দাঁড় বাইবে, আর বাঁদিকে যেতে গেলে ডানদিকে। বুঝলে?" বোঝার কিছু ছিল না। তারপরে আরো অনেককিছু বলছিলো। আমরাও ঢকঢক করে মাথা নাড়ছিলাম। আমাদের আশ্বস্ত করতে শেষকালে ড্যানিয়েল বললে, "মনে রেখো, কায়াক হচ্ছে রাগী বাবার মতন। বেমক্কা নাড়াবে না একদম। নাড়ালেই তোমার সমস্যা। সামলাতে না পারলে দাঁড় তুলে নেবে জল থেকে। দেখবে নিজেই শান্ত হয়ে গেছে?" ছোটবেলায় কিছু অকাজ করার পর সামনে বাবার মুখটা মনে করে বাসের হ্যান্ডেল আঁকড়ে ধরে বসে রইলাম। বাস ততক্ষনে জঙ্গলের মধ্যে কাঁচা রাস্তায় ঢেউ এর মতন নড়তে নড়তে চলেছে। রাস্তাই তো নেই। অন্ধকার এমন যেন ছুরি দিয়ে কাটা যাবে। যা থাকে কপালে আজ, হয় কায়াক চালানো শিখব আর পুরো অভিজ্ঞতাটা সঞ্চয় করব। নয়ত জলে পড়লে সাঁতার দিয়ে পাড়ে উঠব। উদ্বেগটা কেবল পিনাকীকে নিয়ে। ওকে ফিসফিস করে বললাম, "দেখ, কোনো এক্সিডেন্ট হলে কায়াকটাকে ছাড়বি না, হ্যাঁ। প্রানপনে ধরে থাকবি। ওটা ডুববে না। ওটা ধরে ভেসে থাকবি।" সে দেখি হুঁ-হাঁ করে অর্ধেক শুনলো, অর্ধেক শুনলো না। 

মিনিট পনের-কুড়ি পরে বাস আমাদের নামিয়ে দিল একটা অপেক্ষাকৃত চওড়া জায়গায়। সেখানে ট্রাকগুলোও দাঁড়িয়ে আছে। আমরা সবাই লাইফ জ্যাকেট পরে নিয়েছি বাসে বসেই। ড্যানিয়েল আর তার বন্ধুদলের টর্চের আলোয় আমরা আস্তে আস্তে জঙ্গলের সুঁড়িপথ বেয়ে জলের ধারে এসে পৌঁছোলাম। এতক্ষণে অন্ধকারটা একটু পরিষ্কার হলো। আমাদের সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে একটু কম অন্ধকার। ঐটিই mosquito bay। অন্ধকারে চোখটা সয়ে আসতে দেখি, কায়াকগুলো জলের ধার ঘেঁষে পরপর রাখা। এখানে এসে ড্যানিয়েল আমাদের থামালো। বললো, "দেখো আকাশে মেঘ আছে, তাই অন্ধকারটা বেশি। সেটা একদিক থেকে ভালোই। অন্ধকার বেশি থাকলে জলের আলো বেশি উজ্জ্বলভাবে দেখতে পাব আমরা। কিন্তু একেবারেই চাঁদ না উঠলেও মুশকিল। একটুও আলো না থাকলে আবার বিশেষ কিছু দেখা যায়না।" সেই শুনে কেউ একজন উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "তাহলে! মেঘ না সরলে? চাঁদ একেবারেই দেখা না দেয় যদি?" ড্যানিয়েল মজার গলায় হাসল। বললে, "বন্ধু, কিছু চিন্তা কোরো না। তোমাদের সাথে আছে ড্যান। আমি গান গাইলেই মেঘ সরে যায়। এই দেখছো না গিটার এনেছি তো সেজন্যই।" বলে হা হা করে হাসলে।

তারপর বললে, "নাও এবার দুজন দুজন করে কায়াক নিয়ে বেরিয়ে পড়ো। আমি এক এক করে নাম্বার দেব কায়াক গুলোর। নিজেদের নাম্বার মনে রাখবে। জলে নেমে সোজা যাবে। ডানদিকে বেশি যাবে না।  ডানদিকে দেখবে কিছুদূরে গেলেই কতগুলো বয়া ভাসছে। ওটা সীমানা। ওর ওপারে যাওয়া মানা।  ওদিকে কিন্তু একদম যাবে না। তাহলে সমুদ্রে গিয়ে পড়বে। আর বেশি ধার ঘেঁষেও যাবে না।  তাহলে ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের ফাঁকে আটকে যেতে পারো। মাঝামাঝি থাকবে। জলে হাত বা দাঁড় দিয়ে জোরে জোরে আঘাত করবে তারপর দেখবে ম্যাজিক। আমি মাঝে একবার রোলকলের মত নাম্বার কল করব। তখন হাজিরা দিও চেঁচিয়ে। কারো কিছু প্রশ্ন আছে?" কারো কোনো প্রশ্ন ছিল না। আমরাই জলে নামার জন্য নিশপিশ করছি। বাকিরা তো করবেনই। ড্যানিয়েল বললে, "নাম্বার ওয়ান কায়াকে কারা যাচ্ছে তবে?" দুজন এগিয়ে গেলেন। ড্যানিয়েল বললো, একবার দেখাও দেখি তোমদের হুইসিল বাজছে কেমন।" তাঁরা দুজনেই বাজিয়ে দেখালেন। ড্যানিয়েল নিশ্চিন্ত হয়ে দুটি দাঁড় তাঁদের হাতে দিয়ে দিলে। তাঁরা এগিয়ে যেতেই ড্যানিয়েলের বন্ধুরা একটা কায়াক হাঁটুজলে নামালো টেনে। আবছা আলো আঁধারিতে চোখ সয়ে এসেছে। তাঁরা যতক্ষণ উঠছিলেন কায়াকটায়, ড্যানিয়েলের বন্ধুরা ধরে রইল টলমলে প্লাষ্টিকের শালতিটাকে। তারপর তাঁরা থিতু হয়ে বসতেই, "গুডলাক" বলে জলের দিকে ঠেলে দিল কায়াকটাকে। 

এরকম করে আরো কয়েকটা কায়াকের যাওয়া দেখলাম। উঠে বসার পদ্ধতিটি দেখার চেষ্টা করছি।ড্যানিয়েল প্রত্যেকটি কায়াকের নাম্বার দিচ্ছে আর প্রত্যেকটি বাঁশি বাজচ্ছে কিনা পরীক্ষা করে তারপর দাঁড় দিচ্ছে হাতে। একসময় আমরা এগিয়ে গেলাম সাহস করে। আমাদের নম্বর ছয়। আমাদের বাঁশি পরীক্ষা হলো। কিন্তু তারপরেই দাঁড় দিলো না হাতে আমাদের। পিনাকীর পিঠে একটা সাহসের থাবড়া মেরে বললে, "কোনো চিন্তা নেই, এনজয় কোরো। শুধু একটা কথা মনে রেখো, বেশি দোলাবে না কায়াককে। বললাম না, একদম রাগী বাবাদের মত হয়। না ঘাঁটালেই আর কোনো সমস্যা নেই।" এই বলে দুজনের হাতে দুটো দাঁড় দিয়ে দিলে। আমরাও গুটি গুটি পায়ে জলের ধারে এগিয়ে গেলাম। আমাদের নাও প্রস্তুত। ছপছপ করে জলে নেমে পড়লাম বুক ঠুকে। কি আর হবে?  ডুবে যাওয়া অতই সহজ নাকি? ততক্ষণে পায়ের জুতোর ভেতর দুকলসি জল, আর জিন্স হাঁটু পর্যন্ত ভেজা। ওসবের মায়া আমি কোনো কালেই করি না বেড়াতে বেরোলে। ভিজেছে, আবার শুকিয়ে যাবেখন। টলমল করে উঠে বসলাম। পিনাকী সামনে, আমি পিছনের পাটাতনে। মা দুগ্গার ত্রিশুল ধরার ভঙ্গিতে বাগিয়ে ধরেছি দাঁড়টা। "ঠিক আছে?" "হ্যাঁ " বলে উত্তর দিতে না দিতেই একধাক্কায় দেখ না দেখ ওই একফালি প্লাস্টিকের নৌকা সোজা বেশ কয়েক হাত জলে। বুকটা দুড়দাড়িয়ে উঠলো। 

সামনে তিনদিকে ঘন জঙ্গল আর উঁচু পাহাড়ি দ্বীপভূমি। নিঝুম পাহারাদারের মত এই অলীক আলোর খাঁড়িকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশে কালো জল। রাতের সমুদ্রের হাওয়ায় ভেজা প্যান্ট- জুতো-মোজা থেকে শিরশিরিয়ে ঠান্ডা উঠছে। গভীর এক জলজঙ্গলের মাঝে, বিশাল এক উপসাগরের বিশাল এক খাঁড়িতে, রাতের মেঘলা আকাশ ভেদ করে আসা আবছা আলোয় দুই আনকোরা মাঝির হাতে অচেনা এক নৌকা। চালাতে শিখতে হবে আগে, তারপর যে সৌন্দর্য্যের খোঁজে এসেছি সেটির সন্ধান করতে হবে। 

পিনাকী সামনে থেকে জিজ্ঞাসা করল, "রেডি?" একবুক বাতাস টেনে নিয়ে বললাম, "রেডি।" 

Wednesday, 17 June 2020

Hitchcock Nature Center

Today’s trail. In the morning, usual way to the lab has shown an unusual combination of colors. The bright yellow speed caution board in the foreground on a background of a grayish cloudy sky. The chimney usually smokes in the morning but today it was sleeping I guess.

After completion of a routine day we headed towards Hitchcock Nature Center, our nearest and easy way out to collect our scattered mind.

We took our usual trail to the west end of the nature center. It gives us the majestic sunset at the end of the trail every time. Today the trail was not crowded, only a family for photo-shooting during the upward trail and a father-kid camping duo during the way back said “hi” to us.

End of the winter, the forest is flooded with green foliages and full of birds. We do not know the name of the birds but that did not hinder us to be a part of the grand ceremony of ending of a day.

With every shades of green, serenity of sunset colors, whistle of a passing train on a single track, choir of birds and whispering wind in the years old oaks. I touched the leaves and the trunks of them during my way back and took the feeling of the rough surface with me. Every time I touch the rough trunk of an aged tree, I feel a touch of someone, I can depend on. Like the elderly person of the family, like a loving, wise grandpa.

We were returning with the last ray of the day, with bunch of busy butterflies and the velvety bees. A hummingbird also said good night to us from a bunch of yellow grass flowers. They may have a specific name but I do not bother to know the names of plants and the animals always. The “yellow grass flowers” is enough to memorize their beauty under a green canopy and a serene ray of sun.

A small beagle kissed me today during the returning trail. He was going with his human friends for a walk towards the same trail. After a long three months time this was the first touch of a dog for me due to Covid-19. This is another friendly touch that I never miss to realize.

We started towards Hitchcock with a dumbed mood. The jungle filled us with part of her green, part of her silence, part of her sunlight and part of her chorus of natural sounds.

We returned with the flood of nature within us. A place who never refuses us.

https://youtu.be/d2mBQkod4as

Saturday, 13 June 2020

সেদিন হঠাৎ করেই


সাতই মার্চ ২০২০, দিনটা শনিবার। কোনো পড়ে থাকা কাজ নেই যা সেইদিনই শেষ করতে হবে। মিডওয়েস্টের মারকাটারি ঠান্ডাটা একটু সহ্য করার মত অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। সুতরাং মনটা ঘরে থাকছিল না। স্যান্ডহিল ক্রেনরা ফিরছিলো তাদের বাৎসরিক পরিক্রমা সেরে, সে খবর পেয়েছিলাম। নেব্রাস্কার পুব দিক ঘেঁষে এঁকেবেঁকে বয়ে যাওয়া প্ল্যাট নদীর ধারে ধারে ওদের অস্থায়ী বসবাস শীতের শেষে। কিন্তু তার জন্য আমাদের পশ্চিমে ঘন্টা দেড়-দুই উজিয়ে যেতে হবে, ওদের সাথে মোলাকাত সেরে সন্ধ্যের আগেই ফিরে আসতে হবে। ফিরে আসার সময়ের বাধ্যবাধকতার ব্যাপারটা একটা প্ল্যানিং এর কারণে। সেই যে ছোটবেলায় স্কুলে মাঝে মাঝে মুড়ির পিকনিক হতো না, তখন অবশ্য 'ফিস্ট' বলতাম। সমস্ত স্কুলে হতো কিনা জানিনা। আমাদের মতো মফস্বলের গার্লস স্কুলগুলোতে হতো জানি। সেরকমই একটা মুড়ির ফিস্ট হবার কথা ছিল দুই একদা মফস্বলী গার্লস স্কুলে পড়া মূল- উৎপাটিত মেয়ের উদ্যোগে। পুরোনো স্বাদে ফেরা মাঝে মধ্যে, এই আর কি! এই নস্ট্যালজিক সময়ে ফিরে যাবার আকর্ষণ কম নয় অথচ এমন একটা পড়ে পাওয়া দিনে বাড়িতে বসে থাকতেও ইচ্ছে করছে না। শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে পড়ার দিকেই মন বেশি টানলো।  সু কে বললাম তোর বাড়ির মুড়ির পার্টিটা বরং পরের সপ্তাহে পিছিয়ে দেওয়া যাক। আজ বরং বক দেখে আসি চল। করোনার চক্রান্তে সে পার্টি এখনো মুলতুবি আছে যদিও। সু আর বড়দাদাও ছিল ল্যাবে। দুটোকেই ভুজুং ভাজুং দিয়ে বগলদাবা করলাম। অমন দুম করে বেরোনো একটু কঠিন। তাদের কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হলো তারপর চারজনে বেরিয়ে পড়লাম। দুপুরের খাওয়া সেরকম কিছু হয়নি ওদের। রাস্তাতেই অল্পসল্প স্যান্ডউইচ - ফলমূল জাতীয় কিছু দিয়ে দুপুরের জ্বলন্ত খিদে সামলে সাঁই-সাঁই করে এগোচ্ছি ইন্টারস্টেট ৮০ ধরে সিধে পশ্চিমমুখো। সূর্যাস্তের অন্তত এক দেড় ঘন্টা আগে পৌঁছাতে হবে নইলে অন্ধকার হয়ে পড়লে ওদের দেখবো কি করে? আর আমরা যে জায়গা লক্ষ্য করে বেরিয়েছি সে জায়গায় ওদের কোনো বড়ো ঝাঁক নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে একটু আশেপাশে খোঁজাখুঁজি করতে সময় লাগবে। মাঝে একজায়গায় থামা হলো। তখন সবে এখানে করোনা ঘাঁটি গাড়তে শুরু হয়েছে। তেমন ভাবে সকলকে পঙ্গু করে দিতে পারেনি তখনও।

আমরা পৌঁছলাম কার্নে। নেব্রাস্কার কার্নে, নর্থ প্ল্যাট, গ্র্যান্ড আইল্যান্ড - প্ল্যাট নদীর অববাহিকায় এইসমস্ত জায়গা বছরের দুবার প্রায় আড়াইশো প্রজাতির পরিযায়ী পাখির বিশ্রামস্থল হয়ে দাঁড়ায়। এযাত্রা শীতের শেষে ঘরে ফেরার পথে আমরা ওদের সাথে দেখা করতে এসেছি। কিন্তু আমাদের পুরোনো জায়গায় পৌঁছে দেখলাম এবছর ওই জায়গায় কোনো বড় পাখির ঝাঁক নেই। তবুও নদীর কাছে নেমে পায়ে হেঁটে শুকনো ঘাসের জঙ্গলে জঙ্গলে বেশ কিছুটা এগিয়েও তেমন লাভ হলো না। দূরে নদীর ঠিক মাঝখানে একখানা চড়া তৈরী হয়েছে। সেখানে একঝাঁক পাখি উঠছে নামছে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু সে অনেক দূরে। সামনে দিয়ে মাঝে সাঝে পাঁচ-সাতটি পাখির ঝাঁক আমাদের দেখতে পেয়ে কর্কশ গলায় ধমক দিতে দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। কিন্তু ক্যামেরাধারীদের জন্য তা যথেষ্ট নয়। এদিকে সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ছে প্রায়। আমরা পড়ি কি মরি করে সূর্য্যের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে আবার অন্য রাস্তা দিয়ে নদীর অন্য আর একটি দিকে পৌঁছাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু তাড়াহুড়োয় যেখানে গিয়ে পৌঁছালাম সে রাস্তা একটি প্রাইভেট ফার্মহাউসের সামনে গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। নদীর ধারে পৌঁছাতে পারলাম না ঠিকই, কিন্তু যেখান দিয়ে এলাম সেটি ফসল ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে গ্রাম্য রাস্তা। এবং ফসল কাটার পর, পরে থাকা ভুট্টার দানা খেতে সেসব ক্ষেতে নেমেছে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি। তাদের কর্কশ গলার মিলিত কোরাসে সরগরম পুরো জায়গাটা। নদীতে না পৌঁছাতে না পেরে ভালোই হলো। পড়ন্ত সূর্য্যের কমলা আকাশের প্রেক্ষাপটে অজস্র বিশালাকায় পাখির ঝাঁক। উড়ছে, নামছে, নানানরকম আকৃতি তৈরী করছে ঝাঁকের, নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। সে এক মহোৎসব যেন। জায়গাটা যেহেতু পক্ষিসন্ধানী টুরিস্টদের সাধারণ রুটের বাইরে, ইতিউতি দুএকটি ফার্মহাউস আর দিগন্ত বিস্তৃত ফসলক্ষেতের মধ্যেকার একটি গন্ডগ্রাম বিশেষ, সেহেতু অনাবশ্যক মনুষ্যসৃষ্ট শব্দ সেখানে অমিল। আমরা চারজনে প্রাণভরে ছবি তুললাম। মন ভরে তাদের সমবেত কথোপকথন শুনলাম। লাল আকাশের প্রেক্ষাপটে ঝাঁকেঝাঁকে পাখির সারি আর তাদেরই সৃষ্টি করা কোরাসে, উদাত্ত হাওয়া আর মধ্যে নেব্রাস্কার বিখ্যাত আদিগন্ত সমভূমির মাঝখানে ব্যোমকে গিয়ে দাঁড়িয়েই রইলাম কিছুক্ষণ।

ফেরার জন্য পিছন ফিরলাম যখন ততক্ষনে অন্ধকার হতে শুরু করেছে। কি ভাবছেন ভ্রমণ শেষ? আরে না না, এত সহজে ঘর ঢুকবো বলে লিখছি নাকি? বলছি সব আস্তে আস্তে।

গ্রামের মেঠো রাস্তায় ঢুকে গিয়েছিলাম অনেকটা। ফলে বড় রাস্তায় এসে পড়তে বেশ কিছুটা সময় লাগলো। এদিকে সেই যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে মাঝে একটি জায়গায় দাঁড়িয়েছিলাম তারপর থেকে জলযোগ হয়েছে কিঞ্চিৎ কিন্তু জলবিয়োগের অবকাশ পাইনি। সেই থেকে দৌড়েছি। এখন ফেরার আগে সে প্রয়োজন সকলেরই উত্তাল হয়ে উঠেছে এবং সাথে পেটে চোঁ চোঁ করছে খিদে। পথের পাশে একটি ছোট দোকানে দাঁড়ানো স্থির হলো। নেব্রাস্কার এরকম ভেতরদিকের গ্রামে ভারতীয় মুখের আনাগোনা বেশি নয় এখনও। ফলে কিছু জায়গায় এখনো পুরোনো দিনের মানুষেরা দুবার ফিরে তাকান। নতুন প্রজন্মের কমবয়সী দোকানি মেয়েদুটি ভারী মিষ্টি। দোকানটি যেমন পথের পাশের দোকান হয় সেরকমই হরেকরকম্বা গোত্রীয়। আমরা কিছু খাবার দাবার কিনলাম। সাথে ওয়াসাবি পেস্ট লাগানো রোস্টেড সবুজ মটর একপ্যাকেট। সেই বস্তু ভুল করে একমুঠো একসাথে মুখে ফেলে দেবার পরেই টাং করে মাথার সমস্ত স্নায়ুতন্তুর জট খুলে যায়, চোখ থেকে দরদরিয়ে জল পড়তে থাকে, নাকের ভেতরে এককিলো নস্যির সমান জ্বলন শুরু হয়, মুহূর্তে ক্লান্তি গায়েব হয়ে মাথা পরিষ্কার হয়। আহা! সে স্বর্গীয় গাট্টাটি গলাধঃকরণ করেই কিনা জানিনা আর একটি চিন্তার উদয় হলো মাথায়। বললুম, এখনই বাড়ি না ফিরে যদি আর একটু দূরে কোথাও গিয়ে, একটা রাত্তির কাটিয়ে কাল আর একটু এদিক ওদিক দেখে তারপর নয় কাল বিকেল নাগাদ ফিরি? বলেই চোরা চোখে সু কে একটু দেখে নিলুম। প্রথম কিলটা আসলে ওর দিক থেকেই আসবে। আমরা নয় আগে থেকেই এই শনি-রবি কাজ করবো না ঠিক করেই রেখেছিলাম। কিন্তু বাকি দুজনকে তো ল্যাব থেকে ফুসলিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। বড়দাদা নয় খানিক বড়ো হয়ে গেছে বলে নিজের কাজ নিজের সময়মত করার খানিক স্বাধীনতা আছে কিন্তু সু এর তা এখনো নেই। ফলে সে খানিক কাঁইকিচির জুড়লে। কিন্তু দোকানেরই এক কোণে রাখা ছোট দুটি টেবিলে বসে খেতে খেতে শেষ পর্যন্ত সমস্ত নেগেটিভ ভোট পজেটিভ হয়ে গেলো। এক্সপেরিমেন্টগুলোর কাল বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করানোর ব্যবস্থা হিসেব করা গেলো। সকলেই তৈরী কোথাও একটা যেতে। এখন প্রশ্ন যাবোটা কোথায়? 

এই আদিগন্ত প্রেইরি অঞ্চলে ঘাসজমি ছাড়া দেখার বিশেষ কিছু নেই। তা ঘাসজমিই দেখতে পারি কিন্তু থাকার জায়গা একটি লাগবে রাতের মতো। চারটি ফোনের ম্যাপ খুলে এদিক ওদিকের বিস্তর গবেষণা করে স্থির হলো আমরা যাবো নিওব্রারা স্টেট পার্ক। সেটি এখান থেকে সিধা উত্তরে ২০০ মাইল। ঘন্টা তিনেক লাগবে। নেব্রাস্কা আর সাউথ ডাকোটার সীমান্ত বরাবর নিওব্রারা এবং মিসৌরি নদীর সঙ্গমস্থলের একটি জঙ্গুলে জায়গা। সুবিধেটা এই যে  আগামীকাল সেখান থেকে কোনাকুনি দক্ষিণ পুব মুখো রওনা হলে সোজা ওমাহাতে গিয়ে পড়া যাবে। পথ অনেক কমে যাবে। সু বিকেল বিকেল ফিরে গিয়ে ঘানিগাছটায় আবার জুড়ে যেতে পারবে। সুতরাং নিওব্রারাই স্থির হলো। আবার কিছু এদিক ওদিক ফোনকলের পর নিওব্রারার দক্ষিণে নেলি (Neligh) তে একখানা মোটেলে রাতের মত ঠাঁই মিলবার আশ্বাসও পাওয়া গেলো। সুতরাং চল পানসি নেলি পানে।

নেলি খুবই ছোট্ট গ্রাম। মাত্র দেড়হাজার মানুষের বাস। উত্তরে নিওব্রারা থেকে পনকা (Ponca) উপজাতিদের যখন তাড়িয়ে ঠেলে দেওয়া হচ্ছিলো নিচে ওকলাহামার দিকে তখন সেই পরিযায়ী পনকা উপজাতির অসংখ্য মানুষ রাস্তায় মারা যান। পথের কষ্ট সব যুগেই সমস্ত মানুষের জন্যই সমান। সেসময় এই নেলির কাছেই মারা যায় পনকা উপজাতির একজন গোষ্ঠীপতির দেড়বছর বয়সী মেয়ে। তার সমাধি এখনো আছে নেলিতে।  এই সাউথ ডাকোটা থেকে নিচে ওকলাহামার মাঝে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে পুরোনো কালে। আমেরিকান আদি ইন্ডিয়ান উপজাতির বিভিন্ন গোষ্ঠী ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই অঞ্চলে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার চাপে ক্রমশই তারা নিচের দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়। আর সাথে এই আইওয়া, নেব্রাস্কা, সাউথ ডাকোটা, ওকলাহামা,আর্কানসা এসব জায়গায় ফেলে যেতে থাকে অজস্র ইতিহাস। এই অঞ্চলের সেসময়ের গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল ওমাহা। আমাদের বর্তমান কর্মস্থল। ওমাহার আশেপাশে এধরণের অসংখ্য ইতিহাস দেখা যায়।  তেমন করে নজর চলে না যদিও। হেরো মানুষের ইতিহাস-প্রদর্শনীতে দয়া থাকে, করুণা থাকে, বিজয়ীর প্রচ্ছন্ন গর্ব থাকে। কিন্তু বিজয়ীর ইতিহাসের প্রদর্শনীর মতো জাঁক তার কোথায়? সুতরাং আমেরিকান-ইন্ডিয়ান গোষ্ঠীপতিদের নামে হ্রদ বা একটি বনাঞ্চলের নাম দেওয়া হয় মাত্র নতুন পৃথিবীতে। বাকি ইতিহাসের খবর জানতে গেলে ইউনিভার্সিটির নেটিভ-আমেরিকান ইতিহাসের ছাত্র হতে হবে। তা ভিন্ন বিশেষ কিছুই বাকি নেই বাইরের জগতে। 

নেলিতেও কিছু নেই। কয়েক ঘর মানুষের বাস ইতিউতি। একটি ছোট বাজারপাড়া। একটিই রাস্তা আর তার পাশেই আমাদের এই রাতের আস্তানা। সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমাদের প্রায় রাত এগারোটা বাজলো। শুনশান চারিদিক। একটি ছোট আলো জ্বলছে মোটেলের নাম দেখার জন্য সে আলো যথেষ্ট। আর কোনো কাজ সে আলোর দ্বারা হবে না। রাস্তার গায়ে লাগানো একটা পুঁচকি পার্কিং-এর জায়গা আর তার গা ঘেঁষে ঘেঁষে L -আকৃতির গোটা সাত-আট ঘর। এই হলো নেলির মোটেলটি। আস্ত একটি ভূতুড়ে গল্পের পটভূমি যেন। ঘুমন্ত নেলি গ্রামটিতে পৌঁছে আমরা রাস্তা থেকেই সাঁৎ করে ঢুকে গেলাম মোটেলের পার্কিং লটে -"এই তো এইটাই এইটাই।" কালো রঙের আরো একটি জগদ্দল ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারে মিশে গিয়ে। তার পাশেই আমাদের পুঁচকে গাড়িটাকে দাঁড়াতে বলে চারমূর্তি নামলাম। এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকেই দেখতে পেলাম না।  আমাদের ঘরের চাবিটা নেবো কোথা থেকে? অনেকসময় এখানে মোটেলের অফিস খোলা না থাকলে অফিসের সামনে পথিকের নাম লেখা বন্ধ খামে করে চাবি রাখা থাকে। অফিসটা খুঁজে বের করতে হবে। সবই অন্ধকার। সমস্ত দরজাই বন্ধ। সামনে জাঁদরেল সাইজের গুঁড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল ঝুপসি মহীরুহ। কি গাছ কে জানে! জায়গাটা রাস্তার আলোর থেকে আড়াল করে আরো বেশি অন্ধকার করে তুলেছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, এমন সময় পায়ের কাছে লোমশ কি যেন একটা র উত্তাপ। তাকিয়ে দেখি মাটির কাছাকাছি সবুজ দুটো জ্বলজ্বলে চোখ। ওরকম পরিবেশে বুকটা যে ধক করে ওঠেনি তা নয়, তবে আমার অনুভূতিগুলো বোধহয় একটুখানি ভোঁতা। এই পরিবেশে ওরকম দুটো চোখ দেখে আমি ভয় পেরিয়ে উঠে দেখলাম, কালোর সাথে মিশে থাকা কুচ্কুচে কালো একটা গোবদা বেড়াল আমাদের মোটেলের তরফ থেকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। আমাদের অফিসঘর খুঁজতে দেখেই বোধহয় বাঁদিকের একটা সরু দরজার সামনে গিয়ে বললো, "ম্যাঁও।" সেই দরজার ঐপারে টিমটিমে একটা আলো জ্বলছে। কাঁচের বাইরে থেকে একটি বড় এন্টিলোপের মাথার স্টাফিং দেখা যাচ্ছে দেওয়ালে। কোথাও কোনো লোকজন দেখা যাচ্ছে না। বেড়াল পায়ের চারপাশে ঘোরে আর বলে "ম্যাঁও।" শেষকালে খাঁটি ভারতীয় পদ্ধতিতে ঠকঠক করতে শুরু করতে, ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক প্রৌঢ় মানুষ। আমাদের সকলের চেয়ে তিনি বেশি শক্তি ধরেন এতটাই গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। পরনে সাদা টি-শার্ট আর বাদামি প্যান্ট। মাথায় মেক্সিকান হ্যাট। এই রাত্তিরেও মুখে সিগার। বাহুতে ট্যাটু। খাঁটি মধ্য-আমেরিকান চেহারা। চারজন টিংটিঙে বঙ্গসন্তানকে দেখে আশ্রয় প্রত্যাশী বলে চিনে নিতে ভুল হলো না তাঁর। নাম ধাম, সনাক্তকরণ ইত্যাদি মিটিয়ে নিতে অফিসে ঢোকা হলো। অফিস বলতে, বাড়ির সামনের বারান্দাটিতে একটি কাউন্টার বানানো আর কাউন্টারের পেছনে একটি চেয়ার। ব্যাস এই অফিস। সাধারণত এইধরণের রাস্তার পাশে মোটেলগুলোতে প্রাতরাশের ব্যবস্থা থাকে। এটিতে সেসবের বালাই নেই। প্রাতরাশের প্রত্যাশী আমরা ছিলামও না যদিও। নেলির মতো জায়গায় হুট্ করে চলে এসে থাকার জন্য একটি ঘর, ঘুমোবার জন্য একটি বিছানা পাচ্ছি এই ঢের। মোটেলের মালিক বেজায় গম্ভীর। ঘুম থেকে উঠে এসেছেন কিনা কে জানে! ঝটপট কাজ সেরে চাবি ফেলে দিলেন কাউন্টারে। আমরাও মানে মানে চাবি নিয়ে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু বিশেষ দর্শনীয় বিষয়টি হলো, এই যে মিনিট পাঁচেক সময় আমরা অফিস ঘরটিতে ছিলাম, তার মধ্যে আমি চারিদিকে চোখ ছড়িয়ে অন্তত গোটা পঞ্চাশেক পশু পাখির স্টাফিং দেখতে পেয়েছি। কি নেই তার মধ্যে! বেশ কয়েকটি এন্টিলোপের মাথা, তার একটা বাইরে থেকে দেখেছি বললামই। এছাড়া, ঈগল, পেঁচা, ববক্যাট , শেয়াল, রাকুন। এমনকি একখানি সাপ পর্যন্ত। অর্থাৎ আমাদের হোস্টিং করছেন একজন শিকারী। 

 চার্ বঙ্গসন্তানের রাত এগারোটার সময় অপরিকল্পিত ভাবে চলে আসা মধ্য-পশ্চিম আমেরিকার এক শুনশান গ্রামে, কুচকুচে কালো বেড়ালের অভ্যর্থনা, নিঝুম মোটেলে গম্ভীর শিকারী মালিক, অফিসঘরে ঠাসা মৃত জানোয়ারের দেহ! আমার ভোঁতা ইন্দ্রিয়ের পক্ষেও যথেষ্ট ছিল সেদিন। জোরদার ভূতুড়ে গল্পের মশলা একেবারে। 

তারপর আর কি? সাথে তো জামাকাপড়-ব্রাশ-পেস্ট কিছুই ছিল না রাত্রিবাসের জন্য। ব্রাশ -পেস্টের ব্যবস্থা করা গিয়েছিলো গতরাতের ওই হরেকরকম্বা দোকান থেকেই। কিন্তু জামাকাপড় বদলাবার বালাই নেই। চাবি দিয়ে কোণার একখানা ঘর খুলে চারজনে দুটো বিছানায় ফ্ল্যাট হয়ে গেলাম। বেড়াল আমাদের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিলো। আমাদের ঘরের পাশেই দেখলাম তার ঘর। মানে একটি বড়সড় কাঠের বাক্স, তার ভেতরে মোটা করে খড়, কম্বলের বিছানা। অর্থাৎ ইনি বাড়ির ভেতরের পোষ্য নন। বাইরেই তাঁর চৌকিদারী। কালো শরীর আর সবুজ জ্বলজ্বলে চোখে প্রথমটা চমকে দিলেও দিব্য ভাবসাব করতে চান দেখলাম। কিন্তু আশ্চর্য পরদিন সকালে বেড়াল এবং তার মালিকের দেখা আর আমরা পাইনি। ঘরে চাবি রেখে ঘর খোলা রেখেই সাত সকালে স্নান সেরে বেরিয়ে পড়েছিলাম। রাতে অবশ্য নাক ডাকিয়ে দিব্য ঘুমিয়েছি। চারজনের মধ্যে তিনজনই নাক ডাকতে ওস্তাদ। ফলে সকালে উঠে দেখলাম সু এর মুখ রাগে গনগনে করছে। বেচারী একটুও ঘুমোতে পারেনি বাকি তিনজনের রাতভর কনসার্টের চোটে। নেলিতে একজায়গায় পেট ঠুসে খেয়ে নিওব্রারা স্টেট পার্কে গিয়ে পৌঁছলাম। নেলি অসাধারণ সুন্দর ভ্যালি। নেলি থেকে নিওব্রারার রাস্তাটি নেব্রাস্কার সুন্দরতম রাস্তাগুলির একটি। দু পাশে উঁচু-নিচু উপত্যকা। ফসলি জমি। মাঝে মাঝে লাল ছাদওয়ালা সাদা দেওয়ালের ফার্মহাউস। আর দৈত্যাকৃতি হাওয়াকল। একেবারে ক্যালেন্ডারের পাতার দেখা ছবিগুলোর মত সুন্দর। কিছুক্ষন চলার পর বাঁদিকে এসে পড়লো নিওব্রারা নদী। চুপ করে দেখার মত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য। নিওব্রারা স্টেট পার্কে পৌঁছে বাহনকে বিশ্রাম দিয়ে চারমূর্তি জঙ্গলে ঢুকলাম। জঙ্গলে হাঁটতে পারলে আর কিছু চাইনা আমি। অনেকটা ভেতর অবধি গিয়ে একজায়গায় বসে গল্পগাছা হলো। বেড়ানো, হাঁটা, দেখা, এ-ওর পেছনে লাগা এসব তো ছুতো। আসল কথা হলো আমরা চিরকালীন যে নেই রাজ্যে বাস করি, তাতে মাঝে মধ্যে শ্বাস ফেলতে না পারলে অবসাদ অবধারিত। নিজের নিজের হতাশাগুলো বেরোবার পথ পায় এই জলে জঙ্গলে একে ওপরের সাথে কথা ভাগ করে নিতে নিতে। কোনো কিছুরই আশু সমাধান নেই, তবুও একে অপরকে বলা যে, "সাথে আছি আমিও"- এই আর কি। ঘাসে পিঠ পেতে শুয়ে ওপরের নীল আকাশ থেকে আশ্বাস ধার করে নেওয়া। 

আর কি? ভ্রমণ শেষ। এবার ফেরার পালা। 

তারপর সেই কোনাকুনি পথে ওমাহামুখো হলাম আবার। মাঝে একজায়গায় জিরিয়ে নিয়ে বিকেল বিকেল ওমাহা পৌঁছে গেলাম। বড়দাদা এখানে আছে প্রায় এক দশক। অলিগলি চেনে সে। সেদিন আমাদের ছাগলের দলকে একখানি নতুন শাকের ক্ষেত দেখিয়েছিলো। তারপর থেকে সে ক্ষেতে বসে খাওয়া বন্ধ বলে আর ওমুখো হওয়া হয়নি। কিন্তু পরে নিশ্চয়ই যাবো। একখানি জাপানি সুশির দোকান। সেখানে খাবার পরিবেশনের ট্রেগুলি সব কাঠের নৌকাকৃতির। আমাদের খিদে পেয়েছিলো প্রচন্ড। সকালে সেই নেলির দোকানে খেয়েছি। তারপর মাঝে একটু চা-কফি পড়েছে পেটে। ভালো করে বসে খাওয়া হয়নি। ওমাহা পৌঁছাবার তাড়া ছিল। আমি আর সু বাথরুম ঘুরে এসে (সেখানে আমাদের দুদিনের ব্যবহৃত দোমড়ানো জামা, জল-জঙ্গলে হেঁটে কাদামাখা জুতো, হাওয়ায় জট পাকানো চুল ইত্যাদির মিলিত প্রয়াসে জবরদস্ত চেহারা দেখে সকলে কিরকম একটা চোখে তাকাচ্ছিলো। আমরা যদিও পাত্তা দিইনি। ডাঁটসে কাজ সেরে বেরিয়ে এসেছি।) দেখি পিনাকী আর বড়দাদা গুছিয়ে অর্ডার করে ফেলছে। "এটা একটা বলি?" "দুটো বলে দাও।" আমাদের খিদের পরিমাপ করে বেচারারা একটার জায়গায় চারতে করে অর্ডার করে ফেললো। তারপর অপেক্ষা করছি যখন, তখন দেখি পাশের টেবিলে আট-দশ জনের একটা পরিবারের জন্য টেবিল জোড়া একটা কাঠের নৌকা করে বিভিন্ন ধরণের সুশি এসেছে। সে দেখে আমরা বাংলায় চুটিয়ে নিন্দে-মান্দা সেরে একঢোক জল খেয়ে যখন সবে ঠান্ডা হয়ে বসেছি, দেখি আমাদের চারজনের জন্য ওই সমপরিমাণ সুশি আসছে ওরকমই একটা কাঠের নৌকায় চেপে। আমাদের চারজনের টেবিল ছোট। ওদের বড় টেবিলে অন্তত নৌকাটাকে রাখতে অসুবিধা হয়নি। আমাদের টেবিলে যখন ঠকাস করে নৌকাটাকে বসিয়ে দিয়ে গেল, তখন দেখলাম আর প্লেট রাখবার জায়গা পর্যন্ত নেই। অগত্যা সরাসরি নৌকার ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়লাম চারজন চারদিক থেকে। পেটপুরে খেয়ে, বাকিটা চার ভাগ করে ছাঁদা বেঁধে নিয়ে এসে পরের দিন পর্যন্ত খেলাম। 

পাশের টেবিলের লোকেরা খেয়ে উঠে যাবার সময় খাবারের পরিমাণ আড়চোখে দেখছিলো দেখেছি। তাতে যদিও আমাদের ঘন্টা!    

 

Friday, 8 May 2020

অন্য শহর


লাস ভেগাসের রাস্তায় ব্রহ্মা মন্দির।

প্রায় দুশো লোকের সাথে সিগন্যাল পেলে একসাথে রাস্তা পার হবার জন্য একটা ব্যস্ত রাস্তার ধারে জেব্রা ক্রসিং এ দাঁড়িয়ে ছিলাম। পায়ে হাঁটার সিগন্যাল হতেই একসাথে পা বাড়ালাম রাস্তায়। এত লোকের সাথে পা ফেলে রাস্তা পার হতে গিয়ে দুটি অনুভূতি মন ছুঁয়েই বেরিয়ে গেল। আমার মত মানুষের জন্য ওমাহার মত শান্ত শহরই ভাল। লোকজনের ভিড় নেই। অনর্থক চঞ্চলতা নেই। তাই এত লোকের সাথে একসাথে পথ পার হবার সুযোগও নেই। এতো গায়ে গা লাগানো ভিড়ে মন তিক্ত হয়ে যেতেই পারত। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিলো আমার মন। আমার ভাল লাগছিলো সবার সাথে রাস্তার ধারে অপেক্ষা করতে। আমার ভাল লাগছিলো এত লোকের মাঝে 'কেউ না' হয়ে, ভিড়ের অংশ মাত্র হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে, পথ পার হতে। এই যে অন্তত দুশো লোক আমার ডাইনে-বাঁয়ে, আগু-পিছুতে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের কাউকে আমি চিনি না। তারাও আমায় চেনে না। অথচ সকলে একটি নির্দিষ্ট সিগন্যালের দিকে চোখ রেখে অপেক্ষা করছেন। একসাথে হেঁটে রাস্তা পার হবেন বলে। রাস্তাটুকু পার হয়েই হয়তো এই দুশো লোকের পুরো 'ভীড়'টা ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক ওদিক ছড়িয়ে যাবে।তবুও এই অচেনা মানুষের ভিড়ের সকলের আপাতত গন্তব্য একই। রাস্তার ওই ওপারে যেখানে আরো একদল লোক অপেক্ষা করছে সিগন্যাল পেলেই এপারে আসবে বলে, সেই সেখানটায় পৌঁছানো। আমাদের জীবনের মতন না অনেকটা? কিছুদিনের জন্য ছোট্ট একটা রাস্তা পার হবার জন্য অপেক্ষা। আশে পাশের লোকজনের সাথে আদান প্রদান, মান- অভিমান তারপর রাস্তা পার হবার পর গন্তব্য বদলে যাওয়া। এই যে এত লোক আমার আশেপাশে তারা সকলেই আমার অচেনা। মাঝে মাঝে অচেনা লোকের সাথে অদৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। নিজের অপরিমেয় "কেউ না" হওয়ার সত্যিটা নতুন করে উপলব্ধি হয়। আমার যা কিছু চাওয়া-পাওয়া- মান-অভিমান, আমার যা কিছু গুরুত্ব, আলাদা ব্যক্তি মানুষ হিসেবে আমার যা কিছু অন্য কারো কাছে এতটুকুও গুরুত্বপূর্ণ সেরকম মানুষের সংখ্যা গুনতে হাতের এক-দুইটি আঙুলের করই যথেষ্ট। আমরা জানি বা না জানি, মানি বা না মানি, পৃথিবী সুদ্ধ বাকি প্রতিটা লোকের কাছে আমি ভিড় মাত্র। জনবহুল রাস্তার আরো একজন মানুষ। এইটি মনে হলে নিজের প্রতি নজর খানিক কমে। এই যে এত লোক আমার গা ঘেঁষে আমার কাছে তো তারা ভিড় মাত্র। কিন্তু প্রতিটা অবয়ব, মন, অনুভব, হাসি কান্নার কারণ সব আলাদা। তাদের কাছে আমিও তো তাইই। এই কদিনে এই অনুভুতিটা বেশ হচ্ছে।
গত কয়েকদিন লাস ভেগাসে এসেছি। লোকজনের কথায় অবশ্য বুঝেছি, এখন 'লাস ভেগাস' -র জায়গায় 'ভেগাস' বলাটাই স্মার্টনেস। তা সে যাই হোক, আলোর আর হুল্লোড়ের শহর। যে বয়সে লোকে লাস ভেগাস যেতে পেলে মনে মনে নাচতে শুরু করে আমি সে বয়স পেরিয়ে এসেছি অনেকদিন আগেই। এখানে এসে অবশ্য প্রতিপদে লোককে বলতে শুনছি -"Ultimately it's Vegas." এবছর Society for Redox Biology and Medicine (SfRBM) বার্ষিক সম্মেলন হচ্ছে এখানে প্ল্যানেট হলিউড রিসোর্টে। প্রতিবছরেই এই সম্মেলনে আমরা আসি। কারণ রেডক্স বায়োলজির এটিই আপাতত সবচাইতে বড় সম্মেলন। এখানেই সমস্ত রেডক্স বায়োলজিস্টরা জড়ো হন। আইডিয়া আদান প্রদান করেন। আমরাও আমাদের কাজের ঠিক ভুল বুঝে নিই। তাই লাস ভেগাস যাবার আলাদা করে উৎসাহ কিছু ছিল না। যেটা ছিল সেটা হলো, এবছর এই দিন চার-পাঁচদিনের পুরো সময়টা আমার নিজের। এইটা আমার কাছে কম বড় পাওনা নয়। সাধারণত এই সম্মেলনে এতদিন আমি আমার গাইডের সাথে এসেছি, থেকেছি। শেষ দিনে হয়ত পিনাকী গেছে। সম্মেলনের পরের এক-দুই দিন সেই নতুন শহরে হেঁটে বেড়িয়েছি। কিন্তু এবছর আমার গাইড আসেননি। পিনাকীও আসবে না। সুতরাং কারো সময়ের সাথে আমার সময় মেলাবার দায় নেই আমার। উপরোন্তু যখন শুনলাম আমার সাথে থাকছে অন্য প্রদেশের, অন্য ইউনিভার্সিটির সম্পূর্ণ অচেনা একমেয়ে, আমার ভালো বৈ মন্দ লাগলো না। সম্পূর্ণ অচেনা মানুষের কাছে বসে তার কথা শুনতে বড় ভাল লাগে। কারণ সে মানুষ আমায় বিচার করবে না। করলেও সে বিচারে আমার কিছু যাবে আসবে না। তাকে ভালো লাগলে, তার কাছে আমার মন আলগা করে দিতে পারলে, সে আমার নিত্যদিনের দৈনন্দিকতায় নতুন মানুষ। আর ভাল না লাগলে তার সাথে সময় কাটাবার দায় আমার নেই। তাকে এড়িয়ে সম্পূর্ণ নিজের মধ্যে ঢুকে গিয়ে সময় কাটাতে আমার কিছুমাত্র অসুবিধা হবে না।
সুতরাং লাস ভেগাসে এসে যখন নামলাম তখন খানিকটা ছুটির দিনে কোনো পূর্বনির্ধারিত কাজ ছাড়া অনেক ভোরে সতেজ হয়ে ঘুম ভাঙার মতন একটা অনুভূতি হলো। হাতে অনেকটা সময় আর অনেকদিন ধরে করতে চাইছেন মনের মত এমন অনেক পড়ে থাকা কাজ আছে। কিন্তু আজই শেষ করতে হবে এমন কোনো তাড়া নেই। আবার শেষ করে ফেলতে পারলে বেশ একটা শান্তি আসে মনে। একা নিজের সময় নিজে নিয়ন্ত্রন করার বেশ একটা সুযোগ পেয়ে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে লাস ভেগাসে এয়ারপোর্ট থেকে ল্যাবের আর দুইজনের সাথে প্ল্যানেট হলিউডের ঠিকানায় পৌঁছালাম। বেশিক্ষণের রাস্তা নয়। উবেরের ড্রাইভার আমাদের দেখে লাস ভেগাসের বড় বড় শো গুলির কথা জানাতে লাগলেন। আমি কোনোদিন আসিনি। আমাদের মধ্যে একজনই আগে বার-তিনেক এসেছে। আসলে এদেশে ছেলেপুলেরা প্রথম চাকরি বা পিএইচডি করতে এসে এখানে একবার করে আসেই। হুল্লোড়, গাঁঞ্জা, খোলা যৌনতার আর জুয়ার পীঠস্থান। তবে পুরোটাই নিপুন ভাবে কন্ট্রোলড। কোথাও কোনো বাজে ঝামেলা বিশেষ হয়না। তবে এই এত লোকজন আর এত শব্দ চারিদিকে সে বিষয়ে আমার একটা ভাল না লাগা ছুঁৎমার্গ ছিল। ছিল বলবো না, বলা ভাল আছেই। এখনো কোনো খোলা আকাশের নিচে নির্জন কোনো জায়গাকে আমি একবাক্যে বেশি ভোট দেব যেকোনো হুল্লোড়ে শহরের থেকে। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে নিজেকে ভিড় বানিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া ছাড়াও লাস ভেগাস আমায় আর কিছু দিয়েছে। সেটি হলো পারিপার্শ্বিকতাকে অস্বীকার করে মুহূর্তে নিজের খোলসে ভেতরে ঢুকে গিয়ে হুল্লোড়ের মধ্যেও শান্ত থাকার একটা প্রাথমিক পরীক্ষাস্থল।
মাঝে মাঝে নিজেকে ভাল না লাগা জায়গায় ফেলে দিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। কতটা পারিপার্শ্বিকতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, ভীষণ রকম একটা হুল্লোড়ে জায়গায় বসে নিজেকে একটা অদৃশ্য বুদ্বুদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজের মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকতে পারি তার একটা পরীক্ষা করতে ইচ্ছে করে। মানে কমফোর্ট জোনের বাইরে বসে মনটা বরফশীতল রাখার একটা চেষ্টা মনে করতে পারেন। প্ল্যানেট হলিউডে চেক ইন করে সন্ধ্যেবেলা যখন বাইরের রাস্তাটায় হাঁটাহাঁটি করব বলে ক্যাসিনোর ভেতর দিয়ে হেঁটে বেরোচ্ছি, তখন মনে হলো এই মানসিক এক্সসারসাইজটা করার জন্য এর চাইতে ভাল জায়গা আর দুটো হয়না। প্ল্যানেট হলিউড সিজার গ্রূপেরই রিসোর্ট। একদম লাস ভেগাসের বিখ্যাত রাস্তা স্ট্রিপ বা লাস ভেগাস বুলেভার্ডের ওপরেই এর অবস্থান। এই রাস্তাতেই ডাইনে বাঁয়ে পর-পর বিখ্যাত এবং সিনেমাখ্যাত ক্যাসিনোসহ হোটেলগুলো। প্ল্যানেট হলিউডের ক্যাসিনো লেভেল সুতরাং অত্যন্ত জনবহুল, সাথে রয়েছে ক্যাসিনো লাগোয়া নামি দামি খাবারের দোকান। ফলে ভিড়, ক্যাসিনোর উচ্চকিত বাজনা আর হুল্লোড়। কি নেই এখানে! ঠিক করলাম এখানেই বসে লেখার চেষ্টা করব। দেখাই যাক না মনস্থির করতে পারি কিনা। একটু চোখ চারাতেই দিব্যি একখানা স্টারবাক্স নজরে এসে গেল। তার সামনে ক্যাসিনোর প্রাইম জায়গাটা, বাঁয়ে ক্যাফে হলিউড নাম দিয়ে এই রিসোর্টের রেস্তোরাঁ আর ডাইনে বিখ্যাত গর্ডন রামসে বার্গার। সুতরাং মনস্থির করার এর চাইতে ভাল জায়গা আর হয়না। মনে মনে স্টারবাক্সটিকে দাগিয়ে নিয়ে বাকি দুজনের সাথে বেরিয়ে এলাম লাস ভেগাস বুলেভার্ডে।
মানুষ লাস ভেগাসে আসেন এই রাস্তায় হাঁটবেন বলে। এই জনজোয়ারে গা ভাসিয়ে সমস্ত ভুলে আলো আর অলীক সুখ স্পর্শ করবেন বলে। রাস্তার উল্টোদিকেই বেলাজিওর ফোয়ারা। গানের সাথে সাথে সে ফোয়ারার নাচ দেখা হলো। লাস ভেগাসের আলো দেখা হলো। বিখ্যাত হোটেলগুলোর আলো, বহিরঙ্গ আর বৈভব দেখা হলো। যা দেখাতে চায় এরা, আর যা দেখতে আসে মানুষ এখানে। বৈভবের প্রদর্শনীর মত লজ্জা বোধহয় আর হয়না। জানি না হয়তো আমিই ভুল। এই যে চারপাশে এত আলো, এত চাকচিক্য জানিনা আমার বুড়োটে মনের জন্যই কিনা, সেদিকে বিস্মিত-আকুল চোখে তো কই তাকাতে পারছিনা? বরং চোখ চলে যাচ্ছে এই জনসমুদ্রের দিকে। আমার কাছে যারা কেবল ভীড় মাত্র। তাদের কাছে আমি যেমন। অজস্র হাসিমুখ, চকচকে চোখ, অর্ধনগ্ন-অদ্ভুত মেকআপ করা মেয়েদের সাথে ছবি তুলছে। ছবি তুলতে দেওয়ার জন্য এই মেয়েরা টাকা পায়। সাথে তাদের বডিগার্ড যাদের কাজ মানুষকে মাঝে মাঝেই ধমকানো। "No free pictures! No free pictures!" নগ্নতার প্রতি মানুষের কৌতূহল আর খিদে এই মেয়েদের খিদে মেটায়।
এটাই "ভেগাস।" এটাও "লাস ভেগাস।"
হোটেল রিও-র বাফে নাকি খুব বিখ্যাত। জনগণ সেখানেই আজকের ডিনারটা করতে চায়। বাইরে বেরোলে আমার কাছে যাহা রিও তাহাই স্টারবাক্সের স্যান্ডউইচের প্যাকেট। ক্ষিদে মেটার মতন পেটে কিছু পড়লেই হলো। গেলাম। রিও থেকে ফেরার সময় ঠিক হলো হেঁটে ফিরবো। ম্যাপ বলছে পঁয়ত্রিশ মিনিট মত লাগবে। এইটা আমার মনের মত কাজ। মেঘ করেছে আকাশে। হালকা শিরশিরে হাওয়ায় হাঁটতে ভালোই লাগছিলো। হাইওয়ের পাশে ফুটপাথ ধরে হাঁটছি। মাঝে হাইওয়ের কাটাকুটির জায়গায় পথচারীদের জন্য ফুট ওভারব্রিজ করে দেওয়া আছে। অন্ধকার সেখানে। শহরের আলো চুঁইয়ে এসে যতটুকুনি আলো হয় কি না হয়। সেখানে বাসা বেঁধেছে এক দম্পতি। মানবেতর নয় মানব দম্পতি। আমাদের দেশে ঠিক যেমন হয়। অজস্র পোঁটলা-পুঁটলি, সাথে একটা হুইল চেয়ার। পাশ দিয়ে নির্দ্বিধায় পেরিয়ে গেলাম। যেমন যাই। যেমন গিয়ে অভ্যস্ত! পেরিয়েই একগাদা ময়লা জড়ো করে রাখা। গন্ধ বেরোচ্ছে পচে যাওয়া জিনিসের। যেমন আমাদের নাক আর চোখ সওয়া! হাইওয়ের দূরে লাস ভেগাসের আলোকোজ্জ্বল স্কাইলাইন। কি আলো! কি আলো !
এই ভেগাস! এও লাস ভেগাস!
হেঁটে এসে লাস ভেগাস বুলেভার্ডের স্কাই ব্রিজ ধরে রাস্তা পার হয়ে হেঁটে আসছিলাম সকলে মিলে, কেউ আইসক্রিম খাবে, কেউ পরদিনের ব্রেকফাস্ট কিনবে। কেউ টুথব্রাশ ভুলেছে। সেসব কিনবে।বাইরে বেরোলে এদিক ওদিক লোক দেখা ছাড়া আমার কখনোই বিশেষ কিছু করার থাকে না। সুতরাং আমি লোক দেখতে দেখতে এগোচ্ছিলাম। স্বল্পবসনা মেয়েরা পোশাকে, মেকআপে আলো আর চোখে বিরক্তি নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বিচিত্র ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে তুলে আর চামড়ার বিজ্ঞাপন করে করে চোখে তাদের বিরক্তি জন্মে গেছে বোধহয়। তার মধ্যেই 'ভেগাস' বেড়াতে আসা কমবয়সী ছেলে মেয়েদের উজ্জ্বল পোশাক, চোখে মুখে যৌবনের উচ্ছ্বাস। এদের কাছে 'Sin City' এখনো তার ঔজ্বল্য হারায়নি। ভাল লাগে দেখতে। এই ভিড়েই ভালবেসে ঠাম্মার কোমর জড়িয়ে ধরে হাঁটছেন দাদু। আমার ঠিক সামনেই। খুনসুটিতে ঠাম্মা টোকা মারছেন বহু বছরের সঙ্গীর গালে। তারপর দুজনেই হাসছেন। 'Sin City' হয়ে উঠছে প্রেমের শহর, বহু বছরের নির্ভরতার শহর। হাঁটছিলাম CVS ফার্মাসির পাশ দিয়ে। কষ্ট করে বৃদ্ধ বেরোলেন সেখান থেকে হাতে ওষুধ ভর্তি প্যাকেট। আস্তে আস্তে ভিড় ঠেলে হেঁটে চলেছেন। সিজার প্যালেস, নামকরা হোটেল। এই দেখতে কত লোক আসে। তার পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি। এদিকে আলো নেই বিশেষ। আটপৌরে দিক এইটা হোটেলের। পাঁচিলের গায়ে সাজানো গাছের বেদিতে একগোছা জ্যাকেট, জুতো, কম্বল একসাথে পুঁটলি বানিয়ে রাখা। বোঝা যায় এখানেই রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা। পুঁটলির মালিক অবশ্য তখন অনুপস্থিত।
এই ভেগাস! এও লাস ভেগাস!
পরদিন দুপুরে এইলিভ এসে পৌঁছালো। আমার এই কদিনের রুমমেট। সে টার্কির ইসমির থেকে একবছরের জন্য এসেছে এদেশে কিছু কোলাবোরেটিভ এনিম্যাল এক্সপেরিমেন্ট করার জন্য। পিএইচডি স্টুডেন্ট। তার উচ্চারণ শুনেই মনে হয়েছিল তার পর তার সাথে পরে কথা বলে বুঝলাম। সুন্দর চেহারা আর সেই মতোই চোখা সুন্দরী মেয়েটি। টার্কিশ মেয়েরা যেমন হয়। এইবারের কনফারেন্স এইলিভ আমার আর একটা পাওনা। বড় ভাল লেগেছে আমার মেয়েটিকে। সোজা সাপ্টা , স্পষ্ট ধারণা, স্পষ্ট দার্শনিকতার সোজা মেরুদণ্ডের মানুষ সে। সর্বদা হাসছে। আর অজস্র কৌতূহল আমাদের ধর্ম, স্পিরিচুয়ালিটি আমাদের দেবদেবী নিয়ে। আমি যতটা জানি বলার চেষ্টা করছিলাম। ওর সাথে পরদিন রাস্তায় হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। মিরাজের ভলক্যানিক ঝর্ণা দেখেছে সে। আমায় দেখাতে চায়। বললে, চলো তোমায় দেখিয়ে নিয়ে আসি। ঝর্ণা দেখা হয়েছে। কিন্তু ভলক্যানিক শো এর সময় তখন নয় তাই সেটি আর দেখাতে পারেনি মেয়ে। তাই নিয়ে তার ভারী আফশোষ। মনে হলো, আমায় সে কতটুকু চেনে? তবুও ভাল কিছু দেখলে বন্ধু বা বোনের মতো সে আমায় দেখাতে চায়। মনটা ভাল হয়ে যায় এমন অপ্রত্যাশিত পেলে কিছু। এইলিভের সাথে বুলেভার্ডে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে হাঁটতে গল্প করছিলাম। বেশিরভাগই সে জানতে চায় আমাদের ধর্ম আর আধ্যাত্মিকতা বিষয়ে। আমি জানতে চাই তার টার্কিশ জীবন যাপন, রীতি রেওয়াজ সম্পর্কে। আর দুজনেই জানতে চাই আমাদের খাবার দাবারের রেসিপি সম্পর্কে। টার্কির সাথে আমাদের মোঘলাই খানার বেশ মিল। সে অবশ্য থাকাই স্বাভাবিক। এই করতে গিয়ে লাস ভেগাস বুলেভার্ডের একটি অন্ধকার কোণায় আমরা আবিষ্কার করলাম ফুল, ধূপ দিয়ে সাজানো একটি চতুর্মুখ মূর্তি। আমি ভেবেছিলাম বজ্রযানী বৌদ্ধ দেব-দেবী কেউ হবেন। এইলিভ নজর করে বলল, এতো ব্রহ্মা। দেখো লেখা আছে। আমি লাস ভেগাস বুলেভার্ডে ধূপ-ধূনো-ফুল মালা সজ্জিত ব্রহ্মামূর্তি অন্তত আশা করিনি। এইলিভ জিজ্ঞাসা করলে, এটা কি তোমাদের ওখানে ব্রহ্মা-উপাসনার সময়? ব্রহ্ম-উপাসনার তো আমি ছাই জানি। বললুম 'না তো'। আদতে, পুষ্কর ছাড়া ব্রহ্মা মূর্তির পুজো হয় কিনা সেটাই আমার জানা নেই। দুজনে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে এগিয়ে চললাম। আসা ইস্তক সে আমায় রাতে শোবার আগে, ক্যাসিনো লাগোয়া স্টারবাক্সে বসে ল্যাপটপে ক্রমান্বয়ে বাংলায় টাইপ করে যেতে দেখেছিল। জিজ্ঞাসা করেই ফেললো আমি কি এত টাইপ করছি। বললুম, কিছু নন সায়েন্টিফিক লেখা লিখতে আমার ভালো লাগে। তাই লিখছি। আর লাস ভেগাস সম্পর্কে লিখলে তাতে তুমি একটা বড় অংশ হয়ে থাকবে। ততক্ষনে এইলিভ আমার ভাললাগা মানুষের তালিকায় এসে গেছে। তাই আমার যে তাকে ভাল লেগেছে একথা জানাতে আমার কোনো দ্বিধা নেই। আনন্দ-ভালো লাগা কখনো চেপে রাখতে নেই। বিশেষত সেই কারণ যদি কোনো মানুষ হয়। তার কাছে সেইটুকু ভালবাসা পাবার জন্য কৃতজ্ঞতা তো নিশ্চয়ই জানাতে হয়। এইলিভ বললে, "Oh thank you! say 'Hi' to your readers from me."
দুই সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ পৃথিবীর সম্পূর্ণ আলাদা দুটি দেশ থেকে এসে একে অপরের দেশ সম্পর্কে জানতে জানতে 'Sin City' তে বন্ধুত্বের বন্ধনে জড়িয়ে পড়ছিলো।
গতকাল রাতে কনফারেন্স শেষ হয়েছে। আজ ভোর চারটেয় এইলিভ চলে গেছে। ওর ফ্লাইট ছিল সকাল ছটায়। ভোরবেলা ওকে নিচে বিদায় জানিয়ে এসে আমি একা ঘরে বসে টাইপ করছি। এবার বেরোতে হবে আমায়ও। লাস ভেগাস থেকে আমার শান্ত শহর ওমাহার দিকে।


Friday, 31 January 2020

একটি পথ এবং একটি অনুভব-২

প্রথম পর্বের পর

রোদ বাড়ার সাথে সাথে গরম বাড়তে লাগলো। আমরা নিয়মিত হাঁটিয়ে নই। আমাদের গরম জামাকাপড় আস্তে আস্তে বোঝা হয়ে যেতে লাগলো। পরতের পর পরত খুলতে খুলতে এগোচ্ছিলাম। অনেক জায়গায় গোড়ালির ওপর পর্যন্ত তুষারে ডুবে যাচ্ছে। পথের বর্ণনা বিশেষ দেব না। ছবি থেকে কিছুটা আন্দাজ পাবেন। যেটা বলব বলে বসেছি, সেটা পথের বর্ণনা নয়। অন্য কিছু। যেকথাটা আগের পর্বের প্রথমে বলার চেষ্টা করছিলাম, সেটি হলো, কিছুদিন ধরে কোনো বিষয়ে খানিক উৎসাহ জাগলে সে সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে এমনিই খানিক উৎসাহ জাগে। উৎসাহের চোটে কিছু প্রস্তুতি নিশ্চয়ই হয় কিন্তু তা যথেষ্ট কিনা সেটা আসল রঙ্গমঞ্চ ছাড়া বোঝার উপায় নেই। 

আমরা পিচ্ছিল বরফঢাকা পথে লাঠি আর জুতোর ট্রাকশনের দৌলতে মোটামুটি সহজেই এগোচ্ছিলাম। তবে যাঁরা ট্রাকশন ছাড়া এগোচ্ছিলেন তাঁদের বেশ কিছু ক্ষেত্রেই অসুবিধা হচ্ছিলো বুঝতে পারছিলাম। আবার নাতিকে পিঠের ব্যাগে বসিয়ে দাদু দৃপ্ত পায়ে আমাদের ছাড়িয়ে উঠে যাচ্ছিলেন এও দেখছিলাম। আর ভাবছিলাম, আমাদের মা বাবারা কেবলই নিজেদের অপারগ ভাবেন। এতটা না পারলেও অনেক কিছুই তাঁরা পারবেন। দোষটা আমাদেরই, আমরাই তাঁদের আলোটা দেখাতে পারিনা। 

পায়ে পায়ে অনেকটা উঁচুতে উঠে এসেছিলাম। বেশ চড়াই। নিচে ভার্জিন রিভারকে প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। দুই পাহাড়ের মধ্যে সাদা তুষারময় একটা অবতল ভূমিতে কোথায় কে জানে মুখ লুকিয়ে বয়ে চলেছে। এতক্ষন রাস্তায় কোথাও ছায়া ছিল না। গরমকালে যাঁরা আসেন, তাঁদের জন্য এই জায়গাটা উটার রোদ্দুরে এতখানি চড়াই ভেঙে উঠে আসার পর মরুভূমি পেরিয়ে আসার মতোই ব্যাপার। রোদের রাজ্য পেরিয়ে পাহাড়ি রাস্তা বাঁক নিলো। একটা লোহার ছোট্ট ব্রিজ পেরিয়ে সামনে পাহাড়টার পিছনে এসে পড়লাম। এ জায়গাটাকে এই রাস্তার মরুদ্যান বলে বলে শুনেছি। কারণটা আগেই বললাম। এখন থেকে বেশ খানিকটা রাস্তা সমতল। সরু রাস্তা কিন্তু চড়াই নেই। এবার আমাদের এই ডানদিকের পাহাড়টার গা বেয়ে পিছনে পৌঁছে, উত্তরদিক দিয়ে পর পর জিগজ্যাগ চড়াই রাস্তা পেরিয়ে পাহাড়টার মাথায় পৌঁছাতে হবে। সমতল রাস্তাটা সহজেই পেরিয়ে গেলাম। এবার চড়াইটা ভাঙতে বেশ কষ্ট হল। মাঝে মাঝে এক-দু মিনিট দাঁড়িয়ে পড়ছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উঠে পড়লাম ওপরে। উঠেই চোখ ঝলসে গেল। এতক্ষন পাহাড়ের গায়ে এত পুরু বরফ ছিল না।  কিন্তু এখানে পাহাড়ের মাথায় পুরু তুষারের আস্তরণ। কখনো কোনো জায়গায় হাঁটু ছুঁই ছুঁই বরফ। চকচকে সূর্য্যের আলো সাদা তুষারে পড়ে শতগুনে তার ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়ে চারিদিক ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। প্রাণ জুড়িয়ে গেল। একসাথে এতটা চড়াই ভাঙার পর জায়ণের তুষার মোড়া রূপ দেখে কোনো কষ্ট অনুভূত হচ্ছিলো না। 

এই জায়গাটা আসলে তিনটি পাহাড়ের সঙ্গমস্থল। একটি হলো আমরা যে পাহাড়ের পিছন দিক দিয়ে হেঁটে তারপর উত্তরদিকে দিয়ে চড়াই বেয়ে ওপরে উঠেছি। দ্বিতীয়টা হলো সামনে বাঁদিকের চড়াইটা।  এই পাহাড়ের গা দিয়ে ওয়েস্ট রিম ট্রেলটা শুরু। দুদিনের পথ। আর তৃতীয়টি হলো Angel's Landing. যেখানে উঠবো বলেই এ যাত্রা আমাদের জায়ণ অভিযান। সামনের চোখ ধাঁধানো আলোর প্রান্তরটা পেরিয়ে ওই যে সামনে খাড়াই দাঁড়িয়ে আছে Angel's Landing. দুপাশ বেমালুম চাঁছাপোঁছা। বেয়াক্কেলের মত সরু তার প্রস্থ। আর এই সরু গা বরাবর লোহার মোটা চেন লাগানো। সেই ধরে ধরে উঠতে হবে বাকি রাস্তাটা। নইলে সিধে নিচের ভার্জিন রিভারের উপত্যকায় সলিল সমাধি। একসাথে একটিই পা ফেলার জায়গা। সুতরাং এখন থেকে বাহুল্যের কোনো জায়গা নেই। হাঁটতে হাঁটতে গরমের জন্য একটা জ্যাকেট খুলে ফেলেছিলাম। চেনের সামনে পর্যন্ত পৌঁছে সেটাই পেতে পা ছড়িয়ে বসে পড়লাম। এতক্ষন বসার জন্য এতটা জায়গা ছিল না। সরু রাস্তা বেয়ে কেবল উঠে এসেছি। অনেকেই বসে আছেন। আসলে Angel's Landing এ ওঠা শুরু করার আগে একটু শক্তি সঞ্চয় করে নিচ্ছেন বা বলা ভালো নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছেন। আমরাও বসলাম। ব্যাগ থেকে আপেল, কলা, শুকনো ফল বের করে খেলাম। জল খেয়ে, মন ভরে চারিপাশের ছবি তুলে ক্যামেরা, মোবাইল সব বন্ধ করে পিঠের ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলাম। কারণ একদম ওপরে পৌঁছাবার আগে আর ছবি তোলার জন্য দুটো হাত খালি থাকবে না। হাঁটার লাঠি দুটোও ভাঁজ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে দেওয়া গেলো। এদের আপাতত কোনো কাজ নেই। তারপর দুজনে দুজনকে "হবেই হবে" বলে উৎসাহ দিয়ে Angel's Landing এর চড়াই এর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। 

আমাদের বাঁহাতে চেন। আমাদের একমাত্র অবলম্বন এই রাস্তায়। এই চেনের ভরসাতেই শয়ে শয়ে লোক Angel's Landing এ ওঠেন। আমরাও এসেছি। কিন্তু সমস্যাটা অন্য। সমস্যাটা ওই পর্বতারোহীর সংখ্যায়। শয়ে শয়ে মানুষ যদি ওঠেন এবং নামেন ওই সরু পথ বেয়ে, তাহলে আপনি যখন উঠবেন তখন একসাথে অন্তত পক্ষে দশ জন উঠবেন এবং দশজন নামবেন। যে পথে আগেই বলছি একটার বেশি দুটি পা একসাথে ফেলার জায়গা নেই, সেখানে ওই দশ-দশ কুড়ি জনের ওই জটলাটা ঠিক কি দাঁড়াবে আশা করি আন্দাজ করতে পারছেন। উপরন্তু এই কুড়ি জনের প্রত্যেকের অন্তত একটি হাত থাকবে চেনে ধরা। নইলে গন্ডোগোল। এখন এসব ক্ষেত্রে মানুষজনকে ধৈর্য্যশীল এবং সভ্য হতেই হয়। এতো আর হাওড়া স্টেশন নয়, যে কারণ না থাকলেও, স্রেফ অভ্যাস বলে হন হন করে হাঁটতে গিয়ে অন্যের পা মাড়িয়ে, চশমাতে ধাক্কা মেরে বেরিয়ে যাবেন। একজন অন্যেকে উঠতে বা নামতে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করতেই হয়। নইলে ওই সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পের বাসের সামনে ভেড়ার পালের মত অবস্থা হবে। আরো একটা সমস্যা আছে এই মুহূর্তে। সেটি হলো বরফ। বরফে এই ট্রেক করা আমাদের সাধ্যের মধ্যে নয়। কিন্তু গতকালের সারাদিনভর তুষারপাত আমাদের সামনে সেই চ্যালেঞ্জটা খাড়া করেছে। কোথায় পা ফেলবো? পুরোটাই তো সাদা ঝুরো বরফ। এই ট্রেলের যে ছবি বা ভিডিও দেখেছি আগে, তাতে লাল পাথরের গায়ে মানুষ জনের পায়ে পায়ে রীতিমত ধাপ তৈরী হয়ে গেছে দেখেছিলাম। সেসবে পা দিয়ে উঠে যাওয়া সোজা। কিন্তু সেসব তো এখন হাঁটু পর্যন্ত বরফের তলায়। আন্দাজে পা ফেলতে হবে। আর ভুল জায়গায় পা পড়লে....। অর্থাৎ, একটা পা ফেলে সেই পা টি যতক্ষণ না শক্ত পাথরে পৌঁছোচ্ছে ততক্ষন পরের পা গেঁথে রাখতে হবে। আর হাতের ওই জীওনকাঠি চেনটিকে ছাড়লে চলবে না। মনে হচ্ছিলো হবে না। কিন্তু এতটা এসে চেষ্টা না করেই ফিরে যাবো? 

বাঁহাতে চেনটাকে শক্ত করে ধরে পা বাড়ালাম। পিছনে পিনাকী। সামনে জনাতিনেক মেয়ে। একসাথে কোনো এক ইউনিভার্সিটি থেকে এসেছে। ছোট ছোট জিগজ্যাগ বাঁক। আর চেন একবার বাঁদিকে তো পরের বাঁকেই ডানদিকে। প্রথম বাঁক পেরোলাম। দ্বিতীয় বাঁকে এসেই আটকালাম। সামনের বাঁকের চেনটা ডানদিকে। আর সেটা একটু দূরে। এই বাঁকের বাঁহাতের চেনটা ধরা অবস্থায় ডানহাত বাড়িয়ে পরের চেনটা ধরা যাচ্ছে না। কারণটা আমার উচ্চতা। আমার হাত অতটা লম্বা নয়। শেষে কিছুটা লাফিয়েই ধরে ফেললাম চেনটা। ধরার পরে বেশ কনফিডেন্স বাড়লো। তরতর করে পরের বাঁকটা পর্যন্ত উঠে গেলাম। এবারে সামনের চেনটা ধরে কিছুটা সমতল, চড়াই নেই। মনে হচ্ছে আস্তে আস্তে সময় নিয়ে ধীরে ধীরে এগোলে এভাবে বেশ অনেকটাই যেতে পারব। পিছনেই পিনাকীর উঠে আসার কথা আমার মত করেই। কিন্তু পিছনে তাকিয়ে দেখি পিনাকী নেই। সে অনেকটা নিচে দ্বিতীয় বাঁক থেকে তৃতীয় বাঁকের জায়গাটায় আটকে আছে। এটা আমি ভাবিনি। জীববিজ্ঞানের নিয়মেই আমার চাইতে পিনাকীর শারীরিক শক্তি বেশি। আমার চাইতে উচ্চতা প্রায় একফুট বেশি। তাহলে ও বাঁ হাতের চেন ছেড়ে ডানহাতের চেনটা ধরতে পারলো না কেন? চেষ্টা করছে। পারছে না। ওর পেছনে আরো পাঁচ-সাতজন দাঁড়িয়ে আছে চেন ধরে। ও না উঠলে তারাও উঠতে পারবে না। আমি কিছুটা নেমে এলাম। কিন্তু হাত ধরে টেনে তুলে আনা যাবে না এই ঢালু বরফে। ওকে বলছি একটু লাফিয়ে আমার মত করে চেনটা ধরতে। ও লাফাতে ভয় পাচ্ছে। কারণ ওর পিঠের ব্যাগ। আমার পিঠে একটা পাতলা ব্যাগ তাতে একটি ছোট্ট জলের বোতল, কিছু খাবার আর মোবাইল। কিন্তু পিনাকীর পিঠে ক্যামেরা এবং তার সরঞ্জাম বাবদ একটি মোটামুটি বড় ব্যাগ। তার ওজনের জন্য পিনাকী লাফিয়ে চেনটা ধরতে পারছে না। কিছুটা ভয়ও পাচ্ছে। পাওয়াটা স্বাভাবিক। বরফে কোথায় যে পা ফেলছি জানি না। ও বেচারা কনফিডেন্সটাই পাচ্ছে না। আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম যে নেমে যাব। এপথে আর সব কিছু না হলেও চলে কিন্তু নিজের প্রতি বিশ্বাস না থাকলে সে মানুষটাকে জোর করে ওপরে নিয়ে যাওয়া চরম বোকামি। অতবড় ব্যাগ নিয়ে এপথে আসা আর একটা মারাত্মক বোকামি। আর ওই ব্যাগ নিচে রেখে যাওয়া যাবে না। সুতরাং........। 

আমি অনেকটা উঁচু থেকে ওকে দেখছি। কি অদ্ভুত অসহায় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে না এই মানুষটা প্রচন্ড ধৈর্য্য ধরে যেকোনো টেকনিক্যাল ট্রাবলশুট করতে পারে। মনে হচ্ছে না এই মানুষটা অসাধারণ সব ভিডিও এডিটিং করেও তাতে সামান্য খুঁত ঠিক করতে পারছে না বলে নির্মমভাবে তাকে ডিলিট করে দিতে পারে। মনে হচ্ছে না এই মানুষটাই সামান্য একটা বুকলেট, যা কেউ দুবার হাতে নিয়ে দেখবে না, তাকে নিখুঁত করে বানাতে সারাদিন ল্যাবে কাজ করার পর সারারাত জাগতে পারে। কেবল তার সৃষ্টিকে নিখুঁত করবে বলে। আমার চাইতে অনেক কিছুই এই মানুষটা অনেক ভালো করতে পারে, কিন্তু এই ডানহাতের চেনটা সে ধরার সাহস আর জোর পাচ্ছে না। কি অসহায় চোখ! আমায় বললো, "তুই উঠে যা। আমি নিচে অপেক্ষা করছি।" ওর চোখ সোজা আমার দিকে। আর সে ভাষা আমি জানি। ও ভাবছে-ওর জন্য আমি উঠতে পারছি না। আমি ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবারের মত Angel's landing থাক। পরে কখনও হবে। এতটা পথ একসাথে এসে বাকিটা একা যাওয়া যায়না। যেতে নেই। আমায় নামতে হবে। আমাদের নামতে হবে।

নামব বললেই তো নামা সহজ নয়! এত জনের পায়ে পায়ে পথ পিচ্ছিল হয়েছে। ওঠার সময় অসুবিধা হয় না। কিন্তু নামার সময় প্রায় পিছলেই নামতে হচ্ছে। বসে পড়লাম। বরফে পিছলে হুড়মুড় করে পিনাকীর কাছ পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম। ওখানে ততক্ষনে জটলা তৈরী হয় গেছে একটা। এর হাতের তলা দিয়ে ওর মাথার পাশ দিয়ে চেন আঁকড়ে ধরে, কিছুটা হেঁটে, কিছুটা পিছলে অবশেষে নেমে এলাম দুজনে।

পিনাকী একদম চুপ করে গেছে। ওর মন খারাপ আমার চেয়েও বেশি। কারণ ও ভাবছে-ওর জন্য আমি যেতে পারলাম না। সত্যিই হয়ত আরও কিছুটা উঠতে আমি পারতাম। অনেকেই কিছুটা উঠে তারপর নেমে আসছে। হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র একদম ওপর পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে। আমি ভাবিনি যে ওপর অবধি পৌঁছাবো। কিন্তু আরো কিছুটা যেতে পারব এই বিশ্বাস ছিল। তিন চার মাস ধরে ফুসফুসের জোর বাড়িয়েছি এটার জন্যই। হিমালয়ের আরও কত কত কঠিন পথে যাচ্ছেন আমাদের দেশের কত মানুষ। আর আমি এই ছোট্ট একটা পাহাড়ের মাথায় উঠতে পারলাম না! সুতরাং মনটা যে দমে আছে সেকথা সত্যি।

কিন্তু যেকথা পিনাকী জানে না সেটি হলো, এই আপাত পরাজয় আমায় মারাত্মক দুটি কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। এক, আমি এই Angel's landing এর চড়াইটাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিইনি। তাই সেও আমায় তার বুকে জায়গা দেয়নি। আমাদের নেওয়া প্রস্তুতি এর জন্য যথার্থ ছিল না। নইলে এতবড় ব্যাগ নিয়ে আসার মত ভুল আমরা করতাম না। প্রথমেই যে বলছিলাম না, "প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি" -র কথা এই "প্রয়োজনীয়" কথাটির যথার্থ মান বিচার করাটাতেই আমাদের গোড়ায় গলদ ছিল। আমাদের আবার আসতে গেলে 'সত্যিকারের' প্রস্তুতি নিয়ে তবেই আসতে হবে।
আর দুই, সামনে এগিয়ে যাবার সুযোগ এবং অনুমতি থাকলেই সবসময় সামনে এগিয়ে যেতে নেই। টিমের বাকি সদস্যও যতক্ষন না সেই অবস্থায় এসে পৌঁছাচ্ছে ততক্ষন অপেক্ষা করার, ফিরে আসার ধৈর্য্য অন্তত আমার আছে। এটা কি পরাজয় হলো তবে? হিমালয়ের দেশের মেয়েকে Angel's landing পরাজিত করবে এমন সাধ্যি কি তার আছে? তার সর্বোচ্চ উচ্চতায় উঠে সেখান থেকে চারিদিক দেখতে পারিনি ঠিকই তবে পরবর্তী ক্ষেত্রে যেকোনো কাজে 'যথার্থ প্রস্তুতি' আর প্রয়োজন পড়লে পিছিয়ে আসার অমূল্য এক অনুভব সে দিয়েছে আমায়।

নিচে নেমে ওয়েস্ট রিম ট্রেলের শুরুর জায়গাটায় উঠে Angel's landing এর দিকে তাকিয়েছিলাম। রোদে তাকানো যাচ্ছে না ভালো করে। সরু পথটা দেখা যাচ্ছে না ভালো করে।  কালো কালো কিছু জীব নড়াচড়া করছে সাদা তুষারের মাঝে। ওরা মানুষ, আমাদের মত। কেউ উঠবে, কেউ পারবে না আমাদের মত। কিন্তু সকলকেই Angel's landing কিছু না কিছু বলবে। সেকথা শুনতে পাওয়াটাই বোধহয় জয়। মনে গেঁথে নেওয়াটাই ভিক্ট্রি। এই একান্ত কানাকানিটুকু শুনতে পাবার লোভেই বার বার পাহাড়-নদী-জঙ্গল ভেঙে হাঁটা। ঝরাপাতায়, কনকনে তুষারে, মাতাল সমুদ্রের হাওয়ায় বুক পেতে থেবড়ে বসে থাকা। একজন্মেই নিযুত জন্মের খিদে মিটিয়ে নেবার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা।


(শেষ)