Tuesday, 8 July 2014

স্বর্গীয় সব খাবার দাবার

আজ না কিছু স্বর্গীয় খাবার-দাবারের কথা মনে পড়ছে থেকে থেকেই। না না 'খাই খাই' ঘটনাবলীর মত রান্না করতে গিয়ে ভুন্ডুল করে ফেলা একাকার ব্যাপার সাপার নয়। সত্যি সত্যি সব স্বর্গীয় ব্যাপার-স্যাপার। যেগুলো আমি এখনো হাতের কাছে পেলে পিত্জ্জা-পাস্তা কে ভুলে গিয়ে হামলে পড়ে খেয়ে ফেলতে পারি। ছোট বেলায় এরকম স্বর্গীয় খাদ্যবস্তু সবাই কম বেশি খেয়েছেন। হয়ত এইগুলোই খাননি, কিন্তু এরকমই ভয়ানক রকম ভালো ভালো খাবার নিশ্চয়ই খেয়েছেন। তবে কিনা এসব খাবার যেমন তেমন করে খেলে চলবে না। কিছু rules and regulations আছে। নইলে এসবের আসল স্বাদটা ঠিক বোঝা যায় না। সেই সব প্রোটোকল মেনে খেলে তো আহা...........।
আমি আমার ছোট বেলার এইসব অমৃতসম খাবারের কথা প্রোটোকল সমেত বলে যাচ্ছি, দেখুন দিকি আপনাদের প্রটোকলের সাথে মেলে কিনা?

গুঁড়ো দুধ: এটাই সবার প্রথমে আসে। আমি এখনো Nestle Everyday এর প্যাকেট কেটে কৌটোতে ভরার সময় কেউ দেখে ফেলার আগেই খানিকটা খেয়ে নি, তারপর যা করার করি। এবার খাবার প্রোটোকলটা বলি। এটা খেতে হয় চুরি করে। তাহলে আরো ভালো লাগে। আর এটা কে যদি বাটিতে নিয়ে চামচ দিয়ে না খেয়ে, এক খাবলা হাতের তালুতে নিয়ে চেটে চেটে খাওয়া যায় তবে তো অমৃত।
এটা এতবার এত রকম ভাবে চুরি করে খেয়েছি যে কি আর বলব। এমনকি দু চার বছর আগেও, আগেকার ল্যাবের tea-coffee ফান্ড থেকে সকলের চা কফি করার জন্য আনা গুঁড়ো দুধ গণ-হারে সবাই মিলে চুরি করে খেয়েছি। এই সময়টাতে লক্ষ্য করে দেখেছি যে, কারো সাথে কারো মন কষা কষি থাকত না। ছোটবেলায় ধরা পড়ে যেত চুরি, খেয়ে কৌটোর ঢাকনা ঠিক করে লাগাতাম না, মাটিতে ছড়াতাম। আর তারপর মা তার ভূমিকায় নেমে পড়তেন। বরাবরের হাঁদা তো। আমার এক দাদা শীতকালে চাদরের তলায় পুরো কৌটোটাই নিয়ে বসে গেছিল পড়তে। এবং যথারীতি এই ডাকাতিও ধরা পড়েছিল এবং তারপর যা হওয়া সম্ভব আন্দাজ করে নিন। যাই হোক না কেন এই বস্তুটি এই তালিকায় প্রথম স্থানে থাকবেই থাকবে আমার মতে।  

বাপুজি কেক: নেক্সট যেটা আসে সেটা হলো বাপুজি কেক। এখানে পাওয়া যায় না। খুব খারাপ। কলকাতায় থাকতেও খেতাম। সঙ্গে একটা কলা। প্রথমে আপনাকে তেল চুপচুপে কাগজটা ছিঁড়ে কেকটা ভেঙ্গে লাল হলুদ রং করা চেরি- মোরব্বার বিকল্প গুলো খুঁটে-খুঁটে খেয়ে নিতে হবে। তার পর বাকিটা। একবার মনে আছে মা- জেঠিমা, দিদি-দাদা, রাজ্য সুদ্ধু সক্কলে মায় বাবা পর্যন্ত আমায় বাড়িতে রেখে দিয়ে আমাদের গ্রামের পাঁচ টাকা টিকিটওয়ালা সিনেমা হলে কি এক মহার্ঘ্য সিনেমা দেখতে গেছিল। কি অমানবিক। আর আমি প্রচন্ড রাগে সারা সময়টা উঠোনে রাখা ক্যাম্প খাটে পাঁচিলের দিকে মুখ করে শুয়ে ছিলাম, যতক্ষণ না সিনেমার দর্শকরা ফিরে এসে আমার হাতে দু-দুখানা বাপুজি কেক ধরিয়ে দিয়েছিল। কি গাধাই ছিলাম ভাবা যায় না।  

মৌরি লজেন্স: এটা বেশ পাওয়া যায় সর্বত্র। আমি তো যেখানে পাই কিনে ফেলি। প্রথমে প্যাকেট বা কৌটো খুলে তিন চারটে একসাথে নিয়ে সোজা মুখে। তারপরে চুষে চুষে ওপরের মিষ্টি কোটিংটা গলে গেলে তারপর মৌরি গুলো। পরের বার কিন্তু ওরকম করে নয়, তখন পছন্দের রঙের একটা একটা করে নিয়ে কুট কুট করে দাঁতে কেটে এবং চুষে। আহহ। আর এর কৌটো গুলো কি সব দুর্দান্ত shape এর। কোনটা থাম্বস আপ এর মিনিয়েচার বোতল, কোনটা ব্যাং, কোনটা টিয়া পাখি........জাস্ট ছাড়া যায় না।   

কাঠি আইসক্রিম: এটা নিয়ে আর কি বলব? আমি আগেই বলেছি এটার কথা। কাঠির মাথায় কমলা, সবুজ, সাদা - নানা রঙের মিষ্টি রঙিন জল জমিয়ে বানানো স্বর্গের ঠান্ডাই আর কি। খেলে জিভ-টিভ সব রঙিন। আমাদের পাড়ার মোড়ে একটা আইসক্রিম তৈরীর ছোট ফ্যাক্টরি আছে। যার জন্য আমাদের পাড়ার গলির নামই হলো 'বরফকলের গলি'। এখন তাতে নানা রকম কায়দার আইসক্রিম পাওয়া যায়, যেগুলো সম্পর্কে আমার বিশেষ কোনো দুর্বলতা নেই। কিন্তু আজ থেকে বছর কুড়ি আগে সেখানে পাওয়া যেত শুধু বাজারের মাছে দেবার জন্য তাল তাল জমানো বরফ। যা বাজারের মাছবিক্রেতারা কিনতেন।এবং সঙ্গে পাওয়া যেত ওই 'জলবরফ', মানে কাঠির মাথায় মিষ্টি-মিষ্টি জল জমানো। দাম কুড়ি পয়সা। বেশ কিছু বছরের নিষেধাজ্ঞার পর একটু বড় হয়ে আমার মাঝে মাঝে ওই জলবরফ চোষার সৌভাগ্য হয়েছিল। তবে আমি কিনা ভালো মেয়ে তাই সাদা রঙের জলবরফই কিনতাম আর রুমা যদি কমলা বা সবুজ কিনত তো আমি ওকে বেশ করে বোঝাতাম যে রঙিন জিনিস কেন খেতে নেই। এবং শেষের দিকে আর না থাকতে পেরে ওর থেকে খানিকটা কামড়ে নিতাম। ওকেও আমারটা দিতাম, এমনি নয়।
আর একটা কথা, সেসময় ওই বরফ কলের মালিকানা ছিল আমাদের পাড়ারই একটি পরিবারের। গরমকালের বিকেলে যখন ওদের বাড়ির আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা একটা করে জলবরফ হাতে রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরত তখন প্রচন্ড লোভ দিতাম আর হিংসে করতাম। বিশেষ করে ওদের বাড়ির আমাদের সমবয়সী কাউকে এই জিনিসটা হাতে নিয়ে দেখলে তো ভাবতামই ভাবতাম- "উফ! এদের কি মজা"। এরপর যখন সেই বরফ কলে জলবরফ এর সাথে সাথে 'চিঁড়েবরফ' ও 'বেলবরফ' (জলবরফ সঙ্গে উপরের দিকটা চিঁড়ে বা বেল দেওয়া) তৈরী শুরু হলো তখন তো আমাদের দলে রীতিমত হুলুস্থুল পড়ে গেল। যদিও দ্বিতীয় বিষয়টা আমার বিশেষ প্রিয় না হলেও, প্রথম বিষয়টা আমার কাছে...........উফ, খেতে ইচ্ছা করছে। এবার বাড়ি গিয়ে খাবই খাব।

গাভী: নিশ্চয়ই চমকেছেন নামটা শুনে? জানি তো। সবাই চমকে যায়। ঘটনাটা কিছু নয়। বেশ খানিকটা গুড় বা চিনি কে এমন ভাবে ফোটায় যে একটা চটচটে ভাব চলে আসে। এবার সেটাকে নারকেল বা খেঁজুর পাতার ওপর রেখে হাওয়াতে ঠান্ডা করে শক্ত করে। খেতে গেলে দাঁতে জড়িয়ে যায়। মিষ্টি মিষ্টি এই ব্যাপারটা আমাদের বাড়ির কাছের বাজারে ময়রার দোকানে পাওয়া যায়। বাড়ি গেলেই খাই। দারুন লাগে। কিন্তু এই অপূর্ব জিনিসটার নাম 'গাভী' কেন তা আমি জানি না। অনেক ভেবেও বার করতে পারিনি। হয়ত আপনারা এটিকে অন্য নাম চেনেন, আমি চিনি 'গাভী' নামে। এই বস্তুটি আমি আর কোথাও দেখিনি। এটাও খেতে হবে বাড়ি গিয়ে।

চ্যমন বাহার:  বাড়িতে পান সাজা হলে মা একটুখানি হাতে দিত। এক চিমটে। আর একটু চাইলে বলত "বেশি খেলে মাথা ঘুরবে"। এটাও চুরি করে খেলে স্বাদ বাড়ে বলে আমার ধারণা। কিন্তু ওই মাথা ঘোরার ভয়ে বেশি করে চুরি করতে পারিনি কোনদিন। কিন্তু মুখে দিলেই.......উমমম......।

স্কুল থেকে পাওয়া পাঁউরুটি:
এমনিতে পাঁউরুটি আমার খুব একটা কাছের বস্তু ছিল না। কিন্তু সেসময় আমাদের প্রাইমারি স্কুলে বাচ্চাদের একটা বড় পিস পাঁউরুটি দেওয়া হত রোজ। এক পাউন্ড বড় পাঁউরুটি থেকে কেটে কেটে। এখনকার মিড ডে মিলের ছোট সংস্করণ বলা যায়। সেই পাঁউরুটির পিসটার উপর কেন জানিনা আমার দারুন লোভ ছিল। অনেকেই পাবার সাথে সাথে খেয়ে ফেলত। আমাদের মত কয়েক জন অতিবাধ্য ন্যালা-ক্যাবলা গোছের লোক সেটাকে বয়ে বয়ে বাড়ি নিয়ে আসত। কারণ কাঁচা পাঁউরুটি না সেঁকে খাবার অনুমতি ছিল না। বহু কষ্টে লোভ সংবরণ করে বাড়ি নিয়ে আসতাম, আর অপেক্ষা করতাম কখন মা সেঁকে দেবে। 

পাঁপড়ভাজা রুটি: না না পাঁপড়ভাজা দিয়ে রুটি নয়। অন্য জিনিস। রুটি বানানোর শেষে, শেষ দু পিস রুটি মা বেশ পাঁপড় সেঁকার মত করকরে করে সেঁকে নিয়ে আসত। তারপর দুজন মিলে পা ছড়িয়ে বসে কড়মড় কড়মড় করে সেই পাঁপড়ভাজা রুটি সেবন। আহ, কি যে আরাম। সন্ধ্যেবেলার পড়ার মাঝে ওইসময়টুকু বিশ্রাম। সেজন্যই বোধহয় এত ভালো লাগত জিনিসটা খেতে, কে জানে।

আরো অনেক অনেক স্বর্গীয় খাবার যেমন, তিলের পাটালি.....চিনির লাড্ডু......পাকা তালের নুটি...... তারপর......চিনির মুড়কি.......ইত্যাদি ইত্যাদি নানান কিছু তো বলাই হলো না। দারুন দারুন সব ব্যাপার। আপনাদের ঝুলিতেও নিশ্চয়ই এরকম সব অপূর্ব খাদ্যবস্তু আছে তাই না? যেগুলো যেকোনো সময়ই খেতে ইচ্ছে করে? জানাবেন আমায়।     

Sunday, 6 July 2014

দাদার কীর্তি -২

দাদার কীর্তি -১ এর পরে আর নিশ্চয়ই আমার দাদাটির সম্পর্কে আর নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে না। প্রমিস করেছিলাম আমার দাদার আরো মজার কীর্তি কাহিনী শিগগিরিই শোনাব আপনাদের। তাই আজ ভাবলাম আরো একটা রোমহর্ষক কাহিনী শোনাই আপনাদের। বেশি আগড়ম বাগড়ম না বকে সোজা ঘটনাতে চলে যাই। কি বলেন?

দাদার পিএইচডি থিসিস জমা দেবার সময় প্রায় সমাগত। সেই সময়কার ঘটনা। থিসিস লেখা চলছে, ছয়- সাড়ে ছয় বছরের অক্লান্ত সাধনার ধন নিবিষ্টমনে একজায়গায় তিল তিল করে জড়ো হচ্ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মকান্ডের লাইনে আমি হচ্ছি ল্যাব এর নেক্সট ক্যান্ডিডেটদ্বয়ের একজন। অতএব, পারলে প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় গিয়ে খোঁজ নিচ্ছি কদ্দূর এগোলো? কি করে কি ক্যালকুলেশন হচ্ছে? কিরকম ফরম্যাটে লেখালেখি চলছে? কি কি জটিল সব অফিসিয়াল পদ্ধতি অনুসরণ করা চলছে? ইত্যাদি ইত্যাদি। মোটকথা কিছুক্ষণ অন্তর-অন্তরই বলির পাঁঠাটির কাছে গিয়ে, আমায় যখন বলি হতে হবে তখন কি কি ভাবে পুজার্চনাদি করতে হবে তার একটা এস্টিমেট করার চেষ্টা করছি। দাদাও অম্লান বদনে বিনা বিরক্তিতে আমায় সব কিছু মহোত্সাহে বুঝিয়ে চলেছে। কি করে কে জানে? আমায় যদি কেউ ওরকম ভাবে বিরক্ত করত, তো আমি বোধহয় তাকে খুনই করে ফেলতাম। যাই হোক, আমি তো আর দাদা নই, কস্মিনকালে হয়ে ওঠার আশাও দেখি না। সোজা কথায়, মোটামুটি একটা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, যতটা না যে থিসিস লিখছে তার, তার চেয়ে বেশি বোধহয় আমার।

এমতাবস্থায়, একদিন দুপুর নাগাদ আমরা বাকি সব চুনোপুঁটিরা কাজ কর্ম করার একটা ব্যর্থ প্রচেষ্টায় ল্যাজে-গোবরে হচ্ছি। হঠাত ধীরে-সুস্থে দাদা আমার এলেন আমাদের কাছে। এসে ঘোষণা করলেন.....দাঁড়ান, আমি exact ডায়লগ গুলো বলি-
--"কি করছিস তোরা? মন দিয়ে কাজ কর্ম কর, আমার তো হলো না আর, I am finished।"
বলে কি রে ভাই? আমরা সবাই হাঁ করে মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। হলো টা কি? ক্যালকুলেট করতে করতে মাথা গরম হয়ে গেল নাকি?
--"কি হয়েছে?"আমরাই কেউ একজন প্রশ্ন করলাম।
উত্তর এল, " I am finished, আমি সুইসাইড করব, আমার আর কিছু করার নেই। তোরা কাল খবর পাবি।"-পুরোটাই কিন্তু শান্ত ধীর কন্ঠে।
--"আরে কি হয়েছে বলবে তো?"
--"তোরা কাল খবর পাবি ঠিক, আজ আমি বার এ যাব, প্রচুর খাব, আমার সব শেষ, I am finished।"
--"ধুত্তেরি ছাতা, খালি বলে finished finished, কি হয়েছে সেটা তো বলবে তো, বেশ তো লিখছিলে দেখে এলাম, কি হলো এর মধ্যে? কি প্রবলেম বলো, সবাই মিলে কিছু একটা করা যাবে।"
--"কিচ্ছু করার নেই তোদের, অনেক চেষ্টা করেছি, কিচ্ছু করা যাবে না, সব failed, আমি বেরোচ্ছি। বার এ যাব আজ।"
সবাই মিলে হাঁ হাঁ করে চেপে ধরতে অনেক চেষ্টার পর বেরোলো যে, দাদার সমস্ত data ও থিসিস এর ড্রাফট সহ হার্ড-ডিস্কটি গেছে খারাপ হয়ে, মানে সেটি দাদার লড়ঝড়ে কম্পিউটারটিতে detect করছে না। ল্যাপটপটি বহু দিনের, সকালে এসে চালাতে গেলে প্রচুর চড়-থাপ্পড় মারতে হয় তাতে। তাতেই দাদাটি আমার সমস্ত লোকজনের ঠাট্টা-মস্করা, টিকা-টিপ্পনী মৃদু- মৃদু হাসি দিয়ে নস্যাত করে এতদিন চালাচ্ছিলেন। হটাত সেই অতিবৃদ্ধ ল্যাপটপের কোনো এক অভ্যন্তরীণ দেহযন্ত্র বিকল হতে তীরে এসে ঠেকার পথে এই মারাত্মক বিপত্তি।
       
আমি তো এই সুযোগে আবার একটু জ্ঞান দিয়ে ফেললাম (চান্স ছাড়ি না কক্ষনো)। "তোমায় সবাই মিলে কবে থেকে বলছে নতুন ল্যাপটপ কিনতে, হলো তো এখন?"
--"আরে কোথাও detect করছে না আমি ল্যাবের সব কম্পিউটার try করেছি।" দোকানেও নিয়ে গিয়েছিলাম, সব failed। সাধে কি আর বলছি আমি finished।"- এত কিছু হয়ে গেছে নিঃশব্দে, কেউ জানে না ল্যাবের। আমার হলে তো চ্যাঁ-ভ্যাঁ করে পুরো ইনস্টিটিউট মাথায় তুলে ফেলতাম।
মাথা টাথা চুলকে বুঝলাম ব্যাপারটার গুরুত্ব। কি করা যায়?

দাদা ফের একবার আমাদের সবাইকে পারলে চিরজীবনের মত টা-টা করে বেরোতে যাবে এমন সময় আমার মনে পড়ল আমার এক বন্ধুর কথা। তার কম্পিউটার নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার নেশা আছে, আমাদের মত কম্পিউটার সংক্রান্ত জ্ঞানে 'ক' অক্ষর গোমাংস নয়, অতিশয় সুচিকিত্সক এবং ইদানিংকালে এই ধরনের দুর্যোগে সে নাকি ভালই চিকিত্সা করে থাকে বলে খবর। বললাম, " একবার ওর কাছে গিয়ে দেখবে? আমি ফোনে বলে দিচ্ছি।" সমস্ত হাল ছেড়ে দিয়েই নির্লিপ্ত মুখে, সত্যিকারের সাধুপুরুষের মতো  বলল " যাই, দেখি। আর তো কিছু করার নেই।" বলে একটা এমন হাসি দিল- যেটা একমাত্র কাঠমান্ডুতে এলএসডি খাবার পর লালমোহনবাবুর মুখে যে 'লামা স্মাইল' টি শ্রীমান তপেশ দেখেছিল, সেটির সাথেই তুলনীয়। মনে হলো যেন থিসিস জমা দিয়ে সদ্য চাপমুক্ত হয়েছে, জীবনে কোনো ক্রাইসিস নেই। উফফ, কি করে যে পারে লোকটা?

সুখবরটা হলো, শেষ পর্যন্ত সেখানে যাওয়ার পর কোনো ভাবে এই সমস্যার সমাধান হয়েছিল সেদিন।

সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবার পর দাদা বোধহয় ধন্যবাদ কিভাবে দেবে বুঝতে পারছিল না তাই তার প্রকাশটা কিরকম হয়েছিল একটু বলি-
--"চল আজ তোকে ডিনার খাওয়াব। কোথায় খাবি বল? "
বন্ধুটি বলল, " আরে না না, তুমি আগে বাড়ি গিয়ে দেখো সব ঠিকঠাক আছে কিনা।"
--"সে তো হবে, তোকে আগে খাওয়াই।"
--"না না, সত্যি খাবনা।"
--"আরে খা না।"
--"না না।"
--"আচ্ছা বেশ, এখন কিছু একটা খাওয়া যাক।"
বন্ধুটির বোধহয় পেটের হাল ভয়ানক রকম খারাপ ছিল সেদিন - আমার অনুমান, নইলে এ প্রস্তাবে সে সচরাচর না করত না। 'খাদ্য-খাদক'-এর ব্যাপারে সে অত্যন্ত সংবেদনশীল, যদ্দূর আমি জানি। যাই হোক, সে এতেও না করাতে শেষে, "এক কাপ চা অন্ততঃ খা"- তে এসে রফা হলো। সাধে কি বলি- বাঙালির সব ইমোশন শেষ পর্যন্ত পেটে এসে ঠেকে! দাদাকেও ধন্যবাদ জানাতে মরিয়া হয়ে শেষ পর্যন্ত ওই পেটেরই দ্বারস্থ হতে হলো আর কি।

আমার যেটা বক্তব্য, এই যে acute condition, তাতেও ভদ্রলোক বিলকুল শান্ত! এরকম অবস্থায় আমি পড়লে, আমার কথা তো ছেড়েই দিলাম আমার চারপাশের সক্কলে আমার লাফালাফি আর ঘ্যানঘ্যানানির চোটে পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। আর ইনি কিনা অত্যন্ত শান্ত- স্নিগ্ধ- সমাহিত স্বরে নিজের মৃত্যুসংবাদ আগাম ঘোষণা করছেন। সত্যি, কি জিনিস দিয়ে ভগবান এঁনাকে তৈরী করেছেন কে জানে।
সব কিছু মিটে যাবার পরে অনেকদিন পর্যন্ত দাদার সেদিনের বলা ডায়লগ গুলো তাকেই বলে আমরা কয়েক জন খুব হাসাহাসি করতাম মনে আছে। দাদাও খুব লজ্জা-টজ্জা পেয়ে আমাদের হাসিতে যোগ দিত। এবং এখনো পর্যন্ত আমরা মাঝে মধ্যে সেদিনের কথোপকথন মনে করে মজা পাই। কিন্তু মনে হয় ভাগ্যিস আমাদের কারোর সাথে এরকম হয়নি। আমরা সেই টেনশন নিতে পারতাম না। এঁনার সে ক্ষমতা ভগবানপ্রদত্ত। তাই হয়ত বড় বড় পরীক্ষাগুলোর মুখোমুখী এরকম লোককেই বারবার হতে হয়, হতে হচ্ছে। যাতে আমাদের মতো ভিতু, হেরোদের দল এঁনাদের চোখের সামনে দেখে জীবন থেকে ভয় না পাই। যাতে সমস্ত কিছু দক্ষতা থাকা সত্বেও বছরের পর বছর স্বপ্ন পূরণের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে হাল না ছেড়ে দি।

আমার এই মৃদুভাষী-ঋষিপ্রতিম-শান্ত-ধৈর্যশীল দাদাটির গল্প আমার ফুরবেনা। পরে আবার কোনো সময় গল্পের ঝাঁপি খুলে বসা যাবেখন। আজ শুধু বলি, জীবন যতই কঠিন রাস্তা বানিয়ে রাখুক না কেন তার জন্য, আমি জানি সে তার স্বপ্ন পূরণ ঠিকই করবে। এবং তার গান ও তার জীবনবোধের জন্য অনেকের কাছেই সে উদাহরণ হয়ে থাকবে। ভালো থেকো .....দাদা।

আনন্দ

সমস্ত অন্ধকার তখন সরে যাচ্ছিল
মনে হচ্ছিল যেন ছোট্ট ফুটফুটে আমি জন্ম নিলাম
অদ্ভূত পবিত্র এক আলো চারিদিকে-
দূরে কোন এক গভীর থেকে যেন কেউ প্রশ্ন করলো আমায়
'কেন এসেছ? প্রশ্ন কর নিজেকে। কি তোমার উদ্দেশ্য?'

অদ্ভূত সেই আলোর বন্যায় আর কাউকে দেখিনি তখন
নিজেই প্রশ্ন করলাম সেই ছোট্ট আমিকে, 'কেন এসেছি আমি?'
ছোট্ট সেই দেহ মন তখন ভরে উঠেছে কানায় কানায়
কি অপূর্ব সেই অনুভূতি
কি শান্তি, কি পবিত্রতা, কি অবিস্মরণীয় সেই আলোর স্নিগ্ধতা
মনে হলো কোথাও কোনো দুঃখ নেই, মলিনতা নেই, লোভ-জীর্ণতা নেই
এমনকি বুঝি পাপ-পুন্য, ভালো-মন্দ কোনো কিছুর অনুভূতি পর্যন্ত নেই
আছে শুধু অমলিন আনন্দ, আত্মার আনন্দ।

কোথায় কোন অন্তর থেকে উঠে আসা সেই আনন্দ
তখন ঘিরে ফেলল আমার সমস্ত চেতনা
মনে হলো এই তো কারণ
অপার্থিব এই চিরন্তন আনন্দ পেতে আর সক্কলকে এর ভাগ দিতেই তো আমার আসা
সমস্ত নেতি কে ইতি তে পরিনত করে আত্মার আনন্দ কে অনুভব করতেই তো জন্ম আমার

নিমেষে যেন দূর হয়ে গেল আমার সমস্ত দ্বিধা
অপার্থিব সেই পবিত্র আলোয় স্নান করে যেন নব জন্ম হলো আমার
অন্তর থেকে মায়ের মত কেউ যেন বলে উঠলো
এই তো আমি
এই তো আমরা
আমরা সবাই তো তোমারই জন্য অপেক্ষায়
সেই মুহুর্তে নিরসন হলো আবিলতার, সমস্ত ভয়-ভাবনার-দুশ্চিন্তার
জেগে উঠলাম যেন এক নতুন আমি হয়ে
আনন্দ পেতে আর আনন্দ দিতে
আত্মার আনন্দ, চিরন্তন আনন্দ। 

Friday, 4 July 2014

"প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে"


ভারতীয় আবহবিজ্ঞান দপ্তর-এর ওয়েবসাইট থেকে 

এই ছবিটিই আমার গত কয়েক দিনের দেখা সমস্ত ছবির মধ্যে প্রিয়তম ছবি। কি সুন্দর না। কেমন যেন ঝড়-ঝড়, ধোঁয়া-ধোঁয়া, সমুদ্রের ঢেউ-ঢেউ। মাঝের সাদা গুলো দেখুন যেন চেপ্টে যাওয়া ভ্যানিলা আইসক্রিমের কাপের ভেতরটা। বোদ্ধা ছবি তুলিয়েরা এই পুরো ব্যাপারটাকে একটা দারুন অন্যরকম দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে ফেলতে পারবেন, সেসব আমার মতো রামু-শ্যামু দের পক্ষে কল্পনাতেও আসবে না। সে যাক, মোদ্দা কথাটা হলো বিষয়টা দেখে আমার বড্ড ভালো লেগেছে। মানে যাকে বলে ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ।....... হরিয়ানায় বর্ষা ঢুকেছে। কাল যখন কথাটা শুনলাম প্রথমে খুব একটা পাত্তা দিইনি। কারণ মা বলেছে "কক্ষনো বেশি আশা করবে না, যা পাবে তাই নিয়ে খুশি থাকবে।" তাই আমিও আশা করিনি যে হরিয়ানায় পয়লা জুলাই বর্ষা আসার কথা, সে এরকম সুবোধ বালকের মতো দুই তিন তারিখেই এসে পড়বে। তাই গরমে সেদ্ধ হতে হতে, রাতের বেলা ঘুমোতে না পেরে হাঁস ফাঁস করতে করতে, দিনের বেলা ল্যাবে গিয়ে ঢুলতে ঢুলতে.......সবসময় গরমকালের চোদ্দ গুষ্ঠিকে শাপশাপান্ত করতে করতে মনে মনে ভেবেছি........"মুন্নি, সহ্য করো, সহ্য করো......সহ্যের সমান গুণ নেই......সারদা মা সেই কবে থেকেই বলে গেছেন।" আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেছি।

এমতাবস্থায়, কাল যখন দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকে বাড়ি আসার সময় ছাতা খুলে রোদের দাঁত খিঁচুনির বদলে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আটকাতে হলো তখনই মনে হলো আমি যেন হাঁটছি না, উড়ছি। ক্রমে ঝিরিঝিরি থেকে ঝরঝর থেকে ঝমঝম শুরু হলো। আর আমি কালো হয়ে আসা ঘরে ঠ্যাং নাচাতে নাচাতে ছকতে শুরু করলাম রাতে কি ভালো মন্দ খাওয়া যায়। আমার তো 'প্রচন্ড দুঃখ', 'প্রচন্ড আনন্দ', 'প্রচন্ড সবকিছুর' ই প্রকাশ 'প্রচন্ড ভালো মন্দ খাওয়া'। একদম ছাপমারা বাঙালি আর কি। তাই প্রথম বর্ষা আসার 'প্রচন্ড আনন্দ'-টাকে সেলিব্রেট করতে 'প্রচন্ড ভালো' কি খাওয়া যায় ভাবতে লাগলাম। আগেই তো বলেছি, যে জায়গায় থাকি সেখান থেকে চট করে বাইরে গিয়ে খেয়ে আসাটা আর শনিবার সন্ধ্যায় হাওড়া থেকে খড়গপুর লোকালে সিট পাওয়াটা সমান কষ্টকর। সেক্ষেত্রে লোকজনের সাথে সিট নিয়ে ঝগড়া করতে হবে, আর এক্ষেত্রে প্রায় দুশ জনের বাইরে বেরোবার জন্য রাখা ক্যাম্পাসের একমেদ্বিতীয়ম 'টাটা সুমো' গাড়িটি ব্যবহার করার বিরল সুযোগ পেতে হবে। যাক গে যাক সে সব অবান্তর কথা। মোটকথা বাইরে যখন যাওয়া যাবে না তখন রান্না ঘরে রাখা দুটো পেটমোটা ব্যাগই ভরসা। দুজনে মিলে অনেক বাগবিতন্ডা হলো এই নিয়ে। খিচুড়ি খাব-তো ডিম কিনতে যেতে হবে, বিরিয়ানি খাব-তো মাংস কিনতে যেতে হবে। অত করিতকর্মা দুজনের কেউই নই যে সুমো জোগাড় করে বাইরে যাব এর জন্য। শেষে ঠিক হলো 'লুচি-ছোলার ডাল'। সব উপাদান বাড়িতেই আছে। এইসব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শেষ হতে দেখলাম বৃষ্টি থেমে গেছে, রোদ উঠে পড়েছে আবার। কি আর করব, 'লুচি-ছোলার ডাল' ক্যানসেল করে রুটি-ঢ্যাঁড়শের তরকারি ভাবতে ভাবতে দুজনে বোতলের মত মুখ করে তো আবার ল্যাবের দিকে চললাম।

কিন্তু না.....আজ 'হ্যাপি এন্ডিং'। অনেকদিন পর কাল বিকেল বিকেল কাজ শেষ, ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে দেখি মাঝে আরো একপশলা বৃষ্টি হয়েছে এবং, চারি দিক লালে লাল। মনটা এত ফুরফুরে হয়ে গেল যে কাঁধের ব্যাগটাও ওজনও রোজকার মত তিনমণের জায়গায় তিনশ গ্রাম লাগতে লাগলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার মত হ্যাবলাও পট করে মোবাইল দিয়ে 'একখান ফটোক' তুলে ফেললুম। আপনাদের একটু দেখাতে ইচ্ছে হচ্ছে। জানি আপনারা অনেক বেশি ভারী ভারী দামের, ভারী ভারী লেন্স দিয়ে নানান রকম কায়দা কানুন করে যেসব ছবি তোলেন তার যেকোনো একটার ধাক্কাতেই আমি কুপোকাত। তাও কালকের আকাশটা please একটু দেখুন। এই যে,

   

হুঁ হুঁ!! কেমন? ভালো না? না, মানে আমার ছবি তোলার কায়দাটা বলছি না। এত সাহস আমার নেই। আমি আকাশটার কথা বলছি।

আকাশের এরকম চাকচিক্য দেখে তো আমি ফের ফুল মুডে। রোজই আসতে যেতে কাঠ চাঁপা গাছ গুলোকে দেখি ফুলে ফুলে সাদা হয়ে আছে। কাল দেখি প্রচুর ফুল নিচে বৃষ্টির জন্য ঝরে পড়েছে। কি মনে হলো, ছোটবেলার শিউলি ফুল কুড়োতে যাবার কথা মনে পড়ে গেল। পিঠে ব্যাগ নিয়েই দুহাত ভর্তি করে ফুল কুড়োলাম। দুটো ছোট ছোট বাচ্চা মেয়েও দুএকটা ফুল কুড়োচ্ছিলো, লেগে গেলাম কম্পিটিশনে। তারা রোজই আমায় দেখে, গম্ভীর হয়ে চশমা এঁটে যাতায়াত করি। হঠাত আমার এই তত্পরতা দেখে তারাও কেমন যেন ঘাবড়ে টাবড়ে গিয়ে ফুল না কুড়িয়ে আমার দিকে চেয়ে বলল "হ্যালো দিদি"। আমি দুহাত ভর্তি সাদা ফুল নিয়ে একগাল হেসে বললাম,"হ্যালো"। তারপর ফুলগুলো দেখিয়ে মুখে বললাম, "চাহিয়ে"? আর মনে মনে বললাম, "দেখলি, কতগুলো পেলাম ফুল? তোদের চেয়ে কত্ত গুলো বেশি?" তারা বোধহয় আমার হামলে পড়ে ফুল কুড়ানো দেখে আমার প্রতি দয়া পরবশ হয়েই হেসে দুদিকে মাথা নাড়ল। দেখে মজা পেয়েছে মনে হয়, তাতে আমার ভারী বয়েই গেল। আমি দুহাত ভরে কাঠচাঁপা নিয়ে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে মনে মনে তাদের কাঁচকলা দেখিয়ে বাড়ি চলে এলাম।

ও হো, আর কাল রাতে আমরা ময়দার ফুলকো লুচি আর নারকেল সহ ছোলার ডাল দিয়ে গুছিয়ে ডিনার করেছিলাম। পুরোপুরি বাঙালি মতে। শেষ পাতে জিনট্যাক-টাকেও বাদ দিইনি।       

দাদার কীর্তি-১

চারপাশে দাদারা যা সব এক একটি কীর্তির নমুনা দিয়ে চলেছেন তাতে তো দাদা-দিদিদের কীর্তি সম্পর্কে কিছু বলতে যাওয়া মানে এই নগন্য ব্লগটির অত্যন্ত ক্ষমাশীল পাঠকরাও আর দ্বিতীয়বার এটি খুলে দেখবেন না। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি আমার নিজের এক দাদার কথাই বলতে বসেছি আপনাদের। তার সাথে খবরের কাগজের দাদা-দিদিদের কোনো সম্পর্ক নেই। নেহাত খবরের কাগজে দিনরাত দাদাদের কীর্তি দেখে শুনে মনে হলো আমিও এই বাজারে আপনাদের সাথে আমার এক দাদার কিছু মনে রাখার মত কীর্তির গল্প করে নি।

জন্মসুত্রে আমি এই দাদাটিকে লাভ না করলেও আমার এই দাদাটিকে আমি বড়ই শ্রদ্ধা করি। তার প্রথম ও প্রধান কারণ তাঁর মত সুন্দর মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। ভগবান যে কয়েকটি বিষয়ে আমায় দুহাত তুলে আশির্বাদ করেছেন তার মধ্যে এরকম কয়েকটি লোকজনের সাথে জীবনে আমার দেখা হওয়াটা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে আমার মনে হয়। দাদাটি আমার অম্লান বদনে নিজের কৃতিত্ব অন্যকে দিয়ে দিতে পারে। বললে বলবে "ঠিক আছে, ও-ও তো আমায় হেল্প করেছে কাজটা করতে"। অপরের দোষের ভাগ অহেতুক বিনা বাক্যব্যয়ে নিজে নিয়ে নিতে পারে। যুক্তিটা এক্ষেত্রে "ঠিক আছে....অত কথার কি আছে, কেউ একজন বকুনি খেতই, আমার ওপর দিয়েই গেল, কাজটা তো শেষ পর্যন্ত হয়ে গেল, বল"? এমনকি কয়েক মাস ধরে কোনো মেয়ে তাকে অসাধারণ পারদর্শিতায় প্রেম প্রেম চোখ করে use করছে এবং শেষে "তোমায় তো দাদার মত দেখি" বলে ড্যাং- ড্যাং করে অন্যের হাত ধরে টাটা করতে করতে চলে যাচ্ছে জেনেও যেচে সেইমেয়েটিরই উপকার করতে পারে। এক্ষেত্রে যুক্তিটা হয়ত 'ঠিক আছে আমি তো আমার কাজটা করলাম'। 'হয়ত' বললাম এই জন্য যে এইসব ক্ষেত্রে আমি দাদার সাথে কোনো আলোচনা করিনি, কিছুটা কষ্টে, কিছুটা দাদার নির্বুদ্ধিতায় রেগে গিয়ে। অনেকটা বইতে পড়া ঋষিসুলভ মানুষ। এইসব যদি চোখে না দেখতাম, হয়ত বিশ্বাস করতাম না এরকম মানুষ বইয়ের পাতা ছাড়া বাস্তব জীবনেও আছে।

আমার এই ব্যোম-ভোলানাথ টাইপের সুন্দর দাদাটি আবার মাঝে মাঝে এমন সব স্মরণীয় ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে যে কি বলব। এরকমই কয়েকটা বরং এইবেলা আপনাদের সাথে শেয়ার করে ফেলি।

প্রচন্ড ইম্পর্টান্ট কোনো পরীক্ষা দিতে গিয়ে যখন মনে হয় ঘড়িটা ঘোড়ার মত ছুটছে, হাতে জেট-প্লেনের স্পিড আনার চেষ্টা করছেন সব উত্তর দেবার জন্য, এমন সময় কাউকে ঘুমিয়ে পড়তে শুনেছেন?........আমার দাদা এই মহান কাজটি করার ক্ষমতা রাখেন। নেট পরীক্ষা, যা কিনা আমাদের মতো, 'রিসার্চ করে দেশোদ্ধার করব' গোছের ছিটিয়ালদের ল্যাবে ঢোকার সদর দরজা, সেই মরণ-বাঁচন পরীক্ষাতে উনি বেমালুম কুড়ি মিনিট ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছিলেন। ভাবতে পারেন? ওঁনার জবানীতেই বলি। "আরে, খুব ভাবনা চিন্তা করতে গেলেই আমার ঘুম পেয়ে যায় জানিস তো? একবার তো নেট পরীক্ষা দিতে গিয়ে প্রথমে যা লেখার লিখে ফেলেছি, যেগুলো পারছি না সেগুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন চোখ লেগে গেছে বুঝতেই পারিনি বুঝলি, হঠাত চটকা ভেঙ্গে দেখি কুড়ি মিনিট পার হয়ে গেছে।"
আমরা যারা শুনছিলাম আঁতকে উঠে বললাম "বল কি?"
"আরে কি করব? আমার বেশি concentrate করতে গেলেই ঘুম পেয়ে যায়"-বলেই সেই ঋষিসুলভ হাসি, কি আর বলা যায় এঁকে বলুন?

এখানে বলে রাখি, দাদাটি আমার ল্যাবতুতো দাদা, যদিও সেই পরিচয়টা আমার কাছে গৌণ, সে আমার নিজেরই দাদা, তাও পরবর্তী ঘটনা গুলি আপনাদেরকে বোঝাতে সুবিধা হবে তাই বলা আর কি। এঁর কাছেই আমার যাবতীয় কাজকর্ম শেখা, যেসব ভাঙিয়ে আমি এখনো অবধি করে খাচ্ছি। ইনিই আমায় আক্ষরিক অর্থেই হাতে ধরে সমস্ত কিছুকে 'অ-এ অজগর আসছে তেড়ে' থেকে শিখিয়েছিলেন। এবং এখনো কিছু সমস্যা হলে আমি নির্দ্বিধায় এঁনাকে সর্বদা জ্বালাতন করে থাকি।

একবার জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝি আমাদের দুজনকে মুম্বই যেতে হয়েছিল ল্যাব এরই কোনো একটি অকাজে। হাওড়া থেকে মুম্বই দুরন্ত ছাড়বে সকাল আটটা কুড়ি তে। সকাল থেকে প্রবল বৃষ্টি। দক্ষিন কলকাতা থেকে ট্যাক্সি জোগাড় করে আটটার মধ্যে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছানো সেদিন ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। কি করে যে সেদিন পৌঁছেছিলাম সেটি নিয়েই একটা পোস্ট লেখা যায়। যাই হোক, আপাদমস্তক চুপচুপে ভিজে আমরা চারটি প্রাণী কোনোমতে খুবই করুন অবস্থায় তো স্টেশন এ পৌঁছলাম। চারটি প্রাণী বলতে আমার সাথে আমার বাবা, মামা এবং আমার উপগ্রহ পিনাকী। তারা সবাই চলেছে আমার সাথে।আমরা যখন একশ জন লোকের একশ রকম কাজের ফিরিস্তি, যার সাড়ে নিরানব্বই পার্সেন্টও আমাদের কোনো কাজে লাগবে না, তাই শুনতে শুনতে বোর হয়ে-মাথার যন্ত্রণা হয়ে-ক্লান্ত হয়ে প্রায় আধমরা হয়ে পড়ব, ঠিক সেই সময় আমার সঙ্গের তিনজন মজা করে মুম্বই এবং তার আশেপাশে চরকি পাক খাবেন বলে। কি প্যাথেটিক ভাবুন একবার।
সে যাক গে দুঃখের কথা, ক্রমশঃ তো আটটা বাজলো। ট্রেন গুটি গুটি প্লাটফর্মে ঢুকলো। দাদার আমার পাত্তা নেই। বাকিরা চিন্তা করলেও আমার বিশেষ চিন্তা হচ্ছিল না কারণ আমি দাদার প্রোটোকল জানি। উনি সাধারণত ট্রেন ছাড়ার পাঁচ-দশ মিনিট আগে এসে পৌঁছান সব সময়। যদিও ওঁনার এস্টিমেট থাকে আধঘন্টা আগে পৌঁছানোর। তো সে গত এক ঘন্টা আগে শান্ত গলায় ফোনে বলেছে "হ্যাঁ রে আমি বেরিয়েছি। পৌঁছে যাব চিন্তা করিস না। ট্যাক্সি পাচ্ছি না।" ভাবলাম নিশ্চয়ই আটটা পনেরো নাগাদ পৌঁছে যাবে।
ট্রেন এ উঠে আমি আবার ফোন লাগাই। "কি গো কোথায় আছো? ট্রেন তো প্লাটফর্মে ঢুকে গেছে।"
---"আরে আমি মৌলালিতে, ট্যাক্সি পাচ্ছিলাম না। যাও বা অনেক কষ্টে পেলাম রাস্তায় এত জল জমেছে ট্যাক্সি গেল খারাপ হয়ে আমি একটা বাস পেয়েছি, আসছি।"
---আরে কি বলছ??? ট্রেন আটটা কুড়ি তে ছাড়বে!!!!! কি করে পৌছাবে তুমি?? আমি আর্তনাদ করে উঠি।
আমার নিরুত্তাপ দাদাটি বলেন "দাঁড়া না, সকাল বেলা রাস্তা ফাঁকা, ঠিক পনের মিনিটে হাওড়া পৌছে যাব। চিন্তা করিস না।"

বুঝতেই পারছেন পরিস্থিতি, আমরা ট্রেন এ উঠে ব্যাগ-ব্যাগেজ ঠিকঠাক করিনি পর্যন্ত। টেনশনের চোটে পিনাকী বাইরে পায়চারী করছে, আর আমি প্রতি দুই মিনিট অন্তর ফোন করছি "কোথায় আছো-কোথায় আছো" করে। সঙ্গে আবার আমার বাবা। যাঁর স্বভাব অন্তত দুটি ঘন্টা আগে স্টেশনে পৌঁছানো। যাঁরা আমার বাবার কথা পড়েছেন তাঁরা জানেন আমার বাবার পক্ষে এই ঘটনাটি চোখের সামনে বসে দেখা কতটা অবিশ্বাস্যরকমের কষ্টকর। তিনি তো প্রতি দশ সেকেন্ড অন্তর একবার করে মাথা নাড়ছেন, আর বিড়বিড় করছেন "কেন যে এরা একটু তাড়াতাড়ি বেরোয়না"?  "উফ কি যে করে?" "একটু আগে পৌঁছে বসে থাকতে যে কি হয়?"........ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের সাথে সাথে আশেপাশের অন্যান্য সহযাত্রীরাও ব্যাগ-ফ্যাগ গুছিয়ে সুস্থ হয়ে বসে ব্যাপারটা শুনে ক্রমশঃ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে থাকেন।

আটটা পনের।
আবার ফোন করি "কোথায় তুমি?"
---"আমি হাওড়া ব্রিজে। বাসটা খুব আসতে চলছিল বলে নেমে আবার একটা ট্যাক্সি নিয়েছি।"
---"ভগবান! ভালই হয়েছে তুমি সোজা নিউ কমপ্লেক্স এর দিকে চলে এস। এত নম্বর প্লাটফর্মে আছে ট্রেন। জলদি। "

 আটটা কুড়ি। ট্রেন হুইসিল দিল।
---"ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে, কোথায় তুমি?"
---"আমি ঢুকেছি স্টেশনে, দৌড়াচ্ছি রে। মনে হচ্ছে আর হবে না বুঝলি, তোর কাছেই তো আমার পোস্টারটা আছে, তুই আমার পেপারটা প্রেসেন্ট করে দিস। " দৌড়াতে দৌড়াতে একশ ভাগ নিরুত্তাপ-শান্ত গলায় দাদা বলতে থাকে।
আমি জানিনা এই রকম পরিস্থিতিকে কারো পক্ষে কি করে এত শান্ত থাকা সম্ভব? কি করে ওই মুহুর্তে পোস্টার প্রেসেন্টেশনের কথা মাথায় আসা সম্ভব? একটা অক্ষর বানিয়ে বলছি না বিশ্বাস করুন।

আমি দরজার বাইরে প্রায় ঝুলে ফোন কানে নিয়ে চিত্কার করি...." আরে ছাড় তোমার পোস্টার-পেপার। ট্রেন চলতে শুরু করেছে তুমি দৌড়াও, তোমায় দেখতে পাচ্ছি না কেন? তুমি কি প্লাটফর্মে এসে পৌঁছাঁওনি এখনো?"

প্লাটফর্মের কুলিরা, মামা এবং অন্যান্য সহযাত্রীরা আমায় আশ্বাস দেন যে আর চিন্তা করার কারণ নেই, ট্রেনটা দাদার নিশ্চিত ভবেই মিস হয়েছে। বাবা ততক্ষণে চুপ। আমিও দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিটে এসে বসি। আমার সাথে সাথে অন্য পাসেঞ্জার-রাও দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত হয়ে বসেন। সবাই-ই এতক্ষণ উত্কন্ঠায় ছিলেন।
এমন সময় আমাদের ফের উত্কন্ঠিত করে ট্রেন প্লাটফর্মের শেষ প্রান্তে এসে হঠাতই ধীরে ধীরে থেমে যায়। সকলেই শিরদাঁড়া সোজা করে বসেন। আমিও ফের ফোন করি "ট্রেন থেমেছে.... তুমি আর একটু দৌড়াও... পেয়ে যাবে।"
উত্তর আসে সেই ধীর গলায় "হ্যাঁ রে দৌড়াচ্ছি, ট্রেন এর মাথাটা দেখতে পাচ্ছি।"
আমি ফোন রেখে দি। আমার দাদাটি এইরকম ক্রিটিকাল মুহূর্তেও ফোন ধরবেই, ফলে দৌড়ানোর স্পিড কমতে বাধ্য। ঠিক আছে ট্রেন আবার স্পিড নিলে আমি ফোন করব। তখন তো ফয়সালা যা হবার হয়ে যাবে।
ট্রেন চলতে শুরু করল.....দম বন্ধ করে বসে আছি সবাই...থ্রিলার মুভির ক্লাইম্যাক্স চলছে যেন....ট্রেন প্লাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে কিছুটা গেলেই ফোন করব।

আমায় আর করতে হলো না দু মিনিট পরে দাদারই ফোন।
"উঠেছি রে। গার্ড এর কামরায়, গার্ডকে হাত দেখিয়েছিলাম, আমায় অনেক দূর থেকে দৌড়াতে দেখে গার্ড থামিয়েছে ট্রেনটা। দাঁড়া আসছি তোদের কাছে।"
হাতের ব্যাগটা গার্ডকে ছুঁড়ে দিয়ে অন্য ব্যাগটা  কোনোক্রমে টেনে তুলে হাঁচড়- পাঁচড় করতে করতে দাদাটি আমার সে যাত্রা মুম্বই দুরন্তর আপামর যাত্রীকে ঝাড়া দু-দুটি মিনিট এক্সট্রা লেট করিয়ে শেষ পর্যন্ত ট্রেন এ উঠেছিলেন।

যুদ্ধজয়ের পর আমাদের কাছে আসার সময় আমি তো বটেই আমার সাথে অন্য সব যাত্রীরাই আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলেন। কারণ সকলেই তো গত কুড়ি-পঁচিশ মিনিট ধরে আমাদের সাথে সাথে শ্বাস বন্ধ করে ছিলেন, তাই ওটা ছিল টেনশন রিলিজের স্বতস্ফুর্ত বহিঃপ্রকাশ।

আর দাদাটি? সে স্বভাবসুলভ হাসি হাসি মুখে সকলের সাথে হাত মিলিয়ে বিশাল বপুটি নিয়ে বসে হ্যা- হ্যা করে হাঁপাতে লাগলো। আর মৃদু মৃদু হাসতে লাগলো। আর তার পাশে বসে আমার বাবা তো তাকে অবিশ্রান্ত উপদেশ-নির্দেশ, দেরী করে বেরোনোর কুফল ও তাড়াতাড়ি বেরোনোর সুফল সম্পর্কে বেশ বড়সড় একটি প্রবন্ধ মুখে মুখে শোনাতে লাগলেন। সহযাত্রীরাও তাতে বেশ মাথা টাথা নাড়তে লাগলেন।

শেষে একসময় তাঁর উপর গণ-উপদেশের বন্যা শেষ হলো, সমস্ত সহযাত্রীরা যে যার নিজের বাড়িতে ফোন করে ট্রেন ঠিকঠাক ভাবে চলতে শুরু করেছে এবং তাঁরাও ঠিকঠাক ভাবে তাতে চেপে বসতে পেরেছেন এই খবর দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কারণ এতক্ষণ সবাই এই অত্যাবশ্যক কর্মটিকে ভুলে মেরে দিয়েছিলেন এই মৌলিক adventure মুভিটি বিনা পয়সায় দেখতে গিয়ে। এই সময় আমি ভাবলাম আমিই বা জ্ঞান দেবার এই সুবর্ণ সুযোগ ছাড়ি কেন? প্রচন্ড গম্ভীর হয়ে বললাম, "তুমি তো দেখলে এত বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকে, তুমি একটু তাড়াতাড়ি বেরোবে তো? কি হত বল তো?" শান্ত নির্লিপ্ত গলায় একগাল হেসে বলল "কি আর হতো? বাড়ি ফিরে যেতাম, তুই আমার পোস্টার প্রেসেন্ট করে দিতিস?"
খানিকক্ষণ হাঁ করে মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে শেষে ভাবলাম-"সত্যই তো, কি ই বা হতো? এমন কি খুব ক্ষতি হত? আমরা বড্ড বেশি চিন্তা করি জীবন নিয়ে, জীবন বড় সহজ- সরল, তাকে সহজ করে নিলেই হয়।"
দাদাটি আমার বড় ভালো গান করেন, সেযাত্রা তাঁর নতুন অ্যালবামের গান ও অন্য অনেক সুন্দর সুন্দর গানে আমাদের জার্নিটি অত্যন্ত উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল।

আমার এই দাদাটিকে নিয়ে এরকম অনেক মজাদার ঘটনা আছে, যা নিয়ে আমরা সবাই হয়ত হাসাহাসি করি বা করেছি অনেক সময়, কিন্তু দিনের শেষে একা ভাবতে বসলে ওই কথাটাই মনে হয় "সত্যিই তো কি ই বা হত?" শান্ত- সহজ-অত্যন্ত বিনয়ী-নিজের কাজের প্রতি দুশ ভাগ সত এই মানুষটির প্রতি অনেকসময় রাগও হয়েছে জানেন। কেন সে অন্যের কাছ থেকে ঠকছে জেনেও প্রতিবাদ করবে না? কেন তার নিজের সহজাত বিনয়কে অন্য লোকে দুর্বলতা ভেবে তাকে ব্যবহার করছে জেনেও তার উপকার করবে?......ইত্যাদি ইত্যাদি। আজ মনে হয়, আমার সৌভাগ্য যে, এরকম একটা মানুষের সাথে একসময় দিন দুবেলা কাজ করেছি। তাই তো এই গুণগুলোকে কেবলমাত্র ছোটবেলায় বইতে পড়া কেতাবি কথা বলে ভুল না করে নিজের জীবনেও অন্তত কিছুটা প্রয়োগ করার উদাহরণ চোখের সামনে দেখতে পেলাম। ভেবে বড় শান্ত লাগে নিজেকে।

যাক গে, আজ এপর্যন্তই থাক। সদাহাস্যময়-নিরুদ্বিগ্ন ধীর-শান্ত এই মানুষটির আরো অনেক মজার কাহিনী আমি আপনাদের শোনাব ভবিষ্যতে খুব তাড়াতাড়িই। আপাতত এই পোস্টটির জন্য এখানেই থামছি। ভালো থাকবেন সক্কলে।    

Wednesday, 2 July 2014

সাবধান!! সাবধান!! ফেসবুক থেকে সাবধান!!

Fig. 1.

Adam D.I. Kramer এর PNAS, 2014 র পেপার থেকে 

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই একবার, বাথরুম এ ঢুকে একবার, বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে চান্স পেলে আরো একবার এবং কাজের জায়গায় পৌঁছেই ল্যাপটপটাকে কোনো মতে প্লাগে লাগিয়েই যে সাইটটার নাম আমরা সবাই প্রথমেই ঝটপট টাইপ করে ফেলি সেটা নিসন্দেহে Facebook। কি? ঠিক বলিনি? তার পর তো ওই ট্যাবটি সন্ধ্যেবেলা যখন আপনি আবার বাড়ি ফেরার জন্য ব্যাগ গোছাবেন তখন পর্যন্ত খোলাই থাকবে। এবং প্রতি পনের মিনিট অন্তর একবার করে ওই ট্যাব এ ফেরত যেতেই হবে, নইলে নার্সারী ক্লাস থেকে শুরু করে এত বন্ধুবান্ধব, পরিচিত, বন্ধুর বন্ধু, পরিচিতের পরিচিত.....এত এত লোকজনের এত এত আপডেট সব মিস হয়ে যাবে যে। তা তো  হয়না। এখন তো আরো স্মার্ট হয়ে গেছে ব্যাপারটা। আমার মতো আনস্মার্ট ক্যাবলার হাতেও স্মার্ট ফোন। কাজ করতে করতে, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, ভিড় বাসে দাঁড়িয়ে লোকের গুঁতো খেতে খেতে, গাড়িতে যেতে যেতে এমনকি প্রাতঃকালীন প্রাত্যহিকি সারতে সারতে পর্যন্ত লোকে ফেসবুকে মুখ ডুবিয়ে ক্রমাগত আপডেট নিয়ে এবং দিয়ে চলেছে।

সে না হয় করুক গে যাক। কিন্তু আজ একটা খবর পড়া অবধি সবাইকে না বলে স্বস্তি পাচ্ছি না। তাই সকাল সকাল এসে ফেসবুক চেক টেক করেই আপনাদের বলতে বসেছি। সাংঘাতিক এক ছোঁয়াচে অসুখ নাকি ছড়াচ্ছে ফেসবুক থেকে। নাকি বলছি কেন সত্যি সত্যি। পৃথিবী বিখ্যাত মস্ত বৈজ্ঞানিক পত্রিকা তো তাই বলছে। না হাঁচি-কাশি-ফ্লু নয়, রীতিমত ভয়ানক অসুখ। যেমন ধরুন কান্না পাওয়া, পৃথিবীর কাউকে বিশ্বাস না করা, মরজগতে তুমি যে একা- এটা নতুন করে মনে পড়ে 'হা হতোস্মি' বলে উদাস হয়ে যাওয়া ইত্যাদি প্রভৃতি। বোঝা যাচ্ছে না ব্যাপারটা, না? আচ্ছা সহজ করে বলছি। জ্ঞানী গুনী গবেষকরা গবেষণা করে বলছেন যে, আপনি আজ ফুরফুরে মেজাজে শিস দিতে দিতে বাড়ি ফিরবেন নাকি অটোতে বসে পাশের গোবেচারা লোকটির ভেজা ছাতা থেকে একফোঁটা জল গায়ে পড়লেই গলাবাজি করে ফাটিয়ে দেবেন অথবা কোনো কিছুই না করে বাড়ি ফিরে ছাদে বসে আকাশের দিকে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকবেন তা নির্ভর করে আপনার বন্ধুরা ফেসবুক এ কি ধরনের পোস্ট করছেন তার ওপর। যদি আপনি সারাদিন ধরে প্রচন্ড উদ্দীপনা মূলক পোস্ট পড়েন তবে আপনিও সেদিন বাড়ি ফিরে মুখটা বাংলার পাঁচের মত করে বাসন মাজতে না বসে হয়ত রঙ-তুলি নিয়ে ছোটবেলার ভুলতে বসা বিদ্যেটাকে ঝালিয়ে নিতে চাইবেন। আবার যদি আপনি সারাদিন ধরে ঘ্যানঘ্যানে মন খারাপ করা সব পোস্ট পড়েন তবে তো হয়েই গেল, বাসন মাজাটাও সেদিন আর হলো না, বাড়ি ফিরে আলো নিভিয়ে সটান সিলিং এর দিকে তাকিয়ে প্রতি দু মিনিটে একটা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে আপনাকে। ফলে আপনিও রাত সাড়ে বারোটার সময় উঠে অনেক খুঁজে পেতে পরের একঘন্টা ধরে এডিটিং করে আরো একটি একাকিত্ব-দীর্ঘশ্বাস-অশ্রুবিন্দু মার্কা পোস্ট করবেন। সেটি পরদিন সকালে আপনার বন্ধু শিস দিতে দিতে অফিসে এসেই পড়বেন এবং সেদিনের মতো মুডের সাড়ে চোদ্দটা বাজিয়ে ফেলবেন। আপনি কিন্তু ততক্ষণে অন্য একটি উদ্দীপক উদ্ধৃতি পড়ে-টড়ে ফের একদম চাঙ্গা মুডে। মানে ব্যাপারটা খানিকটা এরকম, আপনার কারো থেকে ভাইরাল ইনফেকশন হলো-আপনি কিছুদিন ভুগলেন-আপনার বন্ধু আপনাকে দেখতে এল-আপনি তার মুখের সামনে ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ করে হাঁচলেন-পরদিন আপনার জ্বর সেরে গেল-বন্ধু পড়ল জ্বরে। একদম টিপিকাল ছোঁয়াচে রোগ যেমন হয় আর কি। কি সাংঘাতিক ব্যাপার দেখুন দেখি?

এই বাজারে যখন শুনি নাকি ভালো থাকাটাই বড় কঠিন বিষয়, তখন কোথায় একটু কাজের ফাঁকে, মানে ফাঁকি মেরে ফেসবুক দেখব তাতেও একগাদা বালি? কি নিয়ে বাঁচা যায় বলুন তো? বসের কাছে ধ্যাতানি শুনে এসে মন ভালো করতে ফেসবুক খুলে যদি অন্যের কাঁদুনি শুনে আরো বেশি কাঁদতে হয় তবে আর "তারা দাঁড়াই কোথা "?  তবে ভেবে দেখলাম এর একটা ভালো দিকও আছে। মানে উল্টোটা যদি হয় আর কি? বসের ধ্যাতানি শুনে এসে ফেসবুক খুলে যদি অন্যের কাঁদুনির জায়গায় দলাই লামার উক্তি দেখতে পাই তবে উঠে বসলেও বসতে পারি তাই না? তাই মাথা-টাথা চুলকে ভাবতে বসতে হচ্ছে কি করা উচিত? এমনিতেই অজস্র কান্নাকাটির উপকরণ থাকতে নতুন করে ফেসবুক দেখে জানলার বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে এ ব্যাপারটা বড় ভালো বলে মনে হছে না। আবার ফেসবুক খুললে সক্কলের যে সব আন্তর্জাতিক মানের ফটোগ্রাফি, স্বরচিত কবিতা ইত্যাদি নানান অমূল্য জিনিসপত্র দেখা যায় সেসব থেকেও বঞ্চিত হতে ইচ্ছা করছে না।

আমাকে অত্যন্ত ভাবিত দেখে এক জুনিয়র বলল- "কিছু প্রবলেম?" বললাম সমস্যাটা। বলে "আরে ভাবছ কেন? যারাই কোনো কিছু নিয়ে বেশি বেশি পোস্ট করতে থাকে আমি তো তাদের ব্যান করে দি। সে বেশি বেশি ঠাকুর দেবতার পোস্ট, বেশি বেশি রাজনৈতিক পোস্ট, বেশি বেশি নেগেটিভ পোস্ট যাই হোক না কেন।"

এখন ভাবছি আরো একটা কাজ তাহলে বাড়লো। শুধু ফেসবুক চেক করলেই হবে না, স্ক্রুটিনিও করতে হবে কোন কোন পোস্ট পড়লে আমার সন্ধ্যেবেলার কাজকর্ম ফেলে বেশি বেশি হাবি জাবি খেতে ইচ্ছে করছে। মানে ওটাই আমার ডিপ্রেশন এর মেন সিম্পটম কিনা। আপনাদের কি বক্তব্য এই ব্যাপারে?

নাহ, অনেকক্ষণ গল্পগাছা হলো। এবার একবার ফেসবুক চেক করে নিয়ে একটু কাজকর্ম করা যাক। 

Tuesday, 1 July 2014

সোমভদ্র-মেরুকা না সোমভদ্র-শফরী

সোমভদ্র, মেরুকা আর শফরী কে মনে আছে? নইলে আমি একটু সাহায্য করতে পারি। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা 'আদিম' গল্পের নায়ক-নায়িকা এরা। পাঁচ হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরের একটি বিশেষ সামাজিক রীতি নিয়ে লেখা একটি দুর্দান্ত গল্প। সোমভদ্র-মেরুকা-শফরীর ত্রিকোণ প্রেমের গল্পে জিতেছিল শেষপর্যন্ত সোমভদ্র-শফরী জুটি। ভাবছেন সকাল সকাল এই অতি সাধারণ প্লটের বিশেষ গল্পটি নিয়ে পড়লাম কেন? কারণ আছে। গল্পটির বিশেষত্ব হলো, সোমভদ্র আর শফরী ছিল আপন ভাই-বোন।

ইয়েস!!!!!!!! সেই সময় মিশর কেন আরো অনেক জায়গাতেই আপন ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে সামাজিক ও আইনগত ভাবে স্বীকৃত ছিল। ছোটবেলায় ইতিহাস বইতে পড়া বিখ্যাত সব লোকজন যেমন তুতেনখামেন, ক্লিওপেট্রা এঁরা সবাই নিজের নিজের ভাইবোনকেই বিয়ে করেছিলেন। এছাড়া গল্প উপন্যাসে এরকম নানা ঘটনার উল্লেখ তো আছেই। আজকাল জেনেশুনে এধরনের বিয়ে না হলেও অজান্তে হতেই পারে। যেমন চীন এর একটি সত্যি ঘটনার কথা পড়ছিলাম কিছুদিন আগে। বেচারারা ছোটো থেকে একসাথে বড় হয়েছে পাশাপাশি বাড়িতে। বড় হয়ে প্রেম ও বিয়ে। তারপর তাদের ছানা-পোনা হবার প্রশ্ন যখন ওঠে তখন বেচারী পাত্রের বাবা আসল রহস্য ফাঁস করেন।

তা সে যাই হোক। সামাজিক ভাবে এ প্রথা কেন আগে চালু ছিল আর কেনই বা তা বন্ধ হয়ে গেল তা নিয়ে আপাতত আমার চুল না ছিঁড়লেও চলবে। আমার যেটি বক্তব্য সেটি হলো-বিয়ে এমন লোককেই করা উচিত যার সঙ্গে থাকতে গেলে দিন দুবেলা লাঠালাঠি করতে হবে না। বেশ সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে দুনিয়ার লোকের নামে পি-এন-পি-সি করা যাবে, রাত দুটো পর্যন্ত কমেডি বা থ্রিলার দেখা যাবে.....ইত্যাদি ইত্যাদি আরো অনেক কিছুই করা যাবে। এখন যদি আপনার পাশের লোকটির সাথে আপনার পছন্দ গুলো একেবারেই না মেলে? মানে ধরুন, আপনি 'X'-এর নামে নিন্দে করতে চান কিন্তু 'X'-কে আবার আপনার পার্টনারের দারুন পছন্দ, অথবা- আপনি থ্রিলার দেখতে চান পাশের জন তখন বক্সিং দেখতে মগ্ন। এমতাবস্থায় তো কিছুদিনের মধ্যে লাঠালাঠি হতে বাধ্য।

সেজন্যই আমরা সব আজকাল বিয়ের হাঁড়িকাঠে গলা দেবার আগে ভেবেচিন্তে অনেক দিন ধরে সাম্ভব্য candidate দের বেশ করে বাজিয়ে নিয়ে অর্থাত কি থেতে, কোথায় বেড়াতে যেতে, কোন TV শো দেখতে ভালোবাসে ইত্যাদি নানান গুরুত্বপূর্ণ সব criteria বিচার করে তবে একজনকে পছন্দ করি। তাতে সময় যায় বিস্তর। যথা আপনাকে তার সাথে পার্কে, restaurant এ, সিনেমা হলে আরো নানান জায়গায় দিনরাত্রি- রোদবৃষ্টি মাথায় করে ঘুরে বেড়াতে হবে, প্রচুর প্রেম-প্রেম কবিতা শুনতে ও শোনাতে হবে, একগাদা হাবিজাবি খাদ্য-পানীয়র খেয়ে পেট ও পকেটের অবস্থা খারাপ করতে হবে, এসব করতে গিয়ে মতের মিল না হলে খোলা জায়গায় ক্লাস ফোরের বাচ্চাদের মতো গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করতে হবে, নিদেন পক্ষ্যে কোল্ড ওয়ার এর পর ঘরে বসে চোখ- নাক মুছতে হবে, ফোন বা ইন্টারনেট এর বিল বাড়বে, শরীর খারাপ হবে, বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ কমবে, বাড়ির লোকজনের কাছে চোর চোর হাবভাবে ঘুরে বেড়াতে হবে........ইত্যাদি ইত্যাদি আরো সম্ভব-অসম্ভব কি কি যে হতে পারে তা আর কি বলব। সবাই কম বেশি ভুক্তভুগী। এবং তাতেও যে সবসময় সফল হওয়া যায় তা নয়।

কিন্তু একটা বেসিক প্রশ্ন, এতসব আপনি করবেন কেন? আপনি যার সাথে থাকবেন তার সাথে আপনার পছন্দ মেলে কিনা জানবার জন্য? ভগবান!!! তার জন্য এত সময়-এনার্জি-পয়সা-শরীর সব নষ্ট। দাঁড়ান আমি একটা শর্টকার্ট পদ্ধতির সন্ধান পেয়েছি। আপনাদেরও বাতলে দি।

আপনার পছন্দ-অপছন্দ সমস্ত কিছু কে নিয়ন্ত্রণ করে কে? না আপনার DNA। একথা এখন ক্লাস ফাইভ এর বাচ্চাও জানে, তাইতো? এখন যদি আপনি এমন একটি লোককে খুঁজে বার করতে পারেন যার DNA, আপনার DNA র যমজ না হোক মোটামুটি একই রকম জিনিসপত্র দিয়ে তৈরী, তাহলেই কেল্লা ফতে। বুঝলেন না? তার আর আপনার ডিএনএ যদি মোটামুটি একই রকম হয় তবে তো আপনাদের পছন্দ-অপছন্দ গুলো মিলে যাবার চান্স অনেক বেশি। DNA র মিলে শতকরা যত ভাগ বাড়বে, আপনাদের লাঠালাঠিও শতকরা ততভাগ কমবে। এক্কেবারে ইনভার্স রিলেশনশিপ। আমি বলছি না রিপোর্ট বলছে, পড়ে দেখে নিন। সুখী বিবাহের চাবিকাঠি নাকি ডিএনএ এর মিল। ভালই হলো এখন আর চিন্তা নেই। এত কষ্ট করে কাউকে আর জীবন সঙ্গী খুঁজতে হবে না। সাম্ভব্য পাত্রদের ধরে ধরে তার খানিকটা করে রক্ত নিতে হবে, তা থেকে DNA বার করে নিয়ে ঠান্ডা ল্যাবে বসে খানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিজেরটার সাথে মিলিয়ে দেখলেই হলো। যার সাথে মিল সবচেয়ে বেশি তার গলাতেই মালা। সময়-এনার্জি-পয়সা-শরীর সব সাশ্রয়। দারুন না ব্যাপারটা?

মনে হয় এজন্যই আগেকার দিনে ভাই বোনের মধ্যে বিয়ের প্রচলন ছিল। অন্য পরিবারের কারোর চেয়ে নিজের ভাই বোনের সঙ্গে DNA র মিল বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কে আর দিন-দুবেলা লাঠালাঠি চায় বলুন। সাধে কি আর সোমভদ্র মেরুকাকে ছেড়ে শফরীকে বেছে নিয়েছিল?