Monday, 19 August 2019

মূল-February 18, 2018

একটা পিচঢালা রাস্তা, মাঝে মাঝে অবশ্য ওপরের চামড়া উঠে গিয়ে হাড়গোড় বেরিয়ে এসেছে, চকচকে ছবির মতন রাস্তা সে নয় যদিও, তবুও কাকভোরে কুয়াশা মাখা সে রাস্তায় হেঁটে বড়ো আরাম পেয়েছি। হোকনা সে খানিক ভাঙাচোরা, তবুও তার দুইপাশের জমাট বাঁধা কুয়াশা, আদিগন্ত আধসবুজ-আধহলুদ ধানের ভারে নুয়েপড়া ধানক্ষেত, সে আমার নিজের, বড়ো প্রিয়, বড়ো আরামের।  আজও একবুক কষ্ট নিয়ে তার কাছে গেলে সে বুক পেতে দেবে আমার চোখের জল ধারণ এর জন্য। আমি জানি, আজও সে ফিসফিসিয়ে বাম কানে বলে উঠবে , "কেঁদে নে মেয়ে, যতটা পারিস। সব পরাজয় এইখানে ফেলে উঠে দাঁড়া। কি বললি ? ফের পরাজয় এলে? আবার আসিস আমার কাছে। এ কান্নার জল শুকিয়ে যাবে ততদিনে আমার বুক থেকে। ফের ভিজিয়ে দিস নাহয় আমায়, তারপর উঠে দাঁড়াস। আরও একবার এর জন্য। আমি আছি তোদের সকলের জন্য।  চিরন্তন।"

আম মুকুলের গন্ধ নিয়েছো কোনোদিন, অমন কুয়াশা ভরা কাকভোরে? আমি নিয়েছি। মহূয়ার গন্ধে জগৎ মাতাল হয় শুনেছি। সে কি আমমুকুলের গন্ধের চেয়েও বেশি নেশার? কিশোরবেলার নেশাধরা দোলাচলে আরো নেশাড়ু হয়ে উঠতে সেই আমমুকুলের গন্ধের কোনো ভূমিকা কি নেই সত্যিই?

নতুন কাটা ধান, কুয়াশার আবছায়া, নেশাধরানো আমমুকুলের গন্ধ, আসন্ন দোলউৎসবের আবীর আর সদ্য কৈশোরের তাজা একটা মন, এই তো বসন্ত। আমার দেখা বসন্ত।

সূর্যাস্তের লালিমা দেখতে শেখায়নি কেউই।  শীতের শেষে, বাতাসে যখন হিম ফুরিয়ে যায়নি সেই বছরের মতন,তখন শিরশিরে হাওয়ায়, সদ্যকাটা ধানক্ষেতে বসে সন্ধ্যা নেমে আসা দেখেছি সেই কোন ছোট্টবেলায়। অজান্তেই কখন শিখে গেছি, অস্তগামী সূর্যদেব বিদায় নেন কেবল পরদিন আবার আমায় জাগাবেন বলে।  অশরীরী কেউ যেন বুকের মধ্যে বসে শিখিয়ে দিয়ে গেছে, "সে বিদায়বেলায় শান্ত থেকো। কোলাহল সন্ধ্যাসূর্যের জন্য নয়। অনুভব করো তার শেষ কিরণটুকু। শুষে নাও অন্তরে। আসন্ন রাত্রির পাথেয় কর তাকে।" মাঠের শেষে পড়শী গ্রামের গাছপালার আড়ালে চলে যেতেন সূর্যদেব। অপলক আমায় তাঁর কমলা-লাল আভায় আপাদমস্তক অবিচল করে দিয়ে। ফ্রকপরা সেই ছোট্ট আমি সেই তবে থেকেই সূর্যদেব এর বিদায়কালে আর বিদায়সম্ভাষণ টুকুও জানিয়ে উঠতে পারিনি কোনোদিন। সূর্যাস্তের রক্তিমাভা চোখে লাগলেই কেমন করে যেন ঝিমধরা চোখে কেবল তাকিয়ে থেকেছি, থাকি। শান্ত হয়ে আসে ভিতর-বাহির। আশেপাশের সমস্ত কিছু মুছে গিয়ে ভেসে উঠতে থাকে আমার আশৈশব এর সদ্যকাটা ধানক্ষেত, আর আমার কিশোরী চোখে দেখা অস্তগামী সূর্যদেব। যিনি বিদায় নিচ্ছেন কেবল ফিরে এসে আমায় জাগবেন বলে।

কুয়াশা মাখা-পাকা ধানক্ষেতের পাড় আঁকা-ভাঙা রাস্তা, বসন্তের আমমুকুলের গন্ধের নেশা, সন্ধ্যে নামার আগে, দিগন্তছোঁয়া ফাঁকা ধানক্ষেতে বসে সেদিনের মতো লাল-কমলায় সম্মোহিত হয়ে যাওয়া। এই আমার শৈশব-কৈশোর। এ কোনো কাব্য করে বলা কথা নয়, মধ্যাহ্ন সূর্যের মতো সত্যি। সত্যিকারের আমি। এখনকার আমির মূল। যে আজও আমার চোখের জলে বুক পেতে দেয়। মেরুদন্ড সোজা করার শক্তি জোগায়। যার কারণেই আজও সব পরাজয় সরিয়ে রেখে নিজেকে দেখি সম্মোহিতের মতো স্থির কি অপূর্ব এক সৃষ্টির সামনে।

http://ichhekhata.blogspot.com/2017/02/mul.html?m=0

Written on December 28th, 2017

“The wound is the place where the Light enters you.”-Rumi

পিঠ সোজা করে বোসো একবার, বন্ধ করো চোখ, প্রবেশ করো নিজের ভিতরে, বুকের খাঁচা ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে থুতনি উঁচু করে তাকাও দেখি আকাশের দিকে, এবার একবার ফুসফুস খালি করে ত্যাগ করো দেখি সমস্ত আবর্জনা।

করেছো?

এবার সত্যি করে বোলো দেখি, মাথার ভিতরটা একটুও খালি হল কিনা? দুকাঁধে পেশিগুলো একটুও শিথিল হয়নি কি? দুই ভ্রূ এর মাঝের চামড়াতে একটা ভাঁজও কি কমেনি?

কি বলছো?

জানিনা ঠিক কি পরিবর্তন হলো, কিন্তু ঠিক এর পরের শ্বাসটা মনে হলো যেন একটু বড় করে নিতে পারলাম।

তবে তো উৎসব শুরু।

তুমি যুদ্ধে জিততে শুরু করেছো যে। একটি একটি করে শ্বাস তোমার হয়ে কথা বলবে এভাবেই। তারপর শ্বাসের সাথে সাথে একটু একটু করে দেখবে গোটা ফুসফুসটা তোমার কথা শুনে চলছে। তারপর একদিন দেখবে পুরো শরীরটা, যেখানে তুমি রয়েছো এতগুলি বছর ধরে, সে তোমার কথা শুনতে শুনতে ক্রমশঃ তুমি হয়ে উঠেছে। আর অনুভূতিগুলো যেগুলো এতবছর ধরে পুতুল নাচন নাচিয়ে চলছিল তোমায়, একদিন তাদের কান ধরে শাসন করে, লাটাইয়ের সুতোর ডগায় বেঁধে হুস করে দিয়েছো আকাশে ভাসিয়ে।

সত্যি বলছি। একটা শ্বাস যদি বুকভরে নিতে পারো, এ সবই পারবে তুমি। একবার বিশ্বাস করে বুক চিতিয়ে চোখটা বন্ধ করে দেখোই না।

দুঃখ, দুঃসময়, প্রবঞ্চনা, একাকিত্ব, অপ্রেম, অনিশ্চয়তা এতো কিছু পেরিয়ে চলেছো তুমি, এখনো তো দিব্য বেঁচে আছো, নিজেও কি ভেবেছিলে পার হতে পারবে নড়বড়ে সাঁকোটা?

কিন্তু পেরিয়ে তো এলে? বা পার হবার বার জন্য সাহস করে প্রথম পা টা তো ফেলেছো দেখতে পাচ্ছি। তবে অর্ধেক যুদ্ধ তো জিতেই গেলে প্রায়। কি বললে, যন্ত্রনায় ছিঁড়ে পড়ছে মন? শরীর আর চলছে না? ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে জীবন? জানি তো।  হচ্ছে তো।  তোমার-আমার-ওর-সক্কলের। যন্ত্রণার প্রকার কেবল তোমার-আমার-ওর-সক্কলের মৌলিক। জীবন মৌলিক তাই যন্ত্রণাও মৌলিক।মৌলিক যোদ্ধার জীবন যাপন।  জীবন। যুদ্ধটা কেবল অমৌলিক। সত্যিটা হলো, প্রতিনয়ত, প্রতি সেকেন্ডে যুদ্ধটা জিতে চলেছি তুমি-আমি-ও-সক্কলেই। প্রতিদিনের ওঠা নামায়। নইলে আজও জানলা দিয়ে সূর্য্যাস্তের লাল আলো চোখে পড়লে একবার চোখ বন্ধ করে সে আলোটা চোখে মেখে নাও কেন তুমি? আজো খানসাহেবের আঙ্গুল সরোদ  ছুঁলে ঈশ্বর এসে স্পর্শ করেন কেন তোমার হৃদয়? আজও কেন নেই রাজ্যের বাসিন্দা কারো যুদ্ধজয়ের গল্প শোনার শেষে তোমার চোখ ভিজে আসে? আজও কেন আরো একবার চেষ্টা করতে ইচ্ছে করে? জিতেছ বলেই তো? ওই যে কবে প্রথম শ্বাসটা নিয়েছিলে চেষ্টা করে দেখবে বলে, সেইদিনেই জিততে শুরু করেছিলে নিজেও বোঝোনি। বুঝিনি- বোঝেনা। তুমি-আমি-ও-সক্কলে।

নতুন বছরে নতুন যুদ্ধের রসদ পেয়েছো তো আগের আগের সমস্ত বছরের যুদ্ধ গুলো থেকে? ব্যুহসজ্জাও সম্পন্ন হয়েছে নিখুঁতভাবে? হয়েছে। তোমার-আমার-ওর সক্কলের অজান্তেই।  এস তবে আরেকবার ব্রহ্মক্ষণে দরজা খুলে দাঁড়াই ভৈরবী আলোয়। নতুন যুদ্ধের আবাহনের অপেক্ষায়। জিতবো বলে। বুক পেতে ক্ষতটা গ্রহণ করবো বলে। সেই ক্ষতপথে ভৈরবী আলোর সবটুকু বুকের ভেতর গ্রহণ করবো বলে। বেঁচে উঠবো বলে। আরও একবার। তুমি- আমি-ও-সক্কলে। একসাথে। ভিন্ন ভিন্ন পথে।

ভাগ্যিস ক্ষতরা থাকে সক্কলের জীবনে, নইলে আলোরা যে বাইরেই মাথা কুটে মরতো (“The wound is the place where the Light enters you.”-Rumi)।

শুভ নববর্ষ

অর্পিতা

Sunday, 18 August 2019

রবিবারের সকালের মত

গত রবিবার বেশ মেঘ ছিল আকাশে। বৃষ্টিও ঝরছিল অঝোরে। আজ আবার এক রবিবার আমি জানলার দিকে পিঠ ফিরিয়ে দেওয়ালে থেকে দিয়ে বসে ল্যাপটপ খুলে টাইপ করছি অনেকদিন বাদে। ইয়ারফোন দিয়ে মাথায় গলে গলে পড়ছে রাগ দূর্গা। বাইরে ঝকঝকে রোদ্দুর। লিখতে ইচ্ছে করছে কিছু। কিন্তু কি লিখব? লেখার গল্প লিখতে ইচ্ছে করে।  কিন্তু সেসব অপ্রাসঙ্গিক আর ব্যক্তিগত। তাতে নতুন কোনো তথ্য নেই, আসলে নতুন কিচ্ছুটি নেই। আদ্যন্ত সাধারণীর রোজনামচা। আসলে কিছু লিখব বলে বাকি সব কিছু সরিয়ে গুছিয়ে বসা অনেকদিন পর। সময়ের দোহাই নয়, প্রশ্নটা ইচ্ছে আর প্রয়োজনের। এতদিন টুকরো টাকরা যা লেখার চেষ্টা করেছি সেসব আদতে লেখা নয়। দুয়েক কলম মনের কথা। ইচ্ছে করে গুছিয়ে সুন্দর কিছু লিখতে। কিন্তু আমি নিয়মানুবর্তী লিখিয়ে নই যে প্রতিদিন খাতা কলম খুলে নিয়ম করে নির্দিষ্ট সময়ে বসলেই কিছু না কিছু লাইন কলম বা কীবোর্ড বেয়ে বেরিয়ে আসবে। আর অমনি সেই বস্তুটি আগ্রহ নিয়ে অন্য আর একজন পড়বেন। আমি আসলে আর পাঁচজন মধ্যতিরিশের একজন সাধারণ মানুষ। যার বাকি অন্যদের মতন ছোটবেলায় ফিরে যাবার উপায় নেই। তাই সে মনখারাপ হলে ছোটবেলায় আশ্রয় খোঁজে। তার প্রতিদিনের এই অনন্ত চেষ্টা থেকে বেরিয়ে আসতে অচেনা মানুষদের জীবন থেকে গল্প খোঁজার চেষ্টা করে। তাদের লড়াই থেকে লড়াই করার রসদ জোটায়। আর পাঁচজনার মতোই। সকলেই কোনো না কোনো ভাবে এসবের মধ্যে দিয়ে যান আর সেসব দিয়ে কেউ মনে মনে মহাকাব্য লেখেন আর বিষ্মিত হন জীবনের অদ্ভুত সব প্লট বাস্তবে চাক্ষুষ করে। কেউ কেউ রং তুলি দিয়ে সেসব অভিজ্ঞতা ঢেলে দেয় ক্যানভাসে। কেউ সে জীবন জোড়া অভিজ্ঞতা ঢেলে দেন চলচ্চিত্র বানিয়ে। কেউ কেউ আবার যখন গান করেন বা নাচ, মনে হয়, সুর বা ছন্দ নয় তাঁর পুরো জীবনের শেখা বা অনুধাবন করা সমস্তটুকু তিনি ঢেলে দিচ্ছেন সেই সৃষ্টিতে। সেটি তখন আর কেবল সুর বা ছন্দ নয়, কোনো শ্রোতা বা দর্শকের প্রশংসাবাক্যের আশা বা দাবি নেই সেখানে। সেসব দেখলেই বোঝা যায়। জুড়ে নেওয়া যায় সেসব অনুভব নিজের অনুভূতির সাথে। আর লেখকরা সেই দিয়ে অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে বিরাট এক ছবি এঁকে চলেন। 

তবে মনে হয় প্রতিটি মানুষেরই জীবনে একটি মুখ্য বাক্যই বলার থাকে। সেটিই তার জীবনের প্রধান মন্ত্র। সেটির চারপাশেই আবর্তিত হয় তাঁর পুরো জীবন। সেই যে একটি সর্বদেশের সার্বজনীন প্রাচীন একটি ধারণা আছে না, যে, আমাদের প্রতিটি জন্মে কিছু না কিছু একটিমাত্র মূল মন্ত্র শেখা এবং জীবনে সেটি প্রয়োগ করার জন্যই আমরা সেই বারের জন্য জন্ম নিই। পুরো জন্মেই সেই বিষয়টির আশেপাশেই তাঁর আবর্তন ঘটে। জীবনের পজেটিভ বা নেগেটিভ অভিজ্ঞতা দিয়ে তাঁর সেই শিক্ষা পূরণ হয়। যাতে তিনি সেটি নিশ্চিত ভাবে জীবনের সাথে মিশিয়ে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন পরবর্তী লেশনের দিকে। কিন্তু সেই জন্মের জন্য বোধহয় তিনি এই একটিমাত্র বাক্যটি কেন্দ্রে রেখেই নানান সৃষ্টির বৃত্ত এঁকে চলেন। বেশ কিছু সময় পরে তাইই বোধহয় সেই স্রষ্টার সমস্ত সৃষ্টির মধ্যেই একটা মূলগত মিল আমরা প্রত্যক্ষ করি। সিনেমার ক্ষেত্রে এই আরো বেশি স্পষ্ট। কারণ তার চলমানতার কারণেই চলচ্চিত্রের তাৎক্ষণিক প্রভাব আমাদের মধ্যে বেশী। তাই একই পরিবেশক বা পরিচালকের দুই বা ততোধিক সৃষ্টির মধ্যেকার মিল এত চট করে চোখে পড়ে। আমাদের সবার জীবনেরই একই উদ্দেশ্য মনে হয়। কেবলমাত্র একটি বাক্য, একটি মন্ত্র শেখা এবং তাকে প্রয়োগ করা। বাক্যটা, মন্ত্রটা কেবল আলাদা আলাদা। তাই প্রত্যেকের জীবনের গল্প আলাদা, প্লট আলাদা। আমাদের কাজ কেবল বোধহয় হতাশা থেকে, সুখ থেকে, দুঃখ থেকে, প্রতীক্ষা থেকে, আনন্দ থেকে, না পাওয়া থেকে, অনেক পাওয়া থেকে, আলো থেকে, অন্ধকার থেকে, সারা জীবনের সমস্ত কিছু থেকে সেই একটি মাত্র বাক্যটিকে খুঁজেপেতে চিনে নেওয়া। তাকে আত্মীকরণ করা। জীবনে প্রয়োগ করা। তবেই আমাদের সাথে হয়ে চলা সমস্ত ঘটনার কার্যকারণ সম্পর্কে আমাদের সমস্ত অভিযোগ একটা উত্তর পাবে। আমাদের অভিযোগ করার আর কিচ্ছুটি বাকি থাকবে না।

লেখার গল্প লিখতে গিয়ে কতগুলি অগোছালো কথা লিখে ফেললাম। এসব হল, নিজের সাথে গল্প করতে বসা। অগোছালো লেখার এই একটি সুবিধা আছে, কোথাও পৌঁছানোর দায় নেই। শেষ করার তাড়া নেই। ধারাবাহিকতার নিয়মানুবর্তিতা নেই। বিষয়ও নেই, পুরোটাই নিজের সাথে প্রলাপ। তাই তর্কের অবকাশও নেই। কেমন এক দায়হীন আত্মকথন। ভেবে দেখেছি, আমার অলস মনের অলস লেখনীর সৃষ্টি তাই এত অগোছালো। রবিবারের সকালের মত। দায়হীন, তাড়াহীন। এই যে দুপুর একটা বেজে গিয়েছে। খাবার দাবারের জোগাড় নেই। ল্যাবের কিছু দায়-যা শনি-রবি বোঝে না। জীবনধারণের সাপ্তাহিক দায়িত্বপালন। সমস্ত কিছুকে সরিয়ে রেখে, কেবল বাংলা ভাষায় টাইপ করার স্বাধীনতা আর সুযোগ এই মুহূর্তে আছে বলে, একটা অদৃশ্য বুদ্বুদের মধ্যে ঢুকে কতগুলি অকিঞ্চিৎকর শব্দ পরপর বসিয়ে যাবার আর সেই সূত্রে নিজের সাথে দুদন্ড সময় কাটাবার মোহে এই এত শব্দের আয়োজন।     

Monday, 15 April 2019

অসমাপ্ত শত্রূতা



যাক আর কোনো ভয় নেই।  ঘাড়ের বাঁ দিকের ছোট্ট টিউমারটার সার্জিকাল রিমুভালের পর ডাক্তার তাইই বলেছিলেন অ্যাটর্নি মার্ক গরম্যানকে। মেলানোমা, বিশ্রী ধরণের স্কিন ক্যান্সার ছিল গরম্যানের। এরপর কেটে গেছে কোনো ঘটনাহীন আটটা বছর। ১৯৯৮ সাল। রুটিন ডাক্তারি চেক আপ এ গেছেন গরম্যান। পরীক্ষার পর ডাক্তারবাবুর ভ্রূ রীতিমত কুঁচকে উঠল। জিজ্ঞাসাই করে বসলেন, কি ব্যাপার মিস্টার গরম্যান, আপনার কি হঠাৎ পানাসক্তি ভীষণ বেড়ে গেল নাকি? পুরোনো মেলানোমা টিউমারটি বিশ্রী ভাবে তার রাজ্য বিস্তার করেছে গরম্যানের লিভারে। আশেপাশের অন্য অঙ্গেও ছড়ানোর চেষ্টা করছে। সাংঘাতিক প্রাণঘাতী এই মেলানোমা। ছড়িয়ে পড়লে, রোগ ধরাপড়ার ছয় থেকে দশ মাসের বেশি সময় দেয় না যুঝবার। গরম্যানের তখন সবে ঊনপঞ্চাশ। কেমন শান্ত হয়ে গেলেন গরম্যান।পৃথিবীর রূপ রস এত সীমিত ছিল তাঁর জন্য? 
বোনের কাছ থেকে খবর পেলেন হঠাৎ, কলোরাডোর কোন এক হাসপাতাল নাকি মেলানোমার চিকিৎসায় চলতি কেমোথেরাপির সাথে নতুন কি এক ওষুধ ব্যবহার করছে নাম ইন্টারলিউকিন-২, ডাকনাম-আইএল-২। ডুবন্ত মানুষের কুটোও ভরষা। পত্রপাঠ গোরম্যান মেরিল্যান্ড থেকে কলোরাডোর টিকিট কাটলেন। গোরম্যান যতক্ষণে কলরাডো পৌঁছবেন ততক্ষনে চট করে আমরা অন্য একটা গল্প একটু শুনে নিই কেমন? গল্পটা আইএল-২ এর। 

আমাদের শরীরের অসংখ্য ধরণের প্রোটিন থাকে। তাদের প্রত্যেকের জন্য নানান রকম নির্দিষ্ট ধরণের কাজ রয়েছে। আর তার ফলেই আমি, আপনি বা গরম্যান সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে চলে ফিরে বেড়াতে পারি। আর তার ভগ্নাংশের ভগ্নাংশ পরিমান এদিক ওদিক হলেই গন্ডগোল। হ্যাঁ এতটাই নিয়ন্ত্রিত আমাদের নিজেদের শরীর। এখন, এই আইএল-২ বস্তুটি কি? আইএল-২ হল এই অজস্র প্রোটিনের মধ্যে একধরণের প্রোটিন, যা কিনা তৈরী হয় টি-লিম্ফোসাইট বলে একধরণের শ্বেত রক্তকণিকা থেকে। এইরকম আরো নানান আইএল প্রোটিন আছে। সারা শরীরে নানা কাজে তারা ভীষণ ব্যস্ত। খুব সহজে বললে, এই আইএল-২ যদি শরীরে বেশি পরিমানে ঢোকানো যায় তবে উল্টে তারা এই টি-লিম্ফোসাইটকেই বেশি করে সক্রিয় করে তোলে। তা এই টি-লিম্ফোসাইট বেশি সক্রিয় হলে কি এমন হাতি-ঘোড়া লাভটা হবে শুনি? হাতি-ঘোড়া কি বলছেন মশাই? একেবারে ঐরাবৎ বা উচ্চৈঃশ্রবা বলা যেতে পারে। টি-লিম্ফোসাইট হল আমাদের শরীরের সেই মহার্ঘ্য কোষ যা আমাদের শরীরের কোয়ালিটি কন্ট্রোলার। শরীরের জন্য ক্ষতিকর যেকোনো রকম কোষকে খুঁজে নিয়ে তাকে বেমালুম গিলে ফেলে সে। অবশ্য চিনে নেবার জন্য আরো অন্যান্য বন্ধু বান্ধবদের সাহায্য লাগে। মানে অন্যান্য ধরণের রক্তকণিকাদের আর কি। সেসব এখন বাদ থাক বরং। গিলে ফেলার পর কি হল বলি। তারপর সেই গিলে ফেলা দুষ্টু কোষকে এক্কেবারে কীচক বধের মতন কুচি কুচি করে নষ্ট করে ফেলে, তাকে আমাদের শরীরের ডাস্টবিনের মধ্যে ফেলে, তবে তাদের ছুটি। হ্যাঁ রে বাবা আমাদের শরীরে প্রতিটি কোষে অসাধারণ একটি রিসাইকেল বিন সিস্টেমও আছে তো। আচ্ছা সে গল্পও নাহয় পরে হবে। আপাতত গরম্যানে ফিরতে হবে। তাহলে কি দাঁড়ালো? আইএল-২ বেশি থাকলে, টি-লিম্ফোসাইট বেশি করে এই আপদ বিদায়ের কাজটি করতে পারবে। সে বাইরে থেকে শরীরে ঢোকা বিচ্ছু জীবাণুই হোক বা গরম্যানের মতন বিগড়ে যাওয়া নিজের শরীরের কোষই হোক। এই আইএল-২ থেরাপি কাজ করেছিল গরম্যানের শরীরে। প্রায় পনের বছর গরম্যান ক্যান্সার ফ্রি জীবন কাটালেন। নিজেকে ভাগ্যবান মনে করা ছাড়া আর কিই বা করার ছিল তাঁর।  গোরম্যানের নিজের ভাষায় বললে, “Some doctors say my immune system is really smart, I just know I'm lucky.” 

এই আইএল-২ দিয়ে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে (ইমিউন সিস্টেম) ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র করার পদ্ধতিটিই  ইমিউনোথেরাপি (immunotherapy) হিসেবে ১৯৯২ তে প্রথম FDA (Food and Drug Administration) র মান্যতা পায়। সকলের শরীরের ইমিউন সিস্টেম সমান ভাবে সক্রিয় নয়, সুতরাং গরম্যানের শরীরে আইএল-২ কাজ করলেও আমার আপনার শরীরেও যে ঠিক একইরকম ভাবে কাজ করবে তার তো কোনো স্থিরতা নেই না। সুতরাং আরো অন্য অন্য ইমিউন ফ্যাক্টর খুঁজে বের করতেই হবে। মেলানোমা ছাড়াও অন্যান্য ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও ইমিউনোথেরাপির হাতিয়ার অন্য কোনো প্রোটিন। সুতরাং এই ক্যান্সার-ইমিউনোথেরাপি তে রিসার্চ, ইনভেস্টমেন্ট হু হু করে বাড়তে শুরু করল।তার পরবর্তী প্রায় একদশক কেটে গেছে আরো নতুন ইমিউন প্রোটিন খুঁজে বের করার জন্য। কিন্তু গরম্যানের মতন সাফল্য কোনোটাতেই আর আসেনি। বহু কোম্পানি, বহু সায়েন্টিফিক গ্রান্ট ব্যয় করেও কেবল হতাশারই ইতিহাস।

ইমিউনোথেরাপির আসল ইতিহাসের শুরু কিন্তু এর অনেক অনেক আগে। ১৮৯১ এর আগেই  ডাক্তাররা নজর করেছেন যে, কোনো ইনফেকশন হলে রহস্যজনক ভাবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারের প্রকোপ কমে যাচ্ছে। ১৮৯১ সালে, নিউয়র্কের সার্জেন ড: উইলিয়াম কোলে (William Coley) সেই অবজার্ভেশনের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে প্রথম রোগীদের টিউমারে ব্যাকটেরিয়া ইনজেকশন শুরু করেন। তাঁর আশা ছিল এই যে, বাইরের ব্যাকটেরিয়ার জন্য শরীরের ইমিউন সিস্টেম সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং সেই সক্রিয় ইমিউন সিস্টেম ব্যাকটেরিয়ার সাথে সাথে একই সঙ্গে টিউমারকেও ধ্বংস করবে। এইটি ছিল প্রথম পদক্ষেপ আজকের এই বিশাল ক্যান্সার ইমিউনোথেরাপির জগতের। যদিও কোলের প্রচেষ্টা ছিল এক্কেবারেই একক। এবং সব চাইতে বড় কথা, ব্যাপারটা এতটা সোজা নয়। ইমিউন সিস্টেম সক্রিয় হল আর গপ করে ক্যান্সার কোষকে গিলে ফেলল, তা হয় নাকি? মনে করুন আপনার বাড়িতে চোর এলো। আর আপনার কুকুর তাকে চিনে ফেলে চেঁচাতে লাগলো এবং আপনি বন্দুক নিয়ে চোরকে আটকে দিলেন, আর চোর ধরা পড়ে গেল। এতই সোজা নাকি? চোর প্রথমেই এসে কুকুর আর ওই বন্দুকটার ব্যবস্থা নেবে তারপর নিজের কাজ শুরু করবে। ইমিউন সিস্টেম যেমন স্মার্ট, ক্যান্সার কোষ গুলি তার এক কাঠি বাড়া। তারা প্রথমেই নিজেদের এমনভাবে আড়াল করবে যাতে আপনার টি-লিম্ফোসাইট তাকে চিনতে না পারে। তারপর টি-লিম্ফোসাইট যাতে কাজ করতে না পারে তার জন্য কিছু প্রোটিন নিজের শরীরে তৈরী করবে ঢাল হিসেবে। মানে ওই কুকুর আর বন্দুকের কাজটাকে অকেজো করে দেওয়া আর কি। তার পর শুরু করবে নিজের বিধ্বংসী কাজ। তা এইসব বজ্জাত গুন্ডা প্রোটিন, যারা টি-লিম্ফোসাইটকে আটকে ক্যানসারকে বাড়তে সাহায্য করে, তাদেরকে কোনোভাবে আটকে দেওয়া যায় কিনা, ধ্বংস করা যায় কিনা তার প্রচেষ্টা চলছিলই অনেকদিন ধরে। এইরকম একটি ঢালস্বরূপ প্রোটিন হলো CTLA -4. অনেক বছরের অনেক ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর শেষে ২০১১ সালে FDA এই CTLA-4 কে নষ্ট করতে পারে এমন একটি ড্রাগকে বাজারে আসার অনুমতি দিল। বাজারে এল প্রথম ইমিউনোথেরাপিউটিক ড্রাগ Yervoy (ipilimumab)। 

অর্থাৎ ব্যাপারটা হল এরকম, শরীরের কোনো কোষ ক্যান্সার কোষে পরিণত হলে টি-লিম্ফোসাইট তাকে নষ্ট করতে ছুটে আসবে, ইতিমধ্যে ক্যান্সার কোষ এই CTLA-4 এবং আরো অন্য সব ঢাল বাগিয়ে বসে আছে টি-লিম্ফোসাইটকে আটকাবে বলে। ফলে টি-লিম্ফোসাইট আর নিজের কাজ করতে পারছে না। এমতাবস্থায় যদি Yervoy (ipilimumab) এর মতো কোনো ড্রাগ রোগীর শরীরে দেওয়া যায় তবে CTLA-4 কে আটকে টি-লিম্ফোসাইট আবার তার নিজের মত করে ক্যান্সার কোষ নষ্ট করতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা Yervoy এর লম্বা কার্যকারিতা। Yervoy নিয়ে তেরো বছর পর্যন্ত মেলানোমার রোগী নিরাপদ নিরাময় পেয়েছেন এই উদাহরণও আছে। সমস্যা হল অন্য জায়গায়।Yervoy কাজ করল মাত্র আট শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে। কারণ সকলের ইমিউন সিস্টেম সমান নয়। এবং CTLA-4 ছাড়াও আরো ঢাল আছে ক্যান্সার কোষের নিজেকে বাঁচাতে। এমনকি পনেরো শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে সাইড এফেক্ট দেখা গেল Yervoy নেবার পর। কারণ, কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সার কোষের সাথে সাথে সাধারণ নয় কোষকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে এই Yervoy। এখন উপায়? 

CTLA-4 এর মতোই ক্যান্সার কোষের আরো একটি ঢাল হল PDL-1।  প্রথম থেকেই কিছু গবেষক CTLA-4 এর সাথে সাথে PDL-1 এর বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন। Yervoy বাজারে আসার পাঁচ- ছয় বছরের মধ্যে এলো Nivolumab, PDL-1 এর কার্যকারিতার বিরুদ্ধ ড্রাগ। PDL-1 ইনহিবিটর, Nivolumab এর সুবিধা হলো, এটি  CTLA-4 ইনহিবিটর , Yervoy চেয়ে অনেক অনেক কম ক্ষতিকর নন-ক্যান্সার সাধারণ কোষের জন্য। অর্থাৎ এটি সাধারণ কোষের মধ্যে থেকে আরো ভালোভাবে ক্যান্সার কোষ কে খুঁজে নিয়ে তার PDL-1 প্রোটিনকে নষ্ট করে। এখন, CTLA-4 ইনহিবিটর এবং PDL-1 ইনহিবিটর, দুটোর মিলিত শক্তি আরো ভালো ভাবে সমর্থ হল ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে। ইমিউনোথেরাপিতে সাড়া দিলেন আরো বেশি সংখ্যক রোগী। সাফল্যের হার আরো একটু বাড়লো। এখন ক্যান্সারে ব্যবহৃত অন্য কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশন থেরাপির সাথে মিলিয়ে এই দুটি ইনিবিটরকে ব্যবহার করার চেষ্টা শুরু হল। মানে ব্যাপারটা দাঁড়ালো এরকম যে, অন্য এন্টিক্যান্সার ড্রাগগুলি শরীরে ঢুকে ক্যান্সার কোষকে মারবে, রেডিয়েশন থেরাপি ক্যান্সার কোষকে মারযেও সাথে সাথে ইমিউন ফ্যাক্টর গুলোকে টেনে ক্যান্সার এর জায়গায় নিয়ে আসবে। এবার এর সাথে CTLA-4 এবং PDL-1 ইনহিবিটর দিয়ে ক্যান্সার কোষের CTLA-4 এবং PDL-1 কে ধ্বংস করে তার চারপাশে নির্মিত সুরক্ষাবলয়টিকেও যখন ভেঙে দেওয়া হল তখন, শরীরের টি-লিম্ফোসাইটও তার সাথে হাত লাগালো ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে। এখন কিন্তু সাফল্যের হার আরো অনেক বেশি বেড়ে গেল। তবুও কিন্তু সমস্যা একটা রয়েই গেল, এই নানান কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশন বিভিন্ন রোগীর শরীরে বিভিন্ন রকম কাজ করে, এদের নানান সাইড এফেক্টগুলো তো রয়েই গেল।কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশনের অফ টার্গেট এফেক্টের জন্য তারা ক্যান্সার কোষ ছাড়া কিছুটা হলেও সাধারণ কোষকে নষ্ট করে তার ফলে টিউমার সাইজ ছোট হয়ে বা অনেক ক্ষেত্রে মিলিয়ে গেলেও অনেকের ক্ষেত্রেই তারা আবার ফিরে এলো, বা অন্য শারীরিক সমস্যা শুরু হল। যে সমস্যার সমাধান এখনো পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। পরবর্তী ধাপের চ্যালেঞ্জ এইটাই। গবেষকরা নানান দিক থেকে এই সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখনো সময় আসেনি সেই গল্প লেখার। হয়ত আরো পাঁচ বা দশ বছর পর আমাদের মুখে হাসি ফুটবে। আসার কথা এই যে, চিকিৎসায় সাড়া দেওয়া রোগীর শতকরা অনুপাতটা এখন অনেক অনেক বেশি। 

এর মধ্যে একটি প্রজেক্টের কথা না বললেই নয়। সেটি হলো, এডাপ্টিভ টি-সেল থেরাপি। মেরিল্যান্ডে ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে বৈজ্ঞানিক ড: স্টিভেন রোজেনবার্গ একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করলেন, যেখানে ক্যান্সার রোগীদের শরীর থেকে তাদের টি-লিম্ফোসাইট এবং খানিকটা ক্যান্সার কোষ বের করা হল। তারপর ওই টি-লিম্ফোসাইটের মধ্যে থেকে যারা ওই রোগীর ক্যান্সার কোষকে মারতে পারে তাদের বেছে নিয়ে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হল। তারপর সেই কোষগুলিকে ওই যে প্রথমে বলেছিলাম আইএল-২ (গরম্যানের চিকিৎসায়), তাই দিয়ে এক্টিভেট করে আবার রোগীর শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। এবং এই যাত্রায় ড:রোজেনবার্গ প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ মেলানোমা রোগীর টিউমার কমিয়ে দিতে, এমনকি কুড়ি শতাংশের সম্পূর্ণ নিরাময় করে দিতে সমর্থ হলেন।১৯৯৮ এ যখন গোরম্যানের চিকিৎসা শুরু হয় তখন মেলানোমা রোগীর আয়ু ছিল খুব বেশি হলে একটি বছর।  যাত্রাটা বড় কম দিনের ছিল না,  প্রায় দুই দশক। 

এডাপ্টিভ টি-সেল থেরাপির সবচেয়ে বড় সমস্যা হল টেকনিক্যালিটি। রোগীর দেহ থেকে টি-সেল বের করে এনে- ঝেড়ে -বেছে -এক্টিভেট করে আবার রোগীর দেহে সুষ্ঠ কোষগুলি ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে অনেক গুলো টেকনিক্যাল চ্যালেঞ্জ আছে।  ফলত চিকিৎসার খরচ বাড়ে এবং সাফল্যের হার একটু হলেও কমে। 

আরো একটি বিষয় হল, সমস্ত রকম ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ইমিউনোথেরাপি কাজ করবে না। কারণ খুব সোজা, আপনার টি-লিম্ফোসাইটকে তো ক্যান্সারের জায়গায় পৌঁছতে হবে, তবে তো ক্যান্সার কোষ সেই টি-লিম্ফোসাইটের বিরুদ্ধে CTLA-4, PDL-1 বা অন্য প্রোটিন দিয়ে নিজের চারপাশে সুরক্ষা বলয় তৈরী করবে, আর তখন আপনি এইসব প্রোটিন এর বিরুদ্ধে ইনহিবিটর ব্যবহার করে সেই সুরক্ষাবলয় ভেঙে টি-লিম্ফোসাইটকে জায়গা করে দেবেন ক্যান্সার কোষকে মারার। এখন টি-লিম্ফোসাইট যদি নাই পৌঁছায় তবে তো এই অস্ত্রে যুদ্ধে জেতা যাবে না মশাই। তখন অন্য উপায় ভাবতে হবে। সে আবার অন্য গল্প। কিন্তু হ্যাঁ, দুই দশকের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা গবেষণার পরে মেলানোমা, কিডনি বা ফুসফুসের ক্যান্সারের মতন ইমিউন কোষের সহজ বিচরণ ভূমি যেসব ক্যান্সার, তাতে এই ইমিউনোথেরাপি নিঃসন্দেহে দিনবদলের খবর এনেছে।

আর সেই দিনবদল হয়েছে কাদের হাত ধরে জানেন? এই দুই দশকের যাত্রাপথের প্রধান দুই কান্ডারী কারা বলুন দিকি? নিশ্চয়ই তাঁদের নাম আপনি জানেন। মানে খবরের কাগজে, টিভিতে দেখেছেন। আচ্ছা বলছি, জেমস এলিসন (James P Allison) আর তাসুকু হানজো (Tasuku Hanjo) এই নাম দুটো নিশ্চয়ই আপনার চেনা? তাই না? গতবছর মানে, ২০১৮ তে ফিজিওলোজি এন্ড মেডিসিনে নোবেলটা এঁনাদের দুজনের নামেই লেখা হল যে। সেই কোন ১৯৯০ সাল নাগাদ CTLA-4 এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন এলিসন, আর PDL-1 বিরুদ্ধে হানজো। তারপর তো ইতিহাস।  

১৯৯৮ এর গরম্যানের গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম। যখন তাঁর খাতায় কলমে আয়ু ছিল মাত্র এক বছর, ২০১৪-র সেই একই গোরম্যানের কথা বলি। গরম্যান ২০১৪-তে বারবার দুঃখ করেছেন যে মেলানোমা সাপোর্ট গ্রূপে পাওয়া তাঁর এক বন্ধুও যদি তাঁর সাথে ইমিউনো থেরাপির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নাম লেখাতেন। তাঁর অন্য আর এক বন্ধুর কাহিনী অবশ্য একদম বিপরীত। তিনি CTLA-4 ইনহিবিটর, Yervoy ট্রিটমেন্টে সম্পূর্ণ নিরাময় পেয়েছেন। গরম্যানের নিজের মেলানোমা? প্রতি দুই বছর অন্তর স্ক্যান করা হয়। এখনো কোনো সমস্যা নেই তাঁর। তাঁর নিজের ভাষায়, “My immune system has it under control.” 


'KNOCK CANCER OFF THE BOARD' 




   
         
   


















               


     

Wednesday, 20 March 2019

Learned to love

When I dreamed about love,
You were nowhere in my life.
When I tried to touch your core,
My care was not enough to reach you.
When I learned to smile,
There was no one to smile at.

I cried.
I fell down.
I deconstructed me.

Then I assembled me again.
Learned to live again.
Learned to love me.
Learned to reach me.

Then I reincarnated in a dark evening,
And learned to smile at me at last.

Since then, everyday, every moment,
I learned to immerse myself into me.

Now you smile at me,
Touched my hand.
I felt warmth of love there.

I cried again- yes, truly.
But now I trust me.
Now I learned to trust my love.
Now I am in the path to be me.

পাথরা

লাল মাটির প্রতি কি জানি একটা আকর্ষণ ছিলই প্রথম থেকে। যখন বছর দুই বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে থাকার সুযোগ হল, তখন সাইকেল চালিয়ে লাল মাটির গন্ধ নিয়েছি অনেক। তখনো মেদিনীপুরে লাল মাটি বা মোরাম বিছানো রাস্তার অভাব ছিলনা। আর ইউনিভার্সিটির আশেপাশে ছিল কিশোর বয়স্ক শাল, সেগুন আর কাজু গাছের জঙ্গল। গোধূলিবেলায় লাল মাটি, কচি শাল গাছের সবুজ রং আর সাইকেলের চাকায় মোরামের কুড়কুড় শব্দ, এইসব জড়িয়ে ছিল আমার প্রেম। কিন্তু কখনোই মেদিনীপুর শহরের বাইরে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। অনেক জায়গার নাম শুনতাম, যেতে ইচ্ছে করত। কিন্তু বাহন বলতে- সাইকেল। সে বেচারা কত দূরেই বা নিয়ে যেতে পারে? তাই অনেক জায়গাতেই যাওয়া হয়নি। পাথরাও না। খুব ইচ্ছে করছিল একবার যাবার। না, পাথরা দেখা হয়নি ভাল করে, বলা যায় পাথরা ছুঁয়ে এসেছি। এই কদিন আগে। সেই গল্পই বলি কেমন?

খড়গপুর বা মেদিনীপুর  যেদিক দিয়েই যাওনা কেন, পাথরা পড়বে মাঝামাঝি। তাই সুবিধা মত যেদিক দিয়ে খুশি গেলেই হল। আমরা গিয়েছিলাম খড়্গপুর থেকে। তা খড়গপুরের বম্বে রোডের (আমরা তো এখনো বম্বে রোডই বলি!) চৌরাস্তা থেকে মেদিনীপুরের রাস্তা ধরে খানিক এগোলেই তুমি পাবে আমতলা। ম্যাপ বলবে ক্ষুদিরাম পার্ক। সেখান থেকে বাঁ দিকের সরু রাস্তায় চোখ বন্ধ করে ঢুকে পড়ো। না বাপু আমতলার পর গাড়ি ঘোড়া বিশেষ পাবেনা এ রাস্তায়। তাই বাহনের ব্যবস্থা করে আসাই ভাল। রাস্তা বাঁধানো, তাই ছোট একটা গাড়ি নিয়ে নিশ্চিন্তে ঢুকে পড়ো দেখি পাথরার রাস্তায়। এরপর তোমার ম্যাপ খুলে রাখার আর প্রয়োজন দেখিনা। ডানদিকে ততক্ষনে তোমায় রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাবে বলে সাজুগুজু করে এসে দাঁড়িয়েছে কংসাবতী। ব্যস, বাকি রাস্তাটা ওর সাথেই যাওনা কেন? মাঝে সাঝে একটু আড়ালে চলে যায় বটে, কিন্তু তুমি নিশ্চিন্তে থাকো, পাথরা পৌঁছানো পর্যন্ত কংসাবতী তোমার ডাইনে থাকবেই। দুপাশের লোকজন, ছোট ছোট দোকানপাট, পোষ্য আর বাড়িঘর দেখতে দেখতে এগোও না। ভালোই লাগবে দেখো। দুপুর শেষে বন্ধ বাজার, দোকান পাটের ঝাঁপ পড়ছে। দু- দুইখানি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের ঝাঁপও পড়ব পড়ব করছে হয়ত ততক্ষনে। এই সব দেখতে দেখতে তুমি এসে পৌঁছে গেছো এতক্ষনে হাতিহল্কা  মোড়ে। ওহো বলা হয়নি, এতক্ষন তুমি তো হাতিহল্কা রোড ধরে চলছিলে। এইবার হাতিহল্কা মসজিদকে তার মেলা, প্যান্ডেল, কাঁচের চুড়ি আর ঘুগনীর দোকান সহ বাঁদিকে বসিয়ে রেখে একটু বাঁয়ে বেঁকে তোমায় হাতিহল্কা টু পাথরা রোডে ঢুকতে হবে। পরিষ্কার চকচকে মাটির একতলা বা দোতলা বাড়ি। উঠোনে ভাত ঢেলে খাওয়া চলে এত পরিচ্ছন্ন আর তকতকে করে রাখা। বনবিভাগের শাল প্যান্টেশন দেখতে পাবে। কিন্তু এত কিলোমিটার রাস্তায় কোনো হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র দেখতে পাবে না। অন্তত রাস্তার ধারে তো নয়ই। বাড়িতে বয়স্ক লোকজন থাকলে ঐদিকেই আবার মনটা পড়ে থাকে কিনা। তাই শাল- সেগুন-বাঁশ আর ঘেঁটু গাছের ছায়ায় চলতে চলতে তুমি ভাববে, শরীর খারাপ হলে সবচেয়ে সামনের শহর মেদিনীপুর। রাত্তিরবেলায়, যানবাহনহীন এই রাস্তায় মেদিনীপুর নিয়ে যেতে হবে সামান্য থেকে সামান্যতম চিকিৎসার জন্যও। তখন তুমি ভাববে, তুমি কত ভাগ্যবান যে তুমি এই মুহূর্তে এখানকার ট্যুরিস্ট, স্থায়ী বাসিন্দা নও।

যাক যে যাক এসব কথা। পাথরার গল্পে ফিরি। হ্যাঁ ততক্ষনে তুমি কংসাবতীর সেচখালের ওপর সেই সাঁকোটার কাছে এসে পৌঁছেছো, যেখানে প্রায় তিরিশ বছর আগে প্রাইমারী স্কুলে পড়া শ্রীমান পিনাকী বাবা মায়ের সাথে পাথরা দেখতে এসে একটি নধর ফণীমনসার ঝাড়ে কষিয়ে লাথী মেরেছিলেন। কেন মেরেছিলেন তার কোনো সঠিক কারণ নেই। এই ধরণের কাজে সাধারণত থাকেও না। কিন্তু পা ঢাকা জুতো না পরে, ফণীমনসার ঝাড়ে লাথী কষালে কারণ থাকুক বা না থাকুক তার নির্দিষ্ট একটি ফলাফল নিশ্চিত থাকে। এক্ষেত্রেও ছিল। যথাযথই ছিল।

তা এই লাথী খালের ওপরে এখন আর বাঁশের সাঁকো নেই। এত বছর পরে থাকাটা কাম্যও নয়। রীতিমত কংক্রিটের ব্রিজ। দিব্য গাড়ি চলে। এর এই লাথী খাল পেরোলেই পাথরা গ্রামের সীমানা শুরু। হাতিহল্কা মোড় থেকে কংসাবতী একটু আড়ালে চলে গিয়েছিল। এবার দেখবে কেমন বাইরের পোশাকটি ছেড়ে, মুখ-হাত-পা ধুয়ে শাড়ি পরা কংসাবতী থেকে ফ্রক পড়া কাঁসাই হয়ে তোমায় আদর করে পাথরায় নিয়ে যায়। কাঁসাইয়ের বাঁধ ধরে বাকি রাস্তাটা চলতে চলতে দেখবে ডানদিকে নদীর পাড়ে গোটা, আধভাঙা, পুরো ভাঙা কত মন্দির। গাড়ি থামিয়ে চাইলে কাছে গিয়ে একটু দেখোই না কিছু গল্প শুনতে পাও কিনা। গল্প না শুনলে না হয় কাঁসাইএর চড়ায় শেষ শীতের সবজি ক্ষেতের পাশ দিয়ে একটু হাঁটলেই বা। তারপর আবার বাঁধে উঠে একটু সামনে এগোলেই পাথরার মন্দির পাড়া। যা দেখাবে বলেই কাঁসাই এই এত আপ্যায়ন করে তোমায় এখানে নিয়ে এলো। আসলে কি বলোতো, সেই অনেককাল আগে বিদ্যানন্দ ঘোষাল, নবাব আলীবর্দীর থেকে এই অঞ্চলের খাজনা আদায়ের অনুমতি পেলেন। আর এখানে একের পর এক মন্দির তৈরী করে ফেললেন। কেন বলতো? আরে, তাম্রলিপ্ত বন্দর তখন দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রধান বাণিজ্যপথ। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন সমস্ত ধর্মের লোকজনের যাতায়াত সে রাস্তায়। তা এত গুলি হিন্দু মন্দির একসাথে একজায়গায় পেলে বাণিজ্যযাত্রার আগে পুণ্যসঞ্চয়ী হিন্দু বণিক কি আর তমলুক বন্দরের এত কাছের এই পাথরায় একবার আসবে না? আর স্থান মাহাত্ম্য প্রচার হলে তো আর কথাই নেই। আর যত বেশি লোক সমাগম, তত বেশি খাজনা আদায়ের সুযোগ। সুতরাং বিদ্যানন্দ আলিবর্দি কে খুশি করতে আর নিজের লাভ রাখতে পাথরাকে অল্পদিনের মধ্যেই মন্দির নগরীতে পরিণত করে ফেললেন। কিন্তু বিদ্যানন্দের হিসেবের গোড়ায় যে গলদ। তিনি হিন্দু মন্দির স্থাপন করে কর আদায়ের রাস্তা খুঁজেছিলেন। আলীবর্দী খুশি তো হলেনই না, উপরন্তু বিদ্যানন্দ গেলেন কারাগারে। এবং শেষে মৃত্যু। শোনা যায়, একটি হাতির ওপর দায়িত্ত্ব ছিল বিদ্যানন্দের মাথা গুঁড়িয়ে দেবার জন্য, কিন্তু হাতিটিকে দিয়ে শেষ পর্যন্ত সেকাজ করানো যায়নি। এই ঘটনার পর পাথরা সেসময়ের বাণিজ্য পথে আরো বিখ্যাত হয়ে গেল।  আর বিদ্যানন্দের বংশধরেরা নবাবের ভয়ে ঘোষাল পদবী বদলে মজুমদার হলেন। পরে মজুমদারেরা আর তাঁদেরই আর এক শাখা, বন্দোপাধ্যায়রা মিলে পাথরার মন্দিরের সংখ্যা বাড়াতে থাকেন। তারপর? তারপর আর কি? যা হয়। কলসির জল শেষ হয় আর মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণও চলে যায় স্বয়ং সময়ের হাতে। সময় গড়িয়েছে আর মন্দিরের রমরমা গেছে, বিগ্রহ গেছে, মন্দিরের গা থেকে ইঁট পর্যন্ত চলে গেছে। তারপর এই সেদিন কিছু স্থানীয় মানুষ, খড়গপুর আই আইটির উদ্যোগে মন্দিরগুলির সংরক্ষণ শুরু হয়।  তবে তুমি এখনো গিয়ে দেখবে কোথাও কোনো পাঁচিল নেই। রাতের অন্ধকারে যে কেউ যা খুশি করতে পারে। কাঁসাইয়ের বাঁধের দুপাড়ে সার ধরে দাঁড়িয়ে আছে অজস্র অসংরক্ষিত ইতিহাস।

গাড়ি থামার পর দেখবে, ডানদিকে একটি বড় মন্দির। ঐটি নবরত্ন মন্দির। সবচাইতে বড় আর অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিগ্রস্ত। টেরাকোটার কাজগুলি এখনো তোমার দিকে তাকিয়ে হাসবে দেখো। তার ডাইনে ছোট নাটমন্দির আর শিব মন্দির। আর দুটি ছোট ছোট ঘরও দেখতে পাবে। পূজারীর থাকতেন সে ঘরে? না কি দেবতার ভোগের ঘর? দেউলকে জিজ্ঞাসা করো তো গেলে। ওই দেখো, নবরত্ন মন্দিরের পাশ দিয়ে গা এলিয়ে দিয়েছে কাঁসাই। দেখোনা কেমন উর্বর আঁচলা বিছিয়ে কাত হয়ে থাকা ছিপ নৌকাটা কোলে করে পাতলা কুয়াশা জড়িয়ে শুয়ে আছে। যাও না ডুমুরগাছটার পাশ দিয়ে কেমন পায়ে চলা রাস্তা নেমে গেছে নদী পর্যন্ত। ওই যে গো, ওই মেঠো আল ধরে নদী থেকে ভিজে কাপড়ে মন্দিরের দিকে উঠে আসছে ঠাকুমা। হাতে একগোছা বাসন। সামনে হাঁটছে তার কঞ্চি হাতে ন্যাংটাপুটো বীরপুরুষ নাতিটি। তাঁদের উঠে আসার রাস্তা দেবার পর সাবধানে নেমে পড়ো দিকিনি নদীর কোলে। একটুও অবাধ্য নয় আমাদের কাঁসাই। ভারী ভাল মেয়ে। তোমায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে না। মুখে, ঘাড়ের পেছনে, দুচোখে তাকে মেখে দেখো, কেমন ঠান্ডা।

নামার সময় দেখো দুটি ভাঙা খিলান। হয়ত ঐটেই ছিল নদীপথে পাথরার পুজো দিতে আসা বণিকের মন্দিরে ঢোকার প্রধান পথ।  এতদিন পরে সেকথা ঠিক কিনা কে আর বলে দেবে? কাঁসাইয়ের আদর মেখে তুমিও উঠে এসো সেই একই পথ দিয়ে। নাহয় আজ আর সেই গর্বিত খিলান পথ নেই, কিন্তু কাঁসাই তো আছে। না হয় মন্দিরের বিগ্রহ আজ অন্তর্হিত, কিন্তু ইতিহাসের সেই মন্দির তো আছে।  সেই মন্দিরের গায়ে হাত দিলে খড়খড়ে ঝামাপাথর আর টেরাকোটার মূর্তির পাশ দিয়ে পুরোনো তেল সিঁদুর আর ধুনোর গন্ধ কি একটুও চুঁইয়ে আসবে না তোমার কাছে? ঘাড় উঁচু করে দেখতো একবার সেই পুরোনো কারিগরের হাতের ছোঁয়ায় পাথরে জেগে ওঠা সূক্ষ্ম আল্পনা আজও নিজেকে কালের গর্ভে তলিয়ে যেতে দেয়নি। তোমারই জন্য আজও সে সারা গায়ে পশ্চিমের কমলা রোদের প্রসাধন জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এইবার দেখোতো, সেদিকে তাকিয়ে লাল মাটি, লাল রোদ্দুর আর লাল ঝামাপাথরের মন্দির আর তার ফিসফিসিয়ে বলা ইতিহাস তোমার চোখ থেকে একফোঁটা জল বের করতে পারে কিনা। কান্না নয়, ইতিহাস আর সুন্দরকে স্পর্শ করার আবেগ।

কিন্তু এইসব ক্ষেত্রে চোখকে যে ভিজতে নেই। লোকে দেখলে সে এক কান্ড হবে যে। তাই তুমি চটপট বাঁহাতের কড়ি আঙ্গুল ছুঁইয়ে চোখের কোন থেকে জলের ফোঁটাটা সরিয়ে তুমি মন দেবে বাঁধের ওপারের মন্দিরগুলোয়। সামনেই ওই দেখো একটি চৌকোনা একতলা বাড়ি। দেখে তোমার মনে হবে, পুরোনো জমিদারের সেরেস্তা ঘর বুঝি। অথবা মন্দিরের অফিসঘর। আজকালের মন্দিরে যেমন থাকে। আবার নহবৎ খানাও হতে পারে। সত্যি করে যে কি তার আমি কি জানি? কোথাও কিচ্ছুটি লেখা নেই যে। তখন তোমার কৌতূহল বাড়বে। উত্তেজনাও। পাশে বানানো সিঁড়ি ছেড়ে বাঁধের ঢাল বেয়েই তরতরিয়ে নেমে যাবে তুমি নিচে। নেমেই দেখবে তিনটে পাশাপাশি শিব মন্দির। যেমন আটচালা সারি সারি শিবের মন্দির থাকে আর কি বাংলার নানান জায়গায়। ভেতরের শিবলিঙ্গের জায়গায় এক একটি গহ্বর। শিব মন্দিরের ডানদিকে একটি খন্ডহর। তার একটি সিঁড়ি আজও অক্ষত। এটি মন্দির নয়, আসলে যে কি ছিল আজ আর তা জানার উপায় নেই। এই চত্বরে আরো একটি মন্দির তুমি পাবে। পারলে একটু ছুঁয়ে দেখো মাটিতে প্রায় মিশে যাওয়া ইঁটের সারিগুলোকে।

সেখান থেকে একটু চোখ তুললেই দেখবে ডানদিকে দুর্গাদালান। সুন্দর তোরণ এখনো অক্ষত। আশপাশটা একটু ভেঙে গেছে বটে কিন্তু ঝামাপাথরের সহ্যশক্তির নমুনা এখনও আছে।  ভাল করে ঘুরেঘারে দেখে নাও দিকি চটপট। নইলে আবার কখন প্রি-বিয়ে, পোষ্ট-বিয়ে ছবি তোলাতে একজোড়া মানুষ একটি ফটোগ্রাফার ঘাড়ে করে ভটভটি হাঁকিয়ে আসেপাশের শহর থেকে এসে পড়ে। তুমি গেলে শিব মন্দির আর তার ইতিহাস দেখতে, গিয়ে দেখলে জ্বলজ্বলে একটি বর্তমান সাদা পাঞ্জাবি পরে, লাল শাড়ি পরা-শ্যাম্পু চুলের আর একটি জ্বলজ্বলে বর্তমানকে কাঁখে করে দাঁড়িয়ে আছে। ফটোগ্রাফারের সহকারী লাল শাড়ির নীল আঁচল এমন ভাবে ধরে আছে যে সূর্য্যের আলো দারুন এক রিফ্লেকশন তৈরী করেছে। আর ফটোগ্ৰাফার শুয়ে, বসে, উবু হয়ে, কাত হয়ে সহকারীকে ফ্রেমের বাইরে রেখে, তোমার ইতিহাসকে পিছনে রেখে, বর্তমানের দলিল তৈরী করছে। এরপর পাঞ্জাবী, শাড়ির রং বদল হবে। একজোড়া বর্তমানের পজিশন বদলাবে। প্রেমের প্রকাশ বদলাবে, ক্যামেরার লেন্স বদলাবে। এইসবের মাঝেই কিন্তু তোমায় ঢুকে পড়ে ইতিহাস খুঁজে নিতে হবে নইলে সূয্যিমামা ঘুমোতে গেলে আর এখানে কিচ্ছু নেই দেখার। আলো টালোর বালাই নেই যে এই ফটোসেশন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবে তুমি। চায়ের দোকানও নেই যে গিয়ে বসবে। সুতরাং প্রেমের মাঝে মূর্তিমান বেসুরের মতন তুমি সে চত্বরে ঢুকে পড়বে আর বাকি দুটো মন্দিরও দেখে নেবে। তারপর মাঠের শেষে, শেষ মন্দিরটা যখন তুমি দেখবে তখন পুরোনো বাংলা ভাষার অক্ষর কিছুটা সেই মন্দিরের গায়ে তোমার চোখে পড়লেও পড়তে পারে। আর কালো পাথরের একটি মূর্তি মন্দিরের দরজায় আজও পাহারা দিচ্ছে দেখো। এটিই বোধহয় পঞ্চরত্ন মন্দির। জিজ্ঞাসা কোরো দিকি।

এই চত্বর পেরিয়ে কাঁচা রাস্তায় একটু এগিয়ে বাঁদিকে নেমে গেলে আরো কিছু মন্দির আছে।  সেসব আমার আর দেখা হয়নি। বেলাবেলি পৌঁছে গেলে তুমি কিন্তু দেখতে ভুলোনা। বেলাবেলি কেন? আরে ফিরতে হবে না? পাথরায় কিন্তু থাকার জায়গা বলে কিচ্ছুটি নাই আগেই বলে রাখলুম। তা ওই বাংলা লেখা মন্দিরের পাশ দিয়ে বাঁধে উঠে এসো। রোদ্দুর তখন প্রায় নেই বললেই চলে। বাঁধের গায়ে বেড়ে উঠেছে শিয়ালকাঁটার ঝোপ। আর তাদের ঝকঝকে হলদে রঙের ফুল। লালচে রোদে শ্যাওলা পড়া লাল মন্দিরের ব্যাকগ্রাউন্ডে তোমারও সেই হলুদ ফুলের ছবি তুলতে ইচ্ছে হবে দেখো। দেখবে কেমন করে রোদ্দুরের শেষ কিরণটা তোমার আর ওই হলুদ ফুলের ওপর একসাথে এসে পড়ে। ঐটিই পাথরার দেওয়া উপহার তোমার জন্য। সামলে নিয়ে গাড়িতে উঠে বোসো। ফিরতে হবে তো?

ফেরার সময় গাড়িতে উঠতে গিয়ে লক্ষ্য করে দেখোতো ফটোসেশনের শেষে মন্দির চত্বর থেকে মোটরবাইক নিয়ে বেরিয়ে আসার সময় প্রেমিকের মাথায় ফেজ টুপি আর প্রেমিকার গায়ে কালো বোরখা উঠেছে কিনা। কে যেন বলে, কোথায় যেন শোনা যায়, আমাদের দেশে নাকি ধর্মনিরপেক্ষতা বিপন্ন। হবেওবা অন্য কোথাও। এখানে সেসব বালাই নেই। নিশ্চিন্তে এসে দেখে যেও। তারপর যখন কাঁসাইয়ের বাঁধ ধরে পড়ন্ত দিনের আলোকে সামনে নিয়ে আবার ফিরবে, হাতিহল্কার মসজিদের পাশে গাড়ি থামিয়ে একভাঁড় চা আর সুজির বিস্কুট খেও কেমন। ভাল লাগবে। চা- বিস্কুটের স্বাদের কথা বলছি না। সে আমি কেমন করে জানব? আমি তো খাই-ই নি। আমি বলছি অন্য কথা। ওই ছোট দোকানের পেছনের ঝুপসি বাঁশবন থেকে আসা ঝিঁঝিঁর ডাক শুনবে, চা খেতে খেতে মসজিদের আজান শুনবে, বিস্কুটের লোভে সাদা কালো একটা কুকুর এসে জুটবে, তার জন্য তুমি আরো একটা বিস্কুট কিনে তাকে অল্প অল্প করে ভেঙে দেবে। সে খাবে আর হাসি মুখে অল্প অল্প লেজ নাড়বে। তুমিও খুব অল্প অল্প করে চায়ে চুমুক দেবে যাতে সময়টা তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে না যায়।

দেখবে, অনেকদিন আগে ছোটবেলায় বাড়িতে অতিথি এলে শোনা একটা কথা, আজানের সুর ছাপিয়ে তোমার কানে এসে পৌঁছবে। পৌঁছবেই। "আজকের দিনটা থেকে গেলে হতো না? কাল দুটি মুখে দিয়ে নাহয়......."
  







  

কলমি লতার জোড়

সাদা পাতায় আঁচড় কাটতে আগে কালি-কলম-মন তিনটেরই খোঁজ পড়ত। প্রথম দুটির আজকাল বিশেষ প্রয়োজন পড়ে না যদিও, শেষেরটি না হলেই নয়। আর চিরকালই, যেটি না হলেই নয় সেটিই সময় বুঝে কখনো কখনো বাড়ন্ত হয়ে পড়ে। মনের খোঁজ পাওয়া গেলেই তো শুধু হল না, উপরের সমস্ত উথালপাথাল সরিয়ে একদম ভিতর থেকে উথালপাথালের সঠিক কারণটিকে চিনে নিয়ে তার পর তাকে বের করে আনা। তবেই সাদা পাতায় প্রথম আঁচড়টি পড়ে।

অনেক ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে, তখন সদ্য পড়াশুনা শুরু করেছি হয়ত।  সন্ধ্যেয় পড়তে বসতে হয় কিন্তু একদিন না বসলেও কিছু ক্ষতি হয়না। তখন কেবল রুটিনবদ্ধ পড়াশুনাটাই ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার একমাত্র শিক্ষা ছিল না। ভাগ্যিস! অনেক অনেক এমন কিছু শিখেছিলাম যা স্কুলের ব্যাগে থাকা বইয়ে লেখা ছিল না। ছিল দিদিমনি মাস্টারমশাইদের মুখের কথায়, সরস্বতী পুজোর আগের সন্ধ্যেয় বুড়ো ঠাকুরদাদার গল্পে, পাড়ার কাকীমা-জ্যেঠিমাদের অবাধ রান্নাঘরে। গ্রামের মেয়ে আমি। গোটা একটা পাড়া এককালে একটি পরিবার ছিল।  তারপর ডালপালা মেলতে মেলতে নতুন নতুন রান্নাঘর, নতুন নতুন বাড়ি। যা হয়। তাই ছোট থেকেই পাড়ার বেশিরভাগ মানুষই কাকা-জ্যাঠা-বৌদি- দিদি। লতায় পাতায় সম্পর্কিত। বিজয়া দশমীতে আমার মায়ের ঘুগনি বাটি বরাদ্দ ওই বাড়ির দিদির জন্য। আর ওই কাকিমার বড় বড় গোল্লা গোল্লা নাড়ুর লোভে আমার বাড়িতে খাওয়া বন্ধ। অরন্ধনের দিন ওই বাড়ির বড়বৌদি যতক্ষন না নারকেল ভাজা, চালতার চাটনি, ওলের বড়া নিয়ে হাজির হচ্ছে ততক্ষণ আমাদের বাড়ির ভাতের থালায় কেউ হাত দেয় না। জড়িয়ে পেঁচিয়ে আছে সব।  একই পুকুরের কলমি লতার মতোই। তখন ক্লাস থ্রি বা ফোর হবে, সদ্য সাইকেল চালানো শিখছি। বাবার বড় সাইকেলে, হাফ প্যাডেল। মানে ওই তেকাঠির মধ্যে দিয়ে একটা পা গলিয়ে ডান হাত দিয়ে সাইকেলের সিটটা ধরে অর্ধেকটা উঠে চালানো আর কি। অমন ছোটবেলায় সিটে উঠে প্যাডেল করার আগে সকলেই করেছে। সাইকেল সোজা গিয়ে কিরকম করে যেন ধাক্কা খেল ভাঙা পাঁচিলে, আর আমার বাঁপায়ের শেষ দুটি আঙুলের নখ, চামড়া সব জট পাকিয়ে গেল। বাড়িতে সেদিন বাবা মা দুজনেই নেই। ওই কলমি লতার জোড় ছিল বলে সেদিন বাবা মায়ের বাড়িতে না থাকাটা টের পাইনি। বাবা মা কাছে ছিল না কিন্তু বড়বৌদি ছিল।  পাড়ার প্রায় সক্কলের বড় বৌদি। তার পর তো দুম করে একদিন সকালে উঠে শুনলাম গতকাল রাত থেকে বড়বৌদি নেই হয়ে গেছে। এরকমই হয়, ওই যে বললাম, যার থাকাটা খুব জরুরি সে দুম করে রাতারাতি নেই হয়ে যায়। বাকি সকলকে সাবালক হতেই হয় তখন। তারপর এই তো সেদিন, গেল বার বাড়ি থেকে চলে আসার দিন দুই আগে, ওই বাড়ির কাকিমা, এক টিফিনবাক্স ভর্তি নাড়ু, পিঠে নিয়ে আমায় দিলে। "চলে যাবি, আবার কবে আসবি, তাই একটু করলাম তোর জন্য।" এত ভালবাসা আমি কোথায় আর পাই?  আমাদের তিনজনের পরিবারের তখন ছন্নছাড়া অবস্থা। সদ্য একটা বীভৎস বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার লড়াই চলেছে তিনজনের। একেকটা দিন সুস্থু ভাবে যাপন করতে পারলেই মনে হয় যাক আজকের দিনটা ঠিকঠাক কাটলো। মনে একটু একটু করে আশার সঞ্চার হয়। তখন মেয়ে দুদিন পর চলে যাবে বলে মায়ের আর বিশেষ কিছু রেঁধে দেবার পরিস্থিতি ছিল না।  সেটি আন্দাজ করে কাকিমা বাক্স ভরে খাবার নিয়ে এসেছেন। এত ভালবাসা পাবার যোগ্য কিনা আমি জানিনা। কিছুই বলতে পারিনি সেদিন কাকিমাকে, বাক্সটা নিয়ে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে গিয়ে চোখের জল থামিয়েছিলাম। কলমি লতার জোড় সব। একই পুকুরে বাস। মনে হয় সব আলাদা আলাদা গাছ বুঝি। জলের ওপর থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু জোড় আছে। দরকার মতন ঠিকই টান পড়ে।

একথা সেকথায় অনেক দূর চলে গেছি, যা বলছিলাম, মনের কথা। তা সেই ছোট্টবেলায় যখন বইয়ের অক্ষরই পড়তে হবে এমন বাধ্যবাধকতা ছিল না, সেরকমই এক সন্ধ্যেবেলায়, ছোড়দাদুর বাড়িতে, আমরা তিনজন তুতো ভাইবোন মিলে 'ভবসাগর তারণ কারণ হে' গানটা গাইছিলাম। গাইছিলাম না বলে শিখছিলাম বলাই ভাল। কে যে শেখাচ্ছিল তা আর মনে পড়ে না। দাদুও হতে পারে, পিসিও হতে পারে বা দিদিও হতে পারে। গানটার দুটি লাইন শিখেছিলাম। চোখ বন্ধ করে গাইছিলাম। বেসুরেই হয়ত। কিন্তু বেশ ভাল লাগছিল এটুকু মনে পড়ে। সেই প্রথম বোধহয় মনকে শান্ত হতে দেখেছিলাম। তখন বুঝিনি কিচ্ছুই। এখনো কি ছাই বুঝি? তারপর একা একা, ভিড়ের মধ্যে কত জায়গায় কত রকম ভাবে, কতবার এই দুলাইন গেয়েছি মনে মনে মনে পড়ে না।

মনকে লাগাম পরিয়ে বাইরে টুকুন পরিপাটি রেখে চলার চেষ্টায় দিন গেল। ইচ্ছেরা জন্মায়, অপেক্ষা করে পূরণ হবার। আমরা বড় হই আর ইচ্ছের পায়ের বেড়ি ক্রমশঃ শক্ত হতে হতে পাথরের মতন ইচ্ছের ঘাড়ে চেপে বসে। এখন রইল বাকি অহল্যার মতন প্রতীক্ষা, কখন কেউ এসে পাথর গলিয়ে ইচ্ছেকে মুক্তি দেয়। মনের সে একমুখী গতিই বা কই আর তার জোরই বা কত যে নিজে হাতে আগল খোলে? পাগলের মতন কেবল এদিক সেদিক ছুটে বেড়ায়। অযুত শক্তি নিয়ে কেবল রাস্তা হাতড়ে চলা। তারপর এদেওয়ালে ওদেওয়ালে মাথা কুটে কুটে শক্তিক্ষয়। তারপর, সে শক্তির যখন তিলমাত্র অবশিষ্ট, তখন মনের টনক নড়ল। এই যাহ সমস্ত কিছুই যে রইল পড়ে, কিছুই যে করা হল না। এবার উপায়?