Friday, 18 July 2014

কবিতা হয়ে ওঠা

তপ্ত পৃথিবীকে বৃষ্টির আলিঙ্গন
কবিতা করে দেয় সবকিছুকেই।

অগুন্তি মানুষের অগুন্তি কথা,
অজস্র অভিযোগ, অবান্তর তত্ত্ব
সারাদিনের গতে বাঁধা দিনযাপন,
ঘুম থেকে ওঠা আর ঘুমোতে যাবার মাঝে
কোথাও কখনো নিজেকে খুঁজে না পাবার যন্ত্রণা -

সমস্ত কিছুকে নিমেষে ধুয়ে মুছে দিয়ে
অপ্রয়োজনীয় শব্দ আর দৃশ্যে ভারী হয়ে যাওয়া ইন্দ্রিয়কে
সতেজ করে দিয়ে-
আকাশ বেয়ে এসেছিল প্রেমের বর্ষণ, অঝোরে
ধীরে ধীরে শীতল হচ্ছিল পৃথিবী।
আর আমার সমস্ত চেতনা, সমস্ত অনুভূতি
ধীরে ধীরে কবিতা হয়ে উঠছিল।

কিন্তু একটি সম্পূর্ণ কবিতার জন্মলাভের আগেই
জীবন নিজের ঝুলি পেতে দাঁড়ালো আমার সামনে
আমার আর পুরোপুরি কবিতা হয়ে ওঠা হলনা।

Thursday, 17 July 2014

লোহাঘাট-মায়াবতী-৩.........আজ মায়াবতী

কাল তো Abbott মাউন্টের গল্প বলেছি আপনাদের। সেখান থেকে ফিরে এসে দেখি KMVN বাংলোতে তো হই-হই, রই-রই কান্ড। বাংলোর সামনে প্যান্ডেল, স্টেজ, কার্পেট, চকচকে ফ্লাড লাইট, সার সার গাড়ি। ক্যালোর ব্যালোর। পেয়াঁজ-রসুনওয়ালা ভালো ভালো খাবারের গন্ধ। আর ভেতরে অজস্র রংবেরঙের বাচ্চা। সঙ্গে বাবা মায়েরাও আছেন। মায়েরা চুমকি আর পাথর বসানো গাঢ় সবুজ- টুকটুকে লাল-কমলা-চোখ ঝলসানো গোলাপী-বেগুনি রঙের শাড়ী, কনুই পর্যন্ত ঝুমঝুমি লাগানো চুড়ি, নাকে নথ পরে মহা ব্যস্তসমস্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বাবারাও ততোধিক সজ্জিত। গত দিন সকালে ফোনে টিকরাম সিং জী যে বলেছিলেন "কাল তো বারাতওয়ালী পার্টি হ্যায়"। সেই চলছে। KMVN বাংলো স্থানীয় বিয়েবাড়ির জন্য ভাড়া দেওয়া হয়।সেই বিয়ে বাড়ি শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। তার মাঝে আমরা দুই মক্কেল আগের রাতে না ঘুমিয়ে-সারাদিন টই-টই করে বেড়িয়ে ঝোড়ো কাকের মত চেহারা নিয়ে যখন গাড়ি থেকে নামলাম, তখন "আইয়ে আইয়ে" বলতে গিয়েও একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বাপ-বাপ বলে সামলে নিলেন। আমাদের অতিথি বলে ভুল করে আপ্যায়ন করতে গিয়েই চেহারা দেখে ভুল ভেঙ্গে গেছে। লোকজন, সাজগোজ দেখতে দেখতে আর ক্রমান্বয়ে অবাক হতে হতে নিজেদের ঘরে গিয়ে কোনঠাসা হলাম।

বহুবারের চেষ্টায় টিকরাম সিং জী-কে খুঁজে পেয়ে চা খাওয়াতে বলে ঘরে এসে বসলাম। আর বারান্দা দিয়ে লোকেদের বিয়েবাড়ির জাঁকজমক দেখতে থাকলাম। মনে মনে ইচ্ছে ছিল যে বিয়ে শুরু হলে নিচে গিয়ে দেখব। নাই বা থাকলো গোলাপী রঙের শাড়ী - ঝুমঝুমি চুড়ি - নথ। নাহয় জিন্স-টিশার্ট পরেই যাব, আমার অত লজ্জা টজ্জা নেই বাবা। কাউকে চিনি না তো কি হয়েছে? দেখব পাহাড়ী বিয়ে। নাচা-গানা হলে একটু নেচেও নেওয়া যাবেখন। আর নাচ-টাচ করলে নিশ্চয়ই চক্ষুলজ্জার খাতিরেও একবার কেউ না কেউ পেছনের বাগানে বিশাল প্যান্ডেল করে সকাল থেকে যে চার-পাঁচ জন রন্ধনশিল্পী তাঁদের শিল্পের নমুনা প্রদর্শন করে চলেছেন তার যত্সামান্য রসাস্বাদন করে যেতে বলবেন। এই ফাঁকে বিয়েবাড়ির ভোজ খাওয়াটাও হয়ে যাবে। তাই পিনাকী ঘরে বসে আইপিএল-এ মগ্ন থাকলেও আমি ওসব ফালতু জিনিসে মন না দিয়ে বারান্দা দিয়ে উঁকি-ঝুঁকি মারাতেই বেশি উত্সাহী ছিলাম। কিন্তু বর বা বরযাত্রী আসার তো কোনো লক্ষণই দেখলাম না।

রাত দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে করে শেষে রাতের খাওয়া খেয়ে টিকরাম সিং জীকে ব্রেকফাস্টের মেনু বলে শুয়ে পড়লাম। তখনও বিয়ের মন্ডপ ফাঁকা। কি রে বাবা? বিয়ে আজই তো নাকি? নানা রকম জল্পনা কল্পনা করতে করতে তো ঘুমিয়েই পড়লাম। ফাঁকে-ফোঁকরে বিয়ের ভোজটাও জুটলনা কপালে। এ আমি চিরদিন দেখে আসছি, ফ্রি তে কোনো কিছু আমার জোটে না। লোকে এটা কিনলে ওটা ফ্রি, সেটা কিনলে সারপ্রাইজ গিফট-কতো কি পায়। আমার বেলায় সারপ্রাইজ গিফটের মোড়ক খুলে গিফট এর বহর দেখে এত সারপ্রাইজড হতে হয় কি বলব। তা এহেন ফাটা কপালে কি করেই বা আর ফ্রি তে বিয়েবাড়ির ভোজ জুটবে? বিয়ে শুরু হলে আমি যেতামই যেতাম নিচে। পিনাকী না গেলে আমি একাই যেতাম। কিন্তু কি আর করব? কপালে ঘি না থাকলে আমি আর কত ঠকঠক করব? কপালে যে কি ছিল তখন তার আভাস পাইনি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে, বারান্দায় শেষ বারের মত উঁকি মেরে, কম্বলমুড়ি দিয়ে "ঘুমিয়ে পড়ি বাবা" বলে শুয়ে পড়লাম, কাল আটটায় মায়াবতী যাব।

কিন্তু মারে হরি রাখে কে? শুয়ে পড়লেই কি সকাল হয় সবসময়? আমারও হয়নি। লোহাঘাট পৌঁছে বাস স্ট্যান্ড থেকে দশ মিনিট হেঁটে KMVN বাংলোয় এসে পৌঁছেছিলাম সেটা আপনাদের বলেছিলাম। কিন্তু যেটা বলিনি সেটা হলো- দশ মিনিট কি আর খালি খালি হাঁটবো পিঠে ব্যাগ নিয়ে? এই ভেবে পিনাকীর হাজার বারণ সত্বেও লোহাঘাট বাজারের রাস্তার ধারের দোকান থেকে আড়াইশ গ্রাম গরম জিলিপি লোভে লোভে প্রায় একাই খেয়েছিলাম, আর তারপর দুপুরে চিকেন কারি (দারুন ভালো স্বাদ আর দারুন ভালো ঝাল) এবং সঙ্গে সঙ্গতে বিচ্ছিরি স্বাদের খাবার জল। জল আমরা বাইরে গেলে কিনেই খাই। কিন্তু সেদিন বোধহয় কোনো পূর্বকৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার কথা লেখা ছিল কপালে তাই জল কেনা হয়নি। রাত দুটো নাগাদ আমার পেটে কত্থক নৃত্য শুরু হলো। শুরু তো হলো কিছুতেই আর শেষ হয়না। গোটা তিনেক ওষুধ পড়ে গেল, আমার একার এবং সাথে একবিয়েবাড়ি লোকজনের সৌজন্যে বাথরুমের কলে জল শেষ হয়ে গেল এমন কি ভোর রাত্রে ঢোল বাজিয়ে গান গেয়ে গেয়ে বিয়েও শেষ হলো। শেষ হলো না শুধু আমার পাপ। যাই হোক কোনক্রমে ভোর হলো। টিকরাম সিং জী কে বলে বাথরুমে জলের ব্যবস্থা করে, তার আনা অমৃতসম ব্রেকফাস্ট-এর দিকে করুন দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে ফিরিয়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত মায়াবতীর জন্য বেরোলাম দশটা নাগাদ।

মায়াবতীতে অদ্বৈত আশ্রমে কি আছে, কেন গেছি এসব আর বলছি না। যেকোনো ট্রাভেল গাইড বা গুগলকে জিজ্ঞাসা করলেই বলে দেবে। আমি বরং আপনাদের কয়েকটা ছবি দেখাই। সেদিন আমার বেশি নড়াচড়া করতে ইচ্ছে করছিলো না আর ভারী ক্যামেরা বইবার মত শারীরিক ক্ষমতা ছিল না, তাই টলতে-টলতে মোবাইলে তোলা কতগুলো সোজাসাপটা অশৈল্পিক ছবি দেখাই।

মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রম
আশ্রমের প্রেস ও ডাকঘর ভবন, এখান থেকেই আশ্রম প্রকাশনীর বই পত্র বিক্রি হয় নামমাত্র দামে। আমরা তিনশ টাকায় আটটা বই কিনেছিলাম।
এই যে সেসব বই, আপনাদেরকে দেখাতে শ্রীমান পিনাকীচরণ আমায় এই ছবিটি তুলে দিল এখুনি।
 আশ্রম চত্বরের পশ্চিমমুখো ব্যালকনিটা দারুন। নিচে একপাহাড়ভর্তি আদিম জঙ্গল। দেখলেই মনে হয় এখুনি ডাইনোসর বেরিয়ে আসবে। আগের দিন Abbott মাউন্ট-এর ওই কেয়ার টেকার ভদ্রলোক বলছিলেন যে এখনও নাকি নিচে থেকে চিতা উঠে আসে মাঝে মাঝে। তখন কথাটা বিশ্বাস হয়নি পুরো মাত্রায়। এখন এই জঙ্গল দেখে তো মনে হচ্ছে হতেও পারে। দেখুন একবার।



আর আশ্রমে তো অজস্র ফুল। বাগান দেখে তো আমি আপ্লুত। মায়ের জন্য মন খারাপ করছিল। মা এত বাগান-ফুল ভালোবাসে, এখানে এই ফুলের সমাহার দেখেতো আনন্দে নাচত বোধহয়। আমি তাই ওই লটকে পড়া শরীর নিয়েই মাকে পরে বাড়ি গিয়ে দেখাতে হবে বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফুলের ছবি তুলতে লাগলাম বিভোর হয়ে । এমনি পাগলের মত ছবি তুলছিলাম যে আশ্রমের এক মহারাজ তো আমায় হাসি মুখে জিজ্ঞেসই করে ফেললেন , "এত ফুলের ছবি তুলে কি হবে?" আর আমি যথারীতি হটাত করা প্রশ্নে ভেবলে গিয়ে হেঁ হেঁ করা ছাড়া আর কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। আপনারাও দেখুন পাগল করা বাগান কিনা? এই যে কিছু ছবি।














তারপর বিবেক লেক দেখে, দুপুরে আশ্রমে পঞ্চব্যাঞ্জন দিয়ে ভাত খেয়ে (পেটের কথা ভুলে গিয়ে), অযাচিত ভাবে আলাপ করে প্রায় দু ঘন্টা আমাদেরকে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করা তিলকমহারাজের আশির্বাদ ও অমুল্য সঙ্গ পেয়ে মনে একটা তূরীয় ভাব নিয়ে ফিরে এলাম লোহাঘাট KMVN বাংলোতে।

বিকেল তিনটে নাগাদ পিঠে ব্যাগ নিয়ে ফের যখন শেয়ার জিপ ধরব বলে লোহাঘাট বাজার এর দিকে হেঁটে আসছি, হটাত রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাড়ির ভেতর থেকে চেনা গলায় যে যেন বলে উঠলো, "যা রাহে হ্যায় ম্যাম? হ্যাপি জার্নি। "দেখি আমাদের গত দুদিনের গাড়ির ড্রাইভার নবীন (বা নাভিন)। মায়াবতীর ওই ঘোর আর মনের তূরীয় ভাবটা বোধহয় তখনও কাটেনি। দুম করে তার "হ্যাপি জার্নি"-র উত্তরে ক্যাবলার মত বলে ফেললাম, "হ্যাঁ, হ্যাপি জার্নি" । কত আর বলব নিজের ক্যাবলামির কথা।

এই হলো মোটামুটি আমাদের লাস্ট মায়াবতী ভ্রমনের অমূল্য অভিজ্ঞতা। ওহ, আরো একজনের কথা জানিয়ে রাখি। মায়াবতী আশ্রমে তিলক মহারাজ ছাড়াও আরো একজন আমাদের সাথে যেচে আলাপ করেছিলেন। তিনি একজন কবি। এবং তার পর থেকেই আমি উদীয়মান কবিদের দেখলে শত হস্ত দূরে থাকার চেষ্টা করে থাকি। তাঁর কথা অন্য কোনো একদিন অনেক সময় নিয়ে গুছিয়ে বলা যাবে। মহাপুরুষদের কথা কি আর যেমন তেমন ভাবে বলা যায় বলুন?

Tuesday, 15 July 2014

লোহাঘাট-মায়াবতী-২........অবশেষে লোহাঘাট

মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কি মারাত্মক রকম বিভ্রাটের মধ্যে দিয়ে লোহাঘাট যাবার ডিসিশনটা নেওয়া হলো তা তো লোহাঘাট-মায়াবতী প্রথম পর্বেই বলেছি আপনাদের। সেদিন তো আমরা সন্ধ্যে পৌনে সাতটার অফিসফেরত যাত্রীদের ভিড়ে-ভিড়াক্কার মেট্রোতে উঠলাম। কিন্তু তখনও জানি না যে কোথায় নামব। কারণ বলেছিলাম না যে টিকিট কনফার্ম হলে হরিদ্বার, না হলে লোহাঘাট। অর্থাত প্রথম ক্ষেত্রে নিউ দিল্লি রেল স্টেশন, না হলে আনন্দবিহার বাস ট্যার্মিনাস। এবং সমস্যাটা হলো, ট্রেনের scheduled time রাত বারোটা। এবং IRCTC র নিয়মানুসারে ফাইনাল প্যাসেঞ্জার লিস্ট আমাদের মত দুর্ভাগারা জানতে পারবে ট্রেন ছাড়ার মাত্র দুটি ঘন্টা আগে। অর্থাত রাত দশটার আগে কোনো মতেই নয়। এখন এই পৌনে সাতটার মেট্রোতে চিঁড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে দাঁড়িয়ে দুজনে ক্লাস টুয়েলভের trigonometry র প্রবলেম solve করার মত করে স্টেপ বাই স্টেপ logically ভাবতে থাকি। ফার্স্ট লাইন অফ সল্যুশন: এক্ষেত্রে দুটি বিকল্প পথ আমাদের কাছে। পথ দুটি এবং তাদের সাম্ভব্য প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তিযোগগুলি খতিয়ে দেখে আমরা সেদিন যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলাম সেগুলি হলো-

(এত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলছি কারণ ক্লাস টুয়েলভের trigonometry র প্রবলেম solve কতে গেলে নাকি এরকম কঠিন কঠিন করেই লিখতে হয়, তখন তাই লিখতাম মাস্টারমশায়ের কথা বেদবাক্যি মনে করে। যাই হোক অঙ্কে মনোযোগ দেওয়া যাক)

১: সোজা নিউ দিল্লি স্টেশন এ নামা এবং রাত দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেখা টিকিট কনফার্ম হচ্ছে কিনা

প্রাপ্তি: টিকিট কনফার্ম হোলে সোজা বারোটার ট্রেনে করে পরদিন ভোরে হরিদ্বার। এবং সন্ধ্যেবেলা গঙ্গার ঘাটে ফুরফুরে হাওয়ায় বসে গঙ্গারতি দেখে পুন্যার্জন করা।

 অপ্রাপ্তি: আর যদি ভগবানের দয়ায় টিকিট কনফার্ম না হয় (এটাই চাইছিলাম আমি), তবে রাত দশটায় তল্পি-তল্পা নিয়ে ফের মেট্রো ধরে রাজীব চক হয়ে আনন্দবিহার পৌঁছাতে মিনিমাম রাত এগারোটা। ততক্ষণে টনকপুর যাবার শেষ বাসটাও ছেড়ে চলে যাবে না তো ? তখন তো মাথা চুলকে আবার ভাবতে হবে আর কোথাকার বাস আছে যাবার মত? সেখানে গেলে থাকতে পাব তো? ই ই ই ই ই !!!!!!! হাতে তো তখন স্রেফ ঝুলপড়া একটি আস্ত হ্যারিকেন ছাড়া কিছুই থাকবে না!!!

২. এক্ষুনি রাজিবচকে নেমে সোজা আনন্দবিহারের মেট্রো ধরা:

প্রাপ্তি: সেক্ষেত্রে রাত নটার মধ্যে আনন্দবিহার। ওখানকার হাল-হকিকত, বাস-টাস দেখে উঠে বসা। দশটার সময় ট্রেনের টিকিট কনফার্ম হলে চাইলে স্টেশনে ফিরে বারোটার ট্রেন ধরার জন্য যথেষ্ট সময়ও থাকবে। না চাইলে বা টিকিট কনফার্ম না হোলে সো ও ও ও ও জা রাতের বাসে করে ভোরবেলা টনকপুর। সেখান থেকে লোহাঘাট।

অপ্রাপ্তি: কিচ্ছু নেই। কারণ আমি প্রথম থেকেই আমি এটাই চেয়েছিলাম। তার একটা কারণ অবশ্যই যে, আমি হরিদ্বার আগে গেছি যেমন সবাই যায় আর লোহাঘাট যাইনি। আর দ্বিতীয় ও প্রধান কারণটা হলো লোহাঘাটের উচ্চতা হরিদ্বারের চেয়ে অনেক বেশি তাই হিসেব মত সেখানে গরমটা হরিদ্বারের চেয়ে কম থাকার কথা। কিন্তু তাও কেন আমায় অল্টারনেটিভ ব্যবস্থার কথা ভাবতে হচ্ছে তার কারণটি হলো আমার পরম সাহসী সহযাত্রীটি। বিশদ ব্যাখ্যা ক্রমশঃ প্রকাশ্য।

অতএব, প্রবল বাদানুবাদ-যুক্তি-পাল্টা যুক্তি ইত্যাদির পর যখন প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ব্যাখ্যানুসারে, দ্বিতীয় পন্থাটিই অবলম্বন করা হবে স্থির করা হলো ততক্ষণে দেখি ট্রেন গুড়-গুড় করে কোন একটা স্টেশনে ঢুকছে। এতক্ষণ আমরা দুজন বাইরে তাকাবার সময় পাইনি তাই ভাবলাম দেখি কোন স্টেশন, এত লোকজন কেন?
তারপর? হেঁ হেঁ তার পরের দুমিনিটে যেটা হলো সেটা ঠিক ভাষায় ব্যাখ্যা যোগ্য নয়। কারণ স্টেশনটা ছিল রাজীব চক। গত চল্লিশ মিনিটের আলোচনা অনুসারে যেখানে আমাদের নামা উচিত। আর আমরা আছি ট্রেনের যেদিকে প্লাটফর্ম পড়েছে তার ঠিক উল্টোদিকে। দরজার কাছে পৌছতে গেলে দুটো গাবদা-গাবদা ব্যাকপ্যাক সহ আমাদের প্রায় একশ জন লোককে টপকাতে হবে। এবং সেটা করতে হবে প্লাটফর্ম থেকে লোক ওঠা শুরু হবার আগেই। কারনটা যাঁরা শুক্রবারের রাত আটটায় দিল্লির রাজীবচক স্টেশন থেকে ওঠানামা করেছেন তাঁদের আর বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। আর যাঁদের পুর্বজন্মকৃত অশেষ পুন্যবলে সে দুর্ভাগ্য হয়নি তাঁদের জন্য বলি, চতুর্থীর দিন সন্ধ্যে সাতটায় গড়িয়াহাট মার্কেটে যত লোক থাকা সম্ভব সবাইকে যদি ধরে বেঁধে টালিগঞ্জ মেট্রো স্টেশনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় তবে যে অবস্থা দাঁড়ায় সেটা থেকে খানিকটা আন্দাজ পাবেন। সুতরাং বুঝতেই বেশ একটা adventure সুলভ মনোভাব নিয়ে যে যার ব্যাগ সামনে নিয়ে সামনের লোকজনকে অসভ্যের মত ঠেলতে ঠেলতে দরজার দিকে এগোনোর চেষ্টা করতে থাকলাম। মনে একটায় আশা, এখানে লোক ওঠেও যেমন-নামেও সেরকম তাই ট্রেন থামলে সামনেটা হয়ত খালি হতে পারে।

ট্রেন থামলে আমি নেমে আসতে পেরেছিলাম সেদিন ঠিকই কিন্তু ব্যাগটা প্রায় ভিড়ের টানে হাতছাড়া হয়ে যাবার যোগাড় হয়েছিল। শেষ মুহুর্তে হ্যাঁচকা টানে দুজন নিরীহ ভদ্রলোককে প্রায় স্টেশনে ফেলে দিয়ে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। আর পেছনে অজস্র লোকের গালাগালি শুনতে শুনতে মেট্রোর প্লাটফর্ম চেঞ্জ করেছি।

দ্বিতীয় মেট্রোতেও সমান ভিড়। উঠে কোনক্রমে দরজার পাশে ব্যাগসহ নিজেকে আবিস্কার করলাম একগুচ্ছ সদ্য স্কুল পেরোনো ছানা-পোনাদের মাঝে। পিনাকী নিজের বাহুবলেই বোধহয় আরো খানিকটা ভেতরে ঢুকতে পেরেছে। মোটামুটি লোকজনের ঠেলা খেতে খেতে সিধে হয়ে দাঁড়িয়ে যখন আগের মেট্রো থেকে নামতে গিয়ে কি কি অসভ্যতা করেছি ভেবে মনে মনে লজ্জিত হব হব, তখন চোখ পড়ল আমার চারপাশের সেই ছানা-পোনাগুলোর ওপর। একখানা মোবাইলে চার জন মিলে একটাই গেম নিয়ে টানাটানি করছে। দলে একটিমাত্র মেয়ে এবং বাকি তিনজন ছেলে। অতএব শেষ পর্যন্ত দৃশ্যটা এরকম দাঁড়ালো, মেয়েটির হাতেই মোবাইল বাকিরা তার ঘাড়ের ওপর দিয়ে উঁকি মারছে।

পিনাকী সামনাসামনি না থাকায় আমি আশেপাশের লোকজনকে নিয়ে ঠারে ঠোরে কারো সাথে পিএনপিসি করতে পারছিলাম না বলে ভিড়ের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে বেশ বোর হচ্ছিলাম। ভাবলাম, ওদের সাথে মোবাইল গেমিং করি না কেন। বেশ টাইমপাস হয়ে যাবে। ভেবে আমিও মেয়েটির ঘাড়ের ওপর দিয়ে মোবাইলের স্ক্রীনে চোখ রাখলাম। এবং ঠিক এক মিনিট বাদেই জীবনে সাতহাজার সাতশ সাতাত্তরতম বারের মত realize করলাম যে, পকেটে স্মার্টফোন থাকলেও আমি হচ্ছি পৃথিবীর সেরা আনস্মার্টদের একজন। কি অবিস্মরণীয় দক্ষতায় বাচ্চা মেয়েটি মোবাইল স্ক্রিন এর পুঁচকে গাড়িটাকে এদিক ওদিক করে অন্যসব কিছু থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে ছুটছিল, বাপরে! আমি হলে তো.......যাক সে কথা। নিজের অপার আনস্মার্টনেসের দুঃখে বোধহয় একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল। মেয়েটি হটাত ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালো। আমি চোখ সরিয়ে অন্য দিকে তাকাতে তাকাতেই শেষ মুহুর্তে সে দেখে ফেললো আর আমি তার দিকে তাকিয়ে ভেবলুর মত হেসে ফেললাম।........ সেও হাসলো। ব্যাস, আর কোনো চিন্তা নেই। এবার আর লুকিয়ে চুরিয়ে দেখতে হবে না। অনুমোদন যখন পেয়েই গেছি তখন আর কি? মেয়েটি নামা পর্যন্ত সে খেললো আর আমি তার বাকি তিনজন বন্ধুর সাথে সাথে খেলা দেখতে থাকলাম। যতক্ষণ না তারা নেমে যায়।

তারা নেমে যাবার পর আনন্দবিহার মেট্রো স্টেশন এর ঠিক আগের স্টেশনে আমি বসার সিট পেলাম আর পিনাকীর জন্য পাশের সিটটা রাখতে গিয়ে আবিস্কার করলাম ভারতবর্ষের হারিয়ে যাওয়া আরো একটি উজ্জ্বল প্রতিভাকে। ভদ্রমহিলা যদি ভারতীয় ফুটবল টীমে থাকতেন তবে কে বলতে পারে গত তের তারিখের ফাইনাল ম্যাচটা আর্জেন্টিনা-জার্মানি না হয়ে ইন্ডিয়া-আর্জেন্টিনা বা ইন্ডিয়া-জার্মানি হতে পারত। কি অদ্ভূত দক্ষতায় শৈল্পিক ভাবে পিনাকীকে ডজ করে, আমার একটা পা মাড়িয়ে ভদ্রমহিলা আমার পাসের সিটটা দখল করলেন। দেখে আমি দু চার সেকেন্ড হা আ আ করে তাকিয়ে থেকে পিনাকীর দিকে তাকিয়ে খিক খিক করে হাসতে থাকলাম। দেখে আমাদের ফুটবলার আন্টি একটু লজ্জা লজ্জা পেলেন বলে মনে হলো। জাঁকিয়ে বসলেন।

এইসব দুর্ধর্ষ এডভেঞ্চার সেরে তো আমরা শেষ পর্যন্ত আনন্দবিহার বাস ট্যার্মিনাসে পৌছলাম। ওহ, বলা হয়নি, পুরো প্রসেসটার মধ্যে দুটো কাজ আমায় বিনা বিরক্তিতে continuously করে যেতে হয়েছিল প্রথমটা হলো প্রতি আধঘন্টা অন্তর আমার ব্যস্তবাগীশ বাবার ফোন রিসিভ করা এবং ব্যাখ্যা করে বলা যে কেন এখনো আমরা জানিনা শেষ পর্যন্ত আমরা কোথায় চলেছি। আর দ্বিতীয় কারনটা হলো আমার জুতোর ভেলক্রোটা হাঁটতে গেলেই প্রতি তৃতীয় স্টেপে খুলে যাচ্ছিল ফলে আমায় পিনাকীর পেছন পেছন ছুটতে গিয়ে প্রতি মিনিটে একশ বার করে নিচু হয়ে জুতোর পরিচর্যা করতে হচ্ছিল। সারা ট্রিপেই আমায় এই দ্বিতীয় কাজটা করে যেতে হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত তো রাত ন'টা নাগাদ কাঙ্খিত বাসে উঠে বসলাম। এবং পিনাকীকে বোঝাতে সমর্থ হলাম যে তত্কালে যাঁরা টিকিট কাটেন পাগলা কুকুরে না কামড়ালে তাঁরা টিকিট সাধারণত ক্যানসেল করেন না। অতএব, আমাদের টিকিট কনফার্ম হবার কোনো চান্স নেই। তার চেয়ে ফাঁকা বাসে সিট ফিট ঝাড়াই বাছাই করে গুছিয়ে বসে চিপস- কোল্ডড্রিংক খেতে খেতে অন্য যাত্রীদের নিয়ে ফিসফিস করে পিএনপিসি করতে করতে ভোরবেলা টনকপুর পৌঁছানো অনেক ভালো। আর তার দ্বিতীয় চিন্তা হলো যে বাসে সহযাত্রীরা ঠিক কেমন হবে? যদি গন্ডগোল হয়? সেটাও অনেক ভুজুং ভাজুং দিয়ে বোঝানো গেল যে এই বাস মিস করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। অনেক নখ-টখ কামড়ে, মাথা-টাথা চুলকে ভদ্রলোক শেষে রাজি হলেন ট্রেনের আশা ছাড়তে। আমিও 'জয় মা' বলে ব্যাগ-ফ্যাগ তুলে দিয়ে জনমানবহীন বাসে ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে সিটের আর ব্যাগের দখলদারি করতে থাকলাম। আর তিনি গেলেন খাবার-দাবারের বন্দোবস্ত করতে। বাবাকে লেটেস্ট আপডেট দিতে ভদ্রলোক খুব নিশ্চিন্ত হলেন। এতক্ষণ বোধহয় ভেবে কোনো কুল কিনারা পাচ্ছিলেন না যে এরা দুটোতে ঠিক কি করতে চাইছে। দেখি আবার আমাদের পুরনো বাসভ্রমনের প্রসঙ্গ তুলে দুচারটে রসিকতাও করছেন। বোঝা গেল মেজাজ খুশ।

বাসে আর বিশেষ কিছু ঘটনা ঘটেনি। কেবল পৌনে দশটায় বাস ছাড়ার সময় দ্রব্যগুণে সমৃদ্ধ একটি বছর পঁচিশের ছেলে তার বন্ধুকে বাসে তুলে দিতে এসে অন্ততঃ পাঁচবার বাসে উঠে একবার করে টাটা বলে আবার নেমে যাচ্ছিল। আর বাস ছাড়ার পনের মিনিটের মাথায় একটি অন্ধকার ধাবায় দাঁড় করিয়ে যখন ড্রাইভার আর বাকিরা চা খাচ্ছিলেন তখন বাসের মধ্যে openly বাদাম বিক্রি করার মত করে ঠান্ডা বিয়ার বিক্রি করছিল আট থেকে বারো বছরের দুটি বাচ্চা। এ জিনিস আমি আগে কখনো দেখিনি। বাসে করে প্রায় সারা উত্তর ও দক্ষিনভারত ভ্রমন করেও। নতুন অভিজ্ঞতা। যাই হোক, হওয়া খেতে খেতে, ঢুলতে ঢুলতে, হ্যা-হ্যা, হি-হি করতে করতে মাঝরাতে রোডসাইড ধাবায় জমিয়ে খাওয়া দাওয়া করে ভোর পাঁচটায় টনকপুর।

টনকপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে শেয়ার অল্টো গাড়িতে করে তিন ঘন্টায় লোহাঘাট। মাঝে গাড়ি থামিয়ে পাহাড়ি দোকানে গরম রুটি আর সবজি। অমৃত। লোহাঘাট বাজারে আমাদের নামিয়ে দিল গাড়ি। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে দশ মিনিটে KMVN বাংলো। দারুন ভালো ব্যাপার। এই যে ছবি দেখুন।


সুন্দর পুরনো সরকারী বাংলো। আর তার সুন্দর কেয়ারটেকার টিকরাম সিং জী। অপূর্ব তাঁর রান্নার হাত। বুদ্ধদেব গুহর কোনো লেখায় বোধহয় পড়েছিলাম যে সরকারী বাংলোর কেয়ারটেকার এর cv তে ভালো রান্না জানাটা মাস্ট। সেটার প্রমাণ আরো একবার পেলাম। দুর্ধর্ষ একটা চিকেন কারি খেয়ে। তারপর এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতির শোভা দেখতে দেখতেই Abbott মাউন্ট (লোহাঘাট এরিয়ার highest পয়েন্ট ) নিয়ে যাবার জন্য নবীন ভাই (নাকি নাভিন?? জানি না বাবা !) এসে গেল গাড়ি নিয়ে।



তারপর তো সেখানে গিয়ে দেখি দুরের পঞ্চচুল্লি ইত্যাদি প্রভৃতি রথী মহারথী তো দূরস্থান, কোনো কিছুই দেখা দিলেন না। শুনলাম নাকি নিচে জঙ্গলে আগুন লেগেছিল দুচার দিন আগে তার ধোঁয়ার জন্য সবাই পর্দানশিন। আমরা অবশ্য সম্পূর্ণ বিফল হইনি। দারুন একটা সূর্যাস্ত দেখে, ওখানকার নির্মীয়মান সরকারী বাংলোর চৌকিদারের বানানো চা আর ম্যাগি খেয়ে, চৌকিদারের দুই প্রচন্ড বন্ধুত্বপূর্ণ কুকুর 'সার্বু' আর 'ডোংরী'র সাথে অনেকক্ষণ খেলাধুলা করে প্রচুর ছবি তুলে (আপনাদেরও কয়েকটা দেখালাম নিচে) সেদিনের মত ফিরে এলাম বাংলোয়। কাল যাব মায়াবতী

সার্বু 
ডোংরী   
 Abbott মাউন্টে 
Abbott মাউন্টে সূর্যাস্ত 


লালে লাল

Monday, 14 July 2014

হলুদ আলোর বৃত্ত

একটু দূর থেকে আসছিল হলদেটে আলোটা
উত্সমুখে আলোটার ঔজ্জ্বল্য যদিও ছিল চোখে পড়ার মতো,
কিন্তু রাতের অন্ধকারে সবুজ জঙ্গলের ওপর দূরের ওই হলদে আলো
কেবলমাত্র একটা আবছায়া সৃষ্টি করছিল মাত্র।
মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনতলার ঝুলবারান্দা থেকে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম দুটো দিকই
ডানদিকের চকচকে উজ্জ্বল হলুদ আলোর স্তম্ভ,
এবং তার সাথে সাথে বামদিকের আবছায়া জঙ্গল।

মধ্যরাতের নিঝুমতার সাথে তাল মিলিয়ে নিশ্চুপ ছিল চরাচর।
এমনকি জঙ্গলের দিক থেকে ভেসে আসছিল না কোনো রাতজাগা পাখির আর্তনাদও
ডানদিকে আলোক স্তম্ভের ঠিক নিচেই দেখছিলাম রাত প্রহরার দায়িত্বে থাকা মধ্য চল্লিশের লোকটিকে
কি অদ্ভূত ভাবে দুই পা ছড়িয়ে এলিয়ে দিয়েছে শরীর, প্রায় ভেঙ্গে আসা চেয়ারটির ওপর
যাতায়াতে দেখেছি চেয়ারটাকে, কোনো এককালে লাল রং ছিল
আজ আর চেনা যায় না, কালচে-ধূসর ময়লাটে
আধভাঙ্গা হাতলদুটোর পাশ দিয়ে ঝুলছিল দুটো হাত, শিরাওঠা।
পাশে কোনক্রমে ঠেকনা দিয়ে রাখা রাত প্রহরীর একমাত্র আত্মরক্ষার অস্ত্র,
লম্বা তেল চুকচুকে একটা লাঠি, সঙ্গে একটা টর্চ।

প্রতি রাতেই বদলে যায় রাতপ্রহরী
বদলায় না শুধু রাত-প্রহরার এই নগন্য সরঞ্জাম।
সেই এক আধভাঙ্গা চেয়ার, তেলতেলে লাঠি আর টর্চ।
মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে লাঠির আওয়াজ পাই কনক্রিটের ওপর।
শুনেছি এই জঙ্গলে নাকি আছে ছোটখাটো হিংস্র জন্তুও
মানুষের ওপর আক্রমনের বদনাম তাদের না থাকলেও, তাদের নিরীহ জীবনযাপনই
এই ছোট্ট পাঁচিল ঘেরা জায়গাটির বড় বড় মানুষজনকে জুজু দেখানোর পক্ষে যথেষ্ট।
এসব জানা সত্বেও লোকটি বসে আছে জঙ্গলের দিকে পিঠ ফিরিয়ে,
টুকটাক আলো জ্বলা আমাদের এই পাঁচিল ঘেরা মানুষজনের দিকে মুখ করে।
যদিও সে ঘুমোচ্ছে কিন্তু তাও চটকা ভাঙ্গলে প্রথম তাকাবে সে জঙ্গলের উল্টো দিকেই।

হঠাত কেমন একটা অদ্ভুত নির্দয় চিন্তা খেলে গেল মাথার মধ্যে
হয়ত নিশ্চুপ রাতের মাদকতায় এমনি ভাবেই জেগে ওঠে অপরাধপ্রবণতা-পাশববৃত্তি, জানিনা।
কল্পনায় মনে হলো, এই নিথর বাতাসহীন রাতে-
আবছায়া জঙ্গল থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে কোনো শ্বাপদ।
গুঁড়ি মেরে এগিয়ে চলেছে চেয়ারে এলিয়ে পড়া তার নিশ্চিত শিকারের দিকে।
ঠিক যেমন করে দেখেছি গৃহস্থ বিড়ালকে অসতর্ক কোনো ছোট্ট চড়ুইয়ের দিকে এগিয়ে যেতে।
এই মুহুর্তে আমি ছাড়া কোনো সাক্ষী নেই এই নির্মম খাদ্যান্বেষণের।
মনে হলো এরকম হলে আমি ঠিক কি করতে পারি?
চিত্কার করে লোকটিকে সতর্ক করাটা আমার সহজাত কর্তব্য।
হয়ত আমার মনুষ্যসত্তা তাই করবেও।
কিন্তু সেই অভিশপ্ত মুহুর্তে, মনের পাশবসত্তা যদি সেই চিত্কারটুকু করতে না দেয়?
যদি মনে হয়, দেখিই না কেমন করে সম্পাদিত হত পৃথিবীর আদিমতম প্রবৃত্তি
যদি মনে হয়, দেখিই না কেমন করে আজীবন ঘুরে চলেছে খাদ্য খাদকের চক্র।

কয়েক মুহুর্তের জন্য রুদ্ধ হয়ে এল নিশ্বাস
মনে হলো চিত্কার করে বলি লোকটিকে-
'ভাই, দোহাই তোমার সজাগ থাক, পেছনে তাকাও।'
কিন্তু নিথর জঙ্গলের পাশে,
হলুদ আলোর বৃত্তকে লক্ষণরেখা করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা সেই রাতপ্রহরীকে বলিনি কিছুই।
কয়েকটি রুদ্ধশ্বাস মুহুর্তের পর স্বস্তির শ্বাস নিয়ে ফিরে এসেছিলাম ঘরে।
নিশ্চিন্ত হয়ে।

নীরবতা, রাতের আকাশ আর সেই হলুদ আলোর আবছায়া জঙ্গলের মায়ায়-
ঘোর লেগে যাওয়া নিথর পৃথিবী বোধহয় আমায় নিশ্চিন্ত করেছিল তখন,
বলেছিল, বিপদ যতটুকু তা সবই ওই পাঁচিল ঘেরা মানুষজনের দিক থেকে।
জঙ্গলের শ্বাপদের সাহস নেই এই হলুদ আলোর বৃত্তকে পার করার।
তাই তো প্রহরা ও প্রহরী দুজনের মুখ কেবল উল্টোদিকেই।

পরম নিশ্চিন্ততায় কেবল একটি লাঠিমাত্র সম্বল করে রাতের আবছায়া জঙ্গলকে পিঠের দিকে নিয়ে
অবলীলায় ভাঙ্গা চেয়ারেই এলিয়ে ঘুমোতে থাকে সেদিনকার রাতের প্রহরী।    

Sunday, 13 July 2014

উফফ কি গরম!!!


 সারাদিনের সূর্যদেব এরকম ভাবে মিচকে মিচকে হেসে গেছেন। 

আর আমি দুপুরে ভাত চিকেন সাঁটিয়ে দরজা জানালা বন্ধ করে ঘামে গরমে সূর্যদেবের শাপশাপান্ত করে শেষে ক্লান্ত হয়ে এইভাবে কেতরে পড়েছিলাম  


কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিনা ভাবছি ল্যাবের আইস মেশিন থেকে একবালতি আইস এনে রাতে এইভাবে শুয়ে try করে দেখব ঘুমোতে পারি কিনা।


 আগামী তিন দিন গরম কমার কোনো লক্ষণ নেই। সেটা নিচের তথ্য দেখেই বোঝা যাচ্ছে।


আপাতত বুধবারের দিকে তাকিয়ে বসে আছি কারণটা আশা করি বুঝতে পারছেন। ঐদিন থেকে তিন চার দিন সূর্যের বদলে মেঘ আর দুটো করে নীল নীল দাগ দেখা যাচ্ছে। ওটার মানে যদ্দুর জানি বৃষ্টি। যদিও মাঝে মাঝেই ওটা দেখা যায় আবহাওয়া পূর্বাভাসে কিন্তু বৃষ্টির ছিটেফোঁটাও থাকে না সেদিন। তাও 'আশায় মরে চাষা'। দেখা যাক কি হয়।


গরমের চোটে বিশ্বাস করুন অনেক হাবিজাবি গল্প আপনাদেরকে শোনানোর ইচ্ছে থাকলেও কিছুই লিখতে ইচ্ছে করছে না। দুপুরে গরমে ঘেমে নেয়ে প্রায় গলে জল হয়ে গেলেও ওই তাপমাত্রাতেও কি করে জানিনা খানিকটা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মানে, কি করে বলতে, যেমন করে আমি ঘুমিয়ে থাকি আর কি। আপনাদের আর কি বলব। ঘুমোনোর লজ্জাকর গল্প তো আগেই আপনাদেরকে বলেছি

তা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে একটা স্বপ্ন দেখলাম যে আমি বরফঢাকা জায়গায় লাফিয়ে বেড়াচ্ছি। চিকেন আর গরম একসাথে কাজ করেছিল কিনা জানি না। সে যাই হোক, আমায় ঠিক এরকম দেখাচ্ছিল তখন।



ঘুম থেকে উঠে মেজাজটা এত বিগড়ে গেল কি বলব। কিছু করতে ইচ্ছে করছে না তখন থেকে। তাই এখন লিখতে বসে মনে হলো থাক কাল বলব। গরমের চোটে কি বলতে কি বলব। বিরক্ত লাগছে। ঠিক এই অবস্থায় বসে আছি তখন থেকে।


এত গরম ভাবছি তিব্বতেই চলে যাব। ভাল্লাগেনা। আজকের মত টাটা। ভালো করে সবাই আর্জেন্টিনা-জার্মানির হয়ে গলা ফাটান। ততক্ষণের জন্য টাটা। যদি গরমে বেঁচে-বর্তে থাকি তবে কাল কথা হবে।

সমস্ত ছবি Google বাবুর সৌজন্যে।

Saturday, 12 July 2014

লোহাঘাট-মায়াবতী-১,......উদ্যোগ পর্ব

চার-পাঁচ মাস একটানা পরিশ্রমের, মানে গোদা বাংলায় ঘসটানোর পরও যখন এক্সপেরিমেন্টের এক শতাংশও পজেটিভ রেজাল্ট এলো না এবং দিন কে দিন আমাদের মেজাজও হরিয়ানার রুক্ষ গরমকে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলল, তখন ল্যাব ছেড়ে ধুত্তেরি বলে বেরিয়ে পড়া ছাড়া আর কী বা করার থাকে? অগত্যা মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আর সহ্য করতে না পেরে শ্রীমান পিনাকীচরণ ঘোষণা করলেন যে, "এই উইকএন্ড এ যাবই যাবো। তুই না গেলে আমি একাই যাবো।" বলে কি রে !!!! আমার বলে কিনা বারো মাসের এগারো মাসই ঘুরে বেড়াতে পারলে ভালো হয়, আর বলে কিনা একাই যাবো? কী কান্ড!

তো মোটামুটি বুধবার থেকেই এক্সপেরিমেন্টগুলো এমন ভাবে ফাঁদলাম যে, কোনো মতেই শুক্রবার সন্ধ্যে পাঁচটা থেকে সোমবার সকাল এগারটার আগে আমায় ল্যাবমুখো না হতে হয়। সেদিন থেকেই মনটা বেশ ফুরফুরে বোধ হতে শুরু করলো । মানে মাথার গজালগুলোকে বেশি পাত্তা না দিয়ে গুগল এ সার্চ দিলাম - ‘weekend gateways from Delhi’। কিন্তু যাবোটা কোথায়? জায়গা পছন্দ হয় তো ট্রেন/বাসে টিকিট নেই। টিকিট আছে তো, মনে বাসে আরকি, সেই বাস এমন জায়গায় নিয়ে গিয়ে ফেলবে যে সে জায়গায় যাবার চেয়ে গুরগাঁও এর শপিং মলে ঘোরাঘুরি করা ঢের ভালো। বেশ শরীর ঠান্ডা হবে।

ভেবে ভেবে যখন দুদিন পিনাকীর আঙ্গুলের নখ আর আমার রাতের ঘুম উড়ে যাবে যাবে এমন সময় এক সহকর্মী বলল, "তোমাদের যদি বাড়িতে ঘুমোতে ইচ্ছা না করে তো দিল্লী গিয়ে হোটেল বুক করে থেকে যেতে পারো।" কী অপমান-কী অপমান!!!! আমি যে বেরিয়ে পড়ার পোকা, সে হেন আমি কিনা দিল্লী-র মতো জংশন থেকে একটা weekend ট্রিপ এর ভেন্যু ঠিক করতে পারছি না। নিজেকে বেশ খানিকটা ছি ছি করে ভাবলাম হরিদ্বারেই যাবো, হোক ভিড়, না হোক হিল স্টেশন। যাবই। তত্কালে টিকিট বুক করবো বলে দুই মক্কেল বৃহস্পতিবার ঘুম ঘুম চোখে দুটো ল্যাপটপ খুলে প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলাম IRCTC র দয়া পেতে। ল্যাবের দেরি হছে। পিনাকী বলল- "তুই চলে যা ল্যাবে, আমি এগারোটা পর্যন্তও দেখে আসছি।" এরপর কী হলো সেটার বিশদ ব্যাখ্যার দরকার নেই, যাঁরাই IRCTC র ওয়েবসাইট থেকে তত্কালে টিকিট কাটেন মানে কাটার চেষ্টা করেন আর কি, তাঁরা সবই জানেন কী কী হতে পরে। বলাই বাহুল্য টিকিট পেলাম না। মানে পেলাম, waiting আট আর নয়। বাসের চেষ্টা করা হলো কিন্তু সেরকম suitable বাস মিলল না। টাইম, প্লেস অফ বোর্ডিং ইত্যাদি ঠিক মনের মতো হলো না। পিনাকী বলল, "waiting আট, নয় হয়েও যেতে পারে বুঝলি!" বুঝলাম। আবার সার্চ…. সার্চ….সার্চ। কোথায় আছে এমন সে দেশ যেথায় যেতে সময় লাগে কম, পয়সা লাগে কম, টুরিস্ট যায় কম, মে মাসে হরিয়ানার গরমকে কাঁচকলা দেখাবার মতো উত্কৃষ্ট ও মানানসই টেম্পারেচার এট্সেটরা এট্সেটরা। অতএব বোঝাই যাচ্ছে যে সার্চটা খুব সহজ হয়নি।

সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ঠিক হলো ল্যান্সডাউন যাবো। বেশ বেশ। বেশ সাকসেসফুল মনে হছে নিজেকে। তিন দিন এর চেস্টায় একটা জায়গা তো ঠিক করেছি দুই বাহাদুরে মিলে। সেদিন রাতে দুজনের দুটি ব্যাকপ্যাকে ঠুসে জিনিসপত্র ঢুকিয়ে সব রেডী করে শুতে গেলাম। মানে মেঝেতে জল ঢেলে-মুছে-দুটো বালিশ টেনে নিয়ে শুলাম। এটাই মে থেকে মিড অগাস্ট পর্যন্ত আমাদের বিছানা। সেদিন রাতে আমার ঘুম এবং পিনাকীর নখ দুটোই অক্ষত ছিলো। পিঠের দিকে মেঝের গরম আর ওপর থেকে ছাদের গরমে sandwich হতে হতে, 'কালকে বেশ হিল স্টেশনের দিকে যাবো' এটা ভাবলেই ফ্যানের হাওয়াটা বেশ মধুর মনে হচ্ছিল।

পরদিন ঘুম থেকে উঠে ভাবলাম ভ্রমনে ল্যান্সডাউন সম্পর্কে একটু দেখে নেওয়া যাক। কী হোটেল, কতো দাম, ইত্যাদি ইত্যাদি। ভ্রমন খুলে মাথায় হাত।নেই নেই কোত্থাও নেই ল্যান্সডাউন। আঁতিপাঁতি করে তিন চারবার খোঁজাখুঁজি করে দেখে নিশ্চিন্ত হলাম যে আবার আমায় ল্যাপটপ খুলতে হবে। খুললাম। ল্যান্সডাউনে একটি হোটেল মনোমতো হলো যেটি আমাদের বাজেটের এর মধ্যে। বাকিরা সব বড়দের জন্য। তো সেই ছোটদের হোটেলে ফোন করলাম এবং জানলাম যে পৃথিবী সুদ্ধু সক্কলে ঐদিন আন্ডা-বাচ্চা-বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে ল্যান্সডাউনই যাচ্ছে আর গিয়ে ওই হোটেলেই উঠছে। সুতরাং "ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ছোটো সে হোটেল।" এবং বাকি হোটেলগুলোর tariff-এ লেখা সংখ্যার দিকে তাকালে মনে হয় "হবে নাই, হবে নাই, ছোটো সে পকেট।"

মুখটা বোতলের মতো করে পিনাকীকে ঠেলা মেরে বললাম, "ওঠ রে, আমরা তিন দিন আগে যে জায়গায় ছিলাম আবার সেই জায়গাতেই ফিরে এসেছি, আমাদের ভেন্যু ঠিক করতে হবে- আমরা আজ সন্ধ্যেতে ঠিক কোথাকার বাস ধরবো।"  ঘুম থেকে উঠেই এরকম একটা সুসংবাদ শুনে সে বেচারা ঘাবড়ে গেল দেখে তাকে সান্ত্বনা দিতে বলি-"একটা প্লাস পয়েন্ট যে, আমাদের ব্যাগ গোছানো কমপ্লিট। একটা কাজ তো এগিয়ে আছে। ডেস্টিনেশনটা ঠিক নেই তো কী হয়েছে।" শুনে সেও উদীপ্ত হয়ে হাই-টাই সামলে ভ্রমন ও ল্যাপটপ নিয়ে বসলো।

হরিদ্বারে হোটেলে ফোন করে জানা গেলো যে, সেখানে জায়গা আছে।  অতএব, আমাদের হরিদ্বারের ট্রেনের টিকিট কনফার্ম হলে আমরা হরিদ্বার যাবো নইলে ……..ঘন্টা দেড়েকের ধস্তাধস্তির পর ঠিক হলো আমরা লোহাঘাট যেতে পারি। ওখান থেকে মায়াবতী যেতে পারি। গুড। তা থাকার জায়গা পাবো তো? KMVN এর গেস্ট হাউসে ফোন করে জানা গেলো জায়গা তো আছে কিন্তু “স্যারজি কল তো গেস্ট হাউস পে বারাতওয়ালী পার্টি হ্যায়….আপলোগোঁকা প্রবলেম তো নেহি হোগা?” আরে কোনো প্রবলেম হবে না……. আমরা রাতে থাকতে পেলেই বর্তে যাই ভাই। চাই কী বারাতের সাথে নেচেও নিতে পারি একটু। পাহাড়ী বিয়েও দেখা হয়ে যাবে। ফোন রেখে দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে আকর্ণ হাসলাম, ঠিক দুই দিন পর।এইভাবে আমাদের ভেন্যু ঠিক হলো।

বিজয়দর্পে দুজন মিলে দুহাতে ল্যাপটপ, ছাতা, মোবাইল সামলে ল্যাবে চললাম। ব্যাগ নেই, কারণ কাল রাত থেকেই সব অকাজের জিনিস (মানে ল্যাপটপ, চার্জার, ল্যাব নোটবুক ইত্যাদি, ইত্যাদি) ব্যাগ থেকে বের করে বেড়াতে যাবার সব কাজের জিনিস ঢুকিয়ে রেখেছি। ল্যাবে সবাই বলল, "কোথায় যাবে শেষ পর্যন্তও ঠিক হলো?" বললাম, "যদি টিকিট কনফার্ম হয় তো হরিদ্বার (যদিও এই ব্যাপারটা আমার পছন্দ ছিলনা প্রথম থেকেই) নয় তো টনকপুর, সেখান থেকে লোহাঘাট।" সবাই বলল, "সেটা কোথায়?" এই একটি প্রশ্নেই বুঝে গেলাম যে ঠিক জায়গা সিলেক্ট করা হয়েছে। বেশি লোক জানে না, মানে বেশি টুরিস্ট যাবে না। বেড়াতে গিয়ে চারদিকে তাকিয়ে যদি গুরগাঁও এর রবিবার বিকেলের Auchan mall এ ঢুকে পড়েছি বলে মনে হয়, তবে মনের দুঃখে চাট্টি চিপস-ফিপস খেয়ে ফিরে আসা ছাড়া গতি থাকে না। যাই হোক কোনক্রমে কয়েক ঘন্টা কাটিয়ে সব এক্সপেরিমেন্ট এর failure, পাঁচ মাসের ডিপ্রেশন, রুক্ষ গরম - সব কিছু কে টাটা বলে সাড়ে পাঁচটার বাসে উঠে বসলাম।

কী আনন্দ। আজ এরা সবাই কাজ সেরে বাড়ি ফিরছে আর আমরা দুই স্যাঙ্গাত দুটো ফাটো-ফাটো ব্যাকপ্যাক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। এখনো জানিনা কোথায় যাবো। আনন্দবিহার স্ট্যান্ড থেকে টনকপুরের বাস না নিউ দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন থেকে হরিদ্বারের ট্রেন। যদিও আমি personally প্রথমটাকেই এগিয়ে রেখেছিলাম (কারণ লোহাঘাট এর এলিভেশন হরিদ্বারের চেয়ে অনেক বেশি) এবং মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম যেন টিকিটটা কনফার্ম না হয়। তবুও ভাবলাম যদি আলটিমেটলি যেতেই হয় হরিদ্বার, তো হাসি মুখেই যাবো। 'কোথাও তো যাওয়া হচ্ছে', এই ভেবে বেশ প্রাণ ঠান্ডা হয়ে এসেছে, এমন সময় বাসের জানলা দিয়ে দেখি আকাশ কালো করে এসেছে আর ঝড় শুরু হয়েছে। কেমন লাগে এবার? এতদিন গরম এ পুড়ে ভাজা ভাজা হয়ে গেলাম, একফোঁটা বৃষ্টি নেই, আর আজ এখানে বৃষ্টি-আমরা যাচ্ছি অন্য জায়গায়। এখানকার লোকজন সম্পর্কে মনে একটু হিংসা হবো হবো হচ্ছে…. সামলে নিলাম, ওরা তো বেড়াতে যেতে পারছে না, আমরা তো যাচ্ছি। এই ভেবে উদার হয়ে গেলাম। ওদের এটুকু বৃষ্টির ভাগ না পেয়ে হিংসা করবোনা আজ যাহ্……এছাড়া আমরা কোথাও বেরোলে, ‘হালকা থেকে- মাঝারি থেকে- বজ্র-বিদ্যুত সহ ভারী বর্ষন’ হয়েই থাকে। আজ অবধি তার ব্যত্যয় হয়নি। যাক গে, বলে জানলার বাইরের ঝড় এনজয় করতে করতে চললাম। বাস থেকে নেমে যখন অফিস ফেরত যাত্রীদের ভিড়ে ঠাসা মেট্রোতে উঠলাম তখন সন্ধ্যে পৌনে সাতটা।  

তারপর? ........এখানে দেখুন


Friday, 11 July 2014

আমার শোনা কিছু বিখ্যাত উক্তি

এক একটা উক্তি মানুষ সারা জীবন মনে রেখে দেয়। বিখ্যাত মানুষদের উক্তি তো বাইবেল-কোরান-ভাগবদগীতার মত করে লোকে পড়ে। আমার ছাত্রজীবনেও, মানে আমাদের মত অভাগাদের তো সারা জীবনই ছাত্রজীবন। তাও যে সময়টায় আমি ভদ্র বাচ্চার মতো সকাল সন্ধ্যে বই খাতা খুলে ওপরের ঘরের টেবিলের সামনে বসে গালে হাত দিয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতাম তখনকার কথা বলছি। তখন আমার টেবিলে একটা টেবিল ক্যালেন্ডারের মত জিনিস ছিল যার প্রতিটা পাতায় পাতায় ঠাসা ছিল বক্তার নামসহ নানান বিখ্যাত সঞ্জীবনী উক্তি। নিশ্চয়ই জ্যেঠুমনির দৌলতে পাওয়া। এরকম সব ভালো ভালো জিনিস আমায় জ্যেঠুমনিই অবিরত সাপ্লাই দিয়ে গেছেন নানান জায়গা থেকে পেয়ে সারা ছোটবেলাটা জুড়ে। তো সেই বস্তুটি এখনো বাড়িতে আমার বইয়ের তাকে অতি যত্নে রাখা আছে। এরকম জিনিস হয়ত অনেকেরই আছে। বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের মানসিক গঠন ঠিক করার জন্য বিখ্যাত ব্যক্তিদের বিখ্যাত উক্তির যোগান দিয়ে থাকেন শুনেছি। তার মধ্যে কিছু কিছু উক্তি মানুষের সারা জীবনের মত মনে গেঁথে যায়। আমার যেমন গেছে। এইসব বিখ্যাত উক্তির কয়েকটা ভাবলাম আজ আপনাদের শোনাই। ভালো জিনিস সকলের সাথে ভাগ করে নিতে হয়। তাই না? এটাও যেন কোন বিখ্যাত লোকের উক্তি। ভুলে গেছি। যাই হোক বেশি কথা না বাড়িয়ে প্রথম উক্তিটা বলি-

"মাংসের ডাঁটা দিতে বলনা": বক্তা আমার পিসতুতো দিদির ছেলে। বছর পাঁচ-ছয় বয়স তখন আমাদের বাড়ি বেড়াতে এসেছে। নানান রকমারি তরিতরকারির সাথে মাংসের ঝোল রান্না হয়েছে। তিনি তখন বাচ্চা মানুষ ছিলেন কিনা, কচি দাঁতে হাড় চিবোতে পারবেন না, তাই আমার মা তাঁকে বেছে বেছে মাংসওয়ালা পিসই দিয়েছে। বেশ  কয়েক গ্রাস সোনা মুখ করে খেয়ে নেবার পর শুনি তিনি গুজগুজ করে তাঁর মায়ের কাছে কি যেন অনুযোগ করছেন। আর তাঁর মা তাঁকে কি যেন সব বলে আস্বস্ত করছে। "কি হয়েছে"-"কি হয়েছে" করে অনেক অনুসন্ধানের পর জানা গেল- বাড়িতে ছোটখাটো হাড় চিবিয়ে তিনি অভ্যস্ত এবং তাঁর সেটি বেশ পছন্দের বিষয়। আমার মা তাঁকে যে বাটিটি পরিবেশন করেছেন তাতে একটিও হাড় নেই তাই তিনি তাঁর মাকে অভিযোগ করছেন যে- "মাংসতে একটাও ডাঁটা দেয়নি কেন মা এরা? ডাঁটা দিতে বলনা একটা ।" বক্তা বর্তমানে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এর দ্বিতীয় বর্ষের গম্ভীর চশমা চোখো ছাত্র। ভাগ্যিস আমার এই শিশু ব্লগটির অস্তিত্বের কথা তাঁর অজানা। সেই ভেবে নিশ্চিন্তে লিখছি।

"বড়দির সাথে লুকোচুরি খেলা হচ্ছে": আমার জীবনের এখনো পর্যন্ত সেরা সময় ক্লাস সেভেন থেকে ক্লাস টেন। যে গার্লস স্কুলে আমি পড়তাম সেই স্কুলের প্রচন্ড রাগী বড়দির একটু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকায় তাঁর husband সঙ্গে আসতেন। হয়ত retire করার পর কাজ ছিল না বিশেষ এবং বড়দিরও রাস্তাঘাটে একজন সঙ্গে থাকার দরকার হত তাই তিনি আসতেন। তাঁর নাম আমি জানিনা এখনো। স্কুল সুদ্ধু মেয়েরা সক্কলে তাঁকে হাস্যকরভাবে 'জামাইবাবু' বলে রেফার করত। সম্মোধনটা এড়িয়ে যেত। যাই হোক, দুঁদে বড়দির ঠেলাতেই অস্থির ছিলাম আমরা, তার উপরে শাকের আঁটির মত ছিলেন এই 'জামাইবাবু' ভদ্রলোক। উভয়ার্থেই কঞ্চিসম জামাইবাবু, বাঁশের উপর দিয়ে যেতেন। সর্বদাই মেয়েদের উপর কারণে অকারণে অনধিকার কর্তিত্ব ফলানোর চেষ্টায় থাকতেন।

বিশেষ কোনো এক সর্বজনপ্রিয় দিদিমনির অবসরজীবন শুরুর সম্বর্ধনা নিয়ে উঁচুক্লাসের মেয়েদের সাথে বড়দির মনোমালিন্য চলছে কয়েক দিন ধরেই। ওই বিশেষ শিক্ষিকার সাথে কোনো অজানা কারণে বড়দির ঝামেলা ছিল। তাই তিনি সম্বর্ধনা নিয়ে বিশেষ বাড়াবাড়ি চাইছিলেন না। আর মেয়েরা সকলে চাইছিল উল্টোটা। বলাই বাহুল্য যে মেয়েদের পিছনে স্কুলের অন্য কয়েক জন শিক্ষিকাও গোপনে মদত দিচ্ছিলেন। এই নিয়ে আমাদের ক্লাসের সাথে বড়দির ঝামেলা তুঙ্গে উঠেছে সেদিন। বড়দি ক্লাস থেকে জনে জনে ডেকে জিজ্ঞাসা করছেন ঘটনার ডিটেল আর সবাই পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ক্লাসের সবচেয়ে ফচকে মেয়ে অনুস্মিতা আর তার সাকরেদ সুহিতার ডাক পড়ার খবর আসতেই দুজনে একদৌড়ে ব্যাগ ব্যাগেজ নিয়ে একতলার টয়লেটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। আর আমরাও যথারীতি বলে দিয়েছি "ওরা কোথায় জানিনা তো, ব্যাগও নেই। আজ মনে হয় আসে নি।" বড়দির পায়ের সমস্যা থাকায় আর ওঁনার অফিসঘর দোতলাতে হওয়ায় উনি সকালে এসে একবার দোতলায় উঠে গেলে ছুটি না হওয়া পর্যন্ত আর নামতেন না। সেই সুযোগটাই অনুস্মিতারা নিয়েছিল। জানত একতলায় বড়দি আসবেন না। কিন্তু, কোথায় বলে না- "বাবু যত বলে পরিষদ দল বলে তার শত গুন!" ওদের একতলার টয়লেটে ঢুকতে দেখে ফেলেছিলেন এই 'জামাইবাবু'। তিনি নিজে মেয়েদের টয়লেটের দরজায় ধাক্কা দিতে না পেরে বড়দির অ্যাসিস্ট্যান্ট উষাদিকে পাঠিয়েছেন ওদের ধরে আনতে। আমরা দোতলার সাইড উইং থেকে যে দৃশ্যটা সেদিন দেখেছিলাম সেটা হলো এরকম-উষাদি দুমদাম করে টয়লেটের দরজায় ধাক্কা মারছেন আর তাঁর স্বাভাবিক খনা গলায় চিত্কাত করছেন- "বেরিয়ে আয়, বড়দি ডাকছেন", 'জামাইবাবু' টয়লেট থেকে একটু দূরে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির কাছে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে উষাদির গলার আওয়াজকে ছাপিয়ে চিত্কার করছেন-" বেরিয়ে এস বলছি, আমি জানি তোমরা ওখানে আছ, বড়দির সাথে লুকোচুরি খেলা হচ্ছে নাকি? হ্যাঁ? লুকোচুরি খেলা হচ্ছে?" এবং বড়দি দোতলা থেকে উঁকি মেরে নিচে দেখার চেষ্টা করছেন, এবং অবিশ্বাস্যভাবে তাঁর মুখে অল্প একটু হাসি আসব আসব করছে। আর আমরা টেনশন-ফেনশন ভুলে পুরো ব্যাপারটা দেখে মিচকে মিচকে হাসছি।            

"গরিয়ানার হোরুদের mitochondria বেশি থাকে" : এই ব্যাপারটা একদমই রিসেন্ট। দুতিন দিন আগে বিকেলের চায়ের গামলা হাতে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে হাওয়া খেতে খেতে আমরা দুই মক্কেল বিজ্ঞান বিষয়ক গভীর জ্ঞানের সব কথা আলোচনা করছিলাম। মানে সামনে দিয়ে একটা পায়রা উড়ে যেতে দেখে পাখিরা এতটা পথ উড়ে যেতে এনার্জি কোথায় পায় এই গবেষণা হচ্ছিল আর কি। আমি কোথায় যেন পড়েছিলাম যে পাথীদের দেহকোষে mitochondria বেশি থাকে। যা থেকে নাকি এনার্জি তৈরী হয় বলে গুরুজনরা বলে থাকেন (এবং যা কিনা আমার দেহকোষে অন্ততঃ চল্লিশ শতাংশ কম আছে বলে আমার ধারণা) । আমি ঠিক এই জ্ঞানটাই পিনাকীকে দেবার চেষ্টা করছিলাম। হঠাত দেখি সে দূরে জঙ্গলের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে আমাকে বলছে "হ্যাঁ হ্যাঁ, গরিয়ানার হোরুদের mitochondria বেশি থাকে"।..........আমি হাঁ আ আ আ আ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি দেখে সে ভুরু টুরু কুঁচকে বলল -"কি হলো?" তার পরক্ষনেই ভুল বুঝতে পেরে প্রচন্ড রাগ টাগ করে বলল "আমি কি করব? দূরে বড় বড় গরু চরছে দেখে আমি বলতে চাইছিলাম যে হরিয়ানার গরুগুলো কত বড় বড় হয় দেখ"। আমি নাকি ঠিক সেই সময়েই তাকে মাইটোকনড্রিয়া-ট্রিয়া বলে এমন ব্যতিব্যস্ত করে ফেলেছি যে, সে ঘাবড়ে টাবড়ে গিয়ে "হরিয়ানার গরুগুলো কত বড় বড় হয়" বলতে গিয়ে "গরিয়ানার হোরুদের mitochondria বেশি থাকে" বলে ফেলেছে। কি বলব একে বলুন?

এই উক্তির ফলে সেদিন গায়ে হাতে গরম চা-ফা ফেলে, দোতলার লোকেদের কৌতুহলের উদ্রেক করে পাক্কা তিন মিনিট হ্যা হ্যা করতে হয়েছিল আমাদের।

"কিচ্ছু হচ্ছে না, সব ফুটকি ফুটকি": এই বিখ্যাত উক্তির বক্তা আমার মা। ভদ্রমহিলাকে নতুন কম্পিউটার বিদ্যায় হাতেখড়ি দেওয়ানো হয়েছে। যাতে তিনি চাইলে মেয়ের সাথে Skype-টাইপে চাট্টি গপ্প-গুজব করতে পারেন এবং মাঝে মধ্যে ই-মেল মারফত কিছু খবরাখবর বিনিময় করতে পারেন। গত চার-পাঁচ মাস আগে যখন তিনি এসেছিলেন তখন তাঁকে পাখি পড়ার মত করে রীতিমত সকাল সন্ধ্যা ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। একটি চকমকে খাতায় ক্লাসনোট লিখে দেওয়া হয়েছে। মানে প্রতিটা স্টেপ এ স্টেপ এ কি করতে হবে, কোথায় ক্লিক করতে হবে, কতবার করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয়। তিনিও প্রচুর বার প্র্যাকটিস করে অবশেষে যখন পরীক্ষা দিতে বসলেন মানে বাড়ি পৌঁছে কম্পিউটারে ইন্টারনেট কানেক্ট করতে চেষ্টা করলেন তখন ডাহা ফেল। উপায়ন্তর না দেখে আমায় ফোন পাকড়াও করলেন। সেদিনে আমার নব্য কম্পিউটার স্বাক্ষর মায়ের সাথে আমার যে কথোপকথন হয়েছিল সেটা আমি আপনাদের হুবহু বলে যাবার চেষ্টা করছি।

--"কি ব্যাপার? তুমি তো দেখে গেলে এখান থেকে, এখন পারছ না কেন?"
--"তখন তো হচ্ছিল, এখন তো হচ্ছে না, আমি কি করব?"
--"কি করে করছ বলত?"
--"যা যা লিখে দিয়েছিলি খাতায়, সেটা দেখেই তো করছি, হচ্ছেনা তো?"
--"কি করছ আমায় একবার বল। "
--"ওই তো, Dongle টা লাগিয়েছি, তারপরে পেজটা খুলছে, তারপরে সেটিংস এ একটা ক্লিক করছি, তারপরে পাসওয়ার্ড লেখার জায়গাটা আসছে.........."-মা আমায় খাতা থেকে দেখে দেখে পড়ে শোনাতে থাকে। আমি বলি-
--"বাহ, ঠিকই তো আছে, এবার পাসওয়ার্ডটা লিখে এন্টার করে দাও তাহলেই তো হবে।"
--"হচ্ছে না তো, কত বার ধরে লিখছি, কখন থেকে চেষ্টা করছি।"
--"তার মানে তুমি পাসওয়ার্ড লিখতে ভুল করছ, ঠিক করে ধীরে ধীরে লেখ।"
মা প্রচন্ড অধৈর্য হয়ে বলে উঠলো, "আরে বলছি পাসওয়ার্ডটা লেখা যাছে না ওখানে।"
--অবাক হয়ে বললাম,"মানে? লেখা যাচ্ছেনা আবার কি? টাইপ করো, হবে।"
--মা এক ধমক দিয়ে, রেগে মেগে কেটে কেটে বলল, "না-হবে-না, আমি অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি কোনো লেখা হচ্ছে না, সব ফুটকি ফুটকি আসছে।"

আমি তো শুনে হো হো হাসব না মারাত্মক রেগে যাব বুঝে উঠতে পারলাম না। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ব্যাপারটাকে হজম করলাম। তারপর বললাম, "না মানে, তুমি পাসওয়ার্ড লিখলে সেটা দেখা যাবে না, ওরকম ফুটকি ফুটকিই আসবে, নইলে যদি কেউ দেখতে চায় তুমি টাইপ করার সময় সে তোমার পাসওয়ার্ড জেনে যাবে তো। তাই।"

ফোনের ওপাশে মা কিছুক্ষণ চুপ করে  থেকে দ্বিগুন রেগে বলল "তা সেটা খাতায় লিখে দিতে কি হয়েছিল? আমি কি করে জানব যে পাসওয়ার্ড লিখলে ওরকম ফুটকি ফুটকি দেখায়?"
 বলে ভীষণ রেগে ফোন রেখে দিল। আর আমি হাত পা ছড়িয়ে পেট চেপে ধরে হাসতে বসলাম।
   
"নাহলে তোমার চুমু খেতে অসুবিধা হত": সমস্তরকম স্টেজ শো এর সবচেয়ে আকর্ষনীয় বস্তুটি যেমন সবচেয়ে শেষে দেখানো হয় আমার এই পোস্টের সবচেয়ে মারাত্মক উক্তিটি আমি সকলের শেষে বলব বলে রেখে দিয়েছি।
আমি আর পিনাকী, দুজনেই টো-টো কোম্পানির ক্যাপ্টেন বলা যায়। বেড়াতে পারলে আর কিছু চাই না, নেহাত পকেটে টান পড়ে তাই, নইলে সারা বছরই কাজকর্ম না করে ঘুরে বেড়াতে পারি। যে কোনো অবস্থায় ঘর থেকে বেরোতে পারলেই হলো। তাই যখন আমার এক দাদা ও তার সদ্যবিবাহিত বৌ-এর সনির্বন্ধ প্রস্তাব এল তাদের সাথে কেরালা-তামিলনাড়ু ঘুরতে যাবার, তাদের নববিবাহের কথা মাথায় রেখে প্রথমে দু এক বার না না করলেও পরে রাজি হয়ে গেলাম। যদিও itinerary-র অর্ধেক অংশ আমাদের দেখা তাও বাকি অর্ধেক তো নতুন। অতএব, 'চল পানসি কেরালা-তামিলনাড়ু'। দাদা ও আমার মিষ্টি বৌদি গাড়ির পেছনের সিটে, দাদার পাশে পিনাকী, আমি সামনে ড্রাইভার এর পাশে। দারুন ট্যুর চলছে। সবাই একদম ফুরফুরে মেজাজে। তার ওপর লাঞ্চটাও হয়েছে মন মাতানো। চার জনেই দারুন মাতোয়ারা। কোদাইকানালের পাহাড়-বন-জঙ্গল চষে ফেলা চলছে। গাড়িতে নানা বিষয়ে কথাবার্তা চলছে। হটাত প্রসঙ্গ উঠলো যে দাদার উদাসীনতা বিষয়ে। বিবাহ প্রথার জন্মের সময় থেকে সমস্ত স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের বিষয়ে যে সাধারণ অভিযোগটি করে থাকেন বৌদিও আপামর স্ত্রীদের মত মিষ্টি করে বলল দাদা নাকি তার বিষয়েও উদাসীন। আমরা হালকা চালে হাসলাম। দাদা তার স্বভাবসুলভ মৃদুভাষে হেসে হেসে বলল "কে বলল আমি তোমার ব্যাপারে উদাসীন? বিয়ের আগে দাঁত পরিস্কার করালাম যে?"
বৌদি বলল "তাতে আমার কি হলো? তোমার দাঁত কালো হয়ে যাচ্ছিল তাই পরিস্কার করিয়েছ?"
--"তাহলে তো আগেও করাতে পারতাম, বিয়ের আগেই করালাম কেন?"
--"তার মানে? কি বলতে চাইছ? আমার জন্য করিয়েছ?"
দাদা এরপর অবলীলায় মৃদু মৃদু হেসে যে কথাটা বলল তার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না, বলল- "অবশ্যই, তোমার জন্য, নইলে তোমার চুমু খেতে অসুবিধা হতে পারত তো?"

কথাটির রিঅ্যাকশনে যেটা হলো -
আমি ঘাড় সোজা করে সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম, "ভাগ্যিস ড্রাইভার বাংলা বোঝেন না।"
বৌদি লাল হয়ে "ভগবান!!!!" বলে দুহাতে মুখ ঢাকলো।
পিনাকী আপ্রাণ গম্ভীর হবার চেষ্টা করে জানলার দিকে তাকিয়ে ফ্যাঁচ করে হেসে ফেলল ।

আর দাদা? সে একগাল হেসে বলল- "এত লজ্জা পাবার কি আছে? আমি কি ভুল বলেছি? সবাই তো অ্যাডাল্ট এখানে।" বলে দুলে দুলে হাসতে লাগলো।
বৌদি এক ধমকে দাদাকে চুপ করালো আর আমরা আর থাকতে না পেরে হো হো করে হেসে উঠলাম।
ড্রাইভার আগাপাশতলা কিচ্ছু বুঝতে না পেরে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল একবার।

দাদা-বৌদির permission নিয়েই এই ঘটনাটা লিখলাম।

এই হচ্ছে আমার জীবনের কয়েকটা মারাত্মক স্মরণীয় উক্তি। এরকম আরো আছে। সময় সুযোগ মত শোনাব আপনাদের। বলুন এগুলো ভুলে যাওয়া যায়? আপনাদেরও নিশ্চয়ই এরকম কয়েকটা স্মরণীয় উক্তিই আছে? শেয়ার করবেন। শোনার ইচ্ছা রইলো।