Thursday, 23 October 2025

23rd October 2025

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ছায়া যখন লম্বা হয়ে হেলে থাকা অবস্থা থেকে ছোট্ট হয়ে পায়ের তলায় পড়ে থাকা অবস্থায় পৌঁছায়, মানসিক স্থিতিও ক্রমান্বয়ে লম্বা বিস্তারিত থেকেক্রমশ: ছোট হতে হতে পায়ের তলায় মিলিয়ে যায়।

--------------------

আদতে আমি অন্তর্মুখী হলেও মাঝে মাঝে মানুষের সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করে আসলে সমাজবদ্ধ মানবজীবনে কথোপকথন না হলে মনে চাপ পড়ে আর সবচাইতে বড় কথা, কথা বলা আর শোনার মধ্যে শোনার ভাগ এখন কম সবাই বলতে চায় শোনার জন্য একজন মানুষ যার আছে, সে ভাগ্যবান আমিও হাতে সময় থাকলে নানা মানুষকে ফোন করার কথা ভাবি আজকাল চট করে ফোন করা যায় না কাউকে মেসেজ করে আগাম পরিস্থিতি বুঝতে হয়মেসেজই করি কখনো কেউ উত্তর করে দুই চারজন হাতে গোনা মানুষ ফোন করে কথা বলে একটি বা দুটি মানুষ শোনে আমিও কি শোনার জন্য ফোন বা মেসেজ করি? হয়তো আমার জমে থাকা অনুভূতিগুলিকে বাইরে বের করবার জন্যই হাত বাড়াই চৌকোনা যোগাযোগ যন্ত্রটির দিকে বলার তাগিদই বেশিশোনার আর তেমন তাগিদ কৈ! কেউ কেউ আবার শোনার ভান করেন ভান যে সেটা তাঁরা বুঝে করেন এমনটা নয়কান পেতে অপেক্ষা করেন কখন সামনের মানুষের বাক্যটি শেষ হয় সাথে সাথে তিনি কিছু একটা উত্তর করেন ঝগড়া নয় জাস্ট কথা বলে যাওয়া সামনের মানুষটি কী বললো, তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি যে অনেকসময় অবান্তর কথা বলছেন সেটাই বুঝে বলেন নাকেমন এক মগজ হৃদয়রহিত কথাবার্তা কথোপকথন নয়

আবার এমনও হয়েছে, আগে খুবই গভীর কথোপকথন হয়েছে এমন মানুষের সাথে বহুদিন যোগাযোগ নেই, কি মনে হতে মেসেজ করে কুশল সংবাদ নেবার পরে ভালো করে কথা বলবো এমন প্রস্তাব দিতেই সে মানুষ ভারী ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কিছুতেই ফোন তো দূর, মেসেজ অবধি আর করে উঠতে পারেনি বা ভারী দায়সারা উত্তর দিয়েছেঅথবা, হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই একদিন কথা বলব সেই একদিন আর আসেনি আসলে আসবেওনা এসব সিগন্যাল আজকাল বুঝতে পারি অপরপক্ষ তেমন ভাবে আর উৎসাহিত নয় কথোপকথনে অথবা সেসব পুরোনো দিন গেছেই সত্যসত্যিই চলে অথবা ভেবেছে কোনো জাগতিক প্রয়োজনে কথা বলতে চাইছি সেটা ভাবা অবশ্য তেমন অযৌক্তিক নয় আজকালের চটজলদি ডিজিটাল সম্মোহনের যুগে, পুরোনো মানুষের সাথে সম্পর্ক জিইয়ে নিয়ে পুরোনো কথা কপচাতে চাওয়া মানুষ আর কে আছে! সুতরাং মেসেজের সুতোটা ফোনের স্ক্রিনে ওপেন এন্ডেড হয়েই থেকে গেছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে! তার মধ্যেও দুএকজন নিজে থেকে খোঁজ নেয় মেসেজ করলে উত্তর আসেই একটানা চল্লিশ মিনিট সত্যিকারের কথোপকথনের মতো ফোনকলও আসে সেসব অমূল্যসম্পর্ক! যত্নে লালন করতে হয় অবশ্য লালন না করলেও কি করে যেন সুতোটা রয়েই যায় সৌভাগ্য!   

 

হেমন্তের দুপুর পার হলেই বাতাসে যে গন্ধটা পাই সেটা মনকেমনের এটা কাউকে বোঝানো যাবে না কিন্তু মনকেমনের একটা গন্ধ আছে নাকে আসলে নাকটা অল্প জ্বালা করে সাথে শিরশিরে প্রথম শীতের হাওয়া এসব মিলিয়েই কথা বলতে ইচ্ছে করে কথা শুনতে ইচ্ছে করেএকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর কথোপকথনে ডুব দিতে ইচ্ছে করে তেমনটা আর হয়ে ওঠে কৈ!

 

হেমন্ত কেবলই আসন্ন দুর্দম শীতের আশঙ্কায় শঙ্কায়িত করে  

 

 

Sunday, 21 July 2024

ওকব্রুক পার্কের জানালা

ওকব্রুক পার্কের জানালায় আজ ভরা বর্ষা। কাল সারারাত ধরে ঝরে ঝরে সকালের দিকে ক্ষান্ত দিয়েছে। সকাল থেকে তাই রোদ্দুরের পাট নেই। ইদানিং অবশ্য মোতিমালার সকাল হচ্ছে খানিক দেরি করেই। সপ্তাহান্তের ছুটির দিনগুলিতে কাকভোরে উঠে চুপি চুপি একাই ঊষাকালটিকে জাপটে ধরে খানিক বুঁদ হয়ে উপভোগ করা হয়ে উঠেছে না। তেমন করে কিছুই হয়ে উঠছে না মোতির। নিজেকে সে ছেড়ে দিয়েছে। যা নিজে থেকে তার কাছে আসবে তা তার। নইলে নয়। জোর নেই তার কিছুতেই। তেমনই এই উষা বিলাসও, এই মেঘলা সকালও। চোখে মুখে জল দিয়ে বেরোলো যখন, তখন আর ভোর নেই। কটা চীনাবাদাম কাঠবিড়ালী আর পাখিদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে এসে বারান্দায় পা ছড়িয়ে একটা বই খুলে নিয়ে বসে হাঁ করে সামনের গাছগুলিতে দিকে তাকিয়েছিলো সে। তেমন যে কিছু একটা দেখছিলো তাও নয়। ওই আর কী। চেয়ে থাকা। কিছু দেখতে পাওয়ার আশায় নয়। কিছু দেখার আশায় চেয়ে থাকলে দ্রষ্টব্য সামনে আসে না। দর্শক নির্বিকার হলে বোধহয় দ্রষ্টব্যেরেও নিজেকে প্রকাশ করার তাগিদ জন্মায়। সামনের কটনউড গাছগুলো এখন সবুজ। সে চত্বরে রোদ্দুর উঠুক না উঠুক কাঠবেড়ালী আর পাখিদের ব্যস্ততার হেরফের হয় না তাতে সকালে। পাখিদের কনসার্ট হচ্ছিলো আজ। মোতির কান মন ভরে। মাথায় লাল পাগড়ী একজোড়া কাঠঠোকরা দুএকবার ইলেকট্রিক পোস্টের কাঠে ঠোক্কর মেরে গাছের মরা ডালটাতে বসে দাম্পত্য আলাপনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। গত সপ্তাহে এরকমই সকালে একটি রেড কার্ডিন্যালের স্ত্রী বাদাম নিতে এসেছিলো। মোতির ফোনের ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল সে। আজও দেখ না দেখ টুকটুকে লাল বরটিকে গাছের ডালে বসিয়ে রেখে তার বৌটি টুক করে বাদাম নিয়ে পালালো। আগের দিনেরটাই কিনা কে জানে! পুরুষটি তার রঙের জন্যই সহজে চোখে পড়ে। তাই হয়ত লাজুক বর বৌটিকে পাঠায় মানুষের উঠোনে। তার ঠিক পরেই এলেন একজন একাকী ব্লু জে. তিনিও একটি বাদাম নিলেন। তিনি গাছের দিকে গেলেন না।  অন্য দিকে চলে গেলেন। এঁর বাসা বোধকরি দূর পাড়ার কোনো গাছে। রেড কার্ডিন্যাল আর ব্লু জে রোজকার পাখি এখানকার। যদিও তাদের রূপের সঙ্গে এই নাম একেবারেই লাগসই লাগে না মোতির। মনে মনে মোতি তাদের নাম দিয়েছে লালকমল আর নীলকমল। কেমন রূপকথা রূপকথা নাম তাই না! কিছু পরে কাঠবেড়ালীদের সঙ্গে ঝটরপটর করতে করতে গাছে এলো একটি হলুদ পাখি। মোতি তার নাম জানে না। চেনা হলুদপাখি বেনেবৌ এর মতোই। অরিওলই হবে কোনো। যাই হোক ইনি আর নামলেন না নিচে। পড়া তেমন কিছু আর হলো না আজ মোতির। সামনের সবুজ ক্যানভাসে রঙের কাটাকুটি দেখতে সময় গেলো। কিছু পরে মোতি যখন দপ্তর গুটিয়ে ভেতরে ঢুকে এসেছে দিনের চাহিদা মেটাতে, তখন একটি গোবদা কাঠবেড়ালী উঠোন থেকে বাদাম নিয়ে এসে মোতির পাকঘরের জানালার সামনে বসে মুখে বাদাম নিয়ে মোতির কুশল নিয়ে গেল। 

তেমন কিছুই প্রত্যাশা ছিল না আজ সকালের কাছে মোতিমালার। তবুও সে ভিজিয়ে দিলো মোতিকে আজ। তাই তো মোতি তেমন করে আর কিছু চায় না।            

Tuesday, 4 June 2024

মনস্বিতা

সাতসকালে তখন আলোই ফোটেনি ভালো করে। ঘরের চাল থেকে শিশির চুঁইয়ে পড়ে পড়ে কেমন একটা বৃষ্টি ভেজা হয়ে রয়েছে ঘরের চারপাশের মাটি। কুয়াশা কুয়াশা সাদাটে আঁধার চারদিকে। আঁধার থেকে আলো ফোটার সেই সন্ধিক্ষণটা কোনোদিনই আর চোখে ধরে উঠতে পারেনি মেয়েটা। ঘুম ভেঙে চোখ কচলাতে কচলাতে কতদিন পুব আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে সময় গুনেছে সে। তারপর যেই না অধীর হয়ে একটু এদিক ওদিকে মন দিয়েছে অমনি সেই ফাঁকে আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। এর চাইতে বরং সূর্যাস্ত ভাল। আকাশে দোলখেলা চলে কতক্ষন ধরে! চেয়ে দেখলেও চলে, না দেখলেও। আসলে বোধহয় 'আঁধার আসছে' এই কথাটি মনে করিয়ে দিতেই আকাশের এত আয়োজন সাঁঝবেলায়। আর ভোরের সময় দেখো, চুপি চুপি ফাঁকি দিয়ে টুক করে কেমন একফাঁকে সুয্যিদেবের চলা শুরু। কিছুতেই তাঁর প্রথম পা ফেলাটাকে জাপটে জড়িয়ে নিতে পারেনা মেয়েটা। ঠাকুরদাদা শুনে একদিন হেসেই খুন। বলে, নাই বা দেখলি। এই যে আঁধার কেটে আকাশ ধূসর নীল থেকে পরিষ্কার হলো, এই যে আমার বুক থেকে ঘুম ভেঙে উঠে শুক সারি ঠোঁট দিয়ে পালক মেজে সারাদিনের প্রয়োজনের জন্য তৈরী হচ্ছে, এই যে তুই ঘুম ভেঙে উঠে খালি পায়ে শিশিরমাখা ঘাস মাড়িয়ে আমার সঙ্গে গপ্প করতে এলি রোদ্দুর ওঠার আগেই, এই যে রাত ফুরোলেই তোর কচি শিউলি গাছটা হাত পা নাড়িয়ে তোর জন্য দু-আঁচলা শিউলি ঝরিয়ে রাখে প্রতিদিন, সেবুঝি দিনের শুরু নয়? সুয্যিদেবের পথচলাটুকুনিই দেখলি নাতিন, এদের দেখলিনে? শেষরাতের শিশিরে স্নান সেরে ঠাকুরদাদা তৈরী সুয্যিদেবের অভ্যর্থনায়। তাকেও তাড়া লাগায়। নে নে এবার আলসেমি ছেড়ে ওঠ দিকিনি। স্নানে যা। পুবদিকে গোলাপি আবীর ছড়িয়ে লাল পাটের কাপড়টি উড়িয়ে দিয়ে সুয্যিদেব ততক্ষণে পুজোয় বসেছেন। হাতে পায়ের জট ছাড়িয়ে জোর করেই উঠতে হয় এবার মেয়েটাকে। আড়মোড়া ভেঙে ঠাকুরদাদা আর বাকিদেরকে "আসি গো" বলে পিছন ফিরতেই বাস্তব একরাশ তাড়াহুড়ো নিয়ে আক্রমণ করে মেয়েটাকে। 

প্রতিদিনের ঘুম ভাঙার পরের কিছুক্ষণ, যখন দিনের আগামী কয়েক ঘন্টার জীবনের দাবীদাওয়াকে থামিয়ে রাখে মেয়েটা সেই কিছুক্ষণ মেয়েটার কারো কাছে কোনো সম্পর্কের দায় থাকে না। নিজস্ব কোনো পরিচয়ের, এমনকি নামের পর্যন্ত প্রয়োজন পড়ে না। তখন সে পুবের জানালা ভেদ করে ঠাকুরদাদা গাছের কাছে অনায়াসে চলে যেতে পারে। মনে মনেই। শিশির মাখা ঘাসে হাঁটতে হাঁটতে ঠাকুরদাদার গায়ে হাত বুলিয়ে সমস্ত জমে থাকা প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। প্রতিদিন। তারপর আজকের মতোই শ্বাস ছেড়ে পিছন ফিরে সারাদিনের জন্য মেয়েটাকে ঢুকে পড়তে হয় প্রয়োজনীয়তার জীবনচক্রে। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করে নির্দিষ্ট দায়িত্ব, নির্দিষ্ট সম্পর্কের হিসেবনিকেশ। সেখানে রয়েছে তার ব্যক্তিগত পরিচয়ের এবং পৃথকীকরণের প্রধান উপকরণ, একটি নাম। প্রতিদিনের মত আজও সেই নামের দায়বহনের জন্য মেয়েটা পুবের জানালা থেকে ঘুরে দাঁড়ায় 'অহনা' নামের ভার নিয়ে।

সারাদিনের খাবার আর পিঠের পেটমোটা ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে দুরদাড়িয়ে হাঁটছিলো অহনা। সাড়ে আটটার আগে আজ ঢুকতেই হবে। সব গুছিয়ে এনিম্যাল হাউস থেকে খাঁচাগুলোকে এনে শুরু করতে করতে নয়টা তো বাজবেই। এর বেশি দেরি হলে পুরো কাজটাই পিছিয়ে যাবে। হাসপাতালের সামনে এসে হাতের মাস্কটা পরতে পরতে দেখলো একটা মাঝারি গোছের এম্বুলেন্স এসে দাঁড়িয়েছে মেন গেটে। অর্ধশায়িত অবস্থায় আচ্ছন্ন এক বয়স্ক মানুষ। ধরাধরি করে নামাচ্ছে গেটের আর এম্বুলেন্সের ডিউটিরত ছেলেদুটি। আড়চোখে দেখতে দেখতে অহনা দ্রুতপায়ে এগোচ্ছিল পিছনের গেটের দিকে। ওদিক দিয়েই আজকাল রিসার্চ উইংসের সকলের যাতায়াতের ব্যবস্থা। এলিভেটর যথারীতি বেশ কিছুটা দেরি করিয়ে দিলো ওর। হাঁপাতে হাঁপাতে পৌঁছালো যখন ল্যাবের ঘড়িতে তখন আটটা পঁয়ত্রিশ। ইশ! সকাল সকাল হুড়োহুড়ি করতে এক্কেবারে ভালো লাগে না। কি যে ঘুম থেকে উঠেই জানলা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা অভ্যাস তার! আরও মিনিট পনের আগে পৌঁছানো উচিৎ ছিল। শুধু শুধু দেরি হয়ে গেল। তাকে দেখেই নড়েচড়ে বসেছিল আইলিন। তার  জন্যই অপেক্ষা করছিলো। দুজন না হলে অসুবিধা এই কাজে।
"হাই আইলিন, গুড মর্নিং। সরি, লিটিল লেট্।"  পিঠ থেকে ব্যাগটা খুলতে খুলতে বলে অহনা।
" গুড মর্নিং। ইটস ওকে ডিয়ার। উই উইল বি ওকে। " -মুখে হাসি নিয়ে বলে ওঠে আইলিন।
"আমি তাহলে নিচে থেকে খাঁচাটা নিয়ে আসি। কোন রো-এর কত নম্বর খাঁচা নেব বলোতো?"- আইলিনের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় অহনা।
"দাঁড়াও, দাঁড়াও। তোমায় এখন বোঝাতে গেলে অনেক সময় লাগবে। আমি জানি কোন খাঁচাটা। তুমি বরং এদিকটা দেখো, আমি নিয়ে আসছি খাঁচা।"- আইলিন ডেস্ক থেকে ফোনটা নিয়ে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলে।
অহনার সুবিধাই হলো। আবার এখনই হাঁপাতে হাঁপাতে এনিম্যাল হাউসে ছুটতে হলোনা। সত্যিই আইলিন ইঁদুরগুলোর সার্বিক দায়িত্বে। ওর পক্ষে সহজ হবে ব্যাপারটা অনেক। মেয়েটা অনেক কাজ করে। অহনার "থ্যাংক ইউ আইলিন"  এর উত্তরে মাথা ঝাঁকিয়ে বেরিয়ে গেল আইলিন। অহনা ঝটপট হাতে গ্লাভস চড়িয়ে প্রয়োজনীয় টিউব, রিয়েজেন্ট, প্লেট, কাঁচি, ফরসেপ গুছিয়ে নিয়ে শেষ করলো যখন, তখনও আইলিন ফেরেনি এনিম্যাল হাউস থেকে। ঝুপ করে এনিম্যাল ওয়ার্ক টেবিলের সামনে বসে পড়লো অহনা। যতক্ষণ আইলিন না ফেরে একটু শ্বাস নিয়ে নেবে। সারাদিনের কাজ রয়েছে আজকে। সাতসকালে তাকে চেয়ারে বসে দুলতে দেখে পাশের ল্যাব থেকে রিয়াজ বলে ওঠে "কি সকাল সকাল বসে দোলা খাচ্ছেন যে? কাজ নাই?" আশে পাশে অন্য ভাষার কেউ না থাকলে রিয়াজ অহনার সাথে বাংলাতেই কথা বলে। "এই শুরু করবো।"- হেসে বলে অহনা। কয়েকদিন রিয়াজের সাথে তেমন কথা হয়নি কাজের চাপে। "তারপর করোনার কি অবস্থা বাংলাদেশে? বাড়িতে সব ঠিক আছে তো?" -একেবারেই এই কয়েকমিনিট সময় কাটাতে জিজ্ঞাসা করে অহনা। মুহূর্তে চোখের হাসিটা চলে গিয়ে মুখটা ছোট হয়ে যায় ছেলেটার।
"কোথায় আর ঠিক! বাড়িতে তো মুড়ি-মুড়কির মত মারা যাচ্ছে মানুষ।"
একেবারেই অকারণে সময় কাটাতে রিয়াজের সাথে কথা শুরু করেছিল অহনা। দিনের শুরুতেই এমন একটা উত্তরের জন্য তৈরি ছিল না সে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় কথাটা শুনে। তার ভেতর থেকে "কি বলছিস?" কথাটা বেরিয়ে আসে অজান্তেই। ততক্ষনে মাসি, মাসির ছেলে, কাকিমা আরো কার কার যেন করোনায় মৃত্যুর কথা পরপর বলে চলেছে ছেলেটা। গত দুই মাসে এতগুলি মানুষের অকাল মৃত্যুর সংবাদ বহন করেছে ছেলেটা বিদেশে বসে! হাসিখুশি ছেলেটিকে কোনোদিন দেখে বোঝেনি তো সে? অবশ্য তেমন করে কথা বলা হয়না। দুপক্ষেরই কাজের চাপে। "বাড়িতে ফোন দিতে ভয় পাই জানেন দিদি। মা-বাবা-র মানসিক অবস্থা যা!" - মাথা নিচু করে রিয়াজ।
এ কথা অহনাকে আর বলে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। গত এক বছরে তার বাড়িতেও ছয় জন মানুষ চলে গেছেন। সে কেবল কানে ফোন চেপে শূন্য দৃষ্টিতে শুনে গেছে। শেষের দুইজন অকালে তো বটেই, অকস্মাৎ দুর্ঘটনায়। খবরটা প্রথম আসে তারই কাছে। জীবনে প্রথমবার বাড়িতে এই সংবাদ তাকেই পৌঁছাতে হয়েছিল জনে জনে ফোনের এপারে বসে। কি করে সে পেরেছিলো আজও জানে না সে। মানুষের বোধহয় নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে আন্দাজ থাকে না ঠিকঠাক। সেও জানতো না, যে সে এত বড় হয়ে গেছে এই কয়বছরে। সারা ছোটবেলাটা যাঁদের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল, একবছরের মধ্যে পর পর এইভাবে তাঁদের ছয়জনের চলে যাওয়াকে সেও তো হজম করে ফেলছে আস্তে আস্তে! রিয়াজের মনের তোলপাড়টাকে চিনতে এতটুকু কষ্ট করতে হয়না তাকে। সে জানে রিয়াজ এই মুহূর্তে কতটা অসহায়। কিছুই বলতে পারে না সে রিয়াজকে। একটু এগিয়ে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে অহনা। ভেতরে ভেতরে তার ক্ষতটাও জেগে উঠছিলো, যেটা রিয়াজের সামনে প্রকাশ করতে চাইছিলো না অহনা। মাস্কের আড়ালে ঢোক গিলে গলার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাওয়া নিকট অতীতের কষ্টগুলোকে গিলে ফেলছিলো সে। হয়তো রিয়াজও একই ভাবে তাই করছিলো। এছাড়া কিই বা করতে পারে তারা। ভাঙতে ভাঙতে উঠে দাঁড়ানো ছাড়া!

অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা ভেঙে সেসময় ল্যাবের দরজাটা দুম করে বন্ধ হয়। অহনা আর রিয়াজ দুজনকেই ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাতে সেই মুহূর্তে আইলিন ফিরে এসেছে। হাতে একটা ইঁদুরের খাঁচা।
"হিয়ার ইট ইস।" - আইলিনের হালকা গলাটা ল্যাবে ফিরিয়ে আনে অহনাকে। হাতের পেন্সিলটা টেবিলের ওপর ঠুকতে ঠুকতে রিয়াজও স্মিত হাসার চেষ্টা করে। মুখের পেশীর বিশেষ পরিবর্তন দেখা যায় না যদিও। নিজের চেয়ারের দিকে ফিরে যায় রিয়াজ।
"আর ইউ রেডি হিয়ার? শ্যাল উই স্টার্ট দেন?" আইলিনের প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়ে অহনা। গ্লাভসের বাক্সটা যেন কোথায়? এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে অহনা বোঝে সে আসলে দেখছে না কিছুই। নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে টেবিলের দিকে ফিরে আসে। গ্লাভস পড়া হাতে খাঁচাটা খুলে ধরে অহনা। ভেতরে দুটো কালো ইঁদুর এককোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। ওরা জানে বোধহয় কি হতে চলেছে।অভ্যস্ত হাতে একজনের লেজ ধরে তুলে আনে অহনা।

"উইল ইউ পাশ মি দ্য কন্ট্রোল টিউবস প্লিজ?" বোঁ বোঁ করে হেপা ফিল্টারের ফ্যানের আওয়াজে আইলিনের বলা কথাটা হারিয়ে যাচ্ছিলো প্রায়? কোণাকুণি রাখা অন্য হুডটায় একরাশ টিউব সাজিয়ে বসেছিল আইলিন। হাত বাড়িয়ে টিউবের সারিটা আইলিনকে দিয়ে দেয় অহনা। প্রায় ঘন্টা দেড়েক কাজ করছে দুজনে তারা পাশাপাশি বসে যন্ত্রের মতো। একই প্রজেক্টের দুটো ডিরেক্শনের দুরকম এক্সপেরিমেন্টের দায়িত্বে ওরা দুজনে। এই প্রজেক্টটা আপাতত মাথা খাটানোর দরকার নেই বিশেষ। পর পর করে গেলেই হলো। মাথাটা তাই অন্যদিকে খাটানোর সুযোগ পাচ্ছে অহনা। এরকম লাক্সারি বিশেষ আসেনা অহনার। ফলে বেশ উপভোগ করছে ব্যাপারটা। কাজের শুরুটা ছাড়া। কাজের শুরুর ওই কোষগুলিকে জোগাড় করতে অহনাকে নিতে হয় একটি বা দুটি ইঁদুরের পায়ের হাড়। সেখান থেকে বাকি সব কিছু ফেলে দিয়ে অস্থিমজ্জা অংশটুকু বের করে নেওয়ার কাজটা একটুও উপভোগ করে না অহনা। তবুও ওকেই করতে হয় কাজটা। খারাপ-ভালো মিলিয়েই আদতে শেষের সবটা। এই শেষের সবটা ভালো হলেই বাকিটা মেনে নেওয়া যায়। এই নিয়ে টানাপোড়েনের উত্তর নেই অহনার কাছে।

কতবার সাঁঝের ঝোঁকে মুখ ঝুলিয়ে ঠাকুরদাদার কাছে প্রশ্ন নিয়ে এসেছে মেয়েটা। কেবল সবলতর বলেই কি দুর্বলতর প্রাণীর জীবনের নিয়ন্তা হওয়া যায় ঠাকুরদাদা? ঠাকুরদাদা মেয়েটার গায়ে কচি পাতার আলতো আদর করে, সন্ধ্যের বাতাস বুলিয়ে মাথার চুল যত্নে আঁচড়ে দিয়ে মেয়েটাকে শান্ত করেছে। বলেছে, সব কাজের ভালো-মন্দ হয়না রে নাতিন। কিছু কাজ কেবল কাজই। তুই না করলে অন্য কেউ করবে। কাজটা কেন করছিস সেটা ভাবিস বরং। এই 'কেন'টার উত্তর পেলে তখন নয় বিচার করতে বসিসখন আদতে তুই কাজের কাজ কিছু করলি নাকি পুরোটাই ফাঁকি? ঠাকুরদাদা যেন কী! কোনো কিছুতেই যেন 'নেই' দেখতে পায়না। ঠাকুরদাদার সাথে কথা কইলেই তাই মনটা আলো হয়ে যায় মেয়েটার। তাইতো ভোর থেকে সন্ধ্যে অবধি ঘুরঘুর করে মেয়েটা ঠাকুরদাদার আশেপাশে।মনে মনে সাজিয়ে নেওয়া তার নিজের বাগান। সেখানে ঠাকুরদাদা গাছ আছে, ভুলু আছে, একরাশ পাখপাখালি আছে। আর শান্ত একটি মন রাখা আছে মেয়েটার। সেই যে সাতসকালে এসে গপ্প জুড়েছে, তারপর তো ঠাকুরদাদা সকালের শিশিরে স্নান সেরে হাতে বুকে মাথার আনাচ কানাচ থেকে পাখিদের জাগাবে, পাতা থেকে খসিয়ে দেবে টুপটাপ শিশির জল। সেই জলে মুখ মাথা ধুয়ে জেগে উঠবে ঠাকুরদাদার প্রিয় পাখিরদল। সাথে সাথে কয়েকদিনের জন্য ঠাকুরদাদার কাঁধে এসে আস্তানা গেড়েছে ওই যে পরিযায়ী পাখিরা, ওরাও কিচিরমিচির জুড়ে দেয় সকালবেলা মেয়েটাকে দেখলেই। তবে সেসময় তাদের বড় তাড়া। গল্প হয়না বিশেষ। গল্প হয় সাঁঝের বাতি জ্বালার আগে তারা ফিরে এলে পর। এ ওর ডানা পালক থেকে কুটি-নাটি, পোকা-মাকড় বেছে পরিষ্কার করতে করতে সারাদিনের কত দিগ্বিজয়ের গল্প শোনায় তখন তারা মেয়েটাকে। মেয়েটা গোল গোল চোখে শোনে। সেসময় ভুলুটাও মশা এড়িয়ে মেয়েটার কোল ঘেঁষে বসে থাকে। আজও থাকে কি? থাকে নিশ্চয়ই! এসব গল্প ওর কানে যায়না অবশ্য। ওর এই একসঙ্গে জটপাকিয়ে বসে থাকতেই আনন্দ। ঠাকুরদাদাও সন্ধ্যের ঝোঁকে ঝিমোতে ঝিমোতে গপ্প শোনে কি শোনে না।

কান থেকে ফোনটা নামিয়ে অহনা আস্তে আস্তে হাঁটছিলো। বাড়ি ফিরে ভালো করে গরম জলে স্নান করে, রাতের মত খাওয়া সেরে আশেপাশেই এ-রাস্তা, সে-রাস্তা হেঁটে বেড়াচ্ছিল সে। সবে অন্ধকার হয়েছে। এই গরমের কটা দিনই এখানে এই উদ্দেশ্যহীন হেঁটে বেড়ানোর বিলাসিতা করা সম্ভব। সারাদিন বেজায় ব্যস্ততায় কেটেছে। আলো আঁধারিতে হেঁটে দিনের ক্লান্তি দূর করে অহনা। কথা বলতে ভালো লাগে না এসময়। তবুও ফোনের পর্দায় কিছু মানুষের নাম ফুটে উঠলে তাকে অহনা এড়াতে পারেনা। তেমনই একটি কথোপকথন শেষ করে হাঁটছিলো অহনা। ফোনের ওপাশে দীপ্ত। বলে যাচ্ছিলো হতাশার কথা। দেশ ছেড়ে ভালো করে বিজ্ঞান জানার বাসনায় সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যায় যেসব বোকা মানুষগুলো, বিদেশে যারা দ্বিতীয় ধাপের নাগরিক, আর বছর তিনেক বাদেই যারা আবিষ্কার করে - দেশেও তারা ততদিনে ব্রাত্য, তেমনই 'ঘরেও নহে পরেও নহে'-দের  একজন দীপ্ত। যেমন অহনাও। যেমন রিয়াজ। যেমন আরও আরও কত কত জন। ভালো করবার আশা নিয়ে স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছাড়ে। কেউ করে, কেউ আপাদমস্তক অতিসাধারণত্বের ভার নিয়ে দিনের পর দিন ঘুরে দাঁড়াবার স্বপ্ন বোনে। পুরোটাই অনিশ্চয়তা। অহনার চেয়ে অনেক বেশি বোধ নিয়ে এদেশে এসেছিলো দীপ্ত। অথচ থিতু হতেই পারলো না এখনো। গত পাঁচ বছরে তিন তিন বার ল্যাবের ঠিকানা বদল করতে হয়েছে দীপ্তকে। কখনো গবেষক নয় ঠিকে মজুরের মত দিনের পর দিন কাজ করে যাবার হতাশায়, কখনো কাজের প্রয়োজনীয় টাকাপয়সা জোগাড় না হওয়ায় ল্যাব ছেড়ে এসেছে, কখনো অনভিপ্রেত ল্যাব পলিটিক্সের শিকার হয়ে দীপ্তকে হাতে তৈরী সম্ভাবনাময় গবেষণা ছেড়ে আসতে হয়েছে। ছেলেটা প্রতিবার আশায় বুক বাঁধে। কিন্তু কিছুতে মন ডুবিয়ে কাজ করতে পারে না। অথচ পারলে হয়ত সত্যিকারের একটা কাজের কাজ হত। মনটা খারাপ হয়ে আছে অহনার। দেশে মা-বাবার বয়স এত কিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়ে চলেছে। আর তার সাথে বেড়ে চলেছে হতাশা। দীপ্ত ভেঙে পড়ছে এবার। প্রতিবারের মতোই এবারেও সাধ্যমত তাকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করেছে অহনা। কিন্তু সত্যিই কি যা বলছে, তা নিজেকে বোঝাতে পারছে অহনা?
তার মত অনেকেই অলস পায়ে হাঁটছে, বাচ্চাদের বা পোষ্যকে নিয়ে বা একাই, সাইকেল চালাচ্ছে। ঝিম ধরা পায়ে হাঁটতে হাঁটতে হোপ টাওয়ারটার পায়ের কাছে সিমেন্টের বেঞ্চটায় বসে পড়ে অহনা। কোথায় পৌঁছাচ্ছে সে বা দীপ্ত বা রিয়াজ বা তাদের মত আরো অনেকে? প্রতিদিনের সাধারণত্বকে মেনে নিতে নিতে ভুলেই যেতে বসেছে এর চেয়েও আর একটু সহজে আর একটু কম প্রতিকূলতায় ভালোবাসার কাজটা করা যেতে পারলে বেশ হতো। যাত্রাপথকে নাকি উপভোগ করতে হয় কিন্তু কোথাও পৌঁছোবার দায় না থাকলে যাত্রাপথ বলে কি কিছু থাকে? চলবার প্রয়োজনটাই অবান্তর নয় কি তখন? পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে উজিয়ে এসেছে তাদের মত কত কত মানুষ, যদিও কিছু জনের কাছে তারা এসেছে কেবলই কুবেরের ধন লাভ করবে বলে। তবুও দীপ্তর মতও কেউতো আছে যারা কেবল কাজটার শেষ দেখবে বলে, নিজের মনে জাগা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করবে বলে, নিজের বুদ্ধির অর্ধেক দাম নিয়ে, অর্ধেক মানুষ হয়ে, দিনের পর দিন চেষ্টা করে যাচ্ছে। মানুষের এই জিজ্ঞাসার পথের কাঁকড়, নুড়ি যদি খানিক কম হত! যদি প্রিয়জনের পাশে থেকেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কাজটা করা সম্ভব হতো! মাথা নিচু করে বসেছিল অহনা। 

মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় ঠাকুরদাদা। মনকেমনের ওষুধ নেই রে নাতিন। জীবনকে দুহাত পেতে গ্রহণ করতে হয়। স্রোতকে ঠেলতে গেলে সাঁতার কাটার সাহস, আর যা কোনোদিন হয়নি, তাকে করে দেখানোর উদ্যোগ লাগে। ভালো করে খুঁজে দেখ দিকি মনের ভিতরে, যা করতে চাস তা সত্যিই করতে চাস কিনা? তাহলে ঠিক তার পথ আপনিই খুঁজে পাবি। তারপর সেইমত সাহস করে এগিয়ে যা বরং আর কিচ্ছুটি ভাবিসনে মেয়ে। ভাবলেই ভয় পাবি। এখন যা দিকি সাঁঝের বেলায় পৃথিবী ঘুম যায় জানিসনে! পরের দিনের জন্য প্রস্তুত হতে হয়। তুইও যা মেয়ে। কালকের জন্য প্রস্তুত হয়ে নে বরং। মেয়েটা তবুও ঠাকুরদাদার কোল ঘেঁষে জড়ো হয়ে বসেই ছিল।  

কতক্ষণ বসে ছিল তার হিসেবে করেনি অহনা। শীত শীত করছে এবার। আশেপাশের লোকজনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় রাতের মত বাড়ি ফেরার কথা মনে পড়ে অহনার। হাতের চশমাটা চোখে লাগিয়ে নিয়ে একটা শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায় অহনা। পায়ে পায়ে চকচকে আলো মাখা ফেরার রাস্তাটার দিকে এগিয়ে যায় অহনা। সামনের দিক থেকে আসছেন একজন সাইকেল আরোহী। হেঁটে যাচ্ছেন আরও কয়েকজন। অহনা শুনলো, মধ্যবয়স্ক সাইকেল আরোহী প্রত্যেককে পেরিয়ে আসার সময় বলছেন, "গুড ডেস আর কামিং ফোকস, গুড ডেস আর কামিং।" অহনাকে পার হয়ে এগিয়ে যাবার সময় তাকেও বলে গেলেন "গুড ডেস আর কামিং ফ্রেন্ড।" অহনা হেসে মাথা নাড়লো। মনে মনে বললো, "হোপিং সো।"

ওপর দিকে ঘাড় তুলে তাকালো একবার। অন্ধকার কালো আকাশে হোপ টাওয়ারের সোনালী দেহটা আলোয় আলো মেখে মূর্তিমান স্পর্ধার মত দাঁড়িয়ে আছে। 'হোপ' মানেই তো স্রোতের বিপরীতে যাওয়ার স্পর্দ্ধা। 'আশা' করাটাই ঔদ্ধত্ব। প্রতিকূলতাকে বুক পেতে গ্রহণ করে, হেরে না যাওয়ার অঙ্গীকার।

হাতের ফোনটা টিং করে উঠলো। ফোনের পর্দায় আইলিনের ছোট্ট মেসেজ। "হেই, উই আর গেটিং টু মোর পেসেন্ট ব্লাড টুমোরো। চেক ইওর ইমেইল।" তারপর বেশ কয়েকটা উচ্ছসিত উল্লাসের ইমোজি।এদুটো হলেই ফেজ ওয়ানের সবকটা স্যাম্পল হয়ে যায়। স্নায়ু শিথিল, মুখের পেশী শিথিল। ঘুম পাচ্ছে এইবার অহনার। ইমেইলের ওপর আঙ্গুল ছোঁয়ায় অহনা বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতেই।

Sunday, 1 January 2023

"সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে"

"সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে"

অহংকার কথাটা বেজায় গোলমেলে। না থাকলে কাজকর্ম পন্ড। আবার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে গেলেই গন্ডগোল। উপনিষদ রচয়িতারা বলছেন অহং পঞ্চকোষের অংশমাত্র। আমি নই। আবার জড়জগতে কাজকর্ম চালাতে গেলে এই অহং বা বাইরের আমিটি না থাকলে চলে না। যেই বাইরের কাজ ফুরায় অমনি এই বাইরের আমিটিকে তখনকার মতন ঝেড়েঝুড়ে, পাট করে দেরাজে তুলে রেখে আসল আমিটিকে খুঁজতে ডুব দিতে হয় ভিতরপানে। উপনিষদ রচয়িতা ঋষিরা বলেছেন, রবীন্দ্রনাথও বলেছেন তাঁর গানে, বিবেকানন্দ বলেছেন তাঁর অজস্র বক্তৃতায়, বর্তমানে পাশ্চাত্যের দার্শনিকরাও বলছেন। আবার নব্যযুগের কোয়ান্টাম ফিজিসিস্ট বা কসমোলোজিস্টরাও তেমনই কিছু একটা বলবো বলবো করছেন। উপনিষদ যাকে 'আমি' বলেছেন, 'ব্রহ্ম' বলেছেন, চৈতন্য বা চেতনা বলেছেন, আজকের কোয়ান্টাম ফিজিসিস্ট বা কসমোলোজিস্টরা তাকেই 'Consciousness' বা 'Qualia' বলছেন। এতদিন পর্যন্ত অধিকাংশ পাশ্চাত্যের বৈজ্ঞানিকরা consciousness যে মস্তিস্কপ্রসূত একটি অলীক 'বস্তু'-এই বলে গলা ফাটাতেন,  তাঁদেরই কিছু জন ধীরে ধীরে এতদিনের প্রাচ্যের বলা কথার সারবত্তা বুঝেছেন। বলছেন, যেহেতু Qualia বা Consciousness ফার্স্ট পার্সন এক্সপেরিয়েন্স তৈরী করে, সেহেতু সেটি বস্তু বা জড়জগতের অংশ হতে পারে না বা বস্তুজগৎ থেকে উৎপন্নও হতে পারে না। এবং সেই একই কারণে মস্তিস্ক দ্বারা উৎপন্নও হতে পারে না। বাহিরের যন্ত্রপাতি দিয়ে তাকে ধরা তো যায়ই না। মন, মস্তিক এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা এটি প্রকাশিত হয় মাত্র। অর্থাৎ সেই বাইরের আমির বোধটুকু তৈরী করে মাত্র। শরীর মরে ক্ষয়ে, মন মরে নিজের জ্বালায়। যা কিছু ঝড়-ঝাপ্টা সবই ওই বাইরের আমির। আসল আমিটি দিব্য মজায় থাকে। Untouched . 

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন 'সুন্দর', রামকৃষ্ণ বলেছেন 'চৈতন্য', বেদান্ত বলেছেন 'ব্রহ্ম'। আবার শিব, কালী  বা কৃষ্ণ ভক্ত বলেছেন 'শিব', 'কালী', বা 'কৃষ্ণ'। এখন এই আদত আমিটি নতুন নাম পেয়েছে। Qualia বা Consciousness. যা আমাকে আমি বলে বোধ করাচ্ছে। নামে কী যায় আসে! আসল কথাটি হলো মনে ভার নেমে যাওয়া। এই যে দিন-দুবেলা সে কেন আমার সাথে এমন ভাবে কথা কইলো? ও কেন এমন দেখনদারী করলে? ও কেন আমায় যার পর নাই সম্মান করলে না। ইত্যাদি আর যা কিছু হাবিজাবির ভার বয়ে বয়ে মনে ব্যাথা হলো, উত্তেজনায় রক্তচাপ বেড়ে শরীর ক্ষয় হলো,  সেসব বেশ নামিয়ে রেখে খোলা হাওয়ায় শ্বাস নেওয়া যাচ্ছে এই বা কম কী? যদিও তুমি, আমি, বাকি সকলে আদতে একই- এসব কথাও বড়রা বলেন, তবুও নয় সেসব এখনকার জন্য বাদই রাখলাম।     

এই সেদিন একজায়গায় দেখলাম বড়বড় হরফে লেখা রয়েছে "Relax! Enjoy the show!"  এইটি তারপর থেকে বড় মনে ধরেছে। মনে পড়লেই বেশ গায়ে এক খাবলা সর্ষের তেল মেখে নাইতে নেমেছি এমন একটা অনুভব হয়। তুমি আমার ওপর চেঁচাবে? চেঁচাও। মনে লাগবে, কিন্তু আসল আমিটিকে তুমিতো ছুঁতে পারলে না! তেল ভেদ করে গায়ে লাগলে তবে তো!  মনের ওপরের জল চোখের জলের গামছায় মুছে নিলেই হলো। বাইরের 'আমি'র শান্তি। "সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে।" 

এই যে দিনে-দুপুরে-সন্ধ্যায়-রাত্তিরে বাইরের এই আমিটিকে সাজিয়ে গুছিয়ে পরিবেশন করার এত আয়োজন, পান থেকে চুন খসলেই হয় চোখের জল নয় মনের ঝাল,  একদিন তো তার প্রয়োজন ফুরোবেই। তখন যে বাহির ফেলে ভেতরে ঢুকতে হবেই। তখন কী আর তোমার আমার পার্থক্য থাকবে? আজ যাকে দেখে আড়ালে রসিকতা করে আনন্দ পাচ্ছো, আজ যার অনিচ্ছাকৃত ভুলে সমালোচনার অশ্বমেধ ছোটাচ্ছো, আজ যাকে ঠিক নিজের মতোই নয় বলে দূরে ঠেলে রাখছো, সেদিন তার আর তোমার মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পাবে তো? নিজেই নিজেকে অপমান করার লজ্জা সেদিন তোমায় রাঙিয়ে দেবে না তো? সেই যে, "নিজেরে করিতে গৌরব দান, নিজেরে কেবলই করি অপমান।"

তার চেয়ে বরং এই ভালো।এই যে প্রতিদিন 'বেঁচে থাকা'র মতন দুর্দান্ত একখান অভিজ্ঞতা হচ্ছে সেটিকে তো সাপ্টে উপভোগ করতে হবে নাকি? কে বলতে পারে কাল সকালে চা খাবার সৌভাগ্য হয় কি না হয়! সুতরাং, নতুন বছরে " Relax, enjoy the show".  Happy তো এমনিই হয়ে যাবে বছরটা। 

Sunday, 13 February 2022

বেয়াদব মন

শিশির নামে ক্লান্ত কাঁধ বেয়ে। অযত্নের লালচে চুলের ডগায় জমেছে রুক্ষতা। চিড় ধরেছে। দ্বন্ধ হয়েছে বৃদ্ধি। শিশিরে ভিজেও রুক্ষতা ঘোচেনা তার। মাঝরাতের মেঘহীন আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে ভোর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে কি ধীরে ধীরে গলে যাবে সমস্ত দীর্ঘ্যশ্বাস? অর্ধেকটা প্রশ্বাস নিতে নিতে আর অর্ধেকটা নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে ক্রমশঃ কমে যাচ্ছে হৃদযন্ত্র এবং ফুসফুসের ক্ষমতা। প্রকাশ্যে আসে না এসব কথা। অহেতুক দুঃখ বিলাসিতা বলে একলা মানুষকে আরও একলা করে দেবে বাকিসব আত্মপ্রত্যয়ী মানুষেরা। সকলেরই ভাগ না করে নেবার মতন কিছু যন্ত্রণা থাকে। থাকে কোনো সমাধান না থাকা সমস্যা। থাকে অনিবার্য ক্ষয়। সেসবই ক্লান্তি হয়ে নেমে আসে ঘাড়-পিঠ-চুল বেয়ে। এবং তৎক্ষণাৎ সেসব মনের খোরাক হয়ে যায়। 

মনের কাজই হলো এতটুকু তিলপ্রমাণ বাধার সন্ধান পেলেই তাকে বিশ্বব্যাপী দুর্লঙ্ঘ্য বাধা বলে প্রক্ষেপ করা। তবুও মনের চলনে লাগাম পরানো যায় না। আবার ভালোর সন্ধান পেলে সেই মনই বলে - এই তো বেশ শান্তি! দৈবিক, আধিদৈবিক, আধিভৌতিক সমস্ত পার্থিব যন্ত্রণার ওপরে উঠে মন ঠান্ডা হয়ে আসে। এই যেমন ঘরে ঢুকলেই একটা স্নায়ু শান্তিকর সুগন্ধ আসে নাকে। একটা সুগন্ধী মোমবাতি জ্বলছে কয়েকদিন ধরে। কয়েকদিন বলতে সন্ধ্যায় জ্বলে, রাতে ঘুমোতে যাবার আগে নিভিয়ে দেওয়া হয়। এমন যদি হতো সবকিছুই! এই মনে করো, মন ঠান্ডা করার আয়োজন রইলো হাতের কাছেই সারাদিন ধরে, প্রয়োজন মতো জ্বালিয়ে নেওয়া যেত! এইসব আবোল-তাবোল ভাবনায় সন্ধ্যা কেটে যায়। উদ্যোগী কর্মযোগীরা এরকম পড়ে পাওয়া সন্ধ্যায় কত কীই না করে। বিন্দু বিন্দু কর্ম যোগ করে করে সাগর তৈরী করে। আর আমি বসে এতোল-বেতোল ভেবে মরি। তার মধ্যেই কখন সন্ধ্যে ফুরিয়ে রাত নেমে আসে! এমন করে সাগর কেন, ডোবাও তৈরী হয়না। অবশ্য মাঝে মাঝে ভাবি, এমন কীই বা রয়েছে যা দিয়ে কিছু করা যায়! আমি তো কর্মযোগী নই। এই যে কত কিছুই না ঘটে চলেছে চারিপাশ জুড়ে তার একখানি বেশ সমঝদার শ্রোতা-দর্শক তো চাই। নইলে স্রষ্টা এবং সৃষ্টির উপলক্ষই যে মাটি। আবার মনে হয়, এসব ভাবনা আসলে অলস মনের চলন। যার বেয়াদপিতে আদত আমিটিকেই বেমালুম ভুলতে বসেছি। কাজ না করবার বাহানায় নিজেকেই ফাঁকি দিচ্ছি। হবেও বা। প্রতিদিনের অজস্র খুচরো দাবি মেটাতে গিয়ে প্রধান কাজটিতেই পড়েছে ফাঁকি। মনের এইসব খেলায় ভুলে ছোট ছোট আনন্দের নুড়ি দিয়ে ঝোলা ভরে নিয়ে, সাগরের ঢেউয়ের দোলায় দোলবার বিপুল প্রাণময়তাটিকেই জলাঞ্জলি দিয়ে এইবার ফিরবার সময় হতে চললো। 

সাগরের কথায় মনে পড়লো, একবার একজন গাইছিলেন -"রূপগঞ্জের হাটে আইসা...., পরের কথাগুলি আর মনে নেই। তখন বসে ভাবছিলাম, "রূপসাগর, রূপগঞ্জ, রূপনগর... শব্দকোষের এসব আউলিয়া শব্দ মানবজীবন বা ভবসংসারে মানুষের ক্ষণিকের অবস্থান বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু 'রূপ' কথাটা সবেতেই রয়েছে। "রূপ" কেন? একটু ভেবে কিছু মানে বের করতে পারছিলাম না। মাথা দিয়ে সেরকম ভাবে ভাবছিলাম না হয়তো। একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, হয়তো রূপ মানে সৃষ্টি বা ক্রিয়েশন অর্থে ব্যবহার করা হয়। এই যে চোখ খুললেই আমরা এত কিছু দেখছি এবং প্রায় সমস্ত কিছুর মধ্যেই এত সৌন্দর্য্য, সেই কারণেই হয়তো রূপ কথাটা ব্যবহার করা হয়। কথাটা মনে ধরলো। রূপসাগরের রূপক সত্যিই বেশ পরিচিত। আসলে আউলিয়া বা সুফী সাধকদের অল্প কথায়, সহজ সুরে, সাধারণ জীবনযাত্রার রূপক ব্যবহার করে অনন্ত এক সত্যের কথা বলে যাওয়াটা আমাদের মতন দেশের বিশাল সংখ্যক মানুষদের জন্য অজান্তেই আধ্যাত্মিকতার একটা সুর বেঁধে রেখে দিয়েছে। আজকালের এই পল্লবগ্রাহীতার যুগে আধ্যাত্মিকতার কথা বললে অবশ্য অনেকেই ধর্মীয় বাধা নিষেধ ইত্যাদির প্রসঙ্গ তুলে অনর্থক তর্ক করবেন। অথচ তিনি নিজেও ছোটবেলায় শুনেছেন, একটা বয়স পর্যন্ত মনে মনে বিশ্বাস করেছেন, পালন করেছেন এমন কিছু নিয়ম, যা তৈরী হয়েছিল বিস্তারিত একটি সত্যজ্ঞানকে, লালন করার মতো একটি অভ্যাসকে সাধারণ নিয়মের নাম দিয়ে সকলের মধ্যে দিয়ে যুগ যুগ ধরে বয়ে নিয়ে যাবার সাধু উদ্দেশ্যে। 

এসব ভেবে সন্ধ্যে পার করি। এসব ভাবনার না আছে আদি, না আছে অন্ত। শুধু ভাবনার ভেলায় হাল-দাঁড়হীন দিগভ্রান্তের মতো ভেসে চলা। মনের হাতছানিতে ভেসে চলার যে মারাত্মক নেশা, যাঁর আছে সে জানে। চারিপাশের সমস্ত কিছুকে দশেন্দ্রিয় মন্থন করে আদ্যন্ত শুষে নিয়ে, মন আর বুদ্ধির ক্ষুদ্রতা দিয়ে সাধ্যমত বিশ্লেষণ করে, অহং -এর ভ্রান্ত রং মিশিয়ে চিত্তাকাশে যে ছবিটি প্রতি মুহূর্তে রচিত হয়ে চলেছে, তার কত শতাংশ যে আদতে সত্য- তা বোঝার ক্ষমতা বেচারি মনের আর রইলো না। সে বেশ রঙিন একটি ছবি দেখে এবং দেখিয়েই তার দায় শেষ করলো। এখন এই বিপুল ছবি থেকে সত্য-মিথ্যা বাছাই করতে করতে এবং তদসংক্রান্ত অনুভূতির প্রকাশ সামাল দিতে দিতেই 'আমি' বেচারির দিন গেল। আসল সমে আর ঠিক সময়ে তালটি পড়লো না। মনকে শাসন করে এ নেশা কাটিয়ে বেরিয়ে আসা কঠিন। মানসলোকের একটি তিল থেকে কখন যে তাল, আর সে তাল থেকে কখন যে চোখের সামনে ভুলের একটি বিশাল ইমারত তৈরী হয়ে বসবে বোঝার উপায়টি রইবে না। ভালোর ভালোটিকে বাড়াবে না, কেবল কালোর কালোকে মিশকালো করে তুলবে। এমনই বেয়াদব মন!